সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
فلعلك باخع نفسك على آثارهم إن لم يؤمنوا بهذا الحديث أسفا ﴿٦﴾
হরকত সহ:
فَلَعَلَّکَ بَاخِعٌ نَّفْسَکَ عَلٰۤی اٰثَارِهِمْ اِنْ لَّمْ یُؤْمِنُوْا بِهٰذَا الْحَدِیْثِ اَسَفًا ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ফালা‘আল্লাকা বা-খি‘উন্নাফছাকা ‘আলা আ-ছা-রিহিম ইল্লাম ইউ’মিনূ বিহা-যাল হাদীছিআছাফা-।
আল বায়ান: হয়তো তুমি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজকে শেষ করে দেবে, যদি তারা এই কথার প্রতি ঈমান না আনে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. তারা এ বাণীতে ঈমান না আনলে সম্ভবত তাদের পিছনে ঘুরে আপনি দুঃখে আত্ম-বিনাশী হয়ে পড়বেন।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা এ বাণীতে (কুরআনে) বিশ্বাস না করার কারণে মনে হচ্ছে (হে নাবী!) তুমি তার দুঃখে তোমার নিজের জান বিনাশ করে দেবে।
আহসানুল বায়ান: (৬) তারা এই বাণী[1] বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।
মুজিবুর রহমান: তারা এই বাণী বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।
ফযলুর রহমান: তারা এই বাণী (কোরআন) বিশ্বাস না করলে দুঃখে তুমি হয়তো তাদের পেছনে নিজের জীবন শেষ করে দেবে।
মুহিউদ্দিন খান: যদি তারা এই বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে তাদের পশ্চাতে সম্ভবতঃ আপনি পরিতাপ করতে করতে নিজের প্রাণ নিপাত করবেন।
জহুরুল হক: কাজেই হয়ত বা তাদের পেছনে ঘুরে ঘুরে তোমার নিজেকে তুমি দুঃখে কাতর করে তুলবে যেহেতু তারা এই নতুন বাণীতে বিশ্বাস করছে না।
Sahih International: Then perhaps you would kill yourself through grief over them, [O Muhammad], if they do not believe in this message, [and] out of sorrow.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. তারা এ বাণীতে ঈমান না আনলে সম্ভবত তাদের পিছনে ঘুরে আপনি দুঃখে আত্ম-বিনাশী হয়ে পড়বেন।(১)
তাফসীর:
(১) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে সে সময় যে মানসিক অবস্থার টানাপোড়ন চলছিল এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে। তিনি তাদের হিদায়াতের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তারা আল্লাহ্র আযাবের সম্মুখীন হবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তার এ মানসিক অবস্থাকে একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ “আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির মতো যে আলোর জন্য আগুন জ্বালালো কিন্তু পতংগরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করলো পুড়ে মরার জন্য। সে এদেরকে কোনক্রমে আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। কিন্তু এ পতংগরা তার কোন প্রচেষ্টাকেই ফলবতী করতে দেয় না। আমার অবস্থাও অনুরূপ। আমি তোমাদের হাত ধরে টান দিচ্ছি। কিন্তু তোমরা আগুনে লাফিয়ে পড়ছো।” [বুখারীঃ ৩২৪৪, ৬১১৮ ও মুসলিমঃ ২২৮৪] সূরা আশ শু'আরার ৩ নং আয়াতেও এ ব্যাপারে আলোচনা এসেছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬) তারা এই বাণী[1] বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।
তাফসীর:
[1] بِهَذَا الْحَدِيْثِ (এই বাণী) বলতে কুরআন করীম। কাফেরদের ঈমান আনার ব্যাপারে রসূল (সাঃ) যে অতীব উদগ্রীব ছিলেন এবং (ঈমান আনা থেকে) তাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে যে তিনি কঠিন কষ্ট বোধ করতেন, এই আয়াতে তাঁর সেই মানসিক অবস্থা ও অভিপ্রায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, কাফির-মুশরিকরা এ হাদীস তথা কুরআনের প্রতি ঈমান আনে না তাই বলে দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও আফসোস করে নিজেকে ধ্বংস করে দিও না। হিদায়াতের মালিক তো আল্লাহ তা‘আলা তিনি যাকে হিদায়াত দিয়ে থাকেন তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই, আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে হিদায়াত দেয়ার কেউ নেই। তোমার কাজ তাবলীগ করা, তা করে যাও।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَلَا تَذْھَبْ نَفْسُکَ عَلَیْھِمْ حَسَرٰتٍ)
“অতএব তুমি তাদের জন্য অনুতাপ করে নিজেকে ধ্বংস করবে না।” (সূরা ফাতির ৩৫:৮)
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُوْنُوْا مُؤْمِنِيْن)
“তারা মু’মিন হচ্ছে না বলে তুমি হয়ত (মনোকষ্টে) প্রাণ বির্সজন করবে।” (সূরা শু‘য়ারা ২৬:৩)
সুতরাং তাদের ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোনই প্রয়োজন নেই। যারা সৎ আমল করবে তারা তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই করবে। আর যারা মন্দ আমল করবে তারাও তাদের নিজেদের অকল্যাণের জন্যই করবে এবং তারা যা করবে তাই তথায় প্রাপ্ত হবে।
(زِيْنَةً لَّهَا) অর্থাৎ দুনিয়াতে যা কিছু আছে, গাছ-পালা, পশু-পাখি, ধন-সম্পদ সব কিছু দুনিয়ার সৌন্দর্য ও চাকচিক্যের জন্য। এসব দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা পরীক্ষা করবেন কারা দুনিয়ার সম্পদ ও ভোগবিলাসের মোহে পড়ে আল্লাহ তা‘আলার দীন থেকে সরে যায় আর দীন থেকে না সরে উত্তম আমল করে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, এই পৃথিবী এক সময় ধ্বংস হয়ে যাবে, এর শোভা-সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। ভূ-পৃষ্ঠ গাছ-পালাহীন সমতল ময়দানে পরিণত হবে। আর আখিরাতে যা আছে তা অবশিষ্ট থাকবে।
অতএব মানুষের উচিত এ ধ্বংসশীল দুনিয়ার মোহ পরিত্যাগ করে আল্লাহ তা‘আলা তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য উত্তম আমল করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দুনিয়া পরীক্ষার জায়গা, আর আখিরাত ফলাফলের জায়গা।
২. দুনিয়া একদিন ধ্বংস হয়ে তরুলতাহীন মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।
৩. কেউ মন্দ কাজ করলে তাকে সৎ কাজের দিকে আহ্বান করতে হবে। যদি সে ডাকে সাড়া না দেয় তাঁর জন্য তেমন আফসোস বা দুশ্চিন্তা করা যাবে না যাতে নিজের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে সম্বোধন করে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! মুশরিকরা যে তোমার নিকট থেকে পালিয়ে যাচ্ছে এবং ঈমান আনয়ন করছে না এতে তুমি মোটেই দুঃখ করো না।` এভাবে মহান আল্লাহ স্বীয় নবীকে (সঃ) সান্ত্বনা দিচ্ছেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “তুমি তাদের কারণে এতো দুঃখ আফসোস করো না।” অন্য জায়গায় আছেঃ “তুমি তাদের কারণে এতো বেশী দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ে পড়ো না।” আর এক আয়াতে আছেঃ “তাদের ঈমান না আনার কারণে তুমি নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না।”এখানেও তিনি বলেনঃ “তারা এই বাণী বিশ্বাস করছে না বলে তার পিছনে পড়ে তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়ো না। তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। তাবলীগের কাজে অবহেলা করো না। যে সুপথ প্রাপ্ত হবে সে নিজেরই মঙ্গল সাধন করবে। আর যে পথভ্রষ্ট হবে সেও নিজেরই ক্ষতি করবে। প্রত্যেকের আমল তার সাথেই রয়েছে।`
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “দুনিয়া ধ্বংসশীল। এর শোভা সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। আর আখেরাত বাকী থাকবে। এর নিয়ামত চিরস্থায়ী।”
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়া হচ্ছে মিষ্ট, সবুজ রঙ বিশিষ্ট। আল্লাহ তাতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়ে দেখতে চান, তোমরা কেমন আমল কর। সুতরাং তোমরা দুনিয়া হতে ও স্ত্রীলোকদের হতে বেঁচে থাকো।` বান্ ইসরাঈলের সর্বপ্রথম ফিত্রা ছিল নারীদের ফিত্না। এই দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে এবং নষ্ট হয়ে যাবে। দনিয়ার ধ্বংস অনিবার্য। যমীন পতিত পড়ে থাকবে। তাতে কোন প্রকারের উদ্ভিদ থাকবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “মানুষ কি লক্ষ্য করে না যে, আমি অনাবাদী পতিত ভূমিতে পানি জমিয়ে থাকি? অতঃপর তা থেকে তারা ভূমিতে সেচন করে থাকে, তারা নিজেরা পান করে এবং তাদের পশুগুলিকে পান করিয়ে থাকে? তবুওকি তাদের চক্ষু খুলবে না?” যমীন ও যমীনে যা কিছু আছে সবই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সবকেই প্রকৃত মালিকের সামনে হাযির করা হবে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের কাছে যা-ই শুননা কেন এবং তাদেরকে যে কোন অবস্থায় দেখো না কেন, মোটেই দুঃখ ও আফসোস করো না।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।