সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 102)
হরকত ছাড়া:
يوم ينفخ في الصور ونحشر المجرمين يومئذ زرقا ﴿١٠٢﴾
হরকত সহ:
یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ وَ نَحْشُرُ الْمُجْرِمِیْنَ یَوْمَئِذٍ زُرْقًا ﴿۱۰۲﴾ۚۖ
উচ্চারণ: ইয়াওমা ইউনফাখুফিসসূরি ওয়া নাহশুরুল মুজরিমীনা ইয়াওমাইযিন যুরকা-।
আল বায়ান: যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, আর সেদিন আমি অপরাধীদেরকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০২. যেদিন শিংগায়(১) ফুঁক দেয়া হবে এবং যেদিন আমরা অপরাধীদেরকে নীলচক্ষু তথা দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যেদিন সিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে আর আমি অপরাধীদেরকে একত্রিত করব (ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত) দৃষ্টিহীন অবস্থায়।
আহসানুল বায়ান: (১০২) যেদিন শিঙ্গায়[1] ফুৎকার দেওয়া হবে সেদিন আমি অপরাধীদের (চক্ষু) নীল হয়ে যাওয়া অবস্থায় সমবেত করব।
মুজিবুর রহমান: যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেই দিন আমি অপরাধীদেরকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব।
ফযলুর রহমান: যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে। আর সেদিন আমি অপরাধীদেরকে নীল চক্ষুবিশিষ্ট (দৃষ্টিহীন) অবস্থায় একত্রিত করব।
মুহিউদ্দিন খান: যেদিন সিঙ্গায় ফূৎকার দেয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীদেরকে সমবেত করব নীল চক্ষু অবস্থায়।
জহুরুল হক: সেইদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, আর আমরা অপরাধীদের সেই দিনে সমবেত করব চোখ নীলাকার করে, --
Sahih International: The Day the Horn will be blown. And We will gather the criminals, that Day, blue-eyed.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০২. যেদিন শিংগায়(১) ফুঁক দেয়া হবে এবং যেদিন আমরা অপরাধীদেরকে নীলচক্ষু তথা দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব।(২)
তাফসীর:
(১) ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রশ্ন করলঃ صور (ছূর) কি? তিনি বললেনঃ শিঙ্গা। এতে ফুৎকার দেয়া হবে। [আবু দাউদঃ ৪৭৪২, তিরমিযিঃ ৩২৪৩, ৩২৪৪, আহমাদঃ ২/৩১২, সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ৭০১২, হাকোমঃ ২/৪৩৬, ৫০৬] অর্থ এই যে, صور শিঙ্গা-এর মতই কোন বস্তু হবে। এতে ফিরিশতা ফুঁক দিলে সব মৃত জীবিত হয়ে যাবে। হাদীসে এর কিছু গুণাগুণ বৰ্ণনা করা হয়েছেঃ এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ইসরাফিল শিঙ্গা মুখে পুরে আছেন, তার কপাল তীক্ষ্ণভাবে উৎকৰ্ণ করে নীচু করে রেখেছে, অপেক্ষা করছে, কখন তাকে ফুঁক দেয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। [তিরমিযিঃ ২৪৩১, আহমাদঃ ৩/৭, ৭৩, হাকোমঃ ৪/৫৫৯] এর থেকে বোঝা যায় যে, এটা এক প্রকার শিঙ্গার মত, এর একাংশ মুখে পুরা যায়। তবে এর প্রকৃত স্বরূপ একমাত্র আল্লাহ্ই ভাল জানেন।
(২) অর্থাৎ ভয়ে ও আতংকে তাদের রক্ত শুকিয়ে যাবে এবং তাদের অবস্থা এমন হয়ে যাবে যেন তাদের শরীরে এক বিন্দুও রক্ত নেই। অথবা শব্দটি “আযরাকুল আইন” বা নীল চক্ষুওয়ালার অর্থে গ্রহণ করেছেন। তারা এর অর্থ করেন অত্যাধিক ভয়ে তাদের চোখের মণি স্থির হয়ে যাবে। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০২) যেদিন শিঙ্গায়[1] ফুৎকার দেওয়া হবে সেদিন আমি অপরাধীদের (চক্ষু) নীল হয়ে যাওয়া অবস্থায় সমবেত করব।
তাফসীর:
[1] صُور অর্থাৎ, শিংগা; যাতে ইস্রাফীল (আঃ) আল্লাহর আদেশে ফুঁ দেবেন এবং তখন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। (মুসনাদে আহমাদ ২/১৯১) অন্য একটি হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন যে, ‘‘ইস্রাফীল (আঃ) শিংগা মুখে ভরে দাঁড়িয়ে আছেন, মাথা নত করে প্রভুর আদেশের অপেক্ষায় আছেন যে, কখন তাঁকে আদেশ করা হবে এবং তিনি ফুঁ মারবেন।’’ (তিরমিযী, কিয়ামতের বিবরণ) ইস্রাফীল (আঃ)-এর প্রথম ফুঁতে সকলেই মারা যাবে। আর দ্বিতীয় ফুঁতে আল্লাহর আদেশে সকলেই জীবিত হবে এবং হাশরের মাঠে জমায়েত হবে। আলোচ্য আয়াতে দ্বিতীয় ফুঁকের কথাই বলা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০২-১০৪ নং আয়াতে তাফসীর:
الصُّوْرِ অর্থ শিংগা, অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার আদেশে যে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার জন্য ইসরাফিল (عليه السلام) অপেক্ষমান রয়েছে সেই শিংগা। যখন আদেশ দেয়া হবে তখনই শিংগায় ফুঁ দেবেন। প্রথম ফুঁৎকারে জীবিত সবাই মারা যাবে, দ্বিতীয় ফুঁৎকারে কিয়ামত সংঘটিত হবে। আর তৃতীয় ফুৎকারে সবাই জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানে সমবেত হবে। এখানে তৃতীয় ফুঁৎকার উদ্দেশ্য। কেউ কেউ বলেছেন, ফুঁৎকার মাত্র দুটি হবে। এ সম্পর্কে সূরা আন‘আমের ৭৩ নং আয়াতসহ বিভিন্ন স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।
زُرْقًا অর্থাৎ কাফিরদের চক্ষু ও রঙ বিবর্ণ অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে। আর তারা ভীষণভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কারণে একজন অপর জনের সাথে চুপি চুপি বলবে, তোমরা দুনিয়াতে মাত্র দশ দিন অবস্থান করেছো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُوْنَ ৫ لا مَا لَبِثُوْا غَيْرَ سَاعَةٍ ط كَذٰلِكَ كَانُوْا يُؤْفَكُوْنَ)
“যেদিন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন পাপীরা শপথ করে বলবে যে, তারা মুহূর্তকালের বেশি অবস্থান করেনি। এভাবেই তাদেরকে উল্টা দিকে পরিচালিত করা হত। ” (সূরা রূম ৩০:৫৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(قَالَ كَمْ لَبِثْتُمْ فِي الْأَرْضِ عَدَدَ سِنِيْنَ قَالُوْا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ فَسْئَلِ الْعَادِّيْنَ قَالَ إِنْ لَّبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيْلًا لَّوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ )
“আল্লাহ বলবেন: ‘তোমরা পৃথিবীতে কত বৎসর অবস্থান করেছিলে?’ তারা বলবে, ‘আমরা অবস্থান করেছিলাম একদিন অথবা দিনের কিছু অংশ; তুমি না হয় গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞেস কর।’ তিনি বলবেন: ‘তোমরা অল্প কালই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে!” (সূরা মু’মিনূন ২৩:১১২-১১৪)
আর প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় এরূপই অর্থাৎ অতি অল্পকালের কিন্তু মানুষ দুনিয়াতে তা মনে রাখে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার জন্য ইসরাফিল (عليه السلام) প্রস্তুত, আল্লাহ নির্দেশ দিলেই ফুঁ দেবেন।
২. কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে অপরাধীদের চোখ ও রঙ পরিবর্তন হয়ে যাবে।
৩. দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় অতি অল্প সময়ের এবং খুবই নগণ্য।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর:
হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করা হয় সূর’ বা শিংগা কি জিনিস?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ওটা এমন একটা শিংগা যাতে ফুৎকার দেয়া হবে। ওর বেড় হবে আসমান ও যমীনের সমান। হযরত ইসরাফীল (আঃ) তাতে ফু দিবেন।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে অেিছ যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কিরূপে শান্তি লাভ করবো? অথচ শিংগায় ফুৎকারদানকারী শিংগায় মুখ লাগিয়ে কপাল ঝুঁকিয়ে রয়েছেন এবং আল্লাহর হুকুমের শুধু অপেক্ষায় রয়েছেন। জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! তাহলে আমরা পাঠ করবো কি?” জবাবে তিনি বললেনঃ “তোমরা পড়তে থাকোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মকর্তা, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করেছি।”
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আমি অপরাধীদের দৃষ্টিহীন অব স্থায় সমবেত করবো। তারা তাদের পরস্পরের মধ্যে চুপি চুপি বলাবলি করবেঃ আমরা দুনিয়ায় মাত্র দশ দিন অর্থাৎ অতি অল্প সময় অবস্থান করেছি। আমি তাদের ঐ গোপন কথাবার্তাও সম্যক অবগত আছি। তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত সৎপথে ছিল সে বলবেঃ আমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলাম। মোট কথা, কাফিরদের কাছে দুনিয়ার জীবন অতি অল্প সময় বলে মনে হবে। ঐ সময় তারা শপথ করে করে বলবেঃ “আমরা তো দুনিয়ায় শুধু এক ঘন্টাকাল কাটিয়েছি। অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করার মত বয়স প্রদান করেছিলাম না? তোমাদের কাছে তো ভয় প্রদর্শকও এসেছিল?” (৩৫:৩৭)
আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তোমরা যমীনে কতকাল অব স্থান করেছিলে? (উত্তরে) তারা বলবেঃ “একদিন বা একদিনের কিছু অংশ (আমরা অবস্থান করেছিলাম। আসলে আখেরাতের তুলনায় দুনিয়া এরূপই বটে। কিন্তু তোমরা যদি এটা জানতে বা বুঝতে তবে এই অস্থায়ী জগতকে ঐ স্থায়ী জগতের উপর কখনো প্রাধান্য দিতে না, বরং এই দুনিয়াতেই তোমরা আখেরাতের পূজি সংগ্রহ করে নিতে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।