আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 248)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 248)



হরকত ছাড়া:

وقال لهم نبيهم إن آية ملكه أن يأتيكم التابوت فيه سكينة من ربكم وبقية مما ترك آل موسى وآل هارون تحمله الملائكة إن في ذلك لآية لكم إن كنتم مؤمنين ﴿٢٤٨﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَ لَهُمْ نَبِیُّهُمْ اِنَّ اٰیَۃَ مُلْکِهٖۤ اَنْ یَّاْتِیَکُمُ التَّابُوْتُ فِیْهِ سَکِیْنَۃٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ بَقِیَّۃٌ مِّمَّا تَرَکَ اٰلُ مُوْسٰی وَ اٰلُ هٰرُوْنَ تَحْمِلُهُ الْمَلٰٓئِکَۃُ ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً لَّکُمْ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ ﴿۲۴۸﴾




উচ্চারণ: ওয়াকা-লা লাহুম নাবিইয়ুহুম ইন্না আ-য়াতা মুলকিহী আই ইয়া’তিয়াকুমুত্তা-বূতু ফীহি ছাকীনাতুম মির রাব্বিকুম ওয়া বাকিইইয়াতুম মিম্মা-তারাকা আ-লুমূছা-ওয়া আ-লু হা-রূনা তাহমিলুহুমুল মালাইকাতু ইন্না ফী যা-লিকা লাআ-য়াতাল্লাকুম ইন কুনতুম মু’মিনীন।




আল বায়ান: আর তাদেরকে তাদের নবী বলল, নিশ্চয় তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট তাবূত* আসবে, যাতে থাকবে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে প্রশান্তি এবং মূসার পরিবার ও হারূনের পরিবার যা রেখে গিয়েছে তার অবশিষ্ট, যা বহন করে আনবে ফেরেশতাগণ। নিশ্চয় তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য নিদর্শন, যদি তোমরা মুমিন হও।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪৮. আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট তাবূত(১) আসবে যাতে তোমাদের রব-এর নিকট হতে প্রশান্তি এবং মুসা ও হারূন বংশীয়গণ যা পরিত্যাগ করেছে তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে নিশ্চয় তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের নাবী তাদেরকে বলল, তালুতের বাদশাহ হওয়ার নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট সিন্দুক আসবে, যার মধ্যে তোমাদের প্রতিপালকের শান্তি বাণী রয়েছে এবং সেই অবশিষ্ট জিনিস, যা মূসা ও হারূন সম্প্রদায় রেখে গেছে, ওটা ফেরেশতাগণ উঠিয়ে আনবে, এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে যদি তোমরা মু’মিন হও।




আহসানুল বায়ান: (২৪৮) তাদের নবী তাদেরকে আরও বলল, নিশ্চয় তাঁর রাজত্বের সুস্পষ্ট নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট একটি সিন্দুক আসবে;[1] যাতে আছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য প্রশান্তি এবং কিছু পরিত্যক্ত জিনিস যা মূসা ও হারুনের বংশধরগণ রেখে গেছে; ফিরিশতাগণ সেটি বহন করে আনবে। নিশ্চয় এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।



মুজিবুর রহমান: এবং তাদের নাবী তাদের বলেছিলঃ তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট সিন্দুক সমাগত হবে, যাতে থাকবে তোমাদের রবের নিকট হতে শান্তি এবং মূসা ও হারুনের পরিবারের (পরিত্যক্ত) কিছু সামগ্রী, মালাইকা/ফেরেশতা ওটা বহন করে আনবে, তোমরা যদি বিশ্বাস স্থাপনকারী হও তাহলে ওর মধ্যে নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।



ফযলুর রহমান: তাদের নবী তাদেরকে আরো বলেছিলেন, “তার (তালূতের) রাজা হওয়ার লক্ষণ এই যে, তোমাদের কাছে সিন্দুক আসবে, যাতে থাকবে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে আসা প্রশান্তির উপকরণ এবং মূসা ও হারূনের বংশধরদের রেখে যাওয়া জিনিসপত্রের কিছু অবশিষ্টাংশ। ফেরেশতারা সেটি বহন করে আনবে। তোমরা যদি (প্রকৃত) ঈমানদার হও তাহলে এতে তোমাদের জন্য অবশ্যই একটি নিদর্শন আছে।”



মুহিউদ্দিন খান: বনী-ইসরাঈলদেরকে তাদের নবী আরো বললেন, তালূতের নেতৃত্বের চিহ্ন হলো এই যে, তোমাদের কাছে একটা সিন্দুক আসবে তোমাদের পালকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের মনের সন্তুষ্টির নিমিত্তে। আর তাতে থাকবে মূসা, হারুন এবং তাঁদের সন্তানবর্গের পরিত্যক্ত কিছু সামগ্রী। সিন্দুকটিকে বয়ে আনবে ফেরেশতারা। তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তাহলে এতে তোমাদের জন্য নিশ্চিতই পরিপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে।



জহুরুল হক: আর তাদের নবী তাদের বলেছিলেন -- "নিঃসন্দেহ তার রাজত্বের লক্ষণ এই যে তোমাদের কাছে আসবে 'তাবুত’ যাতে আছে তোমাদের প্রভুর তরফ থেকে প্রশান্তি, এবং মূসার বংশধরেরা ও হারূনের অনুগামীরা যা ছেড়ে গেছেন তার শ্রেষ্ঠাংশ, -- তা বহন করছে ফিরিশ্‌তারা। নিঃসন্দেহ এতে আছে তোমাদের জন্য নিদর্শন যদি তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাকো।



Sahih International: And their prophet said to them, "Indeed, a sign of his kingship is that the chest will come to you in which is assurance from your Lord and a remnant of what the family of Moses and the family of Aaron had left, carried by the angels. Indeed in that is a sign for you, if you are believers."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪৮. আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট তাবূত(১) আসবে যাতে তোমাদের রব-এর নিকট হতে প্রশান্তি এবং মুসা ও হারূন বংশীয়গণ যা পরিত্যাগ করেছে তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে নিশ্চয় তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।


তাফসীর:

(১) বনী ইসরাঈলদের মধ্যে একটি সিন্দুক পূর্ব থেকেই ছিল, তা বংশানুক্রমে চলে আসছিল। তাতে মূসা আলাইহিস সালাম ও অন্যান্য নবীগণের পরিত্যক্ত কিছু বরকতপূর্ণ বস্তুসামগ্রী রক্ষিত ছিল। বনী ইসরাঈলরা যুদ্ধের সময় এ সিন্দুকটিকে সামনে রাখত, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে বিজয়ী করতেন। জালুত ইসরাঈল-বংশধরদেরকে পরাজিত করে এ সিন্দুকটি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ যখন এ সিন্দুক ফিরিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন অবস্থা দাঁড়ালো এই যে, কাফেররা যেখানেই সিন্দুকটি রাখে, সেখানেই দেখা দেয় মহামারী ও অন্যান্য বিপদাপদ। এমনিভাবে পাঁচটি শহর ধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে অতিষ্ঠ হয়ে দুটি গরুর উপর সেটি উঠিয়ে হাকিয়ে দিল। ফেরেশতাগণ গরুগুলোকে তাড়া করে এনে তালুতের দরজায় পৌছে দিলেন। ইসরাঈল-বংশধররা এ নিদর্শন দেখে তালুতের রাজত্বের প্রতি আস্থা স্থাপন করল এবং তালুত জালুতের উপর আক্রমণ পরিচালনা করলেন। [তাফসীরে বাগভী: ১/২৩০, আল-মুহাররারুল ওয়াজীয: ১/৩৩৩]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৪৮) তাদের নবী তাদেরকে আরও বলল, নিশ্চয় তাঁর রাজত্বের সুস্পষ্ট নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট একটি সিন্দুক আসবে;[1] যাতে আছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য প্রশান্তি এবং কিছু পরিত্যক্ত জিনিস যা মূসা ও হারুনের বংশধরগণ রেখে গেছে; ফিরিশতাগণ সেটি বহন করে আনবে। নিশ্চয় এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।


তাফসীর:

[1] সিন্দুক অর্থাৎ, তাবূত বা শবাধার। تابوت শব্দটি توب ধাতু থেকে গঠিত। যার অর্থ হল, প্রত্যাবর্তন করা। যেহেতু বানী-ইস্রাঈল বরকত অর্জনের জন্য এর প্রতি প্রত্যাবর্তন করত, তাই এর নাম তাবূত রাখা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) এই সিন্দুকে মূসা এবং হারূন (আলাইহিমাসসালাম)-এর বরকতময় কিছু জিনিস ছিল। এই সিন্দুকও তাঁদের শত্রুরা তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ নিদর্শনস্বরূপ ফিরিশতাদের মাধ্যমে এই সিন্দুক ত্বালুতের দরজায় পৌঁছিয়ে দিলেন। তা দেখে বানী-ইস্রাঈল আনন্দিতও হল এবং মেনেও নিল যে, এটি ত্বালূতের রাজত্ব প্রমাণের জন্য আল্লাহ কর্তৃক নিদর্শন। অনুরূপ মহান আল্লাহ এটিকে তাদের জন্য একটি অলৌকিক নিদর্শন এবং বিজয় লাভের ও তাদের মনের প্রশান্তির উপকরণ করেন। মনের প্রশান্তির অর্থই হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর খাস বান্দাদের উপর এমন বিশেষ সাহায্যের অবতরণ, যার কারণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে যখন বড় বড় সিংহের মত বীরদের অন্তর কেঁপে ওঠে, তখন ঈমানদারদের অন্তর শত্রুর ভয় থেকে শূন্য এবং বিজয় ও সফলতা অর্জনের আশায় পরিপূর্ণ থাকে।

এই কাহিনী থেকে জানা যায় যে, আম্বিয়া ও সালেহীনদের বরকতময় জিনিসের মধ্যে নিঃসন্দেহে আল্লাহর অনুমতিক্রমে গুরুত্ব ও উপকারিতা আছে। তবে শর্ত হল এই যে, তা সত্যপক্ষেই বরকতময় (এবং নবীদের ব্যবহূত) হতে হবে; যেমন উক্ত তাবূতে নিঃসন্দেহে মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালামের কিছু বরকতময় জিনিস রাখা ছিল। বলা বাহুল্য, মিথ্যা দাবীর ফলে কোন জিনিস বরকতময় হয়ে যায় না। যেমন বর্তমানে বরকতময় জিনিসের নামে কয়েক জায়গায় বিভিন্ন জিনিস রাখা আছে, অথচ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তার সত্যতার কোন প্রমাণ মিলে না। অনুরূপ মনগড়াভাবে কোন জিনিসকে বরকতময় বানিয়ে নিলে, তাও কোন উপকারে আসে না। যেমন কিছু লোক মহানবী (সাঃ)-এর বরকতময় জুতার মূর্তি বানিয়ে নিজের পাশে রাখে অথবা বাড়ির দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখে অথবা বিশেষ পদ্ধতিতে তা ব্যবহার করার মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ ও বিপদ দূর হবে বলে মনে করে থাকে। এইভাবে কবরে বুযুর্গদের নামে নিবেদিত নযর ও নিয়াযের জিনিসকে এবং তবরুকের খানাকে অনেকে বরকতময় মনে করে থাকে। অথচ এ হল গায়রুল্লাহর নামে নিবেদন ও অমূলক বিশ্বাস; যা শিরকের আওতাভুক্ত। এই শ্রেণীর খাবার খাওয়া নিঃসন্দেহে হারাম। কোন কোন কবরের গোসল দেওয়া হয় এবং তার পানিকে বরকতময় মনে করা হয়। অথচ কবরের গোসল দান কা’বাগৃহের গোসল দেওয়ার নকল; যা বৈধই নয়। পক্ষান্তরে গোসলে ব্যবহূত এ নোংরা পানি কিভাবে বরকতময় হতে পারে? বলাই বাহুল্য যে, এ শ্রেণীর অমূলক বিশ্বাস ও বরকত বা তবরুকের ধারণা ভ্রান্ত ও শিরক; ইসলামী শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৪৬-২৫২ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর পরবর্তী যুগের একটি জাতির ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সাগরডুবি থেকে নাজাত পেয়ে মূসা ও হারূন (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিয়ে শামে এসে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পিতৃভূমি ফিলিস্তীন ফিরে গিয়ে আমালেকা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তা পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হল, সাথে এ ওয়াদাও দেয়া হল- যুদ্ধ করলেই বিজয় দান করা হবে (সূরা মায়িদাহ ৫:২৩)। কিন্তু তারা মূসা (আঃ)-কে পরিস্কার জানিয়ে দিল- ‘তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম’(সূরা মায়িদাহ ৫:২৪)। ফলে শাস্তিস্বরূপ তারা তীহ ময়দানে ৪০ বছর উ™£ান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকল। পরে ইউশা বিন নূনের নেতৃত্বে ফিলিস্তীন দখল করা হলেও বানী ইসরাঈল পুনরায় বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয় এবং নানাবিধ অনাচারে লিপ্ত হয়। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর পুনরায় আমালেকা জাতি চাপিয়ে দেন। বানী ইসরাঈলরা আবার নিগৃহীত হতে থাকে। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। এক সময় শামাবীল (شمويل) নাবীর যুগ আসে। তারা এ নাবীর কাছে একজন বাদশা নির্ধারণের দাবি জানাল যাতে তার নেতৃত্বে পূর্বের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে এবং বর্তমান দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের দাবি মতে নেতা হিসেবে তালূতকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তারা তালূতকে মেনে নেয়নি। কারণ তালূত ঐ বংশের ছিল না যে বংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বানী ইসরাঈলের নেতৃত্বের আগমন ঘটেছে। তিনি একজন দরিদ্র ও সাধারণ সৈনিক ছিলেন। তাই তারা আয়াতে বর্ণিত অভিযোগ আনল।



বিষয়টি হল- বানী ইসরাঈলের নিকট একটি সিন্দুক ছিল। যার মধ্যে তাদের নাবী মূসা ও হারূন (আঃ) এবং তাদের পরিবারের ব্যবহৃত কিছু পরিত্যক্ত সামগ্রী ছিল। তারা এটাকে খুবই বরকতময় মনে করত এবং যুদ্ধকালে একে সম্মুকে রাখত। একবার আমালেকাদের সাথে যুদ্ধের সময় বানী ইসরাঈল পরাজিত হলে আমালেকাদের বাদশা জালূত উক্ত সিন্দুকটি নিয়ে যায়। এক্ষণে যখন বানী ইসরাঈলগণ পুনরায় জিহাদের সংকল্প করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে উক্ত সিন্দুক ফিরিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। অতঃপর এ সিন্দুকটির মাধ্যমে তাদের মধ্যকার নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়ার নিসরন করেন। সিন্দুকটি তালূতের বাড়িতে আগমনের ঘটনা এই যে, জালূতের নির্দেশে কাফিররা যেখানেই সিন্দুকটি রাখে, সেখানেই দেখা দেয় মহামারী ও অন্যান্য বিপদাপদ শুরু হয়ে যায়। এমনিভাবে তাদের পাঁচটি শহর ধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে অতিষ্ট হয়ে তারা একে তার প্রকৃত মালিকের কাছে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিল এবং গরুর গাড়িতে উঠিয়ে হাঁকিয়ে দিল। তখন ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশক্রমে গরুর গাড়িটি তাড়িয়ে এনে তালূতের ঘরের সম্মুখে রেখে দিল। বানী ইসরাঈল এ দৃশ্য দেখে সবাই একবাক্যে তালূতের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করল। অতঃপর তালূত আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি নেন। সকল প্রস্তুতি শেষ হলে কথিত মতে ৮০,০০০ হাজার সেনা নিয়ে রওনা হন। অল্প বয়স্ক তরুণ দাউদ (আঃ) ছিলেন উক্ত সেনা দলের সদস্য। পথিমধ্যে সেনাপতি তালূত তাদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। সম্মুখেই ছিল এক নদী। মৌসুম ছিল প্রচণ্ড গরমের। পিপাসায় ছিল সবাই কাতর। তাই তিনি বললেন,



(مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهَرٍ)



‘তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন’এ নদীটি হল জর্ডান ও প্যালেস্টাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বস্তুত নদী পার হওয়া অল্প সংখ্যক ঈমানদার ব্যতীত সকলেই পানি পান করেছিল, যাদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন, যা বদর যুদ্ধে মুসলিম যুদ্ধাদের সংখ্যা ছিল। যারা পানি পান করেছিল তারা আলস্যে ঘুমিয়ে পড়ে। এ স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তালূত শৌর্য-বীর্যের প্রতীক আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চললেন। বস্তুবাদীদের হিসেবে এটা ছিল নিতান্তই আত্মহননের শামিল, একটি অসম যুদ্ধ।



(وَلَمَّا بَرَزُوْا لِجَالُوْتَ وَجُنُوْدِه)



‘আর যখন তারা জালূত ও তার সৈন্যদের মুখোমুুখি হল’জালূত ছিল শত্র“দলের সেনাপতি। তালূত ও তাঁর সঙ্গীরা জালূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। এরা ছিল আমালিকা জাতি। তৎকালীন সময়ে তারা বড় দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধবাজ ছিল। তাই এ যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে নিল। আল্লাহ তা‘আলার সহযোগিতায় তারা সংখ্যায় অল্প হলেও জয় লাভ করল।



(وَقَتَلَ دَاو۫دُ جَالُوْتَ)



‘দাঊদ (আঃ) জালূতকে হত্যা করল’তখন দাঊদ (আঃ) নাবী ছিলেন না। তালূতের একজন সাধারণ সৈন্য ছিলেন। পরে আল্লাহ তা‘আলা তাকে নবুওয়াত ও রাজত্ব উভয়টি দান করলেন।



এসব ঘটনা বর্ণনা করার দু’টি উদ্দেশ্য:



(১) শিক্ষা গ্রহণ, (২) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ। কেননা; তিনি এ সব ঘটনা কোন কিতাবে পড়েননি এবং কারো কাছে শোনেননি। বরং অতীতের এসব ঘটনা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে ওয়াহীর মাধ্যমে অবগত করেছেন। সেজন্য শেষে আল্লাহ তা‘আলা বললেন:



(إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ)



“নিশ্চয়ই তুমি রাসূলগণের অন্যতম একজন।”(সূরা ইয়াসীন ৩৬:২)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. শরীয়তসম্মত জিহাদের শর্ত হল শরীয়তসম্মত ইমাম থাকতে হবে।

২. রাসূলদের ব্যবহৃত জিনিস দ্বারা বরকত নেয়া জায়েয। তবে কোন পীর-ফকির বাবা ইত্যাদি ব্যক্তির থেকে নয়। এটা শুধু রাসূলদের সাথে সীমাবদ্ধ।

৩. ঈমানদার যুদ্ধে গেলে পিছপা হয় না।

৪. মুনাফিকরা যুদ্ধের জন্য খুব আগ্রহ দেখাবে কিন্তু ফরয হলে বা সরাসরি মোকাবেলার সময় হলে পালাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: নবী (আঃ) তাদেরকে বলেন- ‘তালূতের রাজত্বের প্রথম বরকতের নিদর্শন এই যে, শান্তিতে পরিপূর্ণ হারানো তাবৃত তোমরা পেয়ে যাবে। যার ভিতরে রয়েছে পদমর্যাদা, সম্মান, মহিমা, স্নেহ, ও করুণা। তার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী যা তোমরা ভালভাবেই জান। কেউ কেউ বলেন যে, ‘সাকীনা’ ছিল সোনার একটি বড় থালা যাতে নবীদের (আঃ) অন্তরসমূহ ধৌত করা হতো। ওটা হযরত মূসা (আঃ) প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তার মধ্যে তিনি তাওরাতের তক্ত রাখতেন। কেউ কেউ বলেন যে,মানুষের মুখের মত ওর মুখও ছিল, আত্মাও ছিল, বায়ুও ছিল, দু'টি মাথা ছিল, দু’টি পাখা ছিল এবং লেজও ছিল ।

অহাব (রঃ) বলেন যে, ওটা মৃত বিড়ালের মস্তক ছিল। যখন ওটা তাবুতের মধ্যে কথা বলতো তখন জনগণের সাহায্য প্রাপ্তির বিশ্বাস হয়ে যেতো এবং যুদ্ধে তারা জয়লাভ করতো। এই উক্তিও রয়েছে যে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একটা আত্মা ছিল। যখন বানী ইসরাঈলের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হতো কিংবা কোন খবর তারা জানতে না পারতো তখন সেটা তা বলে দিতো। হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারুন (আঃ)-এর অনুচরদের অবশিষ্ট অংশ’-এর ভাবার্থ হচ্ছে কাঠ, তাওরাতের তক্তা, মান্ন' এবং তাদের কিছু কাপড় ও জুতো।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ফেরেশতাগণ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল দিয়ে ঐ তালূতকে উঠিয়ে জনগণের সামনে নিয়ে আনেন এবং হযরত তালূত বাদশাহর সামনে রেখে দেন। তার নিকট তালূতকে দেখে লোকদের নবীর (আঃ) নবুওয়াত ও তালূতের রাজত্বের উপর পূর্ণ বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এটাকে গাভীর উপরে করে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন যে, কাফিরেরা যখন ইয়াহূদীদের উপর জয়যুক্ত হয় তখন তারা ‘সাকিনার সিন্দুককে তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং উরাইহা' নামক জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাদের বড় প্রতিমাটির পায়ের নীচে রেখে দেয়। কাফিরেরা সকালে তাদের মূর্তি ঘরে গিয়ে দেখে যে, মূর্তিটি নীচে রয়েছে এবং সিন্দুকটি তার মাথার উপরে রয়েছে। তারা পুনরায় মূর্তিটিকে উপরে ও সিন্দুকটিকে নীচে রেখে দেয়। কিন্তু পরদিন সকালে গিয়ে আবার ঐ অবস্থাতে দেখতে পায়। পুনরায় তারা মূর্তিটিকে উপরে করে দেয়। কিন্তু আবার সকালে গিয়ে দেখে যে, প্রতিমা ভাঙ্গা অবস্থায় একদিকে পড়ে রয়েছে। তখন তারা বুঝতে পারে যে, এটা বিশ্ব প্রভুরই ইঙ্গিত। তখন তারা সিন্দুকটিকে তথা হতে নিয়ে গিয়ে অন্য একটি ছোট গ্রামে রেখে দেয়। এ গ্রামে এক মহামারী রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

অবশেষে তথায় বন্দিনী বানী ইসরাঈলের একটি স্ত্রী লোক তাদেরকে বলেঃ ‘তোমরা এই সিন্দুকটি বানী ইসরাঈলের নিকট পৌছিয়ে দিলে এই মহামারী থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। সুতরাং তারা তাবূতটি দুটি গাভীর উপর উঠিয়ে দিয়ে বানী ইসরাঈলের শহরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। শহরের নিকটবর্তী হয়ে গাভী দু’টি রশি ছিড়ে পালিয়ে যায় এবং তাবৃতটি ওখানেই পড়ে থাকে। অতঃপর বানী ইসরাঈল ওটা নিয়ে আসে।

কেউ কেউ বলেন যে, দু'টি যুবক ওটা পৌছিয়ে দিয়েছিল। এও বলা হয়েছে যে, এটা প্যালেস্তাইনের গ্রামসমূহের একটি গ্রামে ছিল। গ্রামটির নাম ছিল ‘আযদাওয়াহ্'। এরপর নবী (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘আমার নবুওয়াত ও তালূতের রাজত্বের এটাও একটি প্রমাণ যে, যদি তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর তবে ফেরেশতাগণ তাবূতটি পৌছিয়ে দিয়ে যাবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।