আল কুরআন


সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 131)

সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 131)



হরকত ছাড়া:

ولا تمدن عينيك إلى ما متعنا به أزواجا منهم زهرة الحياة الدنيا لنفتنهم فيه ورزق ربك خير وأبقى ﴿١٣١﴾




হরকত সহ:

وَ لَا تَمُدَّنَّ عَیْنَیْکَ اِلٰی مَا مَتَّعْنَا بِهٖۤ اَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَۃَ الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا ۬ۙ لِنَفْتِنَهُمْ فِیْهِ ؕ وَ رِزْقُ رَبِّکَ خَیْرٌ وَّ اَبْقٰی ﴿۱۳۱﴾




উচ্চারণ: ওয়ালা-তামুদ্দান্না ‘আইনাইকা ইলা-মা-মাত্তা‘না-বিহীআযওয়া-জাম মিনহুম যাহরাতাল হা-য়া-তিদ দুনইয়া- লিনাফতিনাহুম ফীহি ওয়া রিযকুরাব্বিকা খাইরুওঁ ওয়া আবকা-।




আল বায়ান: আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩১. আর আপনি আপনার দু'চোখ কখনো প্রসারিত করবেন না(১) সে সবের প্রতি, যা আমরা বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি, তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। আর আপনার রব-এর দেয়া রিযিকই সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কক্ষনো চোখ খুলে তাকিও না ঐ সব বস্তুর প্রতি যা আমি তাদের বিভিন্ন দলকে পার্থিব জীবনে উপভোগের জন্য সৌন্দর্য স্বরূপ দিয়েছি, এসব দিয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। তোমার প্রতিপালকের দেয়া রিযকই হল সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে বেশী স্থায়ী।




আহসানুল বায়ান: (১৩১) আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না।[1] তোমার প্রতিপালকের জীবিকাই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী। [2]



মুজিবুর রহমান: তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত করনা ওর প্রতি যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়েছি তদ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। তোমার রাব্ব প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।



ফযলুর রহমান: পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের চাকচিক্যস্বরূপ যেসব ভোগের সামগ্রী দিয়েছি, তুমি তার দিকে চোখ বাড়িয়ো না। তোমার প্রভুর দেওয়া জীবিকাই শ্রেষ্ঠ ও অধিকতর স্থায়ী।



মুহিউদ্দিন খান: আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্যে পার্থিবজীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেয়া রিযিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।



জহুরুল হক: আর তোমার চোখ টাটিয়ো না তার প্রতি যা দিয়ে তাদের মধ্যেকার কোনো কোনো দম্পতিকে আমরা আপ্যায়িত করেছি -- দুনিয়ার জীবনের আড়ন্বর, যেন তার দ্বারা আমরা তাদের পরীক্ষা করতে পারি। আর তোমার প্রভুপ্রদত্ত রিযেক অধিকতর ভালো ও বেশী স্থায়ী।



Sahih International: And do not extend your eyes toward that by which We have given enjoyment to [some] categories of them, [its being but] the splendor of worldly life by which We test them. And the provision of your Lord is better and more enduring.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৩১. আর আপনি আপনার দু’চোখ কখনো প্রসারিত করবেন না(১) সে সবের প্রতি, যা আমরা বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি, তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। আর আপনার রব-এর দেয়া রিযিকই সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।


তাফসীর:

(১) এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু আসলে উম্মতকে পথ প্রদর্শন করাই লক্ষ্য। বলা হয়েছে, দুনিয়ার ঐশ্বর্যশালী পুঁজিপতিরা হরেক রকমের পার্থিব চাকচিক্য ও বিবিধ নেয়ামতের অধিকারী হয়ে বসে আছে। আপনি তাদের প্রতি ভ্ৰক্ষেপও করবেন না। কেননা, এগুলো সব ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহ্ তা'আলা যে নেয়ামত আপনাকে এবং আপনার মধ্যস্থতায় মুমিনদেরকে দান করেছেন, তা এই ক্ষণস্থায়ী পার্থিব চাকচিক্য থেকে বহুগুণে উৎকৃষ্ট। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৩১) আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না।[1] তোমার প্রতিপালকের জীবিকাই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী। [2]


তাফসীর:

[1] এটি সেই একই বিষয়ীভূত কথা, যা এর আগে সূরা আলে ইমরান ১৯৬-১৯৭ আয়াতে, সূরা হিজর ৮৮ আয়াতে, সূরা কাহ্ফ ৭ আয়াতে আলোচিত হয়েছে।

[2] এর অর্থ আখেরাতের প্রতিদান ও পুরস্কার যা দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও অন্যান্য উপভোগ্য জিনিস অপেক্ষা উত্তম ও স্থায়ী। ‘ঈলা’র হাদীসে বর্ণিত আছে যে, উমার (রাঃ) নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে দেখলেন, তিনি বিনা বিছানায় একটি চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন। আর তাঁর ঘরের আসবাব-পত্রের অবস্থা এই যে, শুধু দুটি চামড়ার জিনিস ছাড়া আর কিছুই নেই। উমার (রাঃ)-এর চক্ষু দিয়ে পানি এসে পড়ল। নবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘উমার কি ব্যাপার? কাঁদছ কেন?’’ উত্তর দিলেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! রোম ও পারস্যের রাজারা কি সুখ-শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছে, আর আপনি সৃষ্টির সেরা হওয়া সত্ত্বেও আপনার জীবনের এই অবস্থা!’ তিনি বললেন, ‘‘উমার! তুমি কি এখনও সন্দেহে আছ? ওরা তো তারা, যাদের সুখ-শান্তি পৃথিবীতেই­ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ অর্থাৎ, পরকালে ওদের জন্য কিছুই থাকবে না। (বুখারীঃ সূরা তাহরীমের তাফসীর, মুসলিমঃ ঈলা)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩১-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর:



দুর্বল ঈমানের মু’মিনগণ বলে থাকে আমরা ঈমান আনা সত্ত্বেও দুনিয়াতে কত কষ্টে আছি অথচ কাফিররা কত সুখে, আরাম-আয়েশে বাস করছে। তাদের উত্তর অত্র আয়াতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকল মু’মিনকে বলে দিচ্ছেন যে, দুনিয়াতে কাফিরদেরকে যে আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি, ভোগ-বিলাস ও চাকচিক্যময় জীবন দান করেছি সে দিকে দৃষ্টিপাত করো না। এসব দুনিয়ার ঐশ্বর্য ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী, আল্লাহ তা‘আলা পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছেন, কে তা পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস রাখে, আর কে নাফরমানী করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَي الْأَرْضِ زِيْنَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا)‏



“পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা সৌন্দর্য করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে সৎ কর্মে কে শ্রেষ্ঠ। ” (সূরা কাহফ ১৮:৭) এরূপ সূরা হিজরের ৮৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ও তোমার মাধ্যমে মু’মিনদের যে নেয়ামত দান করেছেন তা উত্তম ও চিরস্থায়ী যা আখিরাতের জীবনের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌ وَّأَبْقٰي)‏



“অথচ আখিরাত (জীবন) উত্তম ও চিরস্থায়ী।” (সূরা আ‘লা ৮৭:১৭)



একদা উমার (রাঃ) এসে দেখলেন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাটাইয়ের ওপর শুয়ে থাকায় চাটাইয়ের দাগ পিঠে লেগে রয়েছে। উমার (রাঃ) তা দেখে কেঁেদ ফেললেন। কী ব্যাপার উমার কাঁদ কেন? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন: রোম পারস্যের রাজা-বাদশারা কত সুখ-শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছে, আর আপনি সৃষ্টির সেরা হওয়া সত্ত্বেও কত কষ্ট করছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: উমার! তোমার কি এখনো সন্দেহ আছে? ওরা তো তারা যাদের সুখ-শান্তি পৃথিবীতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। পরকালে তাদের কোন সুখ থাকবেনা। (সহীহ বুখারী, সূরা তাহরীমের তাফসীর)



সুতরাং মু‘মিনদের উচিত দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি প্রাধান্য না দিয়ে আখিরাতের সফলতাকে প্রাধান্য দেয়া।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন: তিনি যেন তার পরিবারবর্গকে সালাতের নির্দেশ দেন এবং তার ওপর অটল থাকেন। এ নির্দেশ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে উম্মাতের সকল মু’মিনকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং সকল মু’মিন নিজে সালাত আদায় করবে সাথে সাথে পরিবাবর্গকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেবে। একদিন সালাত আদায় করবে আরেকদিন ছেড়ে দেবে তা নয়, বরং তা অবিরত আদায় করতে থাকবে, তার ওপর অবিচল থাকবে। যেমন ইসমাঈল (عليه السلام)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার উক্তি



(وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَه بِالصَّلٰوةِ وَالزَّكٰوةِ ص وَكَانَ عِنْدَ رَبِّه۪ مَرْضِيًّا ‏)‏



“সে তার পরিবার পরিজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের সন্তে‎াষভাজন।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৫)



আর এটিই হচ্ছে তাক্বওয়া বা আল্লাহ তা‘আলাভীতির পরিচয়, আর যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে তারাই সফল হবে এবং তাদের জন্যই উত্তম প্রতিদান।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়সে সালাত আদায় করার নির্দেশ দাও, দশ বছর বয়সে প্রহার কর (যদি সালাত আদায় না করে)। (আবূ দাউদ হা: ৪৯৫, সহীহ) এ আয়াত নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক সকালে ফাতিমা (রাঃ) এর বাড়িতে চলে যেতেন এবং সালাতের কথা বলতেন। উমার (রাঃ) রাতে কিয়াম করার জন্য বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে দিতেন। (কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পার্থিব ক্ষণস্থায়ী ধন-সম্পদ আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র হওয়ার আলামত নয়।

২. পার্থিব সম্পদ মানুষের পরীক্ষার বস্তু।

৩. মু’মিনরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের ওপর আখিরাতের সফলতাকে প্রাধান্য দেয়।

৪. নিজে সালাত আদায় করতে হবে এবং পরিবারকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দিতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩১-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি কাফিরদের পার্থিব সৌন্দর্য ও সুখ ভোগের প্রতি আফসোস পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখো না। এটা তো অতি অল্প দিনের সুখ ভোগ মাত্র। তাদের রীক্ষার জন্যেই এ সব তাদেরকে দেয়া হয়েছে। আমি দেখতে চাই যে, তারা এ সব পেয়ে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে কি অকৃতজ্ঞ হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে কৃতজ্ঞ বান্দাদের সংখ্যা খুবই কম। তাদের ধনীদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণে উত্তম নিয়ামত তো তোমাকে দান করা হয়েছে। আমি তোমাকে এমন সাতটি আয়াত দান করেছি যা বারবার পঠিত হয় (অর্থাৎ সূরায়ে ফাতেহা)। আর তোমাকে মর্যাদা সম্পন্ন কুরআন দান করা হয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার দৃষ্টি ঐ কাফিরদের পার্থিব সৌন্দর্য ও উপভোগের উপকরণের প্রতি নিক্ষেপ করো না। অনুরূপভাবে হে নবী (সঃ) ! তোমার জন্যে তোমার প্রতিপালকের নিকট যে আতিথ্যের ব্যবস্থা রয়েছে তার কোন তুলনা নেই এবং এটা বর্ণনাতীত। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।

সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের সাথে স হবাস করা হতে বিরত থাকার শপথ করেছিলেন। তিনি একটি নির্জন কক্ষে অবস্থান করছিলেন। হযরত উমার (রাঃ) সেখানে প্রবেশ করে দেখেন যে, তিনি একটি খেজুরের পাতার চাটাই এর উপর শুয়ে রয়েছেন। চামড়ার একটা টুকরা একদিকে পড়ে রয়েছে এবং কয়েকটি চামড়ার মশক লটকানো আছে। আসবাবপত্র বিহীন ঘরের এ অবস্থা দেখে তার চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (রোম সম্রাট) কায়সার এবং (পারস্যের বাদশাহ) কিসরা কত সুখে শান্তিতে ও আরাম আয়েশে জীবন যাপন করছে, অথচ আপনি সৃষ্টজীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও আপনার এই অবস্থা তাঁর একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! এখনো তো তুমি সন্দেহের মধ্যেই পড়ে রয়েছে! তারা এমন সম্প্রদায় যে, তাদের পার্থিব জীবনেই তাদেরকে তাড়তািড়ি সুখ ভোগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। (পরকালে তাদের কোনই অংশ নেই)।”।

সুতরাং জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্ষমতা ও সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দুনিয়ার প্রতি খুবই অনাসক্ত ছিলেন। যা কিছু হাতে আসতো তা-ই আল্লাহর ওয়াস্তে একে একে দান করে দিতেন এবং নিজের জন্যে এক পয়সাও রাখতেন না।

হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদের ব্যাপারে ঐ সময়কেই সবচেয়ে বেশী ভয় করি যখন দুনিয়া তার সমস্ত সৌন্দর্যও আসবাবপত্র তোমাদের পদতলে নিক্ষেপ করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আসবাবপত্রের অর্থ কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “যমীনের বরকত। (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) মোট কথা, কাফিরদের পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্যেই দেয়া হয়।

মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও যাতে তারা আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচতে পারে। নিজেও ওর উপর অবিচলিত থাকো। নিজেকে এবং নিজের পরিবারবর্গকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর।

হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) অভ্যাস ছিল এই যে, রাত্রে যখন তিনি তাহাজ্জদের নামাযের জন্যে উঠতেন তখন তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগাতেন এবং এই আয়াতটি পাঠ করতেন।

আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তোমার কাছে কোন জীবনোপকরণ চাই না। তুমি নামাযের পাবন্দী কর, আল্লাহ তোমাকে এমন জায়গা হতে রিযক দিবেন যে, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা খোদাভীরুদেরকে মুক্তিদান করে থাকেন এবং তাদেরকে কল্পনাতীত জায়গা হতে জীবিকা প্রদান করেন।

সমস্ত দানব ও মানবকে শুধুমাত্র ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। রিযুকদাতা ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমার কাছে রিযক চাই না, বরং আমিই তোমাকে রিযুক দান করে থাকি।

বর্ণিত আছে যে, হযরত হিশামের (রঃ) পিতা যখন আমীর-উমারার নিকট গমন করতেন এবং তাদের শান-শওকত দেখতেন তখন তিনি নিজের বাড়ীতে ফিরে এসে এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করতেন এবং বলতেনঃ “হে আমার পরিবারবর্গ! তোমরা নামাযের হিফাযত করো, নামাযের পাবন্দী করো, তা হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর দয়া করবেন।` (এটাও মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত আছে)

হযরত সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সংকীর্ণতার সম্মুখীন হতেন তখন তিনি বলতেনঃ “হে আমার পরিবারবর্গ! তোমরা নামায পড় এবং নামাযকে প্রতিষ্ঠিত রাখো।” হযরত সাবিত (রাঃ) আরো বলেনঃ সমস্ত নবীরই এই নীতিই ছিল যে, কোন কারণে তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেই নামায শুরু করে দিতেন। (এটাও মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে ইবনু আদম! তুমি নিজেকে আমার ইবাদতের জন্যে মুক্ত করে দাও, আমি তোমার বক্ষকে ঐশ্বর্য ও অভাবহীনতা দ্বারা পূর্ণ করে দিবো। তোমার দারিদ্র ও অভাব দূর করে দিবো। আর যদি তা না কর তবে আমি তোমার অন্তরকে ব্যস্ততা দ্বারা পূর্ণ করবো এবং তোমার দারিদ্র দূর করবো না।” (এ হাদীসটি জামে তিরমিযী ও সুনানে ইবনু মাজাহতে বর্ণিত আছে)

হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার সমস্ত চিন্তা ফিকির এবং ইচ্ছা ও খেয়াল একমাত্র আখেরাতের জন্যে হয় এবং তাতেই নিমগ্ন থাকে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা ও উদ্বেগ থেকে রক্ষা করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়ার চিন্তায় নিমগ্ন থাকে, সে যে কোন উপত্যকায় ধ্বংস হয়ে যাক এতে আল্লাহ তাআলার কোন পরওয়া নেই।` (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, দুনিয়ার চিন্তায় নিমগ্ন ব্যক্তির সমস্ত কাজে আল্লাহ তাআলার উদ্বেগ নিক্ষেপ করেন এবং তার দারিদ্র তার চোখের সামনে করে দেন। মানুষ দুনিয়া হতে ঐ পরিমাণই প্রাপ্ত হবে যে পরিমাণ তার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ আছে। আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে তার কেন্দ্র স্থল বানিয়ে নেবে এবং নিজের নিয়াত শুধু ওটাই রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি কাজে প্রশান্তি আনয়ন করবেন এবং তার অন্তরকে পরিতৃপ্ত করবেন। আর দুনিয়া তার পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্যেই। সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আজ রাত্রে আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমরা যেন উকবা ইবনু রাফে’র (রাঃ) বাড়ীতে রয়েছি। সেখানে আমাদের সামনে ইবনু তাবের (রাঃ) বাগানের রসাল খেজুর পেশ করা। হয়েছে। আমি এর তা'বীর (ব্যাখ্যা) এই নিয়েছি যে, পরিণামের দিক দিয়ে দুনিয়াতেও আমাদেরই পাল্লা ভারী হবে। উচ্চতাও উন্নতি আমরাই লাভ করবো। আর আমাদের দ্বীন পাক পবিত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।