আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 20)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 20)



হরকত ছাড়া:

كلا نمد هؤلاء وهؤلاء من عطاء ربك وما كان عطاء ربك محظورا ﴿٢٠﴾




হরকত সহ:

کُلًّا نُّمِدُّ هٰۤؤُلَآءِ وَ هٰۤؤُلَآءِ مِنْ عَطَآءِ رَبِّکَ ؕ وَ مَا کَانَ عَطَـآءُ رَبِّکَ مَحْظُوْرًا ﴿۲۰﴾




উচ্চারণ: কুল্লান নুমিদ্দুহাউলাই ওয়া হাউলাই মিন ‘আতাই রাব্বিকা ওয়ামা-কা-না ‘আতাউ রাব্বিকা মাহজূরা-।




আল বায়ান: এদের ও ওদের প্রত্যেককে আমি তোমার রবের দান থেকে সাহায্য করি, আর তোমার রবের দান বন্ধ হওয়ার নয়।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২০. আপনার রবের দান থেকে আমরা এদের ও ওদের প্রত্যেককে সাহায্য করি এবং আপনার রবের দান অবারিত।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমার প্রতিপালকের দান থেকে আমি এদেরকে আর ওদেরকে সকলকেই সাহায্য করে থাকি, তোমার প্রতিপালকের দান তো বন্ধ হওয়ার নয়।




আহসানুল বায়ান: (২০) তোমার প্রতিপালক তাঁর দান দ্বারা এদের ও ওদের (পরলোককামী ও ইহলোককামী উভয়কে) সাহায্য করেন এবং তোমার প্রতিপালকের দান অবারিত। [1]



মুজিবুর রহমান: তোমার রাব্ব তাঁর দান দ্বারা এদেরকে এবং ওদেরকে সাহায্য করেন এবং তোমার রবের দান অবারিত।



ফযলুর রহমান: আমি এদেরকে এবং ওদেরকে প্রত্যেককে তোমার প্রভুর দান থেকে সাহায্য করে থাকি। তোমার প্রভুর দান (কারো জন্য) নিষিদ্ধ নয়।



মুহিউদ্দিন খান: এদেরকে এবং ওদেরকে প্রত্যেককে আমি আপনার পালনকর্তার দান পৌছে দেই এবং আপনার পালকর্তার দান অবধারিত।



জহুরুল হক: প্রত্যেককেই আমরা দিই, এদের এবং ওদের, তোমার প্রভুর দানসামগ্রী থেকে। আর তোমার প্রভুর দানসামগ্রী সীমাবদ্ধ নয়।



Sahih International: To each [category] We extend - to these and to those - from the gift of your Lord. And never has the gift of your Lord been restricted.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২০. আপনার রবের দান থেকে আমরা এদের ও ওদের প্রত্যেককে সাহায্য করি এবং আপনার রবের দান অবারিত।(১)


তাফসীর:

১. অর্থাৎ দুনিয়ায় জীবিকা ও জীবন উপকরণ দুনিয়াদাররাও পাচ্ছে এবং আখেরাতের প্রত্যাশীরাও পাচ্ছে। এসব অন্য কেউ নয়, আল্লাহই দান করছেন। আখেরাতের প্রত্যাশীদেরকে জীবিকা থেকে বঞ্চিত করার ক্ষমতা দুনিয়া পূজারীদের নেই এবং দুনিয়া পূজারীদের কাছে আল্লাহর নিয়ামত পৌঁছার পথে বাধা দেবার ক্ষমতা আখেরাত প্রত্যাশীদেরও নেই। তিনি সর্বময় কর্তৃত্ববান, তিনি কোন যুলুম করেন না। তিনি প্রত্যেককে তার সৌভাগ্য বা দূৰ্ভাগ্য সবই প্ৰদান করেন। তার হুকুমকে কেউ রদ করতে পারে না, তিনি যা দিয়েছেন তা কেউ নিষেধ করতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা! করেছেন তা কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২০) তোমার প্রতিপালক তাঁর দান দ্বারা এদের ও ওদের (পরলোককামী ও ইহলোককামী উভয়কে) সাহায্য করেন এবং তোমার প্রতিপালকের দান অবারিত। [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, দুনিয়ার রুযী ও তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কোন পার্থক্য ছাড়াই মু’মিন এবং কাফের উভয়কেই দিয়ে থাকি। যে দুনিয়া কামনা করে তাকেও দিই এবং যে আখেরাত কামনা করে তাকেও দিই। আল্লাহর (পার্থিব) নিয়ামত থেকে কাউকেও বঞ্চিত করা হয় না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর:



পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা রাসূল প্রেরণ না করে কোন জাতিকে ধ্বংস করেন না। এখানে সে মূল নীতির কথা তুলে ধরা হয়েছে যার ভিত্তিতে জাতির ধ্বংস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। তা হল কোন এলাকা ধ্বংস করার ইচ্ছা করলে সে এলাকার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎ কাজ করার আদেশ দেন কিন্ত তারা আল্লাহ তা‘আলার আদেশ ভঙ্গ করে পাপাচারে লিপ্ত হয় ফলে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়।



উক্ত আয়াতে أَمَرْنَا এর তিনটি অর্থ হতে পারে। যেমন



(১) কেউ কেউ বলেন: এখানে أَمَرْنَا দ্বারা ভাগ্যের দিকে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(أَتٰهَآ أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا)



“তখন দিবসে অথবা রজনীতে আমার নির্দেশ এসে পড়ে।” (সূরা ইউনুস ১০:২৪)



আবার কেউ বলেন: এখানে أَمَرْنَا দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন কিন্তু তারা তা অমান্য করে অসৎ কাজে লিপ্ত হয় আর এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসে পড়ে।



(২) আল্লাহ তা‘আলা ঐ সমস্ত লোকদেরকে সমাজের প্রধান বানিয়ে দেন। আর তারা অপরাধ করে ও সাধারণ লোকেরা তাদের অনুসরণ করে ফলে তাদের ওপর শাস্তি এসে যায়। আল্লাহ বলেন,



(وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَا فِيْ كُلِّ قَرْيَةٍ أَكٰبِرَ مُجْرِمِيْهَا لِيَمْكُرُوْا فِيْهَا)



“অনুরূপভাবে আমি প্রত্যেক জনপদে সেখানের অপরাধীদের প্রধানকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি।” (সূরা আন‘আম ৬:১২৩)



(৩) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এর অর্থ এমনও হতে পারে যে, আমি তাদের শত্র“দের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেই এবং সেখানে তারা পাপাচারের শেষ সীমায় পৌঁছে যায়। তখন তাদের ওপর শাস্তি এসে পড়ে। (ইবনে কাসীর ৫/৬৪)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যারা শুধু পার্থিব জীবন কামনা করে, পার্থিব জীবন তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য তাদের সবাই চাহিদানুযায়ী পার্থিব জীবন পায় না। আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য যতটুকু ইচ্ছা তাকে কেবল ততটুকু দিয়ে থাকেন। কিন্তু আখিরাতে সে নিন্দনীয় ও ভর্ৎসনার সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَنْ کَانَ یُرِیْدُ الْحَیٰوةَ الدُّنْیَا وَزِیْنَتَھَا نُوَفِّ اِلَیْھِمْ اَعْمَالَھُمْ فِیْھَا وَھُمْ فِیْھَا لَا یُبْخَسُوْنَﭞاُولٰ۬ئِکَ الَّذِیْنَ لَیْسَ لَھُمْ فِی الْاٰخِرَةِ اِلَّا النَّارُﺘ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوْا فِیْھَا وَبٰطِلٌ مَّا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ)



“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাদেরকে কম দেয়া হবে না। তাদের জন্য আখিরাতে অগ্নি ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক।” (সূরা হূদ ১১:১৫-১৬)



পক্ষান্তরে যারা ঈমানের সাথে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রেখে সেদিনের সফলতার জন্য ভাল কাজের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালায় তাদের প্রচেষ্টাকে কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হয় এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে জান্নাত।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(مَنْ کَانَ یُرِیْدُ حَرْثَ الْاٰخِرَةِ نَزِدْ لَھ۫ فِیْ حَرْثِھ۪ﺆ وَمَنْ کَانَ یُرِیْدُ حَرْثَ الدُّنْیَا نُؤْتِھ۪ مِنْھَا ﺫ وَمَا لَھ۫ فِی الْاٰخِرَةِ مِنْ نَّصِیْبٍﭣ) ‏



“যে আখিরাতে ফসল কামনা করে তার জন্য আমি তার ফসল বর্ধিত করে দেই এবং যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে এরই কিছু দেই, আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না।” (সূরা শুরা ৪২:২০)



সুতরাং প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তির উচিত প্রতিটি সৎ আমলের দ্বারা আখিরাতের সফলতা কামনা করবে, দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্য করবে না।



আর আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে রুযী ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কম-বেশি সবাইকে দিয়ে থাকেন। যারা দুনিয়া চায় তাদেরকে এবং যারা আখিরাত চায় তাদেরকেও দান করে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা তার সকল বান্দার ওপরই নেয়ামত বর্ষণ করেন কেউ তার নিয়ামতসমূহ থেকে বঞ্চিত নয়। যে নেয়ামত ভোগ করে শুকরিয়া আদায় করবে তার জন্যই উত্তম প্রতিদান আর যারা কুফরী করবে তারাই হবে জাহান্নামী।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অযথা ধ্বংস করেন না; বরং তাদের কৃতকর্মের কারণেই তাদেরকে ধ্বংস করেন।

২. দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৩. সৎ আমল কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত হল ঈমান থাকতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর

অর্থাৎ এই দুই প্রকারের লোকদেরকে আমি (আল্লাহ) বাড়িয়ে দিয়ে থাকি। এক প্রকার হলো তারা, যারা শুধু দুনিয়াই কামনা করে। আর দ্বিতীয় প্রকারের লোক হলো তারা, যারা পরকাল চায়। এদের যারা যেটা চায়, তার জন্যে সেটাই বৃদ্ধি করে থাকি। হে নবী (সঃ)! এটা তোমার প্রতিপালকের বিশেষ দান। তিনি এমন দানকারী ও এমন বিচারক যিনি কখনো জুলুম করেন না। ভাগ্যবানকে সৌভাগ্যবান এবং হতভাগ্যকে তিনি দুর্ভোগ দিয়ে থাকেন। তাঁর আহকাম কেউ খণ্ডন করতে পারে না। তোমার প্রতিপালকের দান অসাধারণ। তা কারো বন্ধ করার দ্বারা বন্ধও হয় না এবং কেউ সরাবার চেষ্টা করলে তা সরেও যায় না। তাঁর দান অফুরন্ত, তা কখনো কমে যায় না।

মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘দেখো, দুনিয়ায় আমি মানুষের বিভিন্ন শ্রেণী রেখেছি। তাদের মধ্যে ধনীও আছে, ফকীরও আছে এবং মধ্যবিত্ত আছে। কেউ। বাল্যবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করছে, কেউ পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হয়ে মারা যাচ্ছে, আবার কেউ এ দুয়ের মাঝামাঝি বয়সে মারা যাচ্ছে। শ্রেণী বিভাগের দিক দিয়ে আখেরাত দুনিয়ার চেয়েও বেড়ে রয়েছে। কেউ তো শৃংখল পরিহিত হয়ে জাহান্নামের গর্তে অবস্থান করবে এবং কেউ জান্নাতে চরম সুখে কালাতিপাত। করবে। তারা তথায় বিরাট অট্টালিকায় নিয়ামত, শান্তিতে আরামের মধ্যে থাকবে। জান্নাতীদের মধ্যেও আবার শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। এক একটি শ্রেণী ও স্তরের মধ্যে আকাশ পাতালের ব্যবধান ও তারতম্য রয়েছে। জান্নাতের মধ্যে এইরূপ একশটি শ্রেণী রয়েছে। যারা সর্বোচ্চ শ্রেণীতে অবস্থান করবে তারা ইল্লীঈনকে এমনই দেখবে যেমন তোমরা কোন উজ্জ্বল তারকাকে উচ্চাকাশে দেখে থাকো। সুতরাং আখেরাত শ্রেণী ও ফজীলতের দিক দিয়ে খুবই বড়। তিবরানীর (রঃ) হাদীসে রয়েছে যে, যে বান্দা দুনিয়ায় যে দরজা বা শ্রেণী বাড়াতে চাইবে এবং নিজের চাহিদা পূরণে সফলকাম হবে, সে তার আখেরাতের দরজা বা শ্রেণীর মান কমিয়ে দেবে এবং তার দুনিয়ার চাহিদায় সে কৃতকার্য হবে। ফলে তার আখেরাতের শ্রেণীর মান হ্রাস পাবে, যা দুনিয়ার তুলনায় অনেক বড়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।