আল কুরআন


সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 132)

সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 132)



হরকত ছাড়া:

وأمر أهلك بالصلاة واصطبر عليها لا نسألك رزقا نحن نرزقك والعاقبة للتقوى ﴿١٣٢﴾




হরকত সহ:

وَ اْمُرْ اَهْلَکَ بِالصَّلٰوۃِ وَ اصْطَبِرْ عَلَیْهَا ؕ لَا نَسْـَٔلُکَ رِزْقًا ؕ نَحْنُ نَرْزُقُکَ ؕ وَ الْعَاقِبَۃُ لِلتَّقْوٰی ﴿۱۳۲﴾




উচ্চারণ: ওয়া’মুর আহলাকা বিসসালা-তি ওয়াসতাবির ‘আলাইহা- লা-নাছআলুকা রিযকান নাহনুনারযুকুকা ওয়াল ‘আ-কিবাতুলিত্তাকওয়া-।




আল বায়ান: আর তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত আদায়ের আদেশ দাও এবং নিজেও তার উপর অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে কোন রিয্ক চাই না। আমিই তোমাকে রিয্ক দেই আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩২. আর আপনার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দিন ও তাতে অবিচল থাকুন(১), আমরা আপনার কাছে কোন রিযিক চাই না; আমরাই আপনাকে রিযিক দেই।(২) আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়াতেই নিহিত।(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর তোমার পবিরার-পরিজনকে নামাযের নির্দেশ দাও আর তাতে অবিচল থাক। তোমার কাছে আমি রিযক চাই না, আমিই তোমাকে রিযক দিয়ে থাকি, উত্তম পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য নির্দিষ্ট।




আহসানুল বায়ান: (১৩২) তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও এবং ওতে অবিচলিত থাক।[1] আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাই না। আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। আর সংযমীদের জন্য শুভ পরিণাম।



মুজিবুর রহমান: আর তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও এবং তাতে অবিচল থাক। আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাইনা, আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিই এবং শুভ পরিণামতো মুত্তাকীদের জন্য।



ফযলুর রহমান: তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাযের আদেশ দাও এবং নিজে তাতে অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে কোন জীবিকা চাচ্ছি না। আমিই তোমাকে জীবিকা দিয়ে থাকি। আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়ারই।



মুহিউদ্দিন খান: আপনি আপনার পরিবারের লোকদেরকে নামাযের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোন রিযিক চাই না। আমি আপনাকে রিযিক দেই এবং আল্লাহ ভীরুতার পরিণাম শুভ।



জহুরুল হক: আর তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের নির্দেশ দাও আর তাতে লেগে থাকো। আমরা তোমার কাছ থেকে কোনো রিযেক চাই না, আমরাই তোমাকে রিযেক দান করি। আর শুভ পরিণাম তো ধর্মপরায়ণতার জন্য।



Sahih International: And enjoin prayer upon your family [and people] and be steadfast therein. We ask you not for provision; We provide for you, and the [best] outcome is for [those of] righteousness.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৩২. আর আপনার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দিন ও তাতে অবিচল থাকুন(১), আমরা আপনার কাছে কোন রিযিক চাই না; আমরাই আপনাকে রিযিক দেই।(২) আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়াতেই নিহিত।(৩)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আপনি পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও এর উপর অবিচল থাকুন। বাহ্যতঃ এখানে আলাদা আলাদা দুটি নির্দেশ রয়েছে। (এক) পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ এবং (দুই) নিজেও সালাত অব্যাহত রাখা। এর এমন ফলাফল সামনে এসে যাবে যাতে আপনার হৃদয় উৎফুল্ল হয়ে উঠবে। এ অর্থটি কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন অন্যত্ৰ সালাতের হুকুম দেবার পর বলা হয়েছেঃ “আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে ‘মাকামে মাহমুদে' (প্ৰশংসিত স্থান) পৌঁছিয়ে দেবেন।” [সূরা আল-ইসরাঃ ৭৯] অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আপনার জন্য পরবর্তী যুগ অবশ্যি পূর্ববর্তী যুগের চাইতে ভালো। আর শিগগির আপনার রব আপনাকে এত কিছু দেবেন যার ফলে আপনি খুশি হয়ে যাবেন।” [সূরা ‘আদ-দুহাঃ ৪–৫]


(২) অর্থাৎ আপনি নিজের পরিবারবর্গের রিযক নিজস্ব জ্ঞান-গরিমা ও কর্মের জোরে সৃষ্টি করুন এবং সালাত থেকে দূরে থাকবেন এটা যেন না হয়। আপনি আল্লাহর ইবাদাতের দিকে বেশী মশগুল হোন। আপনি যদি সালাত কায়েম করেন তবে আপনার রিযিকের কোন ঘাটতি হবে না। কোত্থেকে রিযিক আসবে তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন। না। [ইবন কাসীর] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ যার যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা দুনিয়ার প্রতি ধাবিত হয়, আল্লাহ্‌ তার যাবতীয় কর্মকান্ড বিক্ষিপ্ত করে দেন। আর তার কপালে দারিদ্র্যতা লিখে দেন। আর তার কাছে দুনিয়া শুধু অতটুকুই নিয়ে আসে, যতটুকু আল্লাহ তার জন্য লিখেছেন এবং যার যাবতীয় উদ্দেশ্য হবে আখেরাত, আল্লাহ্ তার যাবতীয় কাজ গুছিয়ে দেন, তার অন্তরে অমুখাপেক্ষীতা সৃষ্টি করে দেন। আর দুনিয়া তার কাছে বাধ্য হয়ে এসে পড়ে। [ইবনে মাজাহঃ ৪১০৫]


(৩) আমার কোন লাভের জন্য আমি তোমাদের সালাত পড়তে বলছি না। বরং এতে লাভ তোমাদের নিজেদেরই। সেটি হচ্ছে এই যে, তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হবে। আর এটিই দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানে স্থায়ী ও শেষ সাফল্যের মাধ্যম। এক হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন যে, তার কাছে রুতাব তা’জা’ খেজুর নিয়ে আসা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটার ব্যাখ্যা করলেন যে, আমাদের এ দ্বীনের মর্যাদা দুনিয়াতে বৃদ্ধি পাবে। [দেখুন, মুসলিম: ২২৭০]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৩২) তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও এবং ওতে অবিচলিত থাক।[1] আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাই না। আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। আর সংযমীদের জন্য শুভ পরিণাম।


তাফসীর:

[1] এই আদেশ নবী (সাঃ)-এর সাথে তাঁর সমস্ত উম্মতের জন্য। অর্থাৎ, মুসলিমদের জন্য জরুরী যে, তাঁরা নিজেদের নামাযের প্রতি যত্নবান হবে এবং পরিবারের লোকেদেরকেও নামাযের জন্য তাকীদ করবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩১-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর:



দুর্বল ঈমানের মু’মিনগণ বলে থাকে আমরা ঈমান আনা সত্ত্বেও দুনিয়াতে কত কষ্টে আছি অথচ কাফিররা কত সুখে, আরাম-আয়েশে বাস করছে। তাদের উত্তর অত্র আয়াতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকল মু’মিনকে বলে দিচ্ছেন যে, দুনিয়াতে কাফিরদেরকে যে আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি, ভোগ-বিলাস ও চাকচিক্যময় জীবন দান করেছি সে দিকে দৃষ্টিপাত করো না। এসব দুনিয়ার ঐশ্বর্য ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী, আল্লাহ তা‘আলা পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছেন, কে তা পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস রাখে, আর কে নাফরমানী করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَي الْأَرْضِ زِيْنَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا)‏



“পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা সৌন্দর্য করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে সৎ কর্মে কে শ্রেষ্ঠ। ” (সূরা কাহফ ১৮:৭) এরূপ সূরা হিজরের ৮৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ও তোমার মাধ্যমে মু’মিনদের যে নেয়ামত দান করেছেন তা উত্তম ও চিরস্থায়ী যা আখিরাতের জীবনের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌ وَّأَبْقٰي)‏



“অথচ আখিরাত (জীবন) উত্তম ও চিরস্থায়ী।” (সূরা আ‘লা ৮৭:১৭)



একদা উমার (রাঃ) এসে দেখলেন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাটাইয়ের ওপর শুয়ে থাকায় চাটাইয়ের দাগ পিঠে লেগে রয়েছে। উমার (রাঃ) তা দেখে কেঁেদ ফেললেন। কী ব্যাপার উমার কাঁদ কেন? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন: রোম পারস্যের রাজা-বাদশারা কত সুখ-শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছে, আর আপনি সৃষ্টির সেরা হওয়া সত্ত্বেও কত কষ্ট করছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: উমার! তোমার কি এখনো সন্দেহ আছে? ওরা তো তারা যাদের সুখ-শান্তি পৃথিবীতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। পরকালে তাদের কোন সুখ থাকবেনা। (সহীহ বুখারী, সূরা তাহরীমের তাফসীর)



সুতরাং মু‘মিনদের উচিত দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি প্রাধান্য না দিয়ে আখিরাতের সফলতাকে প্রাধান্য দেয়া।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন: তিনি যেন তার পরিবারবর্গকে সালাতের নির্দেশ দেন এবং তার ওপর অটল থাকেন। এ নির্দেশ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে উম্মাতের সকল মু’মিনকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং সকল মু’মিন নিজে সালাত আদায় করবে সাথে সাথে পরিবাবর্গকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেবে। একদিন সালাত আদায় করবে আরেকদিন ছেড়ে দেবে তা নয়, বরং তা অবিরত আদায় করতে থাকবে, তার ওপর অবিচল থাকবে। যেমন ইসমাঈল (عليه السلام)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার উক্তি



(وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَه بِالصَّلٰوةِ وَالزَّكٰوةِ ص وَكَانَ عِنْدَ رَبِّه۪ مَرْضِيًّا ‏)‏



“সে তার পরিবার পরিজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের সন্তে‎াষভাজন।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৫)



আর এটিই হচ্ছে তাক্বওয়া বা আল্লাহ তা‘আলাভীতির পরিচয়, আর যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে তারাই সফল হবে এবং তাদের জন্যই উত্তম প্রতিদান।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়সে সালাত আদায় করার নির্দেশ দাও, দশ বছর বয়সে প্রহার কর (যদি সালাত আদায় না করে)। (আবূ দাউদ হা: ৪৯৫, সহীহ) এ আয়াত নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক সকালে ফাতিমা (রাঃ) এর বাড়িতে চলে যেতেন এবং সালাতের কথা বলতেন। উমার (রাঃ) রাতে কিয়াম করার জন্য বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে দিতেন। (কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পার্থিব ক্ষণস্থায়ী ধন-সম্পদ আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র হওয়ার আলামত নয়।

২. পার্থিব সম্পদ মানুষের পরীক্ষার বস্তু।

৩. মু’মিনরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের ওপর আখিরাতের সফলতাকে প্রাধান্য দেয়।

৪. নিজে সালাত আদায় করতে হবে এবং পরিবারকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দিতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩১-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি কাফিরদের পার্থিব সৌন্দর্য ও সুখ ভোগের প্রতি আফসোস পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখো না। এটা তো অতি অল্প দিনের সুখ ভোগ মাত্র। তাদের রীক্ষার জন্যেই এ সব তাদেরকে দেয়া হয়েছে। আমি দেখতে চাই যে, তারা এ সব পেয়ে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে কি অকৃতজ্ঞ হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে কৃতজ্ঞ বান্দাদের সংখ্যা খুবই কম। তাদের ধনীদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণে উত্তম নিয়ামত তো তোমাকে দান করা হয়েছে। আমি তোমাকে এমন সাতটি আয়াত দান করেছি যা বারবার পঠিত হয় (অর্থাৎ সূরায়ে ফাতেহা)। আর তোমাকে মর্যাদা সম্পন্ন কুরআন দান করা হয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার দৃষ্টি ঐ কাফিরদের পার্থিব সৌন্দর্য ও উপভোগের উপকরণের প্রতি নিক্ষেপ করো না। অনুরূপভাবে হে নবী (সঃ) ! তোমার জন্যে তোমার প্রতিপালকের নিকট যে আতিথ্যের ব্যবস্থা রয়েছে তার কোন তুলনা নেই এবং এটা বর্ণনাতীত। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।

সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের সাথে স হবাস করা হতে বিরত থাকার শপথ করেছিলেন। তিনি একটি নির্জন কক্ষে অবস্থান করছিলেন। হযরত উমার (রাঃ) সেখানে প্রবেশ করে দেখেন যে, তিনি একটি খেজুরের পাতার চাটাই এর উপর শুয়ে রয়েছেন। চামড়ার একটা টুকরা একদিকে পড়ে রয়েছে এবং কয়েকটি চামড়ার মশক লটকানো আছে। আসবাবপত্র বিহীন ঘরের এ অবস্থা দেখে তার চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (রোম সম্রাট) কায়সার এবং (পারস্যের বাদশাহ) কিসরা কত সুখে শান্তিতে ও আরাম আয়েশে জীবন যাপন করছে, অথচ আপনি সৃষ্টজীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও আপনার এই অবস্থা তাঁর একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! এখনো তো তুমি সন্দেহের মধ্যেই পড়ে রয়েছে! তারা এমন সম্প্রদায় যে, তাদের পার্থিব জীবনেই তাদেরকে তাড়তািড়ি সুখ ভোগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। (পরকালে তাদের কোনই অংশ নেই)।”।

সুতরাং জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষমতা ও সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দুনিয়ার প্রতি খুবই অনাসক্ত ছিলেন। যা কিছু হাতে আসতো তা-ই আল্লাহর ওয়াস্তে একে একে দান করে দিতেন এবং নিজের জন্যে এক পয়সাও রাখতেন না।

হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদের ব্যাপারে ঐ সময়কেই সবচেয়ে বেশী ভয় করি যখন দুনিয়া তার সমস্ত সৌন্দর্যও আসবাবপত্র তোমাদের পদতলে নিক্ষেপ করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আসবাবপত্রের অর্থ কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “যমীনের বরকত। (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) মোট কথা, কাফিরদের পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্যেই দেয়া হয়।

মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও যাতে তারা আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচতে পারে। নিজেও ওর উপর অবিচলিত থাকো। নিজেকে এবং নিজের পরিবারবর্গকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর।

হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) অভ্যাস ছিল এই যে, রাত্রে যখন তিনি তাহাজ্জদের নামাযের জন্যে উঠতেন তখন তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগাতেন এবং এই আয়াতটি পাঠ করতেন।

আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তোমার কাছে কোন জীবনোপকরণ চাই না। তুমি নামাযের পাবন্দী কর, আল্লাহ তোমাকে এমন জায়গা হতে রিযক দিবেন যে, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা খোদাভীরুদেরকে মুক্তিদান করে থাকেন এবং তাদেরকে কল্পনাতীত জায়গা হতে জীবিকা প্রদান করেন।

সমস্ত দানব ও মানবকে শুধুমাত্র ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। রিযুকদাতা ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমার কাছে রিযক চাই না, বরং আমিই তোমাকে রিযুক দান করে থাকি।

বর্ণিত আছে যে, হযরত হিশামের (রঃ) পিতা যখন আমীর-উমারার নিকট গমন করতেন এবং তাদের শান-শওকত দেখতেন তখন তিনি নিজের বাড়ীতে ফিরে এসে এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করতেন এবং বলতেনঃ “হে আমার পরিবারবর্গ! তোমরা নামাযের হিফাযত করো, নামাযের পাবন্দী করো, তা হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর দয়া করবেন।` (এটাও মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত আছে)

হযরত সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সংকীর্ণতার সম্মুখীন হতেন তখন তিনি বলতেনঃ “হে আমার পরিবারবর্গ! তোমরা নামায পড় এবং নামাযকে প্রতিষ্ঠিত রাখো।” হযরত সাবিত (রাঃ) আরো বলেনঃ সমস্ত নবীরই এই নীতিই ছিল যে, কোন কারণে তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেই নামায শুরু করে দিতেন। (এটাও মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে ইবনু আদম! তুমি নিজেকে আমার ইবাদতের জন্যে মুক্ত করে দাও, আমি তোমার বক্ষকে ঐশ্বর্য ও অভাবহীনতা দ্বারা পূর্ণ করে দিবো। তোমার দারিদ্র ও অভাব দূর করে দিবো। আর যদি তা না কর তবে আমি তোমার অন্তরকে ব্যস্ততা দ্বারা পূর্ণ করবো এবং তোমার দারিদ্র দূর করবো না।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী ও সুনানে ইবনু মাজাহতে বর্ণিত আছে)

হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার সমস্ত চিন্তা ফিকির এবং ইচ্ছা ও খেয়াল একমাত্র আখেরাতের জন্যে হয় এবং তাতেই নিমগ্ন থাকে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা ও উদ্বেগ থেকে রক্ষা করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়ার চিন্তায় নিমগ্ন থাকে, সে যে কোন উপত্যকায় ধ্বংস হয়ে যাক এতে আল্লাহ তাআলার কোন পরওয়া নেই।` (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, দুনিয়ার চিন্তায় নিমগ্ন ব্যক্তির সমস্ত কাজে আল্লাহ তাআলার উদ্বেগ নিক্ষেপ করেন এবং তার দারিদ্র তার চোখের সামনে করে দেন। মানুষ দুনিয়া হতে ঐ পরিমাণই প্রাপ্ত হবে যে পরিমাণ তার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ আছে। আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে তার কেন্দ্র স্থল বানিয়ে নেবে এবং নিজের নিয়াত শুধু ওটাই রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি কাজে প্রশান্তি আনয়ন করবেন এবং তার অন্তরকে পরিতৃপ্ত করবেন। আর দুনিয়া তার পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্যেই। সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আজ রাত্রে আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমরা যেন উকবা ইবনু রাফে’র (রাঃ) বাড়ীতে রয়েছি। সেখানে আমাদের সামনে ইবনু তাবের (রাঃ) বাগানের রসাল খেজুর পেশ করা। হয়েছে। আমি এর তা'বীর (ব্যাখ্যা) এই নিয়েছি যে, পরিণামের দিক দিয়ে দুনিয়াতেও আমাদেরই পাল্লা ভারী হবে। উচ্চতাও উন্নতি আমরাই লাভ করবো। আর আমাদের দ্বীন পাক পবিত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।