আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 121)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 121)



হরকত ছাড়া:

الذين آتيناهم الكتاب يتلونه حق تلاوته أولئك يؤمنون به ومن يكفر به فأولئك هم الخاسرون ﴿١٢١﴾




হরকত সহ:

اَلَّذِیْنَ اٰتَیْنٰهُمُ الْکِتٰبَ یَتْلُوْنَهٗ حَقَّ تِلَاوَتِهٖ ؕ اُولٰٓئِکَ یُؤْمِنُوْنَ بِهٖ ؕ وَ مَنْ یَّکْفُرْ بِهٖ فَاُولٰٓئِکَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ ﴿۱۲۱﴾




উচ্চারণ: আল্লাযীনা আ-তাইনা-হুমুল কিতা-বা ইয়াতলূনাহূ হাক্কা তিলা-ওয়াতিহী উলাইকা ইউ’মিনূনা বিহী ওয়া মাইঁ ইয়াকফুর বিহী ফাউলাইকা হুমুল খা-ছিরূন।




আল বায়ান: যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা পাঠ করে যথার্থভাবে। তারাই তার প্রতি ঈমান আনে। আর যে তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২১. যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি(১), তাদের মধ্যে যারা যথাযথভাবে তা তিলাওয়াত করে(২), তারা তাতে ঈমান আনে। আর যারা তার সাথে কুফরী করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা যথাযথভাবে কিতাব তিলাওয়াত করে, তারাই এতে বিশ্বাস পোষণ করে আর যারা এর প্রতি অবিশ্বাস করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।




আহসানুল বায়ান: ১২১। আমি যাদেরকে কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) দান করেছি [1] তারা যথাযথভাবে তা (ধর্মগ্রন্থ) পাঠ করে থাকে। [2] তারাই তাতে (ধর্মগ্রন্থ) বিশ্বাস করে। আর যারা তা অমান্য করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [3]



মুজিবুর রহমান: আমি যাদেরকে যে ধর্মগ্রন্থ দান করেছি তা যারা সঠিকভাবে সত্য বুঝে পাঠ করে তারাই এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী, এবং যে কেহ এটা অবিশ্বাস করে ফলতঃ তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।



ফযলুর রহমান: আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, (তাদের মধ্যে) যারা তা যথার্থভাবে পাঠ করে তারা তা বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।



মুহিউদ্দিন খান: আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।



জহুরুল হক: যাদের আমরা গ্রন্থ দিয়েছি তারা উহার তিলাওতের ন্যায্যতা মোতাবেক উহা অধ্যয়ন করে। তারাই এতে ঈমান এনেছে। আর যারা এতে অবিশ্বাস পোষণ করে তারা নিজেরাই হয় ক্ষতিগ্রস্ত।



Sahih International: Those to whom We have given the Book recite it with its true recital. They [are the ones who] believe in it. And whoever disbelieves in it - it is they who are the losers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১২১. যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি(১), তাদের মধ্যে যারা যথাযথভাবে তা তিলাওয়াত করে(২), তারা তাতে ঈমান আনে। আর যারা তার সাথে কুফরী করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।


তাফসীর:

(১) কাতাদাহ বলেন, এখানে ইয়াহুদী ও নাসারাদের বুঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের বুঝানো হয়েছে। [ইবনে কাসীর]


(২) যথাযথভাবে তিলাওয়াতের অর্থ, তিলাওয়াতের হক আদায় করা। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এর অর্থ যখন জান্নাতের বর্ণনা আসবে তখন আল্লাহ তা'আলার কাছে জান্নাত চাওয়া। আর জাহান্নামের বর্ণনা আসলে জাহান্নাম থেকে নিস্কৃতি চাওয়া। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এর অর্থ, এগুলোর হালালকে হালাল হিসেবে নেয়া। আর হারামকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করা। যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে পড়া। সেগুলোর কোন অংশকে বিকৃত না করা এবং সঠিক ব্যাখ্যার বিপরীতে কোন বাজে ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করা।

মোটকথা: আল্লাহর আয়াতকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করাই এর যথাযথ তেলাওয়াত বলে বিবেচিত হবে। [ইবনে কাসীর] যথাযথ তেলাওয়াতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান আনা এবং তার যাবতীয় আদেশ নিষেধ বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়া। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ করে বলছি, ইয়াহুদী ও নাসারাদের যে কেউ আমার কথা শোনার পর আমার উপর ঈমান আনবে না, সে অবশ্যই জাহান্নামে যাবে”। [মুসলিম: ১১৫৩]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১২১। আমি যাদেরকে কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) দান করেছি [1] তারা যথাযথভাবে তা (ধর্মগ্রন্থ) পাঠ করে থাকে। [2] তারাই তাতে (ধর্মগ্রন্থ) বিশ্বাস করে। আর যারা তা অমান্য করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [3]


তাফসীর:

[1] আহলে-কিতাবের অযোগ্য উত্তরসুরিদের নিকৃষ্ট চরিত্র ও কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয় আলোচনার পর তাদের মধ্যে যে কিছু সৎ ও উন্নত চরিত্রের লোক ছিল, এই আয়াতে তাদের গুণাবলী এবং তারা যে মুমিন ছিল সেই সংবাদ দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন সালাম এবং আরো কিছু অন্য লোক ছিলেন। ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে এদেরকেই ইসলাম কবুল করার তাওফীক হয়েছিল।

[2] তারা যথাযথভাবে তা পাঠ করে (তারা তার হক আদায় করে তেলাঅত করে) এর কয়েকটি অর্থ বলা হয়েছে। যেমনঃ (ক) অত্যধিক একাগ্রতা ও মনোযোগের সাথে পড়ে। জান্নাতের কথা এলে জান্নাত কামনা করে এবং জাহান্নামের কথা এলে তা থেকে পানাহ চেয়ে নেয়। (খ) তার হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম মনে করে এবং আল্লাহর কালামের কোন বিকৃতি ঘটায় না। (যেমন, ইয়াহুদীরা করত।) (গ) এতে যা কিছু লেখা আছে, তা সবই লোকমাঝে প্রচার করে, এর কোন কিছুই গোপন করে না। (৪) এর সুস্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর আমল করে, অস্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর ঈমান রাখে এবং যে কথাগুলো বুঝে আসে না, তা আলেমদের মাধ্যমে বুঝে নেয়। (ঘ) এর প্রত্যেকটি কথার অনুসরণ করে। (ফাতহুল ক্বাদীর) বস্তুতঃ (উল্লিখিত) সব অর্থই যথাযথভাবে তেলাঅতের আওতায় পড়ে। আর হিদায়াত এমন লোকদের ভাগ্যেই জুটে, যারা উল্লিখিত কথাগুলির প্রতি যত্ন নেয়।

[3] আহলে-কিতাবের মধ্যে যে নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনবে না, সে জাহান্নামে যাবে। যেমন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২০-১২১ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানরা যত ছলনা, প্রশ্ন ইত্যাদি করছে সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য হল- তারা তো তোমার ধর্মের অনুসারী হবেই না বরং তুমি যাতে তাদের ধর্মের অনুসারী হয়ে যাও এটাই তারা চায়। যদি তাদের ধর্মাবলম্বী হয়ে যাও তাহলে তোমার প্রতি তাদের কোন অভিযোগ থাকবে না এবং তারা তোমার প্রতি খুব খুশি হবে।



আল্লাহ তা‘আলা তাদের জবাব রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শিখিয়ে দিচ্ছেন- বল, আমি যে দীন ইসলামের ওপর আছি তা-ই সঠিক।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ধমক দিয়ে বলছেন, যদি তোমার কাছে ওয়াহী আসার পরও তাদের কুপ্রবৃত্তির অনুসারী হও তাহলে তোমার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার কোন অভিভাবকত্ব থাকবে না।



আজও ইয়াহূদী-খ্রিস্টানরা মুসলিমদেরকে সঠিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার জন্য নানা পাঁয়তারা ও কৌশল অবলম্বন করছে। মনে রাখতে হবে মুসলিমদের প্রধান শত্র“ ইয়াহূদীরা ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই মুসলিমদের ক্ষতি করার জন্য পেছনে লেগে আছে, কয়েকবার নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করার অপচেষ্টাও চালিয়েছিল, তাদের কোন থাকার জায়গা ছিলনা, মুসলিমরাই তাদেরকে থাকার একটু জায়গা দিয়েছে, এখন তারা মুসলিমদেরকে চ্যালেঞ্জ করছে। সুতরাং সাবধান! তারা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ থেকে দূরে সরানোর জন্য সংস্কৃতির নামে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, লেবাস-পোষাক ও উৎসব নিয়ে আসবে, আমরা যেন কোনক্রমেই তাদের ধোঁকায় না পড়ি।



(اَلَّذِيْنَ اٰتَيْنٰهُمُ الْكِتٰبَ يَتْلُوْنَه۫)



‘আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি’অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মধ্যে যেমন খারাপ চরিত্রের লোক ছিল তেমনি ভাল লোকও ছিল, যারা ধর্মগ্রন্থ তেলাওয়াত করত। যেমন আব্দুল্লাহ বিন সালাম, ওহাব বিন মুনাব্বাহসহ আরো অনেক ইয়াহূদী যারা ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক পেয়েছিলেন।



(حَقَّ تِلَاوَتِه۪) –



‘সত্যভাবে বুঝার মত পাঠ করে’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে নাযিল করেছেন সেভাবে তেলাওয়াত করে। যখন জান্নাতের সুখ-শাস্তি সম্বলিত আয়াত তেলাওয়াত করে তখন জান্নাত চায়। আর যখন জাহান্নামের শাস্তি সম্বলিত আয়াত তেলাওয়াত করে তখন তা থেকে মুক্তি চায়। যথাযথ জানা ও মানার চেষ্টা করে। যথা-



মুহকাম আয়াতের ওপর আমল করে এবং মুতাশাবাহ আয়াতের ওপর বিশ্বাস রাখে। যা সমস্যা মনে হয় তা আলেমদের কাছে সোপর্দ করে। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড, ৩৫৫)



এরাই হল সৌভাগ্যবান যারা আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে চিনতে পেরেছে এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় করেছে, সকল নাবীর প্রতি ঈমান এনেছে, ঈমান আনার ক্ষেত্রে তাদের মাঝে কোন পার্থক্য করেনি; এরাই প্রকৃত মু’মিন। এদেরই উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَلَّذِیْنَ اٰتَیْنٰھُمُ الْکِتٰبَ مِنْ قَبْلِھ۪ ھُمْ بِھ۪ یُؤْمِنُوْنَﮃوَاِذَا یُتْلٰی عَلَیْھِمْ قَالُوْٓا اٰمَنَّا بِھ۪ٓ اِنَّھُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّنَآ اِنَّا کُنَّا مِنْ قَبْلِھ۪ مُسْلِمِیْنَﮄاُولٰ۬ئِکَ یُؤْتَوْنَ اَجْرَھُمْ مَّرَّتَیْنِ بِمَا صَبَرُوْا وَیَدْرَءُوْنَ بِالْحَسَنَةِ السَّیِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنٰھُمْ یُنْفِقُوْنَ)‏



“তার পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা তাতে বিশ্বাস করে। যখন তাদের নিকট তা আবৃত্তি করা হয় তখন তারা বলে, ‘আমরা এতে ঈমান আনি, এটা আমাদের প্রতিপালক হতে আগত সত্য। আমরা তো পূর্বেও আত্মসমর্পণকারী ছিলাম; তাদেরকে দু‘বার প্রতিদান প্রদান করা হবে, যেহেতু তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভাল দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করে ও আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা হতে তারা ব্যয় করে।”(সূরা কাসাস ২৮:৫২-৫৪)



পক্ষান্তরে আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবে না তারা কাফির, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَن يَّكْفُرْ بِه۪ مِنَ الأَحْزَابِ فَالنَّارُ مَوْعِدُه۫)



“যারা একে অস্বীকার করে, জাহান্নামই তাদের প্রতিশ্র“ত স্থান।”(সূরা হুদ ১১:১৭)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ ولايَهُودِي وَلاَ نَصْرَانِيٌّ ثُم لَا يُؤْمِنُ بِي إِلاَّ دَخَلَ النَّارِ



(রাঃ) সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! এ উম্মাতের মধ্যে যে কেউ ইয়াহূদী হোক বা খ্রিস্টান হোক আমার নির্দেশ শোনার পর আমার প্রতি ঈমান আনল না সে জাহান্নামে যাবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৪০)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মুসলিমদের প্রধান শত্র“ ইয়াহূদী, তারা চায় মুসলিমরা সঠিক ধর্ম থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।

২. যারা ইসলাম ধর্মের অনুশাসন যথাযথ মেনে চলে তাদের জন্য সুসংবাদ।

৩. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের পর যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে না তারা কাফির ও জাহান্নামের অধিবাসী।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১২০-১২১ নং আয়াতের তাফসীর

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সান্ত্বনা প্রদান

উপরোক্ত আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) এ সব ইয়াহুদী ও নাসারা কখনও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। সুতরাং তুমিও তাদের পরিত্যাগ কর এবং তোমার প্রভুর সন্তুষ্টির পিছনে লেগে যাও। তাদের প্রতি রিসালাতের দাওয়াত পৌছিয়ে দাও সত্য ধর্ম ওটাই যা আল্লাহ তাআলা তোমাকে প্রদান করেছেন। ওটাকে আঁকড়ে ধরে থাক।'

হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে অন্যদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে থাকবে এবং বিজয় লাভ করবে। অবশেষে কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নবীকে (সঃ) ধমকের সুরে বলেনঃ “হে নবী (স)! কখনও তুমি তাদের। সন্তুষ্টির জন্যে ও তাদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে স্বীয় ধর্মকে দুর্বল করে দিও না, তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না এবং তাদেরকে মেনে নিও না।` এ আয়াত থেকে ধর্মশাস্ত্রবিদগণ এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কুফরী একটিই ধর্ম। ওটা ইয়াহুদী ধর্মই হোক বা খ্রীষ্টান ধর্মই হোক অথবা অন্য কোন ধর্মই হোক না কেন। কেননা (আরবি) শব্দটিকে এখানে এক বচনেই এনেছেন। যেমন এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে তোমাদের ধর্ম আর আমার জন্যে আমার ধর্ম।”

এই দলীলের উপর এই ধর্মীয় নীতির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে যে, মুসলমান ও কাফির পরম্পর উত্তরাধিকারী হতে পারে না এবং কাফিরেরা পরস্পর একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে। তারা দুজন একই শ্রেণীর কাফিরই হোক বা বিভিন্ন শ্রেণীর কাফিরই হোক না কেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) একটি বর্ণনায় এই উক্তি রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম মালিকের এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে যে, দুই বিভিন্ন মাযহাবের কাফির একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসেও এটাই রয়েছে।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা সত্যভাবে বুঝবার মত করে পাঠ করে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বুঝান হয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহচরবৃন্দকে (রাঃ) বুঝান হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, সত্য ভাবে পাঠ করার অর্থ হচ্ছে জান্নাতের বর্ণনার সময় জান্নাতের প্রার্থনা এবং জাহান্নামের বর্ণনার সময় জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করা। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, স্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর আমল করা ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনা এবং কঠিন বিষয়গুলো আলেমদের কাছে পেশ করাই হচ্ছে। তিলাওয়াতের হক আদায় করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর ভাবার্থ সত্যের অনুসরণ’ও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তিলাওয়াতের অর্থ হচ্ছে আনুগত্য। যেমন (আরবি) (৯১:২) এর মধ্যে। একটি মারফু হাদীসেও এর এ অর্থই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ সঠিক হলেও এর কোন কোন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের অনুসরণকারী জান্নাতের উদ্যানে অবতরণকারী।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পাঠের নিয়ম

হযরত উমারের (রাঃ) তাফসীর অনুসারে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রহমতের বর্ণনাযুক্ত কোন আয়াত পাঠ করতেন তখন থেমে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট রহমত চাইতেন আর যখন কোন শাস্তির আয়াত পড়তেন তখন থেমে গিয়ে তার নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

তারপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঐ সব লোকেই বিশ্বাস স্থাপন করছে', অর্থাৎকিতাবীদের মধ্যে যারা নিজেদের কিতাব বুঝে পাঠ করে তারা কুরআন মাজীদের উপর ঈমান আনতে বাধ্য হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি জরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর এবং তাদের প্রভুর পক্ষ হতে তাদের উপর অবতারিত কিতাবের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতো তবে তারা তাদের উপর হতে এবং পায়ের নীচে হতে আহার্য পেতো।'

আল্লাহ রাব্বল আলামীন অন্যত্র বলেনঃ হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে এবং তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে তোমাদের উপর অবতারিত কিতাবকে প্রতিষ্ঠিত না করো সে পর্যন্ত তোমরা কোন কিছুর উপরই নও।' অর্থাৎ তোমাদের অবশ্য কর্তব্য এই যে, তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআন কারীমের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ওগুলোর মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবগুলোকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর গুণাবলীর বর্ণনা, তার অনুসরণের নির্দেশ এবং তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করার বর্ণনা ইত্যাদি সব কিছুই ঐ সব কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।

এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিরক্ষর নবীর (সঃ) আনুগত্য স্বীকার করে, যার বর্ণনা ও সত্যতা তারা তাদের কিতাব তাওরাত' ও ইঞ্জীল’-এর মধ্যেও লিখিত দেখতে পায়। আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “হে নবী সঃ তুমি বল অেমরা এর উপর (কুরআন কারীমের উপর) বিশ্বাস স্থাপন কর কিংবা নাই কর (কোন ক্ষতি নাই); এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, যখন এ কুরআন মজীদ তাদের সামনে পঠিত হতে থাকে, তখন তারা চিবুকের উপর সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে-আমাদের প্রভু পবিত্র! নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়ে থাকে। অন্যত্র ঘোষিত হয়েছেঃ “যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছি তারা এর উপরও ঈমান এনে থাকে। যখন তাদের উপর এ কিতাব পাঠ করা হয় তখন তারা তাদের ঈমানের স্বীকারোক্তি কবুতঃ বলে আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য, আমরা এর পূর্ব হতেই মুসলমান ছিলাম। এদেরকেই দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, ভাল দ্বারা মন্দকে সরিয়ে দিয়েছিল এবং আমার প্রদত্ত আহার্য হতে দান করেছিল।

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “কিতাব প্রাপ্তদেরকে বলে দাও-তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করছো? যদি তারা মেনে নেয় তবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়েছে, আর ফদি না মানে তবে তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌঁছিয়ে দেয়া এবং আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেছেন যে, একে অমান্যকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউই এর সাথে কুফরী করবে তার প্রতিশ্রুত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (১১:১৭) বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার আয়ত্বাধীনে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যে কেউই ইয়াহূদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক আমার কথা শুনার পরেও আমার উপর ঈমান আনে না সে দোযখে প্রবেশ করবে।'





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।