সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 120)
হরকত ছাড়া:
ولن ترضى عنك اليهود ولا النصارى حتى تتبع ملتهم قل إن هدى الله هو الهدى ولئن اتبعت أهواءهم بعد الذي جاءك من العلم ما لك من الله من ولي ولا نصير ﴿١٢٠﴾
হরকত সহ:
وَ لَنْ تَرْضٰی عَنْکَ الْیَهُوْدُ وَ لَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ ؕ قُلْ اِنَّ هُدَی اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰی ؕ وَ لَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ بَعْدَ الَّذِیْ جَآءَکَ مِنَ الْعِلْمِ ۙ مَا لَکَ مِنَ اللّٰهِ مِنْ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیْرٍ ﴿۱۲۰﴾ؔ
উচ্চারণ: ওয়ালান তারদা-‘আনকাল ইয়াহূদু ওয়ালান নাসা-রা-হাত্তা-তাত্তাবি‘আ মিল্লাতাহুম কূল ইন্না হুদাল্লা-হি হুওয়াল হুদা-ওয়ালাইনিত্তাবা‘তা আহওয়াআহুম বা‘দাল্লাযী জাআকা মিনাল ‘ইলমি মা-লাকা মিনাল্লা-হি মিওঁ ওয়ালিইয়ূওঁ ওয়ালা-নাসীর।
আল বায়ান: আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহর হিদায়াতই হিদায়াত’ আর যদি তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে তার পর, তাহলে আল্লাহর বিপরীতে তোমার কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২০. আর ইয়াহুদী ও নাসারারা আপনার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ করেন। বলুন নিশ্চয় আল্লাহর হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত। আর যদি আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কোন অভিভাবক থাকবে না এবং থাকবে না কোন সাহায্যকারীও।
তাইসীরুল ক্বুরআন: ইয়াহূদী ও নাসারারা তোমার প্রতি রাজী হবে না যে পর্যন্ত না তুমি তাদের ধর্মের আদর্শ গ্রহণ কর। বল, ‘আল্লাহর দেখানো পথই প্রকৃত সুপথ এবং তুমি যদি জ্ঞান আসার পরেও এদের ইচ্ছে অনুযায়ী চল, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহর ক্রোধ হতে রক্ষা করার মত কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না’।
আহসানুল বায়ান: ১২০। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা তোমার প্রতি কখনও সন্তুষ্ট হবে না; যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর।[1] বল, ‘আল্লাহর পথ-নির্দেশ (ইসলাম)ই হল প্রকৃত পথ-নির্দেশ (সুপথ)।’ [2] তোমার নিকট আগত জ্ঞানপ্রাপ্তির পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহর বিপক্ষে তোমার কোন অভিভাবক থাকবে না এবং সাহায্যকারীও থাকবে না। [3]
মুজিবুর রহমান: এবং ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা - তুমি তাদের ধর্ম অনুসরণ না করা পর্যন্ত তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেনা; তুমি বলঃ আল্লাহর প্রদর্শিত পথই সুপথ; এবং জ্ঞান প্রাপ্তির পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর তাহলে আল্লাহ হতে তোমার জন্য কোনই অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।
ফযলুর রহমান: ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কখনো তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ কর। বলে দাও, “আল্লাহর পথই হচ্ছে সঠিক পথ।” আর তোমার কাছে জ্ঞান (কোরআন) আসার পরও যদি তুমি তাদের অভিলাষ অনুসারে চল, তাহলে আল্লাহর বিপক্ষে তোমার কোন বন্ধু কিংবা সাহায্যকারী থাকবে না।
মুহিউদ্দিন খান: ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই।
জহুরুল হক: আর ইহুদীরা কখনো তোমার উপরে সন্তষ্ট হবে না, খ্রীষ্টানরাও নয়, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মমত অনুসরণ কর। তাদের বলো -- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্র যা হেদায়ত তাই-ই হেদায়ত। আর তুমি যদি তাদের ইচ্ছার অনুসরণ কর তোমার কাছে জ্ঞানের যা এসেছে তার পরে, তাহলে আল্লাহর কাছ থেকে তুমি পাবে না কোনো বন্ধু-বান্ধব, না কোনো সাহায্যকারী।
Sahih International: And never will the Jews or the Christians approve of you until you follow their religion. Say, "Indeed, the guidance of Allah is the [only] guidance." If you were to follow their desires after what has come to you of knowledge, you would have against Allah no protector or helper.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১২০. আর ইয়াহুদী ও নাসারারা আপনার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ করেন। বলুন নিশ্চয় আল্লাহর হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত। আর যদি আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কোন অভিভাবক থাকবে না এবং থাকবে না কোন সাহায্যকারীও।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ১২০। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা তোমার প্রতি কখনও সন্তুষ্ট হবে না; যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর।[1] বল, ‘আল্লাহর পথ-নির্দেশ (ইসলাম)ই হল প্রকৃত পথ-নির্দেশ (সুপথ)।’ [2] তোমার নিকট আগত জ্ঞানপ্রাপ্তির পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহর বিপক্ষে তোমার কোন অভিভাবক থাকবে না এবং সাহায্যকারীও থাকবে না। [3]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, ইয়াহুদী অথবা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ না কর।
[2] যা বর্তমানে 'ইসলাম' আকারে বিদ্যমান এবং যার প্রতি নবী করীম (সাঃ) দাওয়াত দিয়েছেন। বিকৃত ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্ম নয়।
[3] এখানে ধমকি দেওয়া হচ্ছে যে, যদি জ্ঞান আসার পরেও তুমি ঐ শ্রেণীর ভ্রষ্ট লোকদেরকে কেবল সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের আনুগত্য কর, তাহলে তোমার কোন সাহায্যকারী থাকবে না। এখানে আসলে উম্মতে মুহাম্মাদীকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে যে, বিদআতী ও ভ্রষ্ট লোকদের সন্তুষ্টি লাভের জন্য তারা যেন এমন কাজ না করে এবং কোন দ্বীনী ব্যাপারে তোষামোদ ও তার অযথা অপব্যাখ্যা না করে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১২০-১২১ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানরা যত ছলনা, প্রশ্ন ইত্যাদি করছে সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য হল- তারা তো তোমার ধর্মের অনুসারী হবেই না বরং তুমি যাতে তাদের ধর্মের অনুসারী হয়ে যাও এটাই তারা চায়। যদি তাদের ধর্মাবলম্বী হয়ে যাও তাহলে তোমার প্রতি তাদের কোন অভিযোগ থাকবে না এবং তারা তোমার প্রতি খুব খুশি হবে।
আল্লাহ তা‘আলা তাদের জবাব রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শিখিয়ে দিচ্ছেন- বল, আমি যে দীন ইসলামের ওপর আছি তা-ই সঠিক।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ধমক দিয়ে বলছেন, যদি তোমার কাছে ওয়াহী আসার পরও তাদের কুপ্রবৃত্তির অনুসারী হও তাহলে তোমার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার কোন অভিভাবকত্ব থাকবে না।
আজও ইয়াহূদী-খ্রিস্টানরা মুসলিমদেরকে সঠিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার জন্য নানা পাঁয়তারা ও কৌশল অবলম্বন করছে। মনে রাখতে হবে মুসলিমদের প্রধান শত্র“ ইয়াহূদীরা ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই মুসলিমদের ক্ষতি করার জন্য পেছনে লেগে আছে, কয়েকবার নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করার অপচেষ্টাও চালিয়েছিল, তাদের কোন থাকার জায়গা ছিলনা, মুসলিমরাই তাদেরকে থাকার একটু জায়গা দিয়েছে, এখন তারা মুসলিমদেরকে চ্যালেঞ্জ করছে। সুতরাং সাবধান! তারা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ থেকে দূরে সরানোর জন্য সংস্কৃতির নামে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, লেবাস-পোষাক ও উৎসব নিয়ে আসবে, আমরা যেন কোনক্রমেই তাদের ধোঁকায় না পড়ি।
(اَلَّذِيْنَ اٰتَيْنٰهُمُ الْكِتٰبَ يَتْلُوْنَه۫)
‘আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি’অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মধ্যে যেমন খারাপ চরিত্রের লোক ছিল তেমনি ভাল লোকও ছিল, যারা ধর্মগ্রন্থ তেলাওয়াত করত। যেমন আব্দুল্লাহ বিন সালাম, ওহাব বিন মুনাব্বাহসহ আরো অনেক ইয়াহূদী যারা ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক পেয়েছিলেন।
(حَقَّ تِلَاوَتِه۪) –
‘সত্যভাবে বুঝার মত পাঠ করে’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে নাযিল করেছেন সেভাবে তেলাওয়াত করে। যখন জান্নাতের সুখ-শাস্তি সম্বলিত আয়াত তেলাওয়াত করে তখন জান্নাত চায়। আর যখন জাহান্নামের শাস্তি সম্বলিত আয়াত তেলাওয়াত করে তখন তা থেকে মুক্তি চায়। যথাযথ জানা ও মানার চেষ্টা করে। যথা-
মুহকাম আয়াতের ওপর আমল করে এবং মুতাশাবাহ আয়াতের ওপর বিশ্বাস রাখে। যা সমস্যা মনে হয় তা আলেমদের কাছে সোপর্দ করে। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড, ৩৫৫)
এরাই হল সৌভাগ্যবান যারা আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে চিনতে পেরেছে এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় করেছে, সকল নাবীর প্রতি ঈমান এনেছে, ঈমান আনার ক্ষেত্রে তাদের মাঝে কোন পার্থক্য করেনি; এরাই প্রকৃত মু’মিন। এদেরই উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَلَّذِیْنَ اٰتَیْنٰھُمُ الْکِتٰبَ مِنْ قَبْلِھ۪ ھُمْ بِھ۪ یُؤْمِنُوْنَﮃوَاِذَا یُتْلٰی عَلَیْھِمْ قَالُوْٓا اٰمَنَّا بِھ۪ٓ اِنَّھُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّنَآ اِنَّا کُنَّا مِنْ قَبْلِھ۪ مُسْلِمِیْنَﮄاُولٰ۬ئِکَ یُؤْتَوْنَ اَجْرَھُمْ مَّرَّتَیْنِ بِمَا صَبَرُوْا وَیَدْرَءُوْنَ بِالْحَسَنَةِ السَّیِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنٰھُمْ یُنْفِقُوْنَ)
“তার পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা তাতে বিশ্বাস করে। যখন তাদের নিকট তা আবৃত্তি করা হয় তখন তারা বলে, ‘আমরা এতে ঈমান আনি, এটা আমাদের প্রতিপালক হতে আগত সত্য। আমরা তো পূর্বেও আত্মসমর্পণকারী ছিলাম; তাদেরকে দু‘বার প্রতিদান প্রদান করা হবে, যেহেতু তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভাল দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করে ও আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা হতে তারা ব্যয় করে।”(সূরা কাসাস ২৮:৫২-৫৪)
পক্ষান্তরে আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবে না তারা কাফির, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَن يَّكْفُرْ بِه۪ مِنَ الأَحْزَابِ فَالنَّارُ مَوْعِدُه۫)
“যারা একে অস্বীকার করে, জাহান্নামই তাদের প্রতিশ্র“ত স্থান।”(সূরা হুদ ১১:১৭)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ ولايَهُودِي وَلاَ نَصْرَانِيٌّ ثُم لَا يُؤْمِنُ بِي إِلاَّ دَخَلَ النَّارِ
(রাঃ) সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! এ উম্মাতের মধ্যে যে কেউ ইয়াহূদী হোক বা খ্রিস্টান হোক আমার নির্দেশ শোনার পর আমার প্রতি ঈমান আনল না সে জাহান্নামে যাবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৪০)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মুসলিমদের প্রধান শত্র“ ইয়াহূদী, তারা চায় মুসলিমরা সঠিক ধর্ম থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।
২. যারা ইসলাম ধর্মের অনুশাসন যথাযথ মেনে চলে তাদের জন্য সুসংবাদ।
৩. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের পর যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে না তারা কাফির ও জাহান্নামের অধিবাসী।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১২০-১২১ নং আয়াতের তাফসীর
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সান্ত্বনা প্রদান
উপরোক্ত আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) এ সব ইয়াহুদী ও নাসারা কখনও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। সুতরাং তুমিও তাদের পরিত্যাগ কর এবং তোমার প্রভুর সন্তুষ্টির পিছনে লেগে যাও। তাদের প্রতি রিসালাতের দাওয়াত পৌছিয়ে দাও সত্য ধর্ম ওটাই যা আল্লাহ তাআলা তোমাকে প্রদান করেছেন। ওটাকে আঁকড়ে ধরে থাক।'
হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে অন্যদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে থাকবে এবং বিজয় লাভ করবে। অবশেষে কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নবীকে (সঃ) ধমকের সুরে বলেনঃ “হে নবী (স)! কখনও তুমি তাদের। সন্তুষ্টির জন্যে ও তাদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে স্বীয় ধর্মকে দুর্বল করে দিও না, তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না এবং তাদেরকে মেনে নিও না।` এ আয়াত থেকে ধর্মশাস্ত্রবিদগণ এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কুফরী একটিই ধর্ম। ওটা ইয়াহুদী ধর্মই হোক বা খ্রীষ্টান ধর্মই হোক অথবা অন্য কোন ধর্মই হোক না কেন। কেননা (আরবি) শব্দটিকে এখানে এক বচনেই এনেছেন। যেমন এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে তোমাদের ধর্ম আর আমার জন্যে আমার ধর্ম।”
এই দলীলের উপর এই ধর্মীয় নীতির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে যে, মুসলমান ও কাফির পরম্পর উত্তরাধিকারী হতে পারে না এবং কাফিরেরা পরস্পর একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে। তারা দুজন একই শ্রেণীর কাফিরই হোক বা বিভিন্ন শ্রেণীর কাফিরই হোক না কেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) একটি বর্ণনায় এই উক্তি রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম মালিকের এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে যে, দুই বিভিন্ন মাযহাবের কাফির একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। একটি বিশুদ্ধ হাদীসেও এটাই রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা সত্যভাবে বুঝবার মত করে পাঠ করে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বুঝান হয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহচরবৃন্দকে (রাঃ) বুঝান হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, সত্য ভাবে পাঠ করার অর্থ হচ্ছে জান্নাতের বর্ণনার সময় জান্নাতের প্রার্থনা এবং জাহান্নামের বর্ণনার সময় জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করা। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, স্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর আমল করা ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনা এবং কঠিন বিষয়গুলো আলেমদের কাছে পেশ করাই হচ্ছে। তিলাওয়াতের হক আদায় করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর ভাবার্থ সত্যের অনুসরণ’ও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তিলাওয়াতের অর্থ হচ্ছে আনুগত্য। যেমন (আরবি) (৯১:২) এর মধ্যে। একটি মারফু হাদীসেও এর এ অর্থই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ সঠিক হলেও এর কোন কোন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের অনুসরণকারী জান্নাতের উদ্যানে অবতরণকারী।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পাঠের নিয়ম
হযরত উমারের (রাঃ) তাফসীর অনুসারে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রহমতের বর্ণনাযুক্ত কোন আয়াত পাঠ করতেন তখন থেমে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট রহমত চাইতেন আর যখন কোন শাস্তির আয়াত পড়তেন তখন থেমে গিয়ে তার নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
তারপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঐ সব লোকেই বিশ্বাস স্থাপন করছে', অর্থাৎকিতাবীদের মধ্যে যারা নিজেদের কিতাব বুঝে পাঠ করে তারা কুরআন মাজীদের উপর ঈমান আনতে বাধ্য হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি জরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর এবং তাদের প্রভুর পক্ষ হতে তাদের উপর অবতারিত কিতাবের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতো তবে তারা তাদের উপর হতে এবং পায়ের নীচে হতে আহার্য পেতো।'
আল্লাহ রাব্বল আলামীন অন্যত্র বলেনঃ হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে এবং তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে তোমাদের উপর অবতারিত কিতাবকে প্রতিষ্ঠিত না করো সে পর্যন্ত তোমরা কোন কিছুর উপরই নও।' অর্থাৎ তোমাদের অবশ্য কর্তব্য এই যে, তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআন কারীমের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ওগুলোর মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবগুলোকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর গুণাবলীর বর্ণনা, তার অনুসরণের নির্দেশ এবং তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করার বর্ণনা ইত্যাদি সব কিছুই ঐ সব কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।
এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিরক্ষর নবীর (সঃ) আনুগত্য স্বীকার করে, যার বর্ণনা ও সত্যতা তারা তাদের কিতাব তাওরাত' ও ইঞ্জীল’-এর মধ্যেও লিখিত দেখতে পায়। আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “হে নবী সঃ তুমি বল অেমরা এর উপর (কুরআন কারীমের উপর) বিশ্বাস স্থাপন কর কিংবা নাই কর (কোন ক্ষতি নাই); এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, যখন এ কুরআন মজীদ তাদের সামনে পঠিত হতে থাকে, তখন তারা চিবুকের উপর সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে-আমাদের প্রভু পবিত্র! নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়ে থাকে। অন্যত্র ঘোষিত হয়েছেঃ “যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছি তারা এর উপরও ঈমান এনে থাকে। যখন তাদের উপর এ কিতাব পাঠ করা হয় তখন তারা তাদের ঈমানের স্বীকারোক্তি কবুতঃ বলে আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সত্য, আমরা এর পূর্ব হতেই মুসলমান ছিলাম। এদেরকেই দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, ভাল দ্বারা মন্দকে সরিয়ে দিয়েছিল এবং আমার প্রদত্ত আহার্য হতে দান করেছিল।
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “কিতাব প্রাপ্তদেরকে বলে দাও-তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করছো? যদি তারা মেনে নেয় তবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়েছে, আর ফদি না মানে তবে তোমার দায়িত্ব শুধুমাত্র পৌঁছিয়ে দেয়া এবং আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেছেন যে, একে অমান্যকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউই এর সাথে কুফরী করবে তার প্রতিশ্রুত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। (১১:১৭) বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার আয়ত্বাধীনে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যে কেউই ইয়াহূদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক আমার কথা শুনার পরেও আমার উপর ঈমান আনে না সে দোযখে প্রবেশ করবে।'
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।