আল কুরআন


সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 2)

সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 2)



হরকত ছাড়া:

أحسب الناس أن يتركوا أن يقولوا آمنا وهم لا يفتنون ﴿٢﴾




হরকত সহ:

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ یُّتْرَکُوْۤا اَنْ یَّقُوْلُوْۤا اٰمَنَّا وَ هُمْ لَا یُفْتَنُوْنَ ﴿۲﴾




উচ্চারণ: আহাছিবান্না-ছুআইঁ ইউতরাকূআইঁ ইয়াকূলূ আ-মান্না-ওয়া হুম লা-ইউফতানূন।




আল বায়ান: মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা(১) না করে অব্যাহতি দেয়া হবে(২)?




তাইসীরুল ক্বুরআন: লোকেরা কি মনে করে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?




আহসানুল বায়ান: (২) মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা বিশ্বাস করি’ এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? [1]



মুজিবুর রহমান: মানুষ কি মনে করেছে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা?



ফযলুর রহমান: মানুষ কি মনে করে যে, “আমরা ঈমান এনেছি” বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?



মুহিউদ্দিন খান: মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?



জহুরুল হক: লোকেরা কি মনে করে যে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে যদি তারা বলে -- "আমরা ঈমান এনেছি", আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?



Sahih International: Do the people think that they will be left to say, "We believe" and they will not be tried?



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২. মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা(১) না করে অব্যাহতি দেয়া হবে(২)?


তাফসীর:

(১) يُفْتَنُون শব্দটি فتنة থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ পরীক্ষা। [ফাতহুল কাদীর] ঈমানদার বিশেষত: নবীগণকে এ জগতে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। পরিশেষে বিজয় ও সাফল্য তাদেরই হাতে এসেছে। এসব পরীক্ষা জান ও মালের উপর ছিল। [ফাতহুল কাদীর] এর মাধ্যমে তাদের ঈমানের দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়ে যেত। কোন সময় কাফের ও পাপাচারীদের শক্ৰতা এবং তাদের নির্যাতনের মাধ্যমে হয়েছে, যেমন অধিকাংশ নবীগণ, শেষনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীগণ প্রায়ই এ ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলী এ ধরনের ঘটনাবলী দ্বারা পরিপূর্ণ। কোন সময় এই পরীক্ষা রোগ-ব্যাধি ও অন্যান্য কষ্টের মাধ্যমে হয়েছে। যেমন আইয়ুব আলাইহিস সালাম-এর হয়েছিল। কারও কারও বেলায় সর্বপ্রকার পরীক্ষার সমাবেশও করে দেয়া হয়েছে।

বর্ণনাদৃষ্টে বোঝা যায়, আলোচ্য আয়াত সেসব সাহাবীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল, যারা মদীনায় হিজরতের প্রাক্কালে কাফেরদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন। কিন্তু উদ্দেশ্য ব্যাপক। সর্বকালের আলেম, সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং হতে থাকবেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সৎকর্মপরায়ন বান্দাদেরকে, তারপর তাদের অনুরূপ, তারপর তাদের অনুরূপদেরকে। প্রত্যেক মানুষকে তার দ্বীনদারী অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। যদি দ্বীনদারী বেশী হয় তাকে বেশী পরীক্ষা করা হয়। [তিরমিযী ২৩৯৮, ইবনে মাজাহ ৪০২৩] কুরআনের অন্যত্রও এ পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে, যেমন: “তোমরা কি মনে করেছ তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে অথচ, আল্লাহ এখনো তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে তাদের জেনে নেননি।” [সূরা আত-তাওবাহ: ১৬]


(২) যে অবস্থায় একথা বলা হয় তা ছিল এই যে, মক্কা মুআযযিামায় কেউ ইসলাম গ্ৰহণ করলেই তার ওপর বিপদ আপদ ও জুলুম-নিপীড়নের পাহাড় ভেঙ্গে পড়তো। এ পরিস্থিতি যদিও দৃঢ় ঈমানের অধিকারী সাহাবীগণের অবিচল নিষ্ঠার মধ্যে কোন প্রকার দোদুল্যমানতা সৃষ্টি করে নি তবুও মানবিক প্রকৃতির তাগিদে অধিকাংশ সময় তাদের মধ্যেও চিত্তচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে যেতো। এ ধরনের অবস্থার একটা চিত্র পেশ করে খাব্বাব ইবনে আরত বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেন, ‘যে সময় মুশরিকদের কঠোর নির্যাতনে আমরা ভীষণ দুরবস্থার সম্মুখীন হয়ে পড়েছিলাম সে সময় একদিন আমি দেখলাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরের দেয়ালের ছায়ায় বসে রয়েছেন।

আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আমাদের জন্য দোআ করেন না? একথা শুনে তাঁর চেহারা আবেগে-উত্তেজনায় রক্তিমবর্ণ ধারণ করলো এবং তিনি বললেন, “তোমাদের পূর্বে যেসব মুমিনদল অতিক্রান্ত হয়েছে তারা এর চাইতেও বেশী নিগৃহীত হয়েছে। তাদের কাউকে মাটিতে গর্ত করে তার মধ্যে বসিয়ে দেয়া হতো এবং তারপর তার মাথার ওপর করাত চালিয়ে দুটুকরা করে দেয়া হতো। কারো অংগ-প্রত্যংগের সন্ধিস্থলে কসম, এ কাজ সম্পন্ন হবেই, এমন কি এক ব্যক্তি সান’আ থেকে হাদ্বারামাউত পর্যন্ত নিঃশংক চিত্তে সফর করবে এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয় তার মনে থাকবে না।” [বুখারী ৩৬১২, মুসনাদে আহমাদ ৫/১০৯]

এ চিত্তচাঞ্চল্যকে অবিচল ধৈর্য ও সহিষ্ণুতায় রূপান্তরিত করার জন্য মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে বুঝান, দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য অর্জনের জন্য আমার যে সমস্ত প্ৰতিশ্রুতি রয়েছে কোন ব্যক্তি নিছক মৌখিক ঈমানের দাবীর মাধ্যমে তার অধিকারী হতে পারে না। বরং প্রত্যেক দাবীদারকে অনিবাৰ্যভাবে পরীক্ষা অতিক্রম করতে হবেই। অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি মনে করেছে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, অথচ এখনো তোমরা সে অবস্থার সম্মুখীন হওনি, যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী ঈমানদারগণ? তারা সম্মুখীন হয়েছিল নির্মমতা ও দুঃখ-ক্লেশের এবং তাদেরকে অস্থির করে তোলা হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা চিৎকার করে বলে উঠেছিল আল্লাহর সাহায্য কবে আসবে? (তখনই তাদেরকে সুখবর দেয়া হয়েছিল। এই মর্মে যে) জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৪]

অনুরূপভাবে ওহুদ যুদ্ধের পর যখন মুসলিমদের ওপর আবার বিপদ-মুসীবতের একটি দুযোগপূর্ণ যুগের অবতারণা হয় তখন বলা হয়ঃ “তোমরা কি মনে করে নিয়েছে, তোমরা জান্নাতে প্ৰবেশ করে যাবে, অথচ এখনো আল্লাহ দেখেনইনি যে, তোমাদের মধ্য থেকে কে জিহাদে প্ৰাণ উৎসর্গকারী এবং কে সবরকারী?” [সূরা আলে ইমরান: ১৪২] প্ৰায় একই বক্তব্য সূরা আলে ইমরানের ১৭৯, সূরা তাওবার ১৬ এবং সূরা মুহাম্মাদের ৩১ আয়াতে বলা হয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলিমদের মনে এ সত্যটি গেথে দিয়েছেন যে, পরীক্ষাই হচ্ছে এমন একটি মানদণ্ড যার মাধ্যমে ভেজাল ও নির্ভেজাল যাচাই করা যায়।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২) মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা বিশ্বাস করি” এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, মৌখিকভাবে ঈমান আনার পর তাদের কোন পরীক্ষা না নিয়েই এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে --এই ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। বরং তাদের জান-মালে বিপদ-আপদ দিয়ে এবং অন্যান্য সমস্যা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, যাতে আসল-নকল, সত্য-মিথ্যা এবং মু’মিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: সূরার নামকরণ:



الْعَنْكَبُوْتِ (আনকাবূত) শব্দের অর্থ মাকড়সা। উক্ত সূরাতে ‘মাকড়সা’ সংক্রান্ত একটি ঘটনা বিবৃত হয়েছে বিধায় এ সূরাকে আনকাবূত নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ সূরাতে বিভিন্ন নাবী ও তাঁদের সম্প্রদায়ের বর্ণনা, মুশরিকদের উপমা, আহলে কিতাবসহ সকল অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়ার পথ, পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সবশেষে আল্লাহ তা‘আলার ওপর প্রকৃত ভরসাকারী এবং তাঁর পথে জিহাদকারীদের মর্যাদা ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।



১-৪ নং আয়াতের তাফসীর:



ال۬مّ۬ - (আলিফ-লাম-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর সঠিক উদ্দেশ্য ও অর্থ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।



(أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُّتْرَكُوْآ....) শানে নুযূল:



ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: প্রথম যাদের ইসলাম গ্রহণ প্রকাশ পেয়েছিল তারা ছিলেন সাতজন। তারা হলেনন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবূ বাকর, সুমাইয়া, আম্মার, সুহাইব, বেলাল এবং মিকদাদ (رضي الله عنهم)। যখন তাদের ইসলাম গ্রহণ প্রকাশ হয়ে পড়ল তখন সকলকে মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণ করার কারণে শাস্তি প্রদান করে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (رضي الله عنه) ব্যতীত। তাদের এ শাস্তির ব্যাপারে এ আয়াতটি নাযিল হয়। (মুসানাদ আহমাদ ১/৪০৪, ইবনু মাজাহ হা: ১৫০, হাসান)



সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের একটি ভুল ধারণা দূর করছেন। অনেকে মনে করতে পারে ঈমান এনেছি, ফলে জান্নাতে যেতে বাধা কোথায়? হ্যাঁ, জান্নাতে যেতে ঈমানের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন কে সত্যিকার ঈমানদার আর কে ঈমানদার নামে মুনাফিক। কখনো শারীরিক কষ্ট ও আর্থিক অভাব, কখনো আসমানী বালা, কখনো কাফিরদের দ্বারা কষ্ট আবার কখনো কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে তাদেরকে হত্যা করা ও নিজের শহীদ হওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন। সুতরাং যারা এসব বিপদাপদে ঈমানের ওপর অটল থাকবে, দীন ইসলামকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে তারাই জান্নাতে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তোমরা কি ধারণা করেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত সঙ্কটময় অবস্থা এখনো তোমাদের ওপর আসেনি। তাদেরকে বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদেরকে কাঁপিয়ে তোলা হয়েছিল। এমনকি রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাথে ঈমান আনয়নকারীরা শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন, কখন আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য আসবে? জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।” (সূরা বাকারাহ ২:২১৪)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتّٰي نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِيْنَ مِنْكُمْ وَالصّٰبِرِيْنَ لا وَنَبْلُوَاْ أَخْبَارَكُمْ)‏



“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যাতে তোমাদের অবস্থা যাচাই করে নিতে পারি এবং দেখে নিতে পারি যে, তোমাদের মধ্যে কারা মুজাহিদ ও ধৈর্যশীল।” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩১)



যার ঈমান যত বেশি, তাকে তত বেশি কষ্ট ও বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। হাদীসে এসেছে:



মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হন নাবী-রাসূলগণ অতঃপর সৎ ব্যক্তিগণ। এরপর তাদের মত যারা ঈমানদার তারা। এভাবে মানুষকে তাদের দীনের অনুপাতে পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। যদি সে তার দীনের ওপর দৃঢ় হয় তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয় এবং বিপদ-আপদ তার ওপর নাযিল হয়ে থাকে। (তিরমিযী হা: ২৩৯৮, ইবনু মাযাহ হা: ৪০২৩, সহীহ) যে ব্যক্তি যত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে তার প্রতিদান তত বেশি হবে। আল্লাহ তা‘আলা যে জাতিকে ভালবাসেন তাদেরকে পরীক্ষা করেন, যে ব্যক্তি সে পরীক্ষায় ধৈর্যশীল ও সন্তুষ্ট থাকবে আল্লাহ তা‘আলাও তার ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন আর অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহ তা‘আলাও অসন্তুষ্ট হবেন। (তিরমিযী, ইবনু মাযাহ হা: ৪০৩১, হাসান)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে জেনে নেনন কে প্রকৃত ঈমানদার, আর কে মিথ্যা ঈমানের দাবীদার। পূর্ববর্তী জাতির ঈমানদারদেরকে আল্লাহ তা‘আলা পরীক্ষা করেছিলেন। যারা প্রকৃত ঈমানদার ছিল তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে আর যারা শুধু মুখে ঈমানের কথা বলত অন্তরে ঈমান ছিল না তারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। খাব্বাব বিন আরাত্ত (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাদর মুড়ি দিয়ে কাবার ছায়াতলে বসে ছিলেন। এমন সময় আমরা অভিযোগ করলাম, আপনি যদি আমাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে সাহায্য চাইতেন, দু‘আ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তোমাদের পূর্ববর্তী যারা ঈমানদার ছিল তাদের কাউকে নিয়ে এসে কাফিররা মাথার ওপর করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলত, লোহার চিরুনী নিয়ে আসা হতো এবং তা দিয়ে শরীরের গোসত হাড় থেকে আলাদা করে ফেলা হত। এর পরেও তাদেরকে দীন থেকে সরাতে পারত না। (সহীহ বুখারী হা: ৩৮৫২)



(أَمْ حَسِبَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ السَّيِّئٰتِ)



অর্থাৎ যারা ঈমান ও আমলের পরওয়া করে না, অসৎ আমল করেই যাচ্ছে তারা কি ধারণা করে যে, তারা আল্লাহ তা‘আলার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পাকড়াও করতে পারবেন না! না, এরূপ ধারণা কতই না খারাপ, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে যথোপযুক্ত শাস্তি দেবেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষকে তার ঈমান অনুপাতে পরীক্ষা করা হয়। যার ঈমান যত মজবুত তার পরীক্ষা তত কঠিন।

২. সকল বস্তুই আল্লাহ তা‘আলার আয়ত্তাধীন, কেউ তার আয়ত্তের বাইরে নয়।

৩. কাফিররাও পরীক্ষার সম্মুখীন হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর

এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ মুমিনদেরকেও পরীক্ষা না করেই ছেড়ে দেয়া হবে- এটা অসম্ভব।

সহীহ হাদীসে এসেছেঃ “সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় মুমিনদের উপর, তারপর সৎ লোকদের উপর, এরপর তাদের চেয়ে নিম্ন মর্যাদার লোকদের উপর, এরপর তাদের চেয়েও নিম্ন মর্যাদার লোকদের উপর। পরীক্ষা তাদের দ্বীনের অনুপাতে হয়ে থাকে। যদি সে তার দ্বীনের উপর দৃঢ় হয় তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয় এবং বিপদ-আপদ তার উপর অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে দাখিল হয়ে যাবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনও জানেন (৩:১৪২) অনুরূপ আয়াত সূরায়ে বারাআতেও রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ সূরায়ে বাকারায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনও তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিল- আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? হ্যা, হ্যাঁ, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” (২:২১৪) এই জন্যেই এখানেও বলেনঃ আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম, আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। এর দ্বারা এটা মনে করা চলবে না যে, আল্লাহ এটা জানতেন না। বরং যা হয়ে গেছে। এবং যা হবে সবই তিনি জানেন। এর উপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সমস্ত ইমাম একমত। এখানে (আরবি) অর্থ (আরবি) বা দেখার অর্থে ব্যবহৃত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি)-এর অর্থ (আরবি) করেছেন। কেননা, দেখার সম্পর্ক বিদ্যমান জিনিসের সাথে হয়ে থাকে এবং (আরবি) এর (আরবি) থেকে বা সাধারণ।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা মন্দ কর্ম করে তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ! অর্থাৎ যারা ঈমান আনয়ন করেনি তারাও যেন এ ধারণা না করে যে, তারা পরীক্ষা হতে বেঁচে যাবে। তাদের জন্যে বড় বড় শাস্তি অপেক্ষা করছে। তারা আল্লাহর আয়ত্তের বাইরে যেতে পারবে না। তাদের ধারণা খুবই মন্দ, যার ফল তারা সত্বরই জানতে পারবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।