সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 2)
হরকত ছাড়া:
يوم ترونها تذهل كل مرضعة عما أرضعت وتضع كل ذات حمل حملها وترى الناس سكارى وما هم بسكارى ولكن عذاب الله شديد ﴿٢﴾
হরকত সহ:
یَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ کُلُّ مُرْضِعَۃٍ عَمَّاۤ اَرْضَعَتْ وَ تَضَعُ کُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَ تَرَی النَّاسَ سُکٰرٰی وَ مَا هُمْ بِسُکٰرٰی وَ لٰکِنَّ عَذَابَ اللّٰهِ شَدِیْدٌ ﴿۲﴾
উচ্চারণ: ইয়াওমা তারাওনাহা-তাযহালুকুলল মুরদি‘আতিন ‘আম্মাআরদা‘আত ওয়া তাদা’উ কুলুল যা-তি হামলিন হামলাহা-ওয়া তারান্না-ছা ছুকা-রা-ওয়ামা-হুম বিছুকা-রা-ওয়ালা-কিন্না ‘আযা-বাল্লা-হি শাদীদ।
আল বায়ান: যেদিন তোমরা তা দেখবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্য দানকারিনী আপন দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভধারিণী তার গর্ভপাত করে ফেলবে, তুমি দেখবে মানুষকে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা মাতাল নয়। তবে আল্লাহর আযাবই কঠিন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্মৃত হবে তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্ৰত্যেক গর্ভবতী তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে(১); মানুষকে দেখবেন নেশাগ্রস্তের মত, যদিও তারা নেশাগ্ৰস্ত নয়। বরং আল্লাহর শাস্তি কঠিন।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: সেদিন তুমি দেখবে প্রতিটি দুগ্ধদায়িনী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে, আর প্রত্যেক গর্ভবতী গর্ভপাত করে ফেলবে, আর মানুষকে দেখবে মাতাল, যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে মাতাল নয়, কিন্তু আল্লাহর শাস্তি বড়ই কঠিন (যার কারণে তাদের ঐ অবস্থা ঘটবে)।
আহসানুল বায়ান: (২) যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নিজ দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। আর মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। [1]
মুজিবুর রহমান: যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্মৃত হবে তার দুগ্ধ পোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে; মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন।
ফযলুর রহমান: যেদিন তোমরা তা (কেয়ামত) দেখবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী তার দুধের শিশুর কথা ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভ ফেলে দেবে; আর মানুষকে তুমি নেশাগ্রস্তের মত দেখতে পাবে, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত থাকবে না। বস্তুত আল্লাহর আজাব বড় কঠিন।
মুহিউদ্দিন খান: যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুতঃ আল্লাহর আযাব সুকঠিন।
জহুরুল হক: সেইদিন যখন তোমরা তা দেখবে, -- প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী ভুলে যাবে যাকে সে স্তন্য দিচ্ছিল, আর প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে, আর তুমি দেখতে পাবে মানুষকে নেশাগ্রস্ত, অথচ তারা মাতাল নয়, বস্তুতঃ আল্লাহ্র শাস্তি হচ্ছে বড় কঠোর।
Sahih International: On the Day you see it every nursing mother will be distracted from that [child] she was nursing, and every pregnant woman will abort her pregnancy, and you will see the people [appearing] intoxicated while they are not intoxicated; but the punishment of Allah is severe.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২. যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্মৃত হবে তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্ৰত্যেক গর্ভবতী তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে(১); মানুষকে দেখবেন নেশাগ্রস্তের মত, যদিও তারা নেশাগ্ৰস্ত নয়। বরং আল্লাহর শাস্তি কঠিন।(২)
তাফসীর:
(১) কেয়ামতের এই ভূকম্পনের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে আয়াতে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যাবে এবং স্তন্যদাত্রী মহিলারা তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা ভুলে যাবে। যদি এই ভূকম্পন কেয়ামতের পূর্বেই এই দুনিয়াতে হয়, তবে এরূপ ঘটনা ঘটার ব্যাপারে কোন সংশয় নেই। কোন কোন মুফাসসির বলেন, مرضعة এমন অবস্থাকে বলা হয় যখন কার্যত সে দুধ পান করাতে থাকে এবং শিশু তার স্তন মুখের মধ্যে নিয়ে থাকে। [ইবন কাসীর] কাজেই এখানে যে ছবিটি আঁকা হয়েছে সেটি হচ্ছে, যখন কেয়ামতের সে কম্পন শুরু হবে, মায়েরা নিজেদের শিশু সন্তানদেরকে দুধ পান করাতে করাতে ফেলে দিয়ে পালাতে থাকবে এবং নিজের কলিজার টুকরার কি হলো, একথা কোন মায়ের মনেও থাকবে না। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
পক্ষান্তরে যদি এ ঘটনা হাশর-নশরের পরে হয় তাহলে এর ব্যাখ্যা কারো কারো মতে এরূপ হবে যে, যে মহিলা দুনিয়াতে গর্ভাবস্থায় মারা গেছে, কেয়ামতের দিন সে তদাবস্থায়ই উত্থিত হবে এবং যারা স্তন্যদানের সময় মারা গেছে, তারাও তেমনিভাবে শিশুসহ উত্থিত হবে। তারা তাদের সন্তানদের দুধ খাওয়ানোর কথা চিন্তাও করবে: না। [কুরতুবী]
(২) একথা সুস্পষ্ট যে, এখানে কিয়ামতের অবস্থা বর্ণনা করা বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য নয় বরং কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থা বর্ণনা করে পুনরুত্থান অস্বীকারকারীদের উপর দলীল প্রমাণাদি পেশ করা। তাই পরবর্তী আয়াতে সেদিকেই দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] অথবা উদ্দেশ্য তাদেরকে সেদিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে উদ্ধৃদ্ধ করা ও নেক কাজ করার মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করা। [কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২) যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নিজ দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। আর মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। [1]
তাফসীর:
[1] পূর্বোক্ত আয়াতে যে প্রকম্পনের কথা বলা হয়েছে যার পরিণতি এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যার অর্থঃ মানুষের মধ্যে কঠিন ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। আর এটি ঘটবে ঠিক কিয়ামতের পূর্বমুহূর্তে, আর তার পরই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। অথবা এ ঘটনা কিয়ামতের (জন্য শিঙ্গায় ফুৎকার করার) পর ঐ সময় ঘটবে, যখন মানুষ কবর হতে উঠে হাশরের ময়দানে জমায়েত হবে। অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারিগণ দ্বিতীয় অর্থ নিয়েছেন। আর তার সমর্থনে কিছু হাদীস পেশ করেন, যেমন মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে আদেশ করবেন যে, যেন তিনি নিজ সন্তানদের মধ্য হতে হাজারে ৯৯৯ জনকে জাহান্নামের জন্য বের করে দেন। এই কথা শুনে গর্ভবতীরা তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে, বালকরা বৃদ্ধ হয়ে পড়বে, আর মানুষকে দেখে মাতাল মনে হবে, অথচ তারা আসলে মাতাল হবে না; বরং আল্লাহর আযাবের ভয়াবহতার জন্য এ রকম (কিংকর্তব্যবিমূঢ়) হবে। সাহাবাদের কাছে এ কথা অত্যন্ত ভারী মনে হল, তাদের চেহারার রং পাল্টে গেল। নবী (সাঃ) তা দেখে বললেন ভয়ের কিছু নেই। ৯৯৯ জনের সংখ্যা য়্যা’জূজ-মা’জূজের মধ্য হতে হবে আর তোমাদের মাত্র একজন। তোমাদের সংখ্যা অন্য মানুষদের তুলনায় এমন হবে, যেমন সাদা গরুর গায়ে একটি কালো লোম অথবা কালো গরুর গায়ে একটি সাদা লোম। আর আমি আশা করি যে, তোমরাই হবে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ বা এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক। তা শুনে সাহাবারা আনন্দে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারিত করলেন। (সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা হাজ্জ) প্রথম বক্তব্যও অমূলক নয়। কিছু দুর্বল হাদীস দ্বারা তার সমর্থন পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রকম্পন হেতু ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার কথাই এখানে স্পষ্ট। অবশ্য একই শ্রেণীর ভয় ও আতঙ্ক উভয় সময়েই হবে। সেই জন্য দু’টি মতই সঠিক হতে পারে। কারণ, দুই সময়েই মানুষের অবস্থা হবে সে রকমই হবে, যে রকম উক্ত আয়াত ও সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বলা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
উক্ত সূরাটিতে হজ্জ সংক্রান্ত বিধি-বিধান আলোচনা করা হয়েছে বিধায় এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে সূরাতুল হজ্জ। এ সূরাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূরা। সূরার শুরুতে কিয়ামতের ভয়াবহতা, শয়তানের অনুসরণের খারাপ পরিণতি, মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া এবং যাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সকল সৃষ্টি আল্লাহর ইবাদত করে, কিন্তু একশ্রেণির মানুষ সেসব সৃষ্টির ইবাদত করে, মূলত তারা নির্বোধ, ইবরাহীম (عليه السلام) ও তাঁর সন্তান ইসমাঈল (عليه السلام) -এর কাবা নির্মাণ ও হজ্জের ঘোষণা এবং কুরবানীর বিধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও সূরার শেষের দিকে যারা অন্যায়ভাবে নির্যাতিত হবে তাদের জন্য জিহাদ করা, কিসসাতুল গারানীক সম্পর্কে সতর্ক করা এবং যারা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের ইবাদত করে তাদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে।
১-২ নং আয়াতের তাফসীর:
সূরার প্রারম্ভিকাতেই আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর সকল মানুষকে সতর্ক করে বলছেন, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করার মাধ্যম হল তাঁর নির্দেশাবলী পালন করা এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা। কারণ কিয়ামতের প্রকম্পন ভয়াবহ জিনিস। মানুষের মাঝে কঠিন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। আতঙেঙ্কর ভয়াবহতা পরের আয়াতে উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: দুগ্ধদানকারিণী মা তার দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা ভুলে যাবে, গর্ভবতী নারীর কখন গর্ভপাত হবে বুঝতেও পারবে না, এমনকি মানুষ নেশাগ্রস্ত হলে তার অবস্থা যেমন হয় কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে তাদের অবস্থা সেরূপ হবে। কিয়ামতের ভয়াবহতা অন্যত্র তুলে ধরে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِذَا زُلْزِلَتِ الْاَرْضُ زِلْزَالَھَاﭐﺫ وَاَخْرَجَتِ الْاَرْضُ اَثْقَالَھَاﭑﺫ وَقَالَ الْاِنْسَانُ مَا لَھَاﭒﺆ یَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ اَخْبَارَھَا)
“যখন পৃথিবীকে তার কম্পনে প্রকম্পিত করা হবে, এবং যখন পৃথিবী তার বোঝা বের করে দেবে, আর মানুষ বলবে, এর কী হল? সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে।” (সূরা যিলযাল ৯৯:১-৪)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَّحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَّاحِدَةً لا - فَيَوْمَئِذٍ وَّقَعَتِ الْوَاقِعَةُ)
“আর পৃথিবী ও পর্বতমালাকে উত্তোলন করা হবে এবং একই ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে। সেদিন যা সংঘটিত হওয়ার তা অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (সূরা হাক্কাহ ৬৯:১৪-১৫)
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন বলবেন: হে আদম! তিনি বলবেন: হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আপনার দরবারে হাজির আছি। অতঃপর উচ্চস্বরে ঘোষণা করা হবে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তুমি তোমার সন্তানদের মধ্য যারা জাহান্নামী তাদেরকে বের কর। তিনি জিজ্ঞেস করবেন: হে আমার প্রতিপালক! কত হাজারের মধ্যে থেকে কত জনকে? তিনি উত্তরে বলবেন: প্রতি হাজারের মধ্যে নয়শ নিরানব্বই জনকে। ঐ সময় গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যাবে এবং স্তন্যদাত্রী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে। আর শিশুরা হয়ে যাবে বৃদ্ধ। মানুষকে সেদিন দেখে মাতাল মনে হবে যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। আল্লাহ তা‘আলার কঠিন শাস্তির কারণেই তাদের এ অবস্থা হবে। এ কথা শুনে সাহাবীদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে বলেন: ইয়া‘জূজ-মা‘জুজের মধ্য হতে নয়শত নিরানব্বই জন (জাহান্নামী) এবং তোমাদের মধ্যে হতে একজন (জান্নাতী)। তোমরা লোকদের মধ্যে এমনই যেমন সাদা রঙের গরুর কয়েকটি কালো লোম এর পার্শ্বদেশে থাকে বা কালো রঙের গরুর কয়েকটি সাদা লোম এর পার্শ্বদেশে থাকে। তারপর তিনি বলেন: আমি আশা করি যে, সমস্ত জান্নাতীদের মধ্যে তোমরাই হবে এক চতুর্থাংশ। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা তখন আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। আবার বললেন: জান্নাতীদের মধ্যে তোমরাই হবে এক তৃতীয়াংশ। এবারও আমরা তাকবীর ধ্বনি করলাম। এরপর তিনি আবার বললেন: তোমরাই হবে জান্নাতীদের অর্ধাংশ। আমরা এবারও তাকবীর ধ্বনি পাঠ করলাম। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩, সহীহ মুসলিম হা: ২০২২) কিয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কিত অসংখ্য আয়াত রয়েছে; যেমন সূরা ওয়াকিয়ার ৪-৫ নং আয়াত, সূরা নাযিয়াতের ৬-৮ নং আয়াত, সূরা মু’মিনের ৩২-৩৩ নং আয়াত, সূরা আহযাবের ১০-১১ নং আয়াত ইত্যাদি । কিয়ামতের এ ভয়াবহ প্রকম্পন কখন হবে তা নিয়ে কয়েকটি মত রয়েছে। কেউ বলেছেন মানুষ হাশরের উদ্দেশ্যে কবর থেকে উত্থিত হওয়ার পূর্বে। কেউ বলেছেন, শেষ যুগে। আবার কেউ বলেছেন হাশরের ময়দানে ইত্যাদি। তবে অধিকাংশ বিদ্বান বলেছেন কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার পর। বলা হয়, কিয়ামতের দিন তো কোন স্তন্যদানকারী থাকবে না এবং কোন গর্ভবতী মহিলাও থাকবে না, তাহলে কিভাবে আয়াতে তা বলা হল। উত্তর, এটা একটি উপমা দিয়ে বলা হয়েছে যে, সেদিন এরূপ কোন মহিলা থাকলে তাদের অবস্থা অনুরূপ হতো। অথবা সেদিন এরূপ মহিলা বানানো হবে।
সুতরাং কিয়ামতের এরূপ ভয়াবহ অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সঠিক ঈমান ও সৎ আমল নিয়ে যেতে হবে। কিয়ামতের ভয়াবহতা মু’মিনের দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। তারা নিরাপদে সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করা যাবে না।
২. কিয়ামতের দিনের অবস্থা হবে খুবই ভয়াবহ।
৩. আদম সন্তানের হাজারে একজন জান্নাতে যাবে।
৪. সমস্ত জান্নাতবাসীর অর্ধেক হবে উম্মাতে মুহাম্মাদী হতে।
৫. কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে ঈমান আনয়ন অতঃপর বেশি বেশি সৎ আমল করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-২ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে সংযমশীল ও ধর্মভীরু হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং আগমনকারী ভয়াবহ ব্যাপার হতে সতর্ক করছেন। বিশেষ করে তিনি তাদেরকে সতর্ক করছেন কিয়ামতের দিনের প্রকম্পন হতে। এটা ঐ প্রকম্পমান যা কিয়ামত সংঘটি হওয়ার অবস্থায় উঠবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রকম্পিত হবে, এবং পৃথিবী যখন ওর ভার বের করে দিবে।” (৯৯৪ ১-২) মহিমময় আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পর্বতমালা সমেত পৃথিবী উৎক্ষিপ্ত হবে এবং একই ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূণ হয়ে যাবে। সেইদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয়।” (৬৯:১৪-১৫) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়বে।” (৫৬:৪-৫) কতকলোক বলেছেন যে, এই প্রকম্পন হবে দুনিয়ার শেষ অবস্থায় ও কিয়ামতের প্রাথমিক অবস্থায়। তাফসীরে ইবনু জারীরে আলকামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই প্রকম্পন হবে কিয়ামতের পূর্বে। আমির শা'বীও (রঃ) বলেন যে, এটা হবে দুনিয়াতেই কিয়ামতের পূর্বে।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করেন তখন তিনি সূর’ বা শিংগা সৃষ্টি করেন এবং ওটা তিনি হযরত ইসরাফীলকে (আঃ) প্রদান করেন। হযরত ইসরাফীল (আঃ) ওটা মুখে করে রয়েছেন এবং চক্ষু উপরের দিকে উঠিয়ে আবৃশের দিকে তাকিয়ে আছেন এই অপেক্ষায় যে, কখন আল্লাহর হুকুম হবে এবং তিনি ঐ শিংগায় ফুৎকার দিবেন।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘সূর বা শিংগা কি জিনিস?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এটা একটা শিং।” তিনি আবার প্রশ্ন করেনঃ “ওটা কেমন?” তিনি জবাব দেনঃ “ওটা একটা বড় শিং, যাতে তিন বার ফুঁক দেয়া হবে। প্রথম ফুকে সবাই হতবুদ্ধি ও কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় খুঁকে সবাই আল্লাহ তাআলার সামনে দণ্ডায়মান হবে।” বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত ইসরাফীল (আঃ) তাতে ফুঙ্কার দিবেন যার ফলে সমস্ত যমীন ও আসমানবাসী হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, শুধু তারা নয় যাদেরকে আল্লাহ চাইবেন। নিঃশ্বাস না নিয়েই দীর্ঘক্ষণ ধরে অনবরত হযরত ইসরাফীল (আঃ) তাতে ফুৎকার দিতে থাকবেন। এটাই হলো ঐ ফুৎকার যে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরা তো অপেক্ষা করছে একটি মাত্র প্রচণ্ড নিনাদের, যাতে কোন বিরাম থাকবে না।” (৩৮:১৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেইদিন প্রথম শিংগা ধ্বনি প্রকম্পিত করবে। ওটাকে অনুসরণ করবে পরবর্তী শিংগা ধ্বনি। কত হৃদয় সেদিন সন্ত্রস্ত হবে।” (৭৯:৬-৮) যমীনের ঐ অবস্থা হবে যে অবস্থা তূফানে এবং জলঘূর্ণিতে নৌকার হয়ে থাকে। অথবা যেমন কোন লণ্ঠন আশে লটকানো হয় যাকে বাতাস চারদিকে হেলাতে দোলাতে থাকে। আহা! তখন অবস্থা এই হবে যে, স্তন্যদাত্রী মহিলা তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হয়ে যাবে এবং গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যাবে, শিশু বৃদ্ধ হয়ে পড়বে, শয়তানরা পালাতে শুরু করবে এবং পালাতে পালাতে যমীনের প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কিন্তু সে ফেরেশতাদের মার খেয়ে সেখান হতে ফিরে আসবে। লোকেরা হতবুদ্ধি হয়ে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করবে। তারা একে অপরকে ডাকতে থাকবে। এজন্যেই এই দিনটিকে কুরআন কারীমে ইয়াওমুত তানাদ' (ডাকাডাকির দিন) বলা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে আশংকা করছি। কিয়ামত দিবসের যেই দিন তোমরা পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, আল্লাহর শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করার কেউ থাকবে না; আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।” (৪০:৩২-৩৩) ঐ দিনই যমীন এক দিক হতে অন্যদিক পর্যন্ত ফেটে যাবে। ঐদিনের ভীতি বিহ্বলতার অনুমান করা যেতে পারে না। আকাশে পরিবর্তন প্রকাশ পাবে। সূর্য ও চন্দ্র কিরণ হীন হয়ে পড়বে। তারকারাজি ঝরে পড়তে থাকবে। চামড়া খসে পড়তে শুরু করবে। জীবিত লোকেরা এসব কিছু দেখতে থাকবে। তবে মৃত লোকেরা এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে অজ্ঞাত থাকবে।
মহান আল্লাহর (আল্লাহ যাদেরকে চান তারা ছাড়া যারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে রয়েছে। সবাই অজ্ঞান হয়ে যাবে এই উক্তি দ্বারা যাদেরকে পৃথক করা হয়েছে যে, তারা অজ্ঞান হবে না তারা হলো শহীদ লোকগুলি। এই ভীতি বিহবলতা। জীবিতদের উপর হবে। শহীদরা আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত রয়েছে এবং তাদেরকে ঐদিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন এবং পূর্ণ নিরাপত্তা দান করবেন। আল্লাহর এই শাস্তি শুধু দুষ্ট ও অবাধ্য লোকদের উপর হবে। এটাকেই মহান আল্লাহ এই সূরার প্রাথমিক আয়াতগুলিতে বর্ণনা করেছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ), ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এবং ইবনু আবি হাতিম (রঃ) খুবই লম্বা চওড়াভাবে বর্ণনা করেছেন) হাদীসের এই অংশটুকু এখানে আনয়নের উদ্দেশ্য এই যে, এই আয়াতে যে প্রকম্পনের কথা বলা হয়েছে তা হবে কিয়ামতের পূর্বে। কিয়ামতের দিকে এর সম্বন্ধ করার কারণ হলো ঐ সময় কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী হওয়া। যেমন বলা হয় “কিয়ামতের নিদর্শন সমূহ' ইত্যাদি। এই সব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অথবা এর দ্বারা ঐ প্রকম্পনকে বুঝানো হয়েছে যা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় হাশরের মাঠে সংঘটিত হবে, যে সময় মানুষ কবর থেকে উঠে ময়দানে একত্রিত হবে। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। এর প্রমাণ হিসেবে বহু হাদীসও রয়েছে।
প্রথম হাদীসঃ হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সফরে ছিলেন। তাঁর সাহাবীবর্গ (রাঃ) দ্রুতগতিতে চলছিলেন। হঠাৎ করে তিনি উচ্চস্বরে উপরোক্ত আয়াত দু'টি পাঠ করেন। সাবাহীদের কানে এ শব্দ পৌঁছা মাত্রই তারা সবাই তাদের সওয়ারীগুলি নিয়ে তার চতপার্শ্বে একত্রিত হয়ে যান। তাদের ধারণা ছিল। যে, তিনি আরো কিছু বলবেন। তিনি বললেনঃ “এটা কোন দিন হবে তা তোমরা জান কি? এটা হবে ঐদিন যেই দিন আল্লাহ তাআ'লা হযরত আদমকে (আঃ) বলবেনঃ “হে আদম (আঃ)! জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।” তিনি বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজনকে বের করবো?` আল্লাহ তাআলা জবাব দিবেনঃ “প্রতি হাযারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে জাহান্নামের জন্যে এবং একজনকে জান্নাতের জন্যে।` এটা শোনা মাত্রই সাহাবীদের অন্তর কেঁপে ওঠে এবং তারা নীরব হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ অবস্থা দেখে তাদেরকে বলেনঃ “দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না, বরং আনন্দিত হও ও আমল করতে থাকো। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের সাথে দু'টি মাখলুক রয়েছে, এ দু'টি মাখলূক যাদের সাথেই থাকে তাদের বৃদ্ধি করে দেয়। অর্থাৎ ইয়াজুজ মাজু। আর বাণী আদমের মধ্যে যারা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ইবলীসের সন্তানরা (জাহান্নামীদের মধ্যে এরাও রয়েছে)।` একথা শুনে সাহাবীদের ভীতি বিহ্বলতা কমে আসে। তখন আবার তিনি বলেনঃ “আমল করতে থাকো এবং সুসংবাদ শুনো। যার অধিকারে মুহাম্মদের (সঃ) প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমরা তো অন্যান্য লোকদের তুলনায় তেমন, যেমন উটের পার্শ্বদেশের বা জন্তুর হাতের (সামনের পায়ের) দাগ।” (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে) এই রিওয়াইয়াতেরই অন্য সনদে রয়েছে যে, এই আয়াতটি সফরের অবস্থায় অবতীর্ণ হয়। তাতে রয়েছে যে, সাহাবীরা (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) পূর্ব। ঘোষণাটি (অর্থাৎ হাজারের মধ্যে নয়শ’ ব্রিানব্বই জন জাহান্নামী ও মাত্র একজন জান্নাতী) শুনে কাঁদতে শুরু করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা কাছে কাছেই হও এবং ঠিক ঠাক থাকো। (ভয়ের কোন কারণ নেই। কেননা, জেনে রেখো যে,) প্রত্যেক নবুওয়াতের পূর্বেই অজ্ঞতার যুগ থেকেছে। ঐ যুগের লোকদের দ্বারাই (জাহান্নামীদের) এই সংখ্যা পূরণ হবে। যদি তাদের দ্বারা পূরণ না হয় তবে মুনাফিকরা এই সংখ্যা পূরণ করবে। আমি তো আশা করি যে, জান্নাতীদের এক চতুর্থাংশ হবে তোমরাই।” একথা শুনে সাহাবীগণ ‘আল্লাহু আকবার' বলেন। এরপর নবী (সঃ) বলেনঃ “এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তোমরাই এক তৃতীয়াংশ।” এতে সাহাবীরা আবার তাকবীর পাঠ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা রাখি যে, তোমরাই হবে জান্নাতীদের অর্ধেক।” বর্ণনাকারী বলেনঃ “ব্বী (সঃ) পরে দুই তৃতীয়াংশের কথাই বলেছিলেন কিনা তা আমার স্মরণে নেই।” (এ রিওয়াইয়াতটি জামে তিরমিযীতে রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি বিশুদ্ধ) অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাৰূকের যুদ্ধ হতে ফিরবার পথে মদীনার নিকটবর্তী হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) (আরবী) (২২:১) এই আয়াতটি পাঠ করেন। তারপর হাদীসটি ইবনু জাদআনের (রঃ) বর্ণনার মতই বর্ণনা করা হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
দ্বিতীয় হাদীসঃ হযরত আনাস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (আরবী) এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এরপর তিনি ঐ হাদীসের মতই হাদীস বর্ণনা করেন যা হাসান (রঃ) ইমরান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি এটুকুও বর্ণনা করেছেন যে, দানব ও মানবের অধিকাংশ যারা ধ্বংস হয়েছে (তারাও জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত)। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এটাকে মামারের (রঃ) হাদীস হতে দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন)
তৃতীয় হাদীসঃ যরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি অনুরূপভাবে হাদীস বর্ণনা করেন এবং তাতে তিনি বলেনঃ “আমি আশা করি যে, জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ তোমরাই হবে। তারপর বলেনঃ “আমি আশা রাখি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ।” এরপর আবার বলেনঃ “আমার আশা এই যে, তোমরাই হবে বেহেশতবাসীদের অর্ধাংশ।` এতে সাহাবীগণ অত্যন্ত খুশী হন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আরও বলেনঃ “তোমরা হাজার অংশের এক অংশ।` (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
চতুর্থ হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেনঃ “হে আদম (আঃ)!” তিনি বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আপনার দরবারে হাজির আছি।” অতঃপর উচ্চ স্বরে ঘোষণা করা হবেঃ “আল্লাহ তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তুমি তোমার সন্তানদের মধ্যে যারা জাহান্নামী তাদেরকে বের কর।` তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কত জনের মধ্য হতে কতজনকে (বের করবো)? তিনি উত্তরে বলবেনঃ “প্রতি হাজারের মধ্যে নয়শ নিরানব্বই জনকে।” ঐ সময় গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যাবে এবং স্তন্যদাত্রী তার দুগ্ধ পোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে, আর শিশুরা হয়ে যাবে বৃদ্ধ। মানুষকে সেই দিন মাতাল সদৃশ দেখা যাবে, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। আল্লাহর কঠিন শাস্তির কারণেই তাদের এই অবস্থা হবে।` এ কথা শুনে সাহাবীদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “ইয়াজুজ মাজুজের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বইজন (জাহান্নামী) এবং তোমাদের মধ্য হতে একজন (জান্নাতী)। তোমরা লোকদের মধ্যে এমনই যেমন সাদা রঙ এর গরুর কয়েকটি কালো লোম ওর পার্শ্বদেশে থাকে বা কালো রঙ এর গরুর কয়েকটি সাদা লোম ওর পার্শ্বদেশে থাকে। তারপর তিনি বলেনঃ “আমি আশা করি যে, সমস্ত জান্নাতবাসী তোমরাই হবে এক চতুর্থাংশ।” (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা তখন তাকবীর ধ্বনি করলাম। আবার তিনি বলেনঃ “তোমরাই হবে বেহেশতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ।` এবারেও আমরা আল্লাহু আকবার' বললাম। এরপর তিনি বললেনঃ “জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ হবে তোমরাই।” আমরা এবারেও তাকবীর ধ্বনি করলাম। (এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)
পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন ঘোষণাকারীকে পাঠাবেন যিনি ঘোষণা করবেনঃ “হে আদম (আঃ)! আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আপনি যেন আপনার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামের অংশ বের করেন।” তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ হে আমার প্রতিপালক! তারা কারা?` উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “প্রতি একশ জন হতে নিরানব্বই জনকে।` তখন কওমের একটি লোক বললেনঃ “আমাদের মধ্যকার এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা মানুষের মাঝে তো উটের বুকের একটা চিহ্নের মত।` (এহাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ষষ্ঠ হাদীসঃ হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমরা শূন্য পা, উলঙ্গ দেহ এবং খত্না বিহীন অবস্থায় আল্লাহর কাছে উত্থিত হবে।` একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পুরুষ লোক ও স্ত্রীলোক একে অপরের দিকে তাকাবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! ঐ সময়টা হবে খুবই কঠিন ও ভয়াবহ (কাজেই কি করে একে অপরের দিকে তাকাবে।)” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন বন্ধু তার বন্ধুকে স্মরণ করবে কি?` তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! তিনটি অবস্থায় বা সময় কেউ কাউকেও স্মরণ করবে না। প্রথম হলো আমল ওজন করার সময়, যে পর্যন্ত না ওর কম বা বেশী হওয়া জানতে পারে। দ্বিতীয় হলো, যখন আমলনামা প্রদান করা হবে যে, না জানি তা ডান হাতে প্রদান করা হচ্ছে কি বাম হাতে প্রদান করা হচ্ছে। তৃতীয় হলো ঐ সময়, যখন জাহান্নাম হতে একটি গর্জন বের হবে ও সবকে পরিবেষ্টন করে ফেলবে এবং অত্যন্ত ক্রোধান্বিত অবস্থায় থাকবে। আর বলবেঃ ` তিন প্রকার লোকের উপর আমাকে আধিপত্য দেয়া হয়েছে। প্রথম প্রকার হলো ঐ লোকেরা যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে আহ্বান করতো। দ্বিতীয় প্রকারের লোক হলো ওরাই যারা হিসাবের দিনের উপর বিশ্বাস করতো না। আর তৃতীয় শ্রেণীর লোক হলো প্রত্যেক উদ্ধত, হঠকারী এবং অহংকারী।” তাদেরকে জড়িয়ে ফেলবে এবং বেছে বেছে নিজের পেটের মধ্যে ভরে নেবে। জাহান্নামের উপর পুলসিরতি থাকবে যা হবে চুলের চেয়েও বেশী সূক্ষ্ম এবং তরবারীর চেয়েও বেশী তীক্ষ্ণ ওর উপর আঁকড়া ও কাটা থাকবে। আল্লাহ তাআলা যাকে চাইবেন তাকে এ দুটো ধরে ফেলবে। ঐ পুলসিরাত যারা অতিক্রম করবে তারা কেউ কেউ বিদ্যুৎ বেগে ওটা পার হয়ে যাবে, কেউ কেউ চোখের পলকে পার হবে, কেউ পার হবে বায়ুর গতিতে, কেউ অতিক্রম করবে দ্রুতগতি ঘোড়ার মত এবং কেউ পার হবে দ্রুতগতি উটের মত। চতুর্দিকে ফেরেশতারা দাড়িয়ে দুআ করতে থাকবেনঃ “হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দান করুন!” সুতরাং কেউ কেউ তো সম্পূর্ণ ব্রিপিত্তার সাথে পার হয়ে যাবে, কেউ কিছুটা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে রক্ষা পেয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) কিয়ামতের নিদর্শনসমূহ ও ওর ভয়াবহতা সম্পর্কে আরো বহু হাদীস রয়েছে, যেগুলির জন্যে অন্য স্থান রয়েছে। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী) (নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার)। ভীতি বিহ্বলতার সময় অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠাকে বলা হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন মু'মিনরা পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।” (৩৩:১১)
মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে দিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে’ (আরবী) এটা যামীরে শান এর প্রকারভুক্ত। এ কারণেই এর পরে এর তাফসীর রয়েছেঃ ঐ দিনের কাঠিন্যের কারণে স্তন্যদাত্রী মাতা তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। মানুষ হয়ে যাবে মাতাল সদৃশ্য। তাদেরকে নেশাগ্রস্ত বলে মনে হবে। কিন্তু আসলে তারা নেশাগ্রস্ত হবে না। বরং শাস্তির কঠোরতা তাদেরকে অজ্ঞান করে রাখবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।