সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 39)
হরকত ছাড়া:
ليبين لهم الذي يختلفون فيه وليعلم الذين كفروا أنهم كانوا كاذبين ﴿٣٩﴾
হরকত সহ:
لِیُبَیِّنَ لَهُمُ الَّذِیْ یَخْتَلِفُوْنَ فِیْهِ وَ لِیَعْلَمَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْۤا اَنَّهُمْ کَانُوْا کٰذِبِیْنَ ﴿۳۹﴾
উচ্চারণ: লিইউবাইয়িনা লাহুমুল্লাযী ইয়াখতালিফূনা ফীহি ওয়া লিইয়া‘লামাল্লাযীনা কাফারূআন্নাহুম কা-নূকা-যিবীন।
আল বায়ান: যাতে তিনি তাদের জন্য স্পষ্ট করেন, যা নিয়ে তারা মতবিরোধ করে। আর যারা কুফরী করেছে, যেন তারা জানতে পারে যে, নিশ্চয় তারা ছিল মিথ্যাবাদী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৯. যে বিষয়ে তারা মতানৈক্য করছে, তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার জন্য এবং কাফিরদের জানার জন্য যে, নিশ্চয় তারা ছিল মিথ্যাবাদী।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: (তাদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে) যারা এ ব্যাপারে মতভেদ করেছিল তাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য, আর কাফিরগণ যাতে জানতে পারে যে, তারা ছিল মিথ্যেবাদী।
আহসানুল বায়ান: (৩৯) তিনি (পুনর্জীবিত করবেন) যাতে তাদের বিতর্কিত বিষয় তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন এবং যাতে অবিশ্বাসীরা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী।[1]
মুজিবুর রহমান: তিনি পুনরুত্থিত করবেন, যে বিষয়ে তাদের মতানৈক্য ছিল তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে দেখানোর জন্য এবং যাতে কাফিরেরা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী।
ফযলুর রহমান: (তিনি মৃতদেরকে পুনরুত্থিত করবেন) যাতে তারা যে বিষয়ে মতভেদ করত তিনি তা প্রকাশ করতে পারেন এবং যাতে কাফেররা জানতে পারে যে, তারাই মিথ্যাবাদী ছিল।
মুহিউদ্দিন খান: তিনি পুনরুজ্জীবিত করবেনই, যাতে যে বিষয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য ছিল তা প্রকাশ করা যায় এবং যাতে কাফেরেরা জেনে নেয় যে, তারা মিথ্যাবাদী ছিল।
জহুরুল হক: যেন তিনি তাদের কাছে সুস্পষ্ট করতে পারেন সেই বিষয় যাতে তারা মতভেদ করছে, আর যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা যেন জানতে পারে যে তারা নিশ্চয় মিথ্যাবাদী ছিল।
Sahih International: [It is] so He will make clear to them [the truth of] that wherein they differ and so those who have disbelieved may know that they were liars.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৯. যে বিষয়ে তারা মতানৈক্য করছে, তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার জন্য এবং কাফিরদের জানার জন্য যে, নিশ্চয় তারা ছিল মিথ্যাবাদী।(১)
তাফসীর:
(১) এ বক্তব্য থেকে মৃত্যুর পরের জীবন এবং শেষ বিচারের দিনের জন্য মানুষের পুনরুত্থানের রহস্য ও হিকমত বর্ণনা করা হচ্ছে। [ইবন কাসীর] দুনিয়ায় যখন থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, সত্য সম্পর্কে অসংখ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ ধরনের মতবিরোধের ক্ষেত্রে বিবেকের দাবী এই যে, এক সময় না এক সময় সঠিক ও নিশ্চিতভাবে প্রতিভাত হোক যথার্থই তাদের মধ্যে হক কি ছিল এবং বাতিল কি ছিল, কে সত্যপন্থী ছিল এবং কে মিথ্যাপন্থী। এ দুনিয়ায় এ যবনিকা সরে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই দেখা যায় না। এ দুনিয়ার ব্যবস্থাপনাই এমন যে, এখানে সত্য কোনদিন পর্দার বাইরে আসতে পারে না। কাজেই বিবেকের এ দাবী পূরণ করার জন্য ভিন্ন আরেকটি জগতের প্রয়োজন। আর সেটাই হচ্ছে আখেরাত। [এ বিষয়টির দিকে আল্লাহ তা'আলা ইঙ্গিত করেছেন, দেখুন সূরা আত-তুরঃ ১৪-১৬, সূরা আল-কামারঃ ৫০, সূরা লুকমান ২৮]
তাছাড়া আরও একটি কারণে মানুষের পুনরুত্থান প্রয়োজন বলে এখানে বলা হয়েছে, তা হচ্ছে, এ সমস্ত কাফের ও মুশরিকরা শপথ ও কসম করে কিয়ামতের আগমন ও সেখানে মানুষের পুনরুত্থানের বিষয়টি অস্বীকার করছে, সুতরাং কিয়ামত ও পুনরুত্থান হলে কারা তাদের শপথে মিথ্যাবাদী ছিল সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে। [ইবন কাসীর] তখন তাদের বিচার করা হবে। যেদিন তাদেরকে ধাক্কা মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের আগুনের দিকে। [ইবন কাসীর] [এ ব্যাপারে দেখুন সূরা আন-নাজমঃ ৩১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৯) তিনি (পুনর্জীবিত করবেন) যাতে তাদের বিতর্কিত বিষয় তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন এবং যাতে অবিশ্বাসীরা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী।[1]
তাফসীর:
[1] এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার হিকমত ও কারণ উল্লেখ করা হচ্ছে যে, সেদিন মহান আল্লাহ সেই সকল বিষয়ে ফায়সালা করবেন, যে সকল বিষয়ে তাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল। হকপন্থী ও পরহেযগারদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং কাফের ও পাপীদেরকে তাদের পাপকাজের শাস্তি দেবেন। তাছাড়া সে দিন কাফেরদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কিয়ামত হওয়ার ব্যাপারে যে শপথ তারা করত, তাতে তারা মিথ্যাবাদী ছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৮-৪০নং আয়াতের তাফসীর:
(وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ....)
উক্ত আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মুশরিকদের কাছে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়াটা ছিল অসম্ভাব্য একটি বিষয়। তাই তারা শক্তভাবে শপথ করে বলত যে, আল্লাহ তা‘আলা মৃতকে জীবিত করবেন না। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ কথার উত্তরে বলেন যে, এটা অবশ্যই করা হবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা সত্য।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(زَعَمَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْآ أَنْ لَّنْ يُّبْعَثُوْا ط قُلْ بَلٰي وَ رَبِّيْ لَتُبْعَثُنَّ)
“কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বল: নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।” (সূরা তাগাবুন ৪৩:৭)
অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে অধিকাংশ মানুষ রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে ও পুনরুত্থানের ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান রাখে না।
(لِيُبَيِّنَ لَهُمُ) এখানে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার হিকমত ও কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। সেদিন আল্লাহ তা‘আলা সে সকল বিষয়ে ফায়সালা করবেন, যে সকল বিষয়ে তাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল। হকপন্থী ও পরহেযগারদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং কাফির ও পাপীদেরকে তাদের পাপকাজের শাস্তি দেবেন। তাছাড়া সেদিন কাফিরদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কিয়ামত হওয়ার ব্যাপারে যে শপথ তারা করত তাতে তারা মিথ্যাবাদী ছিল।
(إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ....)
অর্থাৎ মানুষের নিকট কিয়ামত সংঘটিত হওয়া যতই কঠিন মনে হোক আল্লাহ তা‘আলার নিকট এটি খুবই সহজ। তিনি চাইলেই তা হয়ে যাবে। তাতে তার কোনই পরিশ্রম করতে হবে না। তিনি শুধু বলবেন, হও, আর সাথে সাথে তা হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَمْرُ السَّاعَةِ إِلَّا كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ)
“কিয়ামতের ব্যাপার তো চোখের পলকের ন্যায়, বরং তার চেয়েও দ্রততর।” (সূরা নাহল ১৬:৭৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(إِنَّمَآ أَمْرُه۫ ٓ إِذَآ أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَّقُوْلَ لَه۫ كُنْ فَيَكُوْنُ)
“বস্তুতঃ তাঁর সৃষ্টিকার্য এরূপ যে, যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তাকে বলেনঃ “হও”, অমনি তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৮২) অতএব আল্লাহ তা‘আলার নিকট কিয়ামত, পুনরুত্থান কোনই কঠিন কাজ নয়। আর তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করবে আর যার ইচ্ছা অস্বীকার করবে; এতে আল্লাহ তা‘আলার কিছুই যায় আসে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পুনরুত্থান অবশ্যই করা হবে।
২. আল্লাহ তা‘আলার কাজ ‘হও’ বলা মাত্রই হয়ে যায়।
৩. আল্লাহ তা‘আলার জন্য সকল কাজই সহজ।
৪. কিয়ামতের দিন মুশরিকরা জানতে পারবে যে, তারা ছিল দুনিয়াতে মিথ্যাবাদী ইত্যাদি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, যেহেতু তারা কিয়ামতকে বিশ্বাস করে না, সেই হেতু অন্যদেরকেও এই বিশ্বাস হতে সরাবার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। ঈমান বিক্রি করে আল্লাহর নামে জোরদার কসম খেয়ে বলেঃ “ আল্লাহ পাক বলেন যে, কিয়ামত অবশ্যই হবে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য। কিন্তু অধিকাংশ লোক মুখতা ও অজ্ঞতা বশতঃ রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করে, আল্লাহর হুকুম অমান্য করে এবং কুফরীর গর্তে পড়ে যায়।”
অতঃপর আল্লাহ তাআলা কিয়ামত সংঘটনের ও দেহের পুনরুত্থানের কিছু নিপুণতা প্রকাশ করেছেন। একটি এই যে, যেন এর মাধ্যমে পার্থিব মতভেদের মধ্যে কোনটি সত্য ছিল তা প্রকাশ হয়ে পড়ে, অসৎ লোকেরা শাস্তি এবং সৎ লোকেরা পুরস্কার লাভ করে। আর কাফিরদের আকিদায়, কথায় এবং কসমে মিথ্যাবাদী হওয়া যেন প্রমাণিত হয়ে যায়। এ সময় তারা সবাই দেখে নেবে যে, তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং বলা হবেঃ “এটাই হচ্ছে এ জাহান্নাম যাকে তোমরা অস্বীকার করতে। এখন বলতো, এটা কি যাদু, না তোমরা অন্ধ? এর মধ্যেই তোমরা পড়ে থাকো। এখন তোমরা ধৈর্য ধারণ কর অথবা হায়, হায় কর উভয় সমান। এখন তোমাদেরকে তোমাদের দুষ্কর্মের শাস্তি ভোগ করতেই হবে।”
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় অসীম ক্ষমতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি যা চান তাই করতে পারেন। কোন কিছু হতে তিনি অপারগ নন। কোন জিনিসই তার অধিকার বহির্ভূত নয়। তিনি যা করতে চান তার সম্পর্কে শুধু বলেনঃ ‘হয়ে যাও' সাথে সাথেই তা হয়ে যায়। কিয়ামতও শুধু তাঁর হুকুমেরই কাজ। যেমন তিনি বলেনঃ “চোখের পলকের মধ্যে আমার হুকম পালিত হয়।” অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “আমি কোন কিছু ইচ্ছা করলে সে বিষয়ে আমার কথা শুধু এই যে, আমি বলিঃ ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়। অর্থাৎ আমি একবার মাত্র আদেশ করি এবং সাথে সাথে তা হয়ে যায়। যেমন কবি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আল্লাহ কোন বিষয়ের ইচ্ছা করেন তখন ওটাকে একবার মাত্র বলেনঃ ‘হও’ আর তেমনই তা হয়ে যায়। অর্থাৎ গুরুত্ব আরোপের জন্যে তাঁর দ্বিতীয়বার আদেশ করার প্রয়োজন হয় না। এমন কেউ নেই, যে তাঁর বিরোধিতা করতে পারে। তিনি এক ও মহাপ্রতাপান্বিত। তিনি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও সাম্রাজ্যের মালিক। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া নেই কোন মাবুদ, নেই কোন শাসনকর্তা, নেই কোন প্রতিপালক এবং নেই কোন ক্ষমতাবান।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে গালি দেয়, অথচ এটা তার জন্যে সমীচীন নয় এবং আদম সন্তান আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, অথচ এটা তার পক্ষে উচিত। নয়। তার মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এই যে, সে গুরুত্ববোধক শপথ করে বলেঃ “আল্লাহ তাআলা মৃতকে জীবিত করবেন না।” আমি বলিঃ “হাঁ, হাঁ, অবশ্য আমি জীবিত করবো।” এটা সত্য ওয়াদা, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়। আর আমাকে তার গালি দেয়া এই যে, সে বলেঃ “আল্লাহ তিনের একজন”। অথচ আমি এক, আমি আল্লাহ, আমি কারো মুখাপেক্ষী নই, সবাই আমার মুখাপেক্ষী, আমার কোন সন্তান নেই এবং আমিও কারো সন্তান নই, আর আমার সমতুল্য কেউই নেই।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) মাওকুফ রূপে বর্ণনা করেছেন। আর এটা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও ভিন্ন শব্দে মারফু রূপে বর্ণিত হয়েছে)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।