সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 111)
হরকত ছাড়া:
وعنت الوجوه للحي القيوم وقد خاب من حمل ظلما ﴿١١١﴾
হরকত সহ:
وَ عَنَتِ الْوُجُوْهُ لِلْحَیِّ الْقَیُّوْمِ ؕ وَ قَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا ﴿۱۱۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া ‘আনাতিল উজূহু লিলহাইয়িল কাইয়ুমি ওয়া কাদ খা-বা মান হামালা জুলমা-।
আল বায়ান: আর চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত সত্তার সামনে সকলেই অবনত হবে। আর সে অবশ্যই ব্যর্থ হবে যে যুলম বহন করবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১১. আর চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত-সর্বসত্তার ধারকের কাছে সবাই হবে নিম্নমুখী এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে যুলুম বহন করবে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: চিরঞ্জীব চিরস্থায়ীর সম্মুখে সকলেই হবে অধোমুখী, আর সে ব্যর্থ হবে যে যুলমের (পাপের) ভার বহন করবে।
আহসানুল বায়ান: (১১১) সকল মুখমন্ডলই সেই চিরঞ্জীব, সব কিছুর ধারক (আল্লাহর) জন্য অবনমিত হবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে যুলুমের ভার বহন করবে।[1]
মুজিবুর রহমান: স্বাধীন, স্বধিষ্ঠ- পালনকর্তার নিকট সকলেই হবে অধোবদন এবং সে’ই ব্যর্থ হবে যে যুলমের ভার বহন করবে।
ফযলুর রহমান: চিরঞ্জীব চিরস্থায়ী সত্তা আল্লাহর সামনে সকল মুখমণ্ডল অবনমিত হবে। আর যে জুলুমের ভার (পাপ) বহন করেছে সে ব্যর্থ হবে।
মুহিউদ্দিন খান: সেই চিরঞ্জীব চিরস্থায়ীর সামনে সব মুখমন্ডল অবনমিত হবে এবং সে ব্যর্থ হবে যে জুলুমের বোঝা বহন করবে।
জহুরুল হক: আর চেহারাগুলো বিনয়াবনত হবে তাঁর কাছে যিনি চিরীব, সদা-বিদ্যমান। আর সে তো নিশ্চয় ব্যর্থ হবে যে অন্যায়াচরণের বোঝা বহন করবে।
Sahih International: And [all] faces will be humbled before the Ever-Living, the Sustainer of existence. And he will have failed who carries injustice.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১১. আর চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত-সর্বসত্তার ধারকের কাছে সবাই হবে নিম্নমুখী এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে যুলুম বহন করবে।(১)
তাফসীর:
(১) যে কেউ যুলুম নিয়ে হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে তার মত হতভাগা আর কেউ নেই। কেননা, সে প্রত্যেক মজলুমকে তার হক বুঝিয়ে দিতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত যখন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না তখন তার উপর অপরের গোনাহের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম থেকে বেঁচে থাক; কেননা যুলুম কিয়ামতের দিন প্রগাঢ় অন্ধকার হিসেবে দেখা দিবে।’ [মুসলিম: ২৫৭৮] এ যুলুমের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুলুম হলো, শির্ক। কারণ এটি আল্লাহর সাথে কৃত সবচেয়ে বড় গুনাহ। যে কেউ শির্কের ভার নিয়ে হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে তার আর বাঁচার কোন পথ রইলো না। মহান আল্লাহ বলেনঃ “অবশ্যই শিৰ্ক হচ্ছে বড় যুলুম” [সূরা লুকমান: ১৩]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১১) সকল মুখমন্ডলই সেই চিরঞ্জীব, সব কিছুর ধারক (আল্লাহর) জন্য অবনমিত হবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে যুলুমের ভার বহন করবে।[1]
তাফসীর:
[1] কারণ, সেদিন মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে ইনসাফ করবেন। প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রাপ্য অধিকার প্রাপ্ত হবে। এমনকি যদি কোন শিংবিশিষ্ট ছাগল কোন বিনা শিং-এর ছাগলের উপর অত্যাচার করে থাকে, তাহলে তারও বদলা দেওয়া হবে। (আহমাদ ২/২৩৫, মুসলিম) সেই জন্য ঐ হাদীসেই মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করে দাও।’’ নচেৎ কিয়ামতের দিন তা দিতে বাধ্য হবে। এক অন্য হাদীসে তিনি বলেন, ‘‘তোমরা অত্যাচার করা হতে দূরে থাকো, কেননা অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারের কারণ হবে।’’ আর সবার থেকে বেশী ব্যর্থ হবে সেই ব্যক্তি, যে শিরকের বোঝা নিয়ে উপস্থিত হবে। কারণ শিরক হল বড় যুলম (মহা অন্যায়), যা ক্ষমার অযোগ্য।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০৯-১১২ নং আয়াতের তাফসীর:
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ছাড়া কেউ কারো জন্য শাফাআত করতে পারবে না। এমনকি নাবী-রাসূলগণও নয়।
গ্রহণযোগ্য শাফায়াত: এর জন্য তিনটি শর্ত। যথা
১. শাফাআতকারীর ওপর আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি। যেমন অত্র আয়াত।
২. যার জন্য শাফাআত করা হবে তার ওপর আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَي)
“আকাশসমূহে কত ফেরেশতা রয়েছে! তাদের কোন সুপারিশ কাজে আসবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।” (সূরা নাজম ৫৩:২৬)
৩. শাফাআত করার অনুমতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ)
“কে সে যে তাঁর নিকট (আল্লাহর) সুপারিশ করবে তার অনুমতি ছাড়া।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৫)
এসব শর্তসাপেক্ষে শাফাআত করা যাবে এবং পাওয়া যাবে। সুতরাং যে সব নামধারী মুসলিম শাফাআত করার ও পাওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন ছাড়া কিছুই নয়।
এ শাফাআত সম্পর্কে সূরা বাকারার ৪৮ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষের সকল বিষয় অবগত আছেন। মানুষ যা অতীতে করে এসেছে তাও জানেন, মানুষের সামনে যা আছে তাও জানেন। সেদিন তাঁর সম্মুখে সকলেই অবনত হবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে দুনিয়াতে নিজের প্রতি জুলুম করেছে, আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করে জুলুম করেছে, মানুষের প্রতি জুলুম করেছে, ফলে কিয়ামতের দিন জুলুমের ভার বহন করতে হবে।
পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদের কোন প্রকার ক্ষতির ভয় বা আশঙ্কা থাকবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ج وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُّضٰعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيْمًا )
“আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। আর কোন পুণ্য কর্ম হলে আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ করেন এবং আল্লাহ তাঁর নিকট হতে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” (সূরা নিসা ৪:৪০)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَآ إِنَّ أَوْلِيَا۬ءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ )
“জেনে রেখ! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” (সূরা ইউনুস ১০:৬২)
সুতরাং যেদিন কারো সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে না, কোন সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কাজে আসবে না, সেদিনের সম্বল হিসেবে ঈমান ও সৎ আমল করা উচিত। যারা ঈমান ও সৎ আমল নিয়ে যাবে তাদের কোন ভয় ও শংকা থাকবে না ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সেদিন আল্লাহ তা‘আলা যাকে অনুমতি দেবেন সে ব্যতীত কেউ কোন প্রকার সুপারিশ করতে পারবে না।
২. আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল বিষয় অবগত আছেন।
৩. মানুষের জ্ঞান দ্বারা আল্লাহ তা‘আলাকে আয়ত্ত করা যায় না।
৪. সেদিন সকলে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে অবনমিত অবস্থায় থাকবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০৯-১১২ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিয়ামতের দিন কারো ক্ষমতা হবে না যে, সে অন্যের জন্যে সুপারিশ করে। তবে যাকে তিনি অনুমতি দিবেন সে করতে পারে। আকাশের ফেরেশতা অথবা কোন বুযুর্গ ব্যক্তিও আল্লাহ তাআলার অনুমতি ছাড়া কারো জন্যে সুপারিশ করতে পারবে না। সবাই সেদিন তীত সন্ত্রস্ত থাকবে। অনুমতি ছাড়া কারো সুপারিশ চলবে না। ফেরেশতামণ্ডলী ও রুহ (জিবরাঈল (আঃ) সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবেন। আল্লাহ তাআলার অনুমতি ছাড়া কেউ যুবান খুলতে পারবে না স্বয়ং সাইয়্যেদুল মুরসালীন হযরত মহাম্মদ (সঃ) আরশের নীচে আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন। খুব বেশী তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করবেন। দীর্ঘক্ষণ তিনি সিজদায় পড়ে থাকবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! মাথা উঠাও, কথা বল, তোমার কথা শোনা হবে। শাফাআত কর, তোমার শাফাআত কবুল করা হবে। তারপর সীমা নির্ধারণ করা হবে। তিনি সুপারিশ করে তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। আবার তিনি ফিরে আসবেন এবং এটাই হবে। চার বার এরূপই ঘটবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং সমস্ত নবীর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
হাদীসে আরো আছে যে, আল্লাহ তাআলা হুকুম করবেনঃ “ঐ লোকদেরকেও জাহান্নাম হতে বের করে আনো যাদের অন্তরে এক দানা পরিমাণও ঈমান আছে।” তখন তার (ফেরেশতারা) বহু সংখ্যক লোককে
জাহান্নাম হতে বের করে আনবেন। আবার তিনি বলবেনঃ “যাদের অন্তরে অর্ধদানা পরিমাণও ঈমান আছে তাদেরকেও বের করে আনো। যাদের অন্তরে অনুপরিমাণও ঈমান আছে তাদেরকেও বের করে নিয়ে এসো। যাদের অন্তরে এর চেয়েও কম ঈমান রয়েছে তাদেরকেও জাহান্নাম হতে বের করে নিয়ে এসো। এর চেয়েও কম ঈমানদারদের বের করো।”
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবকে নিজের জ্ঞান দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন, কিন্তু সৃষ্টজীব তাদের জ্ঞান দ্বারা তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না।` (২:২৫৫)
তিনি বলেনঃ তার নিকট সবাই হবে অধোবদন এবং সেই ব্যর্থ হবে যে জুলুমের ভার বহন করবে। কেননা, তিনি মৃত্যু ও ধ্বংস হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি চিরঞ্জীব ও চির বিদ্যমান। তিনি ঘুমও যান না এবং তাঁকে তন্দ্রাও আচ্ছন্ন করে না। তিনি নিজে সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছেন এবং কৌশল ও ক্ষমতা বলে সবকিছুকেই প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন। সবকিছুর দেখা শোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ তিনিই করে থাকেন। সবারই উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং সমস্ত সৃষ্টজীব তাঁরই মুখাপেক্ষী। মহান আল্লাহর মর্জি বা ইচ্ছা ছাড়া কেউ সৃষ্টও হতে পারে না এবং বাকীও থাকতে পারে না। এখানে যে জুলুম করবে সেখানে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। কেননা, সেইদিন আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করে দিবেন। এমন কি শিং বিহীন বকরীকেও তিনি শিং বিশিষ্ট বকরী হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করাবেন।
হাদীসে রয়েছে যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের শপথ! আজ জালিমের জুলুম আমাকে অতিক্রম করতে পারবে না।” সহীহ্ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা জুলুম থেকে দূরে থাকো। কেননা, কিয়ামতের দিন জুলুম অন্ধকাররূপে প্রকাশ পাবে। আর সেইদিন সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঐ ব্যক্তি যে মুশরিক অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। কেননা, শিক হচ্ছে বড় জুলুম।`।
জালিমদের পরিণাম ফল বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের প্রতিদানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যারা মু'মিন অবস্থায় সকার্যাবলী সম্পাদন করে তাদের অবিচারেরও কোন আশংকা নেই এবং ক্ষতিরও কোন ভয় নেই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।