আল কুরআন


সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 6)

সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 6)



হরকত ছাড়া:

ومن جاهد فإنما يجاهد لنفسه إن الله لغني عن العالمين ﴿٦﴾




হরকত সহ:

وَ مَنْ جَاهَدَ فَاِنَّمَا یُجَاهِدُ لِنَفْسِهٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَغَنِیٌّ عَنِ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া মান জা-হাদা ফাইন্নামা-ইউজা-হিদুলিনাফছিহী ইন্নাল্লা-হা লাগানিইইউন ‘আনিল ‘আ-লামীন।




আল বায়ান: আর যে চেষ্টা করে সে তো তার নাফ্সের জন্য চেষ্টা করে। নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিকুল থেকে প্রয়োজনমুক্ত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আর যে কেউ প্রচেষ্টা চালায়, সে তো নিজের জন্যই প্রচেষ্টা চালায়(১); আল্লাহ তো সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যে লোক (আল্লাহর পথে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, সে তার নিজের কল্যাণেই প্রচেষ্টা চালায়, আল্লাহ সৃষ্টিজগত থেকে অবশ্যই বে-পরওয়া।




আহসানুল বায়ান: (৬) যে কেউ সংগ্রাম করে, সে তো নিজের জন্যই সংগ্রাম করে; আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বজগতের ওপর নির্ভরশীল নন। [1]



মুজিবুর রহমান: যে কেহ (কঠোর) সাধনা করে, সে তা করে নিজেরই জন্য; আল্লাহতো বিশ্বজগত হতে অনপেক্ষ।



ফযলুর রহমান: যে চেষ্টা করে সে নিজের জন্যই চেষ্টা করে। (কারো চেষ্টার ফল আল্লাহ ভোগ করবেন না।) আল্লাহ তো বিশ্বজগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী।



মুহিউদ্দিন খান: যে কষ্ট স্বীকার করে, সে তো নিজের জন্যেই কষ্ট স্বীকার করে। আল্লাহ বিশ্ববাসী থেকে বে-পরওয়া।



জহুরুল হক: আর যে কেউ জিহাদ করে, সে তাহলে নিশ্চয়ই সংগ্রাম করে তার নিজেরই জন্যে। আল্লাহ্ নিঃসন্দেহ বিশ্বজগতের উপরে অনন্য- নির্ভর।



Sahih International: And whoever strives only strives for [the benefit of] himself. Indeed, Allah is free from need of the worlds.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬. আর যে কেউ প্রচেষ্টা চালায়, সে তো নিজের জন্যই প্রচেষ্টা চালায়(১); আল্লাহ তো সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।(২)


তাফসীর:

(১) “মুজাহাদা” শব্দটির মূল অর্থ হচ্ছে, কোন বিরোধী শক্তির মোকাবিলায় দ্বন্দ্ব, প্রচেষ্টা চালানো। আর যখন কোন বিশেষ বিরোধী শক্তি চিহ্নিত করা হয় না বরং সাধারণভাবে “মুজাহাদা” শব্দ ব্যবহার করা হয় তখন এর অর্থ হয় একটি সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী দ্বন্দ্ব-সংঘাত। মুমিনকে এ দুনিয়ায় যে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম করতে হয় তা হচ্ছে এ ধরনের। তাকে নাফস, শয়তান ও কাফেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। [সা'দী] তাকে শয়তানের সাথে লড়াই করতে হয়, কারণ সে তাকে সর্বক্ষণ সৎকাজের ক্ষতির ভয় দেখায় এবং অসৎকাজের লাভ ও স্বাদ উপভোগের লোভ দেখিয়ে বেড়ায়। তাকে নিজের নফসের বা কুপ্রবৃত্তির সাথেও লড়তে হয়, যে তাকে সর্বক্ষণ নিজের খারাপ ইচ্ছা-আকাংখার দাসে পরিণত করে রাখার জন্য জোর দিতে থাকে।

নিজের গৃহ থেকে নিয়ে বিশ্ব-সংসারের এমন সকল মানুষের সাথে তাকে লড়তে হয় যাদের আদর্শ, মতবাদ, মানসিক প্রবণতা, চারিত্রিক নীতি, রসম-রেওয়াজ, সাংস্কৃতিক ধারা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিধান সত্য দ্বীনের সাথে সংঘর্ষিক। তাকে কাফেরদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়। [দেখুন: সা’দী; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] এ প্রচেষ্টা এক-দুদিনের নয়, সারাজীবনের। দিন-রাতের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রতি মুহুর্তের। কোন একটি ময়দানে নয়, বরং জীবনের প্রত্যেকটি ময়দানে ও প্রতি দিকে। হাসান বসরী বলেন, একজন মানুষ প্রতিনিয়ত জিহাদ করে যাচ্ছে অথচ একদিনও তরবারী ব্যবহার করেনি। [ইবন কাসীর]


(২) অর্থাৎ আল্লাহ এ জন্য তোমাদের কাছে এ দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের দাবী করছেন না যে, নিজের সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার ও প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন, বরং এটিই তোমাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথ, তাই তিনি তোমাদের এ দ্বন্দ্ব-সংগ্রামে লিপ্ত হবার নির্দেশ দিচ্ছেন। এ পথে অগ্রসর হয়ে তোমরা এমন শক্তির অধিকারী হতে পারো যার ফলে দুনিয়ায় তোমরা কল্যাণ ও সুকৃতির ধারক এবং আখেরাতে আল্লাহর জান্নাতের অধিকারী হবে। এ যুদ্ধ চালিয়ে তোমরা আল্লাহর কোন উপকার করবে না বরং তোমরা নিজেরাই উপকৃত হবে। তাছাড়া এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পার যার কথা সূরার শুরুতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। [দেখুন: ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর; সা’দী, ইবনুল কাইয়্যেম, শিফাউল আলীল: ২৪৬]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬) যে কেউ সংগ্রাম করে, সে তো নিজের জন্যই সংগ্রাম করে; আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বজগতের ওপর নির্ভরশীল নন। [1]


তাফসীর:

[1] এর অর্থ {مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاء فَعَلَيْهَا}  এর মত। (সূরা জাসিয়াহ ১৫ আয়াত) অর্থাৎ, যে ভাল কাজ করবে তার ফল সে নিজেই ভোগ করবে। তাছাড়া আল্লাহ বান্দাদের কোন কাজের মুখাপেক্ষী নন। যদি পৃথিবীর সবাই আল্লাহর পরহেযগার বান্দা হয়ে যায়, তাহলে তার ফলে তাঁর রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি হবে না। আর যদি সকল মানুষই আল্লাহর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে যায়, তাহলেও তাঁর রাজ্যে কোন প্রকার কমি আসবে না। শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে এতে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদও শামিল। কারণ, এটিও অন্যতম সৎকর্ম।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫-৭ নং আয়াতের তাফসীর:



(لِقَا۬ءَ اللّٰهِ) ‘আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাত’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ভালবাসা, আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও সৎ বান্দা হয়ে যে আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাত কামনা করে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ তা‘আলার সাথে সাক্ষাতের নির্দিষ্ট সময় অবশ্যই আসবে এবং তা খুবই নিকটে। কেননা



كُلُّ مَا آتٍ فَهُوَ قَرِيْبٌ



যা অবশ্যই হবে তা খুবই নিকটে। তাই আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য যথাসম্ভব সকল অসৎ আমল থেকে বিরত থেকে সৎ আমল ও নেকীর কাজ চালিয়ে যেতে থাক।



جَاهَدَ শব্দের অর্থন প্রচেষ্টা করা, এখানে ঈমান আনা থেকে শুরু করে যাবতীয় সৎ আমল করা ও অসৎ আমল থেকে বিরত থাকা এমনকি আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা পর্যন্ত সবই শামিল। ঈমান আনতেও প্রচেষ্টা করতে হয়, কেননা শয়তান তাতে কঠিনভাবে বাধা দেয়। কারণ একজন ব্যক্তি ঈমান আনলে জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ط وَإِنَّ اللّٰهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِيْنَ)



“যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ অবশ্যই সৎ কর্মপরায়ণদের সঙ্গে থাকেন।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৬৯)



যে ব্যক্তি ঈমান ও সৎ আমলের পথে প্রচেষ্টা করল সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই করল। ‘নিশ্চয়ই‎ আল্লাহ তা‘আলা বিশ্বজগত হতে অমুখাপেক্ষী।’ কে সৎ আমল করল আর কে অসৎ আমল করল সে জন্য তাঁর কিছু আসে যায় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِه۪ ج وَمَنْ أَسَا۬ءَ فَعَلَيْهَا ز ثُمَّ إِلٰي رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْنَ)‏



“যে সৎ আমল করে সে তার নিজের (কল্যাণের) জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কর্ম করলে তার প্রতিফল তার ওপরই বর্তাবে, অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:১৫) যেহেতু আল্লাহ সৎ আমল ও সৎ আমলকারীদেরকে ভালবাসেন সেহেতু তিনি তাদের দ্বারা যে সকল পাপ কাজ হয়ে গেছে তা মিটিয়ে দেবেন এবং তাদের কর্মের উত্তম প্রতিদান দেবেন।



অতএব প্রত্যেক ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে যা আমল করবে তার প্রতিদান সে পাবে ভাল বা মন্দ হোক। তবে যারা সর্বদা ভাল আমল করে তাদের দ্বারা যদি কোন অন্যায় কাজ হয়ে যায় আর তৎক্ষণাৎ যদি তারা তাদের ভুলের কথা স্বীকার করে তাওবা করে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের মন্দ আমলগুলোকে নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। মূলত তাদের কর্মফল কখনো নষ্ট করা হবে না। বরং তারা আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহে আরো দ্বিগুণ পাবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষ যা আমল করে তা আমলকারীর ওপর বর্তাবে, ভাল করলে ভাল আর মন্দ করলে মন্দ।

২. ঈমানদার সৎ ব্যক্তিদের দ্বারা কোন পাপ কাজ হয়ে গেলে তা থেকে তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন এমনকি আরো উত্তম প্রতিদান দেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫-৭ নং আয়াতের তাফসীর

যাদের আখিরাতে বিনিময় লাভের আশা রয়েছে এবং ওটাকে সামনে রেখে তারা পুণ্যের কাজ করে থাকে তাদের আশা পূর্ণ হবে। তারা এমন পুরস্কার লাভ করবে যা কখনো শেষ হবার নয়। আল্লাহ তা'আলা প্রার্থনা শ্রবণকারী। তিনি জগতসমূহের সব খবরই রাখেন। তার নির্ধারিত সময় টলবার নয়।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ ভাল আমল করে সে নিজের লাভের জন্যেই তা করে। আল্লাহ তাআলা মানুষের আমলের মুখাপেক্ষী নন। যদি সমস্ত মানুষ আল্লাহভীরু হয়ে যায় তবুও তাঁর সাম্রাজ্য সামান্য পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে ।

হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, শুধু তরবারী চালনা করার নামই জিহাদ নয়। মানুষ পুণ্যময় কাজের চেষ্টায় লেগে থাকবে এটাও এক প্রকারের জিহাদ। মানুষ ভাল কাজ করলে তা আল্লাহ তাআলার কোন উপকারে আসবে না, তবুও এটা তার বড় মেহেরবানী যে, তিনি মানুষকে তার ভাল কাজের পুরস্কার প্রদান করে থাকেন। এই কারণে তিনি তার গুনাহ মাফ করে দেন। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম পুণ্যেরও তিনি মর্যাদা দিয়ে থাকেন এবং এর জন্যে বড় রকমের পুরস্কার প্রদান করেন। একটি পুণ্যের বিনিময়ে তিনি সাতশগুণ পর্যন্ত প্রতিদান দিয়ে থাকেন।

আর পাপকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমা করে দেন। অথবা ওর সমপরিমাণ শাস্তি প্রদান করেন। তিনি যুলুম হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি পুণ্যকে বাড়িয়ে দেন এবং নিজের নিকট হতে বিরাট প্রতিদান প্রদান করেন। তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা ঈমান আনে ও সত্যার্যাবলী সম্পাদন করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের মন্দ কর্মগুলো মিটিয়ে দিবো এবং তাদের কর্মের উত্তম ফল দান করবো।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।