আল কুরআন


সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 77)

সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 77)



হরকত ছাড়া:

يا أيها الذين آمنوا اركعوا واسجدوا واعبدوا ربكم وافعلوا الخير لعلكم تفلحون ﴿٧٧﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا ارْکَعُوْا وَ اسْجُدُوْا وَ اعْبُدُوْا رَبَّکُمْ وَ افْعَلُوا الْخَیْرَ لَعَلَّکُمْ تُفْلِحُوْنَ ﴿ۚٛ۷۷﴾




উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুরকা‘উওয়াছজুদূওয়া‘বুদূরাব্বাকুম ওয়াফ‘আলুলখাইরা লা‘আল্লাকুম তুফলিহূন।




আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা রুকূ‘ কর, সিজদা কর, তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং ভাল কাজ কর, আশা করা যায় তোমরা সফল হতে পারবে।[সাজদাহ]




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৭. হে মুমিনগণ! তোমরা রুকূ’ কর, সিজদা কর এবং তোমাদের রব-এর ইবাদাত কর ও সৎকাজ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! তোমরা রুকূ‘ কর, সেজদা কর আর তোমাদের প্রতিপালকের ‘ইবাদাত কর ও সৎকাজ কর যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পার। [সাজদাহ]




আহসানুল বায়ান: (৭৭) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা রুকূ কর, সিজদা কর[1] এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর; যাতে তোমরা সফলকাম[2] হতে পার। [3] (সাজদাহ-ইমাম শাফেয়ীর মতে)



মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমরা রুকু কর, সাজদাহ কর এবং তোমাদের রবের ইবাদাত কর ও সৎ কাজ কর যাতে সফলকাম হতে পার। [সাজদাহ]



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা রুকু ও সেজদা করো (নামায পড়), তোমাদের প্রভুর ইবাদত করো এবং (অন্যান্য) সৎকর্ম করো; যাতে সফলকাম হতে পার।



মুহিউদ্দিন খান: হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু কর, সেজদা কর, তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর এবং সৎকাজ সম্পাদন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা রুকু করো ও সিজদা করো, আর তোমাদের প্রভুর এবাদত করো এবং ভালকাজ করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।



Sahih International: O you who have believed, bow and prostrate and worship your Lord and do good - that you may succeed.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭৭. হে মুমিনগণ! তোমরা রুকূ’ কর, সিজদা কর এবং তোমাদের রব-এর ইবাদাত কর ও সৎকাজ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ সফল হতে হলে এ কাজগুলো করতে হবে। সালাত কায়েম করতে হবে, রুকু ও সিজদার মাধ্যমে, এ দু'টি সালাতেরই গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আর এ ইবাদতই হচ্ছে চক্ষু শীতলকারী, চিন্তান্বিত অন্তরের জন্য সান্ত্বনা। আর আল্লাহর রুকুবিয়াতে বিশ্বাসের এটাই দাবী যে, বান্দা একমাত্র তারই ইবাদাত করবে এবং যাবতীয় কল্যাণের কাজ করবে। [সা’দী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭৭) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা রুকূ কর, সিজদা কর[1] এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর; যাতে তোমরা সফলকাম[2] হতে পার। [3] (সাজদাহ-ইমাম শাফেয়ীর মতে)


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, নামাযের প্রতি যত্নবান হও যা শরীয়তে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ইবাদতের আদেশও করা হয়েছে, যার মধ্যে নামাযও শামিল। কিন্তু নামাযের বিশেষ গুরুতত্ত্ব ও মর্যাদার দিক দিয়ে লক্ষ্য রেখে তার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ হয়েছে।

[2] অর্থাৎ, সফলতা আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর আনুগত্যে; অর্থাৎ সৎকর্ম সম্পাদনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে শুধু দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও বিলাস-সামগ্রীর আধিক্যে সফলতা নেই; যেমন অধিকাংশ মানুষের ধারণা।

[3] এই আয়াত শেষে তিলাঅতের সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ’রাফের শেষ আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর:



মু’মিনদের সফলতার চাবিকাঠি সালাতের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে মু’মিনগণ, তোমরা সালাত আদায় কর। এখানে বিশেষভাবে রুকু‘ ও সিজদা করার নির্দেশ দেয়ার কারণ হল সালাতের অন্যতম রুকন হচ্ছে রুকূ-সিজদা। এ দুটি রুকন বাদ পড়লে সালাত হবে না, তাছাড়া অংশ (রুকূ-সিজদা) উল্লেখ করে পূর্ণাঙ্গ (সালাত) বুঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে আবার ইবাদতের আদেশ করা হয়েছে, যার মধ্যে সালাত শামিল। কিন্তু সালাতের গুরুত্ব ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ সালাত ঈমানের পরিচায়ক, মু’মিন ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য নিরূপণকারী। যেমন সহীহ হাদীসে বলা হয়েছেন কিয়ামতের মাঠে সর্বপ্রথম যে জিনিসের হিসাব গ্রহণ করা হবে তা হল সালাত। (নাসাঈ হা: ৪৬৬, তিরযিমী হা: ৪১৩, ইবনে মাজাহ হা: ১৪২৬, সহীহ)



উক্ত আয়াতে সালাত ও অন্যান্য ইবাদতের কথা বলার পর আবার কল্যাণকর কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সালাত যেমন একটি কল্যাণের কাজ, তেমনি অন্যান্য সকল কল্যাণকর কাজ কর তাহলে অবশ্যই সফলকাম হবে। এ আয়াত তেলাওয়াত শেষে সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ‘রাফের শেষ আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।



(وَجَاهِدُوْا فِي اللّٰهِ حَقَّ جِهَادِه)



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন আল্লাহ তা‘আলার পথে সংগ্রাম করে। এ ‘সংগ্রাম’ বলতে কেউ কেউ সেই বড় জিহাদ উদ্দেশ্য নিয়েছেন যা আল্লাহ তা‘আলার কালিমা ও দীনকে উন্নত করার জন্য কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে করা হয়। আবার কেউ কেউ আদেশাবলী মান্য করার অর্থ নিয়েছেন। যেহেতু তাতেও নাফসে আম্মারাহ (মন্দপ্রবণ মন) ও শয়তানের মুকাবিলা করতে হয়। আবার কেউ কেউ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, তা হল প্রত্যেক সেই চেষ্টা-সাধনা যা হক ও সত্যের শির উন্নত এবং বাতিল ও অন্যায়ের শির অবনত করার জন্য করা হয়।



মূলত জিহাদ হল, উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য প্রানান্তর চেষ্টা করা। আর আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ বলতে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশকে পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করা, আল্লাহ তা‘আলার পথে মানুষকে দাওয়াত দেয়ান সেটা হতে পারে উপদেশ, শিক্ষা, যুদ্ধ, শিষ্টাচার, ধমক এবং নসীহত ইত্যাদির মাধ্যমে। (তাফসীর সাদী)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি মানব জাতির জন্য যে দীন বা ধর্ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাতে কঠিন কোন কিছু নেই। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে এমন আদেশ নেই, যা মান্য করা অত্যন্ত কষ্টকর। বরং পূর্ববর্তী শরীয়তের কিছু কঠিন আদেশ রহিত করে দেয়া হয়েছে এবং মুসলিমদের জন্য এমন অনেক সহজতা দান করা হয়েছে যা পূর্ববর্তী শরীয়তে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নিশ্চয়ই দীন সহজ, দীনের ব্যাপারে কেউ কঠোরতা করলে দীন তার ওপর বিজয়ী হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯)



(مِلَّةَ أَبِيْكُمْ إِبْرٰهِيْمَ طهُوَ سَمّٰكُمُ الْمُسْلِمِيْنَ)



‘এটাই তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের ধর্ম। তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ অর্থাৎ উল্লিখিত নির্দেশাবলী তোমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর ধর্মের অন্তর্ভুক্ত, যা সর্বদা বহাল ছিল। সুতরাং তোমরা তাঁর মিল্লাত তথা ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থাক। এখানে ইবরাহীম (عليه السلام)-কে পিতা বলার কারণ হল, আরব জাতি ইসমাঈল (عليه السلام)-এর বংশধর ছিল। সেই হিসেবে ইবরাহীম (عليه السلام) হলেন আরববাসীর পিতা আর অনারবরাও তাঁকে একজন উচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করত, যেমন পুত্র তার পিতাকে শ্রদ্ধা করে থাকে। সেই হিসেবে তিনি সকলের আদি পিতা ছিলেন। এছাড়াও ইসলামের নাবী আরবী হওয়ার কারণে ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁরও পিতা ছিলেন। আর এ জন্য তিনি সকল উম্মাতে মুহাম্মাদীরও পিতা হলেন। আর তিনিই তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম বলে। এখানে هُوَ তিনিই বলতে কাকে বুঝানো হয়েছে? কেউ বলেছেন, ইবরাহীম (عليه السلام); কেউ বলেছেন, কুরআন; আবার কেউ বলেছেন আল্লাহ তা‘আলা। مِنْ قَبْلُ অর্থাৎ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে, আর وَفِيْ هٰذَا দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ)



“হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য হতেও আপনার অনুগত একদল লোক সৃষ্টি করুন।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৮)



অতএব তোমরা তাঁরই ধর্মের অনুসারী হও। কেননা তাঁর ধর্মই হল সঠিক ধর্ম। আল্লাহ বলেন:



(قُلْ إِنَّنِيْ هَدَانِيْ رَبِّيْٓ إِلٰي صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ ৫ ط دِيْنًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيْمَ حَنِيْفًا ج وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ)‏



“বল:‎ নিশ্চয়ই ‘আমার প্রতিপালক আমাকে সৎ পথে পরিচালিত করেছেন, তা সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।’’ (সূরা আন‘আম ৬:১৬১)



(لِيَكُوْنَ الرَّسُوْلُ شَهِيْدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُوْنُوْا شُهَدَا۬ءَ عَلَي النَّاسِ)



অত্র আয়াতে উম্মাতে মুহাম্মাদীর মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের ভাল-মন্দ আমলের সাক্ষী হবেন আর তোমরা (উম্মাতে মুহাম্মাদী) হবে সমগ্র মানব জাতির ওপর সাক্ষী। কারণ তোমরা মধ্যমপন্থী জাতি, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ১৪৩ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



(وَاعْتَصِمُوْا بِاللّٰهِ)



‘আল্লাহকে আঁকড়ে ধর’ বলতে আল্লাহ তা‘আলার রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখ, তোমাদের সমস্ত কাজে তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর। সব সময় তাঁর ওপরই নির্ভর কর। তাঁরই সাহায্য-সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রতি দৃষ্টি রাখ।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মু’মিনদের সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি হল সালাত আদায় করা।

২. উম্মাতে মুহাম্মাদীর মর্যাদা সম্পর্কে জানলাম।

৩. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে।

৪. মুসলিমদের জাতির পিতা হলেন ইবরাহীম (عليه السلام)।

৫. মু’মিনদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ তা‘আলা।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর:

এই দ্বিতীয় সিজদাটির ব্যাপারে দু’টি উক্তি রয়েছে। প্রথম সিজুদার জায়গায় আমরা ঐ হাদীসটি বর্ণনা করেছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরায়ে ‘হাজ্জ’কে দুটি সিজদার মাধ্যমে ফযীলত দান করা হয়েছে। যারা এ দুটো সিজদা করে না তারা যেন এই আয়াতটি না পড়ে।”

আল্লাহ তাআলা রুকু সিজদা, ইবাদত ও সৎকর্মের হুকুম করার পর বলছেনঃ তোমরা তোমাদের জান, মাল ও কথা দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ কর এবং যেভাবে জিহাদ করা উচিত সেভাবেই কর। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিত।”

তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। অন্যান্য উম্মত বর্গের উপর তিনি তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। পূর্ণ রাসূল (সঃ) ও পূর্ণ শরীয়ত দানের মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তোমাদেরকে তিনি সহজ এবং উত্তম দ্বীন প্রদান করেছেন। এমন আহকাম তোমাদের উপর রাখেন নাই যা পালন করা তোমাদের পক্ষে কঠিন। এমন বোঝা তিনি তোমাদের উপর চাপিয়ে দেন নাই বহন করা তোমাদের সাধ্যাতিত।

‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল এ দুটি সাক্ষ্য দানের পর ইসলামের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন হচ্ছে নামায। বাড়ীতে অবস্থানকালে চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামায চার রাকআতই পড়তে হয়। আর সফরে থাকাকালে চার রাকআতের স্থলে দু'রাকআত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। ভয়ের নামায তো হাদীস অনুযায়ী মাত্র এক রাকআত পড়ার হুকুম আছে। ওটাও আবার পায়ে হেঁটে বা সওয়ারীর উপর এবং কিবলামুখী হয়ে হোক কিংবা কিবলার দিকে মুখ না হোক। সফরের নফল নামাযেরও অনুরূপ হুকুম আছে যে, সওয়ারীর মুখ যেদিকেই থাক না কেন নামায হয়ে যাবে। রুগ্ন ব্যক্তি বসে নামায পড়তে পারে এবং বসে না পারলে শুয়েও পড়তে পারে। অন্যান্য ফরয ও ওয়াজিব গুলোকেও মহান আল্লাহ সহজ সাধ্য করেছেন। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমি একনিষ্ঠ ও খুবই সহজ দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মুআয (রাঃ) এবং হযরত আবু মূসাকে (রাঃ) ইয়ামানের আমীর নিযুক্ত করে পাঠান তখন তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেনঃ “তোমরা (জনগণকে) সুসংবাদ দেবে, তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করবে না এবং এমন কাজের হুকুম করবে যা পালন করা তাদের পক্ষে সহজ সাধ্য হয়, কঠিন না হয়। এই বিষয় সম্পৰ্কীয় বহু হাদীস রয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের নিম্নরূপ তাফসীরই করেছেনঃ “তোমাদের দ্বীনে কোন সংকীর্ণতা কঠোরতা নেই।” ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এর (আরবী) উপর (আরবী) বা যবর দেয়া হয়েছে (আরবী) হিসেবে। এটা যেন (আরবী) এইরূপ ছিল। আবার (আরবী) কে উহ্য মেনে নিয়ে (আরবী) কে ওর (আরবী) হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এই অবস্থায় এটা (আরবী) এই আয়াতের মত হয়ে যাবে।

মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম। অর্থাৎ আল্লাহ তাআ'লা হযরত ইবরাহীমেরও (আঃ) পূর্বে মুসলিম নামকরণ করেন। কেননা, তার প্রার্থনা ছিলঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে (দু’জন অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমাদের সন্তানদের মধ্য হতে একটি দলকে ‘মুসলিম বানিয়ে দিন। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন এই উক্তিটি সঠিক বলে বিবেচিত হচ্ছে না। যে, পূর্বে দ্বারা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পূর্বে বুঝানো হয়েছে। কেননা এটা প্রকাশমান যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) এই উম্মতের নাম এই কুরআনে ‘মুসলিম রাখেন নাই। তাহলে পূর্বে দ্বারা অর্থ হবেঃ পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, যিকরে এবং এই পবিত্র শেষ কিতাবে।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনেরও উক্তি এটাই। আর এটা সঠিকও বটে। কেননা ইতিপূর্বে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। এবং তাদের দ্বীন সহজ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অতঃপর এই দ্বীনের প্রতি আরো বেশী অকির্ষণ সৃষ্টি করার জন্যে বলা হচ্ছেঃ এটা হলো ঐ দ্বীন যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) আনয়ন করেছিলেন।

এরপর এই উম্মতের বুযুর্গীর জন্যে এবং তাদেরকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের বর্ণনা আমার পূর্ববর্তী কিতাব সমূহেও ছিল। যুগ যুগ ধরে নবীদের (আঃ) আসমানী কিতাবসমূহে তোমাদের আলোচনা হতে থেকেছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের পাঠকরা তোমাদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং এই কুরআনের পূর্বে এবং এই কুরআনেও তোমাদের নাম ‘মুসলিম'। আর এই নামকরণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ।

হযরত হারিস আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অজ্ঞতার দাবী এখনও করে (অর্থাৎ বাপ-দাদার উপর এবং বংশের উপর গর্ব প্রকাশ করে; আর অন্যান্য মুসলমানদেরকে ইতর ও তুচ্ছ জ্ঞান করে) সে জাহান্নামের ইন্ধন।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদিও সে রোযা রাখে ও নামায পড়ে (তবুও কি) ?` উত্তরে তিনি বলেনঃ “হা ,হাঁ'। যদিও সে রোযাদার হয় এবং নামাযীও হয় (তবুও সে জাহান্নামের ইন্ধন হবে)।” সুতরাং আল্লাহ তাআলা তোমাদের যে নাম রেখেছেন সেই নামেই ডাকো। তা হলো ‘মুসলেমীন', ‘মুমিনীন' এবং ইবাদুল্লাহ'।` (ইমাম নাসাঈ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন) সূরায়ে বাকারার। এই আয়াতের তাফসীরে আমরা এই হাদীসটিকে পূর্ণ রূপে বর্ণনা করেছি।

মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণ এবং উত্তম উম্মত এ জন্যেই বানিয়েছি এবং এজন্যেই আমি তোমাদের সুখ্যাতি অন্যান্য সমস্ত উম্মতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন মানব জাতির জন্যে সাক্ষীস্বরূপ হও। পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মত উম্মতে মুহাম্মদীর (সঃ) শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা স্বীকার করবে। এই উম্মত সমস্ত উম্মতের উপর নেতৃত্ব লাভ করেছে। এই জন্যেই এই উম্মতের সাক্ষ্য অন্যান্য উম্মত বর্গের উপর ধর্তব্য হবে। তাদের সাক্ষ্য হবে এটাই যে, পূর্ববর্তী উম্মত বর্গের কাছে তাদের নব্বীরা (আঃ) আল্লাহর পয়গাম পৌছিয়ে দিয়েছিলেন। আর এই উম্মতের উপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষ্য প্রদান করবেন যে, তিনি তাদের কাছে আল্লাহর দ্বীন পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব তিনি পূর্ণভাবে পালন করেছেন। এই ব্যাপারে যতগুলি হাদীস রয়েছে এবং যত কিছু তাফসীর আছে সবই আমরা সূরায়ে বাকারার সপ্তদশ রুকুর (আরবী) (২:১৪৩) এই আয়াতের তাফসীরে লিখে এসেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। সেখানে আমরা হযরত নূহ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতের ঘটনাও বর্ণনা করেছি।

আল্লাহ তাআলার উক্তি সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর। অর্থাৎ এত বড় নিয়ামতের অধিকারী যিনি তোমাদেরকে করেছেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা তোমাদের একান্ত কর্তব্য। এর পন্থা এই যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর যা কিছু ফরয করেছেন তা অতি আগ্রহের সাথে খুশী মনে তোমরা পালন কর। বিশেষ করে নামায ও যাকাতের প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হবে। আল্লাহ তাআলা যা কিছু ওয়াজিব করেছেন তা আন্তরিক মুহাব্বতের সাথে পালন কর। যা কিছু তিনি হারাম করেছেন তার কাছেও যেয়ো না। সুতরাং নামায, যা নির্ভেজাল আল্লাহরই জন্যে এবং যাকাত, যার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত ছাড়াও তার সৃষ্টজীবের প্রতিও ইহসান করা হয়, ধনী লোকেরা তাদের মালের একটা অংশ সন্তুষ্ট চিত্তে দরিদ্রদেরকে দান করে, এতে তাদের কাজ চলে, মনে তৃপ্তি আসে। এতেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অংশও কম এবং বছরে মাত্র একবার।

যাকাতের সমস্ত নিয়ম কানুন সূরায়ে তাওবা’র (আরবী) (৯:৬০) এই আয়াতের তাফসীরে আমরা বর্ণনা করে দিয়েছি। আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা বলেনঃ আল্লাহকে অবলম্বন কর। তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা রাখো। তোমাদের সমস্ত কাজে তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর। সব সময় তাঁর উপরই নির্ভর কর। তারই সাহায্য সহায়তা ও পৃষ্ঠ পোষকতার প্রতি দৃষ্টি রাখো।

মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তিঃ তিনিই তোমাদের অভিভাবক। তিনিই তোমাদের রক্ষক। তিনিই তোমাদের সহায়ক। তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের উপর বিজয় দানকারী তিনিই। তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক। তিনি যার অভিভাবক হন, তার আর কোন অভিভাবকের প্রয়োজন নেই। সর্বোত্তম সাহায্যকারী তিনিই। দুনিয়ার সবাই যদি শত্রু হয়ে যায় তাতেও কোন যায় আসে না। সবারই উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী।

মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে হযরত ওয়াহীব ইবনু অরূদ (রাঃ) হতে। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে ইবনু আদম! তোমার ক্রোধের সময় তুমি আমাকে স্মরণ করো, তা হলে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। আর যাদের উপর আমার শাস্তি অবতীর্ণ হবে তাদের মধ্য থেকে আমি তোমাকে রক্ষা করবো। ধ্বংস প্রাপ্তদের সাথে আমি তোমাকে ধ্বংস করবো না। হে আদম সন্তান! যখন তোমার উপর যুলুম করা হয় তখন তুমি ধৈর্য ধারণ কর, আমার প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং আমার সাহায্যের উপর ভরসা রাখো ও আমার সাহায্যের উপর সন্তুষ্ট থাকো। জেনে রেখো যে, তুমি তোমার নিজেকে সাহায্য করবে এর চেয়ে আমিই তোমাকে সাহায্য করবে এটাই উত্তম।” এ সব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।