আল কুরআন


সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 8)

সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 8)



হরকত ছাড়া:

ووصينا الإنسان بوالديه حسنا وإن جاهداك لتشرك بي ما ليس لك به علم فلا تطعهما إلي مرجعكم فأنبئكم بما كنتم تعملون ﴿٨﴾




হরকত সহ:

وَ وَصَّیْنَا الْاِنْسَانَ بِوَالِدَیْهِ حُسْنًا ؕ وَ اِنْ جَاهَدٰکَ لِتُشْرِکَ بِیْ مَا لَیْسَ لَکَ بِهٖ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ؕ اِلَیَّ مَرْجِعُکُمْ فَاُنَبِّئُکُمْ بِمَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ ﴿۸﴾




উচ্চারণ: ওয়া ওয়াসসাইনাল ইনছা-না বিওয়া-লিদাইহি হুূছনাওঁ ওয়া ইন জা-হাদা-কা লিতুশরিকা বী মা-লাইছা লাকা বিহী ‘ইলমুন ফালা-তুতি‘হুমা- ইলাইইয়া মারজি‘উকুম ফাউনাব্বিউকুম বিমা-কুনতুম তা‘মালূন।




আল বায়ান: আর আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করতে। তবে যদি তারা তোমার উপর প্রচেষ্টা চালায় আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। আমার দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮. আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।(১) তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই(২), তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না(৩) আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা। অতঃপর তোমরা কি করছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।(৪)




তাইসীরুল ক্বুরআন: পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য আমি মানুষের প্রতি ফরমান জারি করেছি। তারা যদি তোমার উপর বলপ্রয়োগ করে আমার সঙ্গে শরীক করার জন্য এমন কিছুকে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদেরকে মান্য কর না। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন, অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব যা তোমরা করছিলে।




আহসানুল বায়ান: (৮) আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি,[1] তবে ওরা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে অংশী করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না।[2] আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন; অতঃপর তোমরা যা কিছু করেছ, আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।



মুজিবুর রহমান: আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে; কিন্তু তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে, আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদেরকে মান্য করনা। আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দিব যা তোমরা করতে।



ফযলুর রহমান: আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে ভাল আচরণ করতে বলেছি। তবে তারা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে বলে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। আমার কাছেই তোমরা ফিরে আসবে। তখন অবশ্যই আমি তোমাদেরকে তোমাদের অতীত কৃতকর্ম অবহিত করব।



মুহিউদ্দিন খান: আমি মানুষকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে।



জহুরুল হক: আর আমরা মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু তারা যদি তোমার সঙ্গে জেদ করে যেন তুমি আমার সাথে এমন কিছু শরিক কর যার সন্বন্ধে তোমার কাছে কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আজ্ঞাপালন করো না। আমারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন, তখন আমি তোমাদের জানিয়ে দেব যা কিছু তোমরা করছিলে।



Sahih International: And We have enjoined upon man goodness to parents. But if they endeavor to make you associate with Me that of which you have no knowledge, do not obey them. To Me is your return, and I will inform you about what you used to do.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮. আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।(১) তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই(২), তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না(৩) আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা। অতঃপর তোমরা কি করছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।(৪)


তাফসীর:

(১) হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন; সময়মত সালাত আদায় করা। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ। [বুখারী: ৫৯৭০]


(২) আয়াতে বর্ণিত “যাকে তুমি আমার শরীক হিসেবে জানো না” বাক্যাংশটিও অনুধাবনযোগ্য। এর মধ্যে তাদের কথা না মানার সপক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি প্ৰদান করা হয়েছে। এতে শির্কের জঘন্যতা প্ৰকাশ পেয়েছে। কারণ শির্কের সপক্ষে কোন জ্ঞান নেই। কেউ শির্ককে সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারবে না। [সা’দী] এটা পিতা-মাতার অধিকার যে, ছেলেমেয়েরা তাদের সেবা করবে, তাদেরকে সম্মান ও শ্ৰদ্ধা করবে এবং বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মেনে চলবে। কিন্তু শির্কের ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। অনুরূপভাবে কোন গোনাহর কাজেও নয়। যেমনটি রাসূলের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [মুয়াস্‌সার]

এ অধিকার দেয়া হয়নি যে, মানুষ নিজের জ্ঞানের বিরুদ্ধে পিতামাতার অন্ধ অনুকরণ করবে। শুধুমাত্ৰ বাপ-মায়ের ধর্ম বলেই তাদের ছেলে বা মেয়ের সেই ধর্ম মেনে চলার কোন কারণ নেই। সন্তান যদি এ জ্ঞান লাভ করে যে, তার বাপ-মায়ের ধর্ম ভুল ও মিথ্যা তাহলে তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তার সঠিক ধর্ম গ্ৰহণ করা উচিত এবং তাদের চাপ প্রয়োগের পরও যে পথের ভ্রান্তি তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে সে পথ অবলম্বন করা তার উচিত নয়। বাপ-মায়ের সাথে যখন এ ধরনের ব্যবহার করতে হবে তখন দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তির সাথেও এ ব্যবহার করা উচিত। যতক্ষণ না কোন ব্যক্তির সত্য পথে থাকা সম্পর্কে জানা যাবে ততক্ষণ তার অনুসরণ করা বৈধ নয়।


(৩) অর্থাৎ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার সাথে সাথে এটাও জরুরী যে, আল্লাহর নির্দেশাবলীর অবাধ্যতা না হয়, সীমা পর্যন্ত পিতা-মাতার আনুগত্য করতে হবে। তারা যদি সন্তানকে কুফর ও শির্ক করতে বাধ্য করে, তবে এ ব্যাপারে কিছুতেই তাদের আনুগত্য করা যাবে না; যেমন হাদীসে আছে, আল্লাহর অবাধ্যতা করে কোন মানুষের আনুগত্য করা বৈধ নয়। [মুসনাদে আহমাদ: ১/১৩১] কোন কোন বর্ণনা মতে আলোচ্য আয়াত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি দশ জন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীগণের অন্যতম ছিলেন এবং অতিশয় মাতৃভক্ত ছিলেন। তার মাতা হামনা বিনতে সুফিয়ান পুত্রের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ অবগত হয়ে খুবই মর্মাহত হয়। সে পুত্ৰকে শাসিয়ে শপথ করল, আমি তখন পর্যন্ত আহার্য ও পানীয় গ্রহণ করব না, যে পর্যন্ত তুমি পৈতৃক ধর্মে ফিরে না আস। আমি এমনিভাবে ক্ষুধা ও পিপাসায় মৃত্যুবরণ করব, যাতে তুমি মাতৃহন্তা রূপে বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হও। [মুসলিম: ১৭৪৮]

এই আয়াত সাদকে মাতার আবদার রক্ষা করতে নিষেধ করল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সাদের জননী একদিন একরাত মতান্তরে তিনদিন তিনরাত শপথ অনুযায়ী অনশন ধর্মঘট অব্যাহত রাখলে সা’দ উপস্থিত হলেন। মাতৃভক্তি পূর্ববৎ ছিল; কিন্তু আল্লাহর ফরমানের মোকাবেলায় তা ছিল তুচ্ছ। তাই জননীকে সম্বোধন করে তিনি বললেনঃ আম্মাজান, যদি আপনার দেহে একশ’ আত্মা থাকত, এবং একটি একটি করে বের হতে থাকত, তা দেখেও আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতাম না। এখন আপনি ইচ্ছা করলে পানাহার করুন অথবা মৃত্যুবরণ করুন। আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতে পারি না। এ কথায় নিরাশ হয়ে তার মাতা অনশন ভঙ্গ করল। [বাগভী]


(৪) অর্থাৎ এ দুনিয়ার আত্মীয়তা এবং আত্মীয়দের সাহায্য-সহযোগিতা কেবলমাত্র এ দুনিয়ার সীমা-ত্রিসীমা পর্যন্তই বিস্তৃত। সবশেষে পিতা-মাতা ও সন্তান সবাইকে তাদের স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতে হবে। সেখানে তাদের প্রত্যেকের জবাবদিহি হবে। তাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বের ভিত্তিতে। যদি পিতা-মাতা সন্তানকে পথভ্রষ্ট করে থাকে তাহলে তারা পাকড়াও হবে। যদি সন্তান পিতা-মাতার জন্য পথভ্রষ্টতা গ্ৰহণ করে থাকে তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আর সন্তান যদি সঠিক পথ অবলম্বন করে থাকে এবং পিতা-মাতার বৈধ অধিকার আদায় করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি না করে থাকে। কিন্তু পিতা-মাতা কেবলমাত্র পথভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগী না হবার কারণে তাকে নির্যাতন করে থাকে, তাহলে তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না। আল্লাহ বলছেন যে, কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে।

তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের পিতামাতার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছ এবং তোমাদের দ্বীনের উপর যে দৃঢ়পদ থেকেছ তার জন্য পুরস্কৃত করব। আর আমি তোমাকে সৎবান্দাদের সাথে হাশর করব, তোমার পিতা-মাতার দলে নয়। যদিও তারা দুনিয়াতে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল। কারণ, একজন মানুষের হাশর কিয়ামতের দিন তার সাথেই হবে, যাকে সে ভালবাসে অর্থাৎ দ্বীনী ভালবাসা। তাই পরবর্তী আয়াতে বলেছেন যে, “আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব।” [ইবন কাসীর; আরও দেখুন: ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮) আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি,[1] তবে ওরা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে অংশী করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না।[2] আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন; অতঃপর তোমরা যা কিছু করেছ, আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।


তাফসীর:

[1] কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ তাঁর একত্ববাদের ও ইবাদতের আদেশ দানের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করারও আদেশ দিয়েছেন। যাতে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর প্রতিপালকত্ব ও উপাস্যত্বের চাহিদা তারাই সঠিকভাবে বুঝতে ও পূরণ করতে পারে, যারা পিতা-মাতার আনুগত্য ও খিদমতের চাহিদাকে বুঝে ও পূরণ করে থাকে। যে ব্যক্তি এ কথা বুঝতে অক্ষম যে, পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব তার মাতা-পিতার মিলনের একান্ত ফল এবং তার লালন-পালন তাদের সীমাহীন করুণা ও মায়া-মমতার ফসল। অতএব তাদের খিদমতে কোন প্রকার অনীহা ও তাদের কথার কোন প্রকার অবাধ্যতা প্রকাশ করা কোনক্রমেই সন্তানের উচিত নয়। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান অবশ্যই সৃষ্টিকূলের সৃষ্টিকর্তাকে বুঝতে এবং তাঁর একত্ববাদ ও ইবাদতের চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম। এই কারণেই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ হাদীসেও এসেছে। এক হাদীসে মাতা-পিতার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলা হয়েছে। (সূরা ইসরা’ ২৩-২৪ আয়াত দ্রষ্টব্য)

[2] অর্থাৎ, মাতা-পিতা যদি শিরক করতে (অনুরূপ অন্যান্য পাপ করতে) আদেশ করে এবং এর জন্য তারা যদি চাপ সৃষ্টি করে, তবুও তাদের আনুগত্য করা চলবে না। কেননা, لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق অর্থাৎ, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন ব্যক্তির আনুগত্য চলবে না। (আহমাদ ৫/৬৬, হাকেম, সহীহুল জামে’ ৭৫২০নং) এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে সা’দ বিন আবী অক্কাস (রাঃ)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়। কারণ যখন তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন, তখন তাঁর মাতা শপথ করেছিলেন যে, আমি আমরণ পানাহার করব না; যদি না তুমি মুহাম্মাদের নবুঅতকে অস্বীকার করেছ! শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর মাতার মুখে জোরপূর্বক খাবার পুরে দিয়েছিলেন। যার জন্য উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।

(মুসলিম, তিরমিযীঃ সূরা আনকাবূতের ব্যাখ্যা পরিচ্ছেদ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা সৎ আমলের উত্তম প্রতিদান বর্ণনা করার পরপরই এখানে আল্লাহ তা‘আলার পরেই বান্দাদের মধ্য হতে সবচেয়ে বেশি ভাল ব্যবহার ও খেদমত পাওয়ার হকদার পিতা-মাতার বিষয়টি আলোকপাত করেছেন। তাই কুরআনের যেখানে আল্লাহ তা‘আলা নিজের হকের কথা তথা একমাত্র তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন সেখানে পিতা-মাতার হকের কথা সংযুক্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের গুরুত্ব অপরিসীম। সূরা বানী ইসরাঈলের ২৩-২৪ নং আয়াতে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব এত বেশি থাকা সত্ত্বেও তাদের নির্দেশ পালনে একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে আর তা হলোন তারা যদি আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করার নির্দেশ দেয় তাহলে তাদের কথা মানা যাবে না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর যদি তোমার মাতা-পিতা তোমার ওপর চাপ দেয় যে, তুমি আমার সাথে এমন কিছু শরীক সাব্যস্ত কর, যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর।” (সূরা লুকমান ৩১:১৫)



হাদীসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হল: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমার নিকট সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার পাবার হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল তার পর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। পুনরায় লোকটি জিজ্ঞেস করল। অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। চতুর্থবার জিজ্ঞেস করা হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমার পিতা। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৭১, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৪৮)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা সৎ আমল করবে ও ঈমান নিয়ে আসবে তিনি তাদেরকে সৎ কর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর তারা তাদের এ সকল সৎ আমলের কারণে জান্নাতে অনাবিল আনন্দে বসবাস করবে। যেখানে তারা শুধু সুখই ভোগ করবে, কোন দুঃখ তাদেরকে স্পর্শ করবে না। এটা মূলত তাদের সৎ আমলের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির কারণেই। তাই আমাদের উচিত সর্বদা ভাল আমল করা এবং মন্দ আমল করা থেকে বিরত থাকা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সর্বদা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। তারা খারাপ ব্যবহার করলেও তাদের সাথে অসদ্ব্যবহার করা যাবে না।

২. পিতা-মাতা যদি আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করার নির্দেশ দেয় শুধু সেক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা যাবে না।

৩. মানুষকে সর্বশেষে আল্লাহ তা‘আলার দিকেই ফিরে যেতে হবে।

৪. সৎ কর্ম করলে সৎ কর্মশীলদের মধ্যে শামিল হওয়া যায়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম তার তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার নির্দেশ দেয়ার পর এখন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। কেননা, পিতা-মাতার মাধ্যমেই মানুষ অস্তিত্বে এসে থাকে। পিতা সন্তানের জন্যে খরচ করে এবং তাকে লালন-পালন করে। আর মা তাকে স্নেহ দান করে, ভালবাসে এবং লালন-পালন করে থাকে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; তাদের সাথে বলো সম্মান সূচক নম্র কথা। মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলল- হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।” (১৭:২৩-২৪) তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, যদি তারা শিরকের দিকে আহ্বান করে তবে তাদের কথা মানতে হবে না। মানুষের জেনে রাখা উচিত যে, তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তারা যা করতো তা তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। যদি মানুষ আল্লাহর সাথে শিরক করার ক্ষেত্রে তাদের পিতা-মাতার আদেশ না মানে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করবেন।

হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, আমার ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। এগুলোর মধ্যে একটি (আরবি) আয়াতটিও। এটা এজন্যে অবতীর্ণ হয় যে, আমার মা আমাকে বলেঃ “(হে সা’দ রাঃ)! আল্লাহ কি তোমাকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেননি? আল্লাহর শপথ! তুমি যদি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার না কর তবে আমি পানাহার ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুবরণ করবো।” সে তাই করে। শেষ পর্যন্ত লোকেরা জোরপূর্বক তার মুখ ফেড়ে তার মুখে খাদ্য ও পানীয় প্রবেশ করিয়ে দিতো। ঐ সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।