আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 19)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 19)



হরকত ছাড়া:

ومن أراد الآخرة وسعى لها سعيها وهو مؤمن فأولئك كان سعيهم مشكورا ﴿١٩﴾




হরকত সহ:

وَ مَنْ اَرَادَ الْاٰخِرَۃَ وَ سَعٰی لَهَا سَعْیَهَا وَ هُوَ مُؤْمِنٌ فَاُولٰٓئِکَ کَانَ سَعْیُهُمْ مَّشْکُوْرًا ﴿۱۹﴾




উচ্চারণ: ওয়া মান আরা-দাল আ-খিরাতা ওয়া ছা‘আ- লাহা- ছা‘ইয়াহা- ওয়া হুওয়া মু’মিনুন ফাউলাইকা কা-না ছা‘ইউহুম মাশকূরা-।




আল বায়ান: আর যে আখিরাত চায় এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে মুমিন অবস্থায়, তাদের চেষ্টা হবে পুরস্কারযোগ্য।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯. আর যারা মুমিন হয়ে আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে। তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে আর তার জন্য চেষ্টা করে যতখানি চেষ্টা করা দরকার আর সে মু’মিনও, এরাই হল তারা যাদের চেষ্টা সাধনা সাদরে গৃহীত হবে।




আহসানুল বায়ান: (১৯) যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে। [1]



মুজিবুর রহমান: যারা বিশ্বাসী হয়ে পরকাল কামনা করে এবং ওর জন্য যথাযথ চেষ্টা করে তাদের প্রচেষ্টাসমূহ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে।



ফযলুর রহমান: আর যে আখেরাত চায় এবং তার জন্য ঈমান সহকারে যথাযথ চেষ্টা করে, এমন লোকদের চেষ্টা প্রশংসিত (পুরস্কারযোগ্য) হয়ে থাকে।



মুহিউদ্দিন খান: আর যারা পরকাল কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে।



জহুরুল হক: আর যে কেউ পরকাল কামনা করে, আর তার জন্যে চেষ্টা করে যথাযথ প্রচেষ্টায় এবং সে মুমিন হয়, তাহলে এরাই -- এদের প্রচেষ্টা হবে স্বীকৃত।



Sahih International: But whoever desires the Hereafter and exerts the effort due to it while he is a believer - it is those whose effort is ever appreciated [by Allah].



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৯. আর যারা মুমিন হয়ে আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে। তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।(১)


তাফসীর:

১. মুমিন যখনই যে কাজে আখেরাতের ইচ্ছা ও নিয়ত করবে, তার সেই কাজ গ্রহণযোগ্য হবে; যদিও তার কোন কোন কাজের নিয়তে মন্দ মিশ্রিত হয়ে যায়। এ অবস্থাটি হচ্ছে মুমিনের। তার যে কৰ্ম খাঁটি নিয়ত সহকারে অন্যান্য শর্তনুযায়ী হবে, তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং যে কর্ম এরূপ হবে না, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ আয়াতে চেষ্টা ও কর্মের সাথে سعيها শব্দযোগ করে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক কর্ম ও চেষ্টা কল্যাণকর ও আল্লাহর কাছে গ্ৰহণযোগ্য হয় না; বরং সেটিই ধর্তব্য হয়, যা আখেরাতের লক্ষ্যের উপযোগী।

উপযোগী হওয়া না হওয়া শুধু আল্লাহ ও রাসূলের বর্ণনা দ্বারাই জানা যেতে পারে। তাই তাকে সে কাজটি সুন্নাত অনুযায়ীই করতে হবে। কাজেই যে সৎকর্ম মনগড়া পন্থায় করা হয়- সাধারণ বেদআতী পন্থাও এর অন্তর্ভুক্ত, তা দৃশ্যতঃ যতই সুন্দর ও উপকারী হোক না কেন- আখেরাতের জন্যে উপযোগী নয়। তাই সেটা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং আখেরাতেও কল্যাণকর নয়। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৯) যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে। [1]


তাফসীর:

[1] মহান আল্লাহর কাছে মূল্যায়নের জন্য তিনটি জিনিস এখানে বর্ণিত হয়েছে। (ক) আখেরাত কামনা। অর্থাৎ, কর্মে ইখলাস থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। (খ) যথাযথ প্রচেষ্টা করা। অর্থাৎ, সুন্নাহ অনুযায়ী কর্ম করা। (গ) ঈমান থাকা। কেননা, এ ছাড়া কোন আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থাৎ, আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানের সাথে সাথে তাতে ইখলাস থাকা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী সে আমল সম্পাদিত হওয়া জরুরী। (অন্য কথায়, প্রত্যেক আমল কবুল হওয়ার ভিত্তি হল ঈমান এবং ইখলাস ও মুহাম্মাদী তরীকা হল তার শর্ত। -সম্পাদক)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর:



পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা রাসূল প্রেরণ না করে কোন জাতিকে ধ্বংস করেন না। এখানে সে মূল নীতির কথা তুলে ধরা হয়েছে যার ভিত্তিতে জাতির ধ্বংস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। তা হল কোন এলাকা ধ্বংস করার ইচ্ছা করলে সে এলাকার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎ কাজ করার আদেশ দেন কিন্ত তারা আল্লাহ তা‘আলার আদেশ ভঙ্গ করে পাপাচারে লিপ্ত হয় ফলে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়।



উক্ত আয়াতে أَمَرْنَا এর তিনটি অর্থ হতে পারে। যেমন



(১) কেউ কেউ বলেন: এখানে أَمَرْنَا দ্বারা ভাগ্যের দিকে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(أَتٰهَآ أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا)



“তখন দিবসে অথবা রজনীতে আমার নির্দেশ এসে পড়ে।” (সূরা ইউনুস ১০:২৪)



আবার কেউ বলেন: এখানে أَمَرْنَا দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন কিন্তু তারা তা অমান্য করে অসৎ কাজে লিপ্ত হয় আর এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসে পড়ে।



(২) আল্লাহ তা‘আলা ঐ সমস্ত লোকদেরকে সমাজের প্রধান বানিয়ে দেন। আর তারা অপরাধ করে ও সাধারণ লোকেরা তাদের অনুসরণ করে ফলে তাদের ওপর শাস্তি এসে যায়। আল্লাহ বলেন,



(وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَا فِيْ كُلِّ قَرْيَةٍ أَكٰبِرَ مُجْرِمِيْهَا لِيَمْكُرُوْا فِيْهَا)



“অনুরূপভাবে আমি প্রত্যেক জনপদে সেখানের অপরাধীদের প্রধানকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি।” (সূরা আন‘আম ৬:১২৩)



(৩) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এর অর্থ এমনও হতে পারে যে, আমি তাদের শত্র“দের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেই এবং সেখানে তারা পাপাচারের শেষ সীমায় পৌঁছে যায়। তখন তাদের ওপর শাস্তি এসে পড়ে। (ইবনে কাসীর ৫/৬৪)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যারা শুধু পার্থিব জীবন কামনা করে, পার্থিব জীবন তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য তাদের সবাই চাহিদানুযায়ী পার্থিব জীবন পায় না। আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য যতটুকু ইচ্ছা তাকে কেবল ততটুকু দিয়ে থাকেন। কিন্তু আখিরাতে সে নিন্দনীয় ও ভর্ৎসনার সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَنْ کَانَ یُرِیْدُ الْحَیٰوةَ الدُّنْیَا وَزِیْنَتَھَا نُوَفِّ اِلَیْھِمْ اَعْمَالَھُمْ فِیْھَا وَھُمْ فِیْھَا لَا یُبْخَسُوْنَﭞاُولٰ۬ئِکَ الَّذِیْنَ لَیْسَ لَھُمْ فِی الْاٰخِرَةِ اِلَّا النَّارُﺘ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوْا فِیْھَا وَبٰطِلٌ مَّا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ)



“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাদেরকে কম দেয়া হবে না। তাদের জন্য আখিরাতে অগ্নি ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক।” (সূরা হূদ ১১:১৫-১৬)



পক্ষান্তরে যারা ঈমানের সাথে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রেখে সেদিনের সফলতার জন্য ভাল কাজের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালায় তাদের প্রচেষ্টাকে কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হয় এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে জান্নাত।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(مَنْ کَانَ یُرِیْدُ حَرْثَ الْاٰخِرَةِ نَزِدْ لَھ۫ فِیْ حَرْثِھ۪ﺆ وَمَنْ کَانَ یُرِیْدُ حَرْثَ الدُّنْیَا نُؤْتِھ۪ مِنْھَا ﺫ وَمَا لَھ۫ فِی الْاٰخِرَةِ مِنْ نَّصِیْبٍﭣ) ‏



“যে আখিরাতে ফসল কামনা করে তার জন্য আমি তার ফসল বর্ধিত করে দেই এবং যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে এরই কিছু দেই, আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না।” (সূরা শুরা ৪২:২০)



সুতরাং প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তির উচিত প্রতিটি সৎ আমলের দ্বারা আখিরাতের সফলতা কামনা করবে, দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্য করবে না।



আর আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে রুযী ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কম-বেশি সবাইকে দিয়ে থাকেন। যারা দুনিয়া চায় তাদেরকে এবং যারা আখিরাত চায় তাদেরকেও দান করে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা তার সকল বান্দার ওপরই নেয়ামত বর্ষণ করেন কেউ তার নিয়ামতসমূহ থেকে বঞ্চিত নয়। যে নেয়ামত ভোগ করে শুকরিয়া আদায় করবে তার জন্যই উত্তম প্রতিদান আর যারা কুফরী করবে তারাই হবে জাহান্নামী।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অযথা ধ্বংস করেন না; বরং তাদের কৃতকর্মের কারণেই তাদেরকে ধ্বংস করেন।

২. দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৩. সৎ আমল কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত হল ঈমান থাকতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, যেব্যক্তি দুনিয়া কামনা করে তার যে সব চাহিদাই পূর্ণ হবে তা নয়। বরং তিনি যার যে চাহিদা পূর্ণ করতে চান পূর্ণ করে থাকেন। হাঁ, তবে এইরূপ লোক পরকালে সম্পূর্ণরূপে শূন্য হস্ত রয়ে যাবে। সেখানে সে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষিপ্ত হবে। সেখানে সে অত্যন্ত লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় থাকবে। কেননা, এখানে সে একথাই বলেছিল। সে ধ্বংসশীলকে চিরস্থায়ীর উপর এবং দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিয়েছিল। এই জন্যেই সেখানে সে আল্লাহর করুণা হতে দূরে থাকবে।

মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়া ঐ ব্যক্তির ঘর, পরকালে যার কোন ঘর নেই। এটা ঐ ব্যক্তিই জমা করে যার কোন বিবেক বুদ্ধি নেই।” হাঁ, তবে আখেরাতের সাক্ষাৎ যে কামনা করে এবং সঠিক পন্থায় আখেরাতের কাজে লাগে এরূপ পূণ্য অর্জন করে এবং তার অন্তরেও পূর্ণ মাত্রায় আল্লাহর প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস থাকে, শাস্তি পুরস্কার ও ওয়াদাকে সঠিক বলে মনে করে এবং বিশ্বাস রাখে, তার চেষ্টা বিফলে যাবে না আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।