সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 55)
হরকত ছাড়া:
ليكفروا بما آتيناهم فتمتعوا فسوف تعلمون ﴿٥٥﴾
হরকত সহ:
لِیَکْفُرُوْا بِمَاۤ اٰتَیْنٰهُمْ ؕ فَتَمَتَّعُوْا ۟ فَسَوْفَ تَعْلَمُوْنَ ﴿۵۵﴾
উচ্চারণ: লিয়াকফুরূবিমা আ-তাইনা-হুম ফাতামাত্তা‘ঊ ফাছাওফা তা‘লামূন।
আল বায়ান: যাতে আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তা তারা অস্বীকার করতে পারে। অতএব তোমরা ভোগ কর, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৫. আমরা তাদেরকে যা দিয়েছি তা অস্বীকার করার জন্য। কাজেই তোমরা ভোগ করে নাও, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তাদের না-শোকরি করা জন্য। অতএব তোমরা ভোগ করে নাও, শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।
আহসানুল বায়ান: (৫৫) যাতে আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা অস্বীকার করে;[1] সুতরাং তোমরা ভোগ করে নাও, অচিরেই জানতে পারবে। [2]
মুজিবুর রহমান: আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা অস্বীকার করার জন্য, সুতরাং তোমরা ভোগ করে নাও, অচিরেই জানতে পারবে।
ফযলুর রহমান: আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তা অস্বীকার করার জন্য (এমনটি করে থাকে)। ঠিক আছে! ভোগ করে নাও; একদিন জানতে পারবে।
মুহিউদ্দিন খান: যাতে ঐ নেয়ামত অস্বীকার করে, যা আমি তাদেরকে দিয়েছি। অতএব মজা ভোগ করে নাও-সত্বরই তোমরা জানতে পারবে।
জহুরুল হক: যাতে তারা অস্বীকার করতে পারে যা আমরা তাদের দিয়েছিলাম। "অতএব ভোগ করে নাও, শীঘ্রই কিন্তু টের পাবে!"
Sahih International: So they will deny what We have given them. Then enjoy yourselves, for you are going to know.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৫. আমরা তাদেরকে যা দিয়েছি তা অস্বীকার করার জন্য। কাজেই তোমরা ভোগ করে নাও, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৫) যাতে আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা অস্বীকার করে;[1] সুতরাং তোমরা ভোগ করে নাও, অচিরেই জানতে পারবে। [2]
তাফসীর:
[1] কিন্তু মানুষ এতই অকৃতজ্ঞ যে, দুঃখ-কষ্ট (অসুখ, দরিদ্রতা, ক্ষতি ইত্যাদি) দূর হলেই আবার আল্লাহর সাথে শিরক করতে শুরু করে।
[2] এটি অনুরূপ যেমন পূর্বে বলেছেন,{قُلْ تَمَتَّعُواْ فَإِنَّ مَصِيرَكُمْ إِلَى النَّارِ} তুমি বল, ভোগ করে নাও, পরিণামে জাহান্নামই তোমাদের ঠিকানা। (সূরা ইবরাহীম ৩০)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫১-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা‘আলা সকল মানুষকে তাঁর সাথে অন্য কোন বাতিল মা‘বূদের ইবাদত করতে নিষেধ করছেন। কারণ তিনিই একমাত্র মা‘বূদ যিনি মানুষের সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার। সে সাথে তাঁকেই ভয় করার নির্দেশ দিচ্ছেন, কারণ তাঁর হাতে সকল কল্যাণ-অকল্যাণ ও ভাল-মন্দ। সুতরাং কবর, মাযার, পীর, গাউস-কুতুব ও অন্য সকল তাগুতের ইবাদত বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা আবশ্যক।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَفِرُّوْٓا اِلَی اللہِﺚ اِنِّیْ لَکُمْ مِّنْھُ نَذِیْرٌ مُّبِیْنٌﮁﺆوَلَا تَجْعَلُوْا مَعَ اللہِ اِلٰھًا اٰخَرَﺚ اِنِّیْ لَکُمْ مِّنْھُ نَذِیْرٌ مُّبِیْنٌﮂ)
“আল্লাহর দিকে ধাবিত হও; আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ হতে স্পষ্ট সতর্ককারী। তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা‘বূদ স্থির কর না; নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ হতে স্পষ্ট সতর্ককারী।” (সূরা যারিয়াত ৫১:৫০-৫১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(لَا تَجْعَلْ مَعَ اللّٰهِ إلٰهًا اٰخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُوْمًا مَّخْذُوْلًا)
“আল্লাহর সাথে অপর কোন মা‘বূদ সাব্যস্ত কর না; করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়বে।” (সূরা ইসরা ১৭:২২)
আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া একাধিক মা‘বূদ হলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَوْ كَانَ فِيْهِمَآ اٰلِهَةٌ إِلَّا اللّٰهُ لَفَسَدَتَا ج فَسُبْحَانَ اللّٰهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُوْنَ)
“যদি আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে বহু মা‘বূদ থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে তা হতে ‘আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র, মহান।” (সূরা আম্বিয়া ২১:২২)
(فَإِيَّايَ فَارْهَبُوْنِ)
অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকেই ভয় করে সকল নিষেধ কাজ বর্জন ও নির্দেশাবলী পালন করা উচিত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(نِالَّذِيْنَ يُبَلِّغُوْنَ رِسٰلٰتِ اللّٰهِ وَيَخْشَوْنَه۫ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللّٰهَ ط وَكَفٰي بِاللّٰهِ حَسِيْبًا)
“তারা (নাবীগণ) আল্লাহর বাণী প্রচার করত এবং তাঁকে ভয় করত, আর তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করত না। হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা আহযাব ৩৩:৩৯)
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আকাশে ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তার কর্তৃত্ব, পরিচালনা এবং মালিক একমাত্র তিনি। সুতরাং একমাত্র তাঁরই অনুগত হওয়া উচিত এবং তাঁকেই ভয় করা উচিত।
الدِّيْنُ এখানে দীন অর্থ আনুগত্য, وَاصِبًا অর্থ অবিরাম, ধারাবাহিক। অর্থাৎ অবিরামভাবে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করতে হবে।
(إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ...) এখানে মানুষের একটি মন্দ অভ্যাসের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ। তারা বিপদে পড়লে তাদের ভ্রান্ত মা‘বূদদের কথা ভুলে যায়। বিনীতভাবে আল্লাহ তা‘আলাকেই ডাকে। আর যখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে যায় তখন তারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে যায় এবং তাঁর সাথে শরীক করে বসে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُوْنَ إِلَّآ إِيَّاهُ ج فَلَمَّا نَجَّاكُمْ إِلَي الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ ط وَكَانَ الْإٍنْسَانُ كَفُوْرًا)
“সমুদ্রে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন কেবল তিনি ব্যতীত অপর যাদেরকে তোমরা আহ্বান করে থাক তারা অন্তর্হিত হয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইসরা ১৭:৬৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(قُلِ اللّٰهُ يُنَجِّيْكُمْ مِّنْهَا وَمِنْ كُلِّ كَرْبٍ ثُمَّ أَنْتُمْ تُشْرِكُوْنَ)
“বল: আল্লাহই তোমাদেরকে তা হতে এবং সমস্ত দুঃখ-কষ্ট হতে নাজাত দেবেন। এতদসত্ত্বেও তোমরা তাঁর সাথে শরীক কর।’’ (সূরা আন‘আম ৬:৬৪)
তাদের এ অকৃতজ্ঞতাপূর্ণ কাজের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধমক দিয়ে বলেন তোমরা যা খুশি করতে থাক। তোমাদের এই কৃতকর্মের ফলাফল জানতে পারবে। অর্থাৎ এর ফলে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে যা অতি ভয়াবহ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল ইবাদত করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য, অন্য কারো জন্য নয়।
২. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই, থাকলে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যেত।
৩. মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকে, কিন্তু বিপদ থেকে উদ্ধার হলে আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে শিরক করে।
৪. যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শিরক করে তাদের পরিণাম ভয়াবহ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫১-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেনঃ “এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই ইবাদতেরযোগ্য নেই। তিনি শরীক বিহীন। তিনি প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টি কর্তা, মালিক এবং প্রতিপালক। আন্তরিকতার সাথে সদা-সর্বদা তাঁরই ইবাদত করা অবশ্য কর্তব্য। তিনি ছাড়া অন্যের ইবাদতের পন্থা অবলম্বন করা মোটেই। উচিত নয়। আসমান ও যমীনের সমস্ত কিছু ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় তারই অনুগত। সকলকেই তাঁরই কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। সুতরাং তোমরা খাঁটিভাবে তারই ইবাদত করতে থাকো। তার সাথে অন্যকে শরীক করা হতে বিরত থাকো। নিখুঁত দ্বীন একমাত্র আল্লাহরই। আসমান ও যমীনের সমস্ত কিছুর একক মালিক তিনিই।
লাভ ও ক্ষতি তাঁরই ইচ্ছাধীন। যত কিছু নিয়ামত বান্দার হাতে রয়েছে সবই তাঁরই নিকট হতে এসেছে। জীবিকা, নিয়ামত, নিরাপত্তা এবং সাহায্য সবই তার পক্ষ হতে আগত। তাঁরই দয়া ও অনুগ্রহ বান্দার উপর রয়েছে। জেনে রেখো, এতগুলো নিয়ামত পাওয়ার পরেও তোমরা এখনো তাঁরই মুখাপেক্ষী। রয়েছে। বিপদ-আপদ এখনো তোমাদের মাথার উপর ঘুরপাক খাচ্ছে। দুঃখ ও বিপদ-আপদের সময় তোমরা তাঁকেই স্মরণ করে থাকো। কঠিন বিপদের সময় কেঁদে কেঁদে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তোমরা তাঁরই দিকে ঝুঁকে পড়। স্বয়ং মক্কার মুশরিকদের অবস্থাও এরূপই ছিল। যখন তারা সমুদ্রে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়তো, বিপরীত বাতাস যখন নৌকা ঝুকিয়ে দিতো এবং নৌকা টলমল করে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হতো তখন তোমরা তোমাদের ঠাকুর, দেবতা, প্রতিমা, পীর, ফকীর, ওয়ালী, নবী সবকেই ভুলে যেতে এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ঐ বিপদ হতে মুক্তি পাওয়ার জন্যে আল্লাহর নিকটই প্রার্থনা করতে। কিন্তু যখন নৌকা নদীর তীরে পৌঁছে যেতো তখন ঐ পুরাতন মা'বুদগুলির আবার তারা স্মরণ করতো। আর প্রকৃত মা’ৰূদের সাথে পুনরায় ঐ মা'বুদের পূজা শুরু করে দিতো। এর চেয়ে বড় অকৃতজ্ঞ ও বিশ্বাসঘাকতা আর কি হতে পারে? এখানেও আল্লাহ পাক বলেন যে, উদ্দেশ্য সফল হওয়া মাত্রই অনেক লোক চক্ষু ফিরিয়ে নেয়। শব্দটি সমাপ্তিবোধক লাম। আবার এটাকে আমি তাদের এই স্বভাব এজন্যেই করেছি যে, তারা আল্লাহর নিয়ামতের উপর পর্দা ফেলে দেয় এবং তা অস্বীকার করে, অথচ প্রকৃত পক্ষে নিয়ামত দানকারী এবং বিপদ-আপদ দূরকারী আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
এরপর মহান আল্লাহ তাদেরকে ধমকের সুরে বলছেনঃ “আচ্ছা, দুনিয়ায় তোমরা নিজেদের কাজ চালিয়ে যাও এবং সুখ ভোগ করতে থাকো। কিন্তু এর পরিণাম ফল সত্বরই জানতে পারবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।