সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 24)
হরকত ছাড়া:
ألم تر كيف ضرب الله مثلا كلمة طيبة كشجرة طيبة أصلها ثابت وفرعها في السماء ﴿٢٤﴾
হরকত সহ:
اَلَمْ تَرَ کَیْفَ ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا کَلِمَۃً طَیِّبَۃً کَشَجَرَۃٍ طَیِّبَۃٍ اَصْلُهَا ثَابِتٌ وَّ فَرْعُهَا فِی السَّمَآءِ ﴿ۙ۲۴﴾
উচ্চারণ: আলাম তারা কাইফা দারাবাল্লা-হুমাছালান কালিমাতান তাইয়িবাতান কাশাজারাতিন তাইয়িবাতিন আসলুহা-ছা-বিতুওঁ ওয়া ফার‘উহা-ফিছছামাই।
আল বায়ান: তুমি কি দেখ না, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালিমা তাইয়েবা, যা একটি ভাল বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুস্থির আর শাখা-প্রশাখা আকাশে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের(১) তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত,(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কি দেখ না কীভাবে আল্লাহ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন? উৎকৃষ্ট বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছের ন্যায় যার মূল সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত আর শাখা-প্রশাখা আকাশপানে বিস্তৃত।
আহসানুল বায়ান: (২৪) তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের উপমা উৎকৃষ্ট বৃক্ষ; যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত।
মুজিবুর রহমান: তুমি কি লক্ষ্য করনা আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎ বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট বৃক্ষ যার মূল সুদৃঢ় এবং যার প্রশাখা উর্ধ্বে বিস্তৃত ।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ কীভাবে এক একটি উপমা দিয়েছেন তুমি কি তা লক্ষ্য করনি? একটি ভাল কথা একটি ভাল গাছের মত, যার শিকড় খুব মজবুত এবং যার শাখা-প্রশাখা আকাশে (অনেক ওপরে) বিস্তৃত।
মুহিউদ্দিন খান: তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনঃ পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মত। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত।
জহুরুল হক: তোমরা কি ভেবে দেখ নি আল্লাহ্ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন সাধু কথাকে উৎকৃষ্ট গাছের সঙ্গে, যার শিকড় হচ্ছে মজবুত ও যার ডালপালা আকাশে,
Sahih International: Have you not considered how Allah presents an example, [making] a good word like a good tree, whose root is firmly fixed and its branches [high] in the sky?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৪. আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের(১) তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত,(২)
তাফসীর:
(১) মূল আয়াতে (كَلِمَةً طَيِّبَةً) বলা হয়েছে। “কালেমা তাইয়েবা”র শাব্দিক অর্থ “পবিত্র কথা।” পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এ কালেমা। [বাগভী] এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ (كَلِمَةً طَيِّبَةً) হলোঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দেয়া আর (كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ) হলো মু'মিন। [ইবন কাসীর] এরপর (أَصْلُهَا ثَابِتٌ) এর অর্থ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুমিনের অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত। (وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ) অর্থ, এ কালেমার কারণে এর মাধ্যমে মুমিনের আমল আসমানে উত্থিত হয়। [ইবন কাসীর] আর এ তাফসীরই দাহহাক, সায়ীদ ইবনে জুবাইর, ইকরিমাহ এবং কাতাদা সহ অনেক মুফাসসেরীন থেকে বর্ণিত হয়েছে। যার সারকথা হলো, উত্তম বৃক্ষ হলো মুমিন যার তুলনা খেজুর গাছের সাথে বিভিন্ন হাদীসে দেয়া হয়েছে। খেজুর গাছ শুধু ভাল কিছুই উপহার দেয়। তেমনি ঈমানদার, শুধু ভালকাজই তার কাছ থেকে আসমানে উঠতে থাকে। সে ভাল কথা, ভাল কাজ করেই যেতে থাকে আর তা দুনিয়াতে হলেও তার ফলাফল নির্ধারিত হয় আকাশে। [ইবন কাসীর]
(২) এ আয়াতে মুমিন ও তার ক্রিয়াকর্মের উদাহরণে এমন একটি বৃক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার কাণ্ড মজবুত ও সুউচ্চ এবং শিকড় মাটির গভীরে প্রেথিত। ভূগর্ভস্থ ঝর্ণা থেকে সেগুলো সিক্ত হয়। গভীর শিকড়ের কারণে বৃক্ষটি এত শক্ত যে, দমকা বাতাসে ভূমিসাৎ হয়ে যায় না। ভূপৃষ্ঠ থেকে উর্ধ্বে থাকার কারণে এর ফল ময়লা ও আবর্জনা থেকে মুক্ত। এ বৃক্ষের দ্বিতীয় গুণ এই যে, এর শাখা উচ্চতায় আকাশ পানে ধাবমান। তৃতীয় গুণ এই যে, এর ফল সবসময় সর্বাবস্থায় খাওয়া যায়। এ বৃক্ষটি কি এবং কোথায়, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত আছে। সর্বাধিক তথ্যনির্ভর উক্তি এই যে, এটি হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ। [আত-তাফসীরুস সহীহ] এর সমর্থন অভিজ্ঞতা এবং চাক্ষুষ দেখা দ্বারাও হয় এবং বিভিন্ন হাদীস থেকেও পাওয়া যায়। খেজুর বৃক্ষের কাণ্ড যে উচ্চ ও মজবুত, তা প্রত্যক্ষ বিষয়-সবাই জানে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ কুরআনে উল্লেখিত পবিত্র বৃক্ষ হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ এবং অপবিত্র বৃক্ষ হচ্ছে হানযল তথা মাকাল বৃক্ষ। [তিরমিযিঃ ৩১১৯, নাসায়ীঃ ২৮২]
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ ‘একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি তার কাছে খেজুর বৃক্ষের শাস নিয়ে এল। তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামকে একটি প্রশ্ন করলেনঃ বৃক্ষসমূহের মধ্যে একটি বৃক্ষ হচ্ছে মর্দে-মুমিনের দৃষ্টান্ত। (বুখারীর রেওয়ায়েত মতে এ স্থলে তিনি আরো বললেন যে, কোন ঋতুতেই এ বৃক্ষের পাতা ঝরে না।) বল, এ কোন বৃক্ষ? ইবনে উমর বললেনঃ আমার মন চাইল যে, বলে দেই- খেজুর বৃক্ষ। কিন্তু মজলিশে আবু বকর, উমর ও অন্যান্য প্রধান প্রধান সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তাদেরকে চুপ দেখে আমি বলার সাহস পেলাম না। এরপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ এ হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ। [বুখারীঃ ৭২, ১৩১, ২২০৯, ৪৬৯৮, মুসলিমঃ ২৮১১, মুসনাদে আহমাদঃ ২/১২, ২/৬১]
এ বৃক্ষ দ্বারা মুমিনের দৃষ্টান্ত দেয়ার কারণ এই যে, কালেমায়ে তাইয়্যেবার মধ্যে ঈমান হচ্ছে মজবুত ও অনড় শিকড়বিশিষ্ট, দুনিয়ার বিপদাপদ একে টলাতে পারে না। সাহাবী ও তাবেয়ী; বরং প্রতি যুগের খাঁটি মুসলিমদের দৃষ্টান্ত বিরল নয়, যারা ঈমানের মোকাবেলায় জান, মাল ও কোন কিছুর পরওয়া করেনি। দ্বিতীয় কারণ তাদের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। তারা দুনিয়ার নোংরামী থেকে সবসময় দূরে সরে থাকেন যেমন ভূপৃষ্ঠের ময়লা-আবর্জনা উচু বৃক্ষকে স্পর্শ করতে পারে না। এ দুটি গুণ হচ্ছে (أَصْلُهَا ثَابِتٌ) এর দৃষ্টান্ত। তৃতীয় কারণ এই যে, খেজুর বৃক্ষের শাখা যেমন আকাশের দিকে উচ্চে ধাবমান, মুমিনের ঈমানের ফলাফলও অর্থাৎ সৎকর্মও তেমনি আকাশের দিকে উত্থিত হয়। কুরআন বলেঃ (إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ) [সূরা ফাতিরঃ ১০]- অর্থাৎ পবিত্র বাক্যাবলী আল্লাহ্ তা'আলার যেসব যিকর, আল্লাহর দরবারে পৌছতে থাকে।
চতুর্থ কারণ এই যে, খেজুর বৃক্ষের ফল যেমন সব সময় সর্বাবস্থায় এবং সব ঋতুতে দিবারাত্র খাওয়া হয়, মুমিনের সৎকর্মও তেমনি সবসময়, সর্বাবস্থায় এবং সব ঋতুতে অব্যাহত রয়েছে এবং খেজুর বৃক্ষের প্রত্যেকটি অংশই যেমন উপকারী, তেমনি মুমিনের প্রত্যেক কথা ও কাজ, ওঠাবসা এবং এসবের প্রতিক্রিয়া সমগ্র বিশ্বের জন্য উপকারী ও ফলদায়ক। তবে শর্ত এই যে, আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা অনুযায়ী হতে হবে। [দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, ইলামুল মুওয়াক্কেয়ীন, ১/১৩৩; আল-বদর, তাআম্মুলাত কী মুমসালাতিল মুমিন বিন নাখলাহ] উপরোক্ত বক্তব্য থেকে জানা গেল যে, (تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ) বাক্যে أُكُلٌ শব্দের অর্থ হচ্ছে ফল ও খাদ্যোপযোগী বস্তু এবং حِين শব্দের অর্থ প্রতিমুহুর্ত। এটিই সবচেয়ে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। [তাবারী] যদিও এখানে অন্যান্য মতও রয়েছে। [দেখুন, তাবারী; বাগভী; কুরতুবী ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৪) তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের উপমা উৎকৃষ্ট বৃক্ষ; যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৪-২৭ নং আয়াতের তাফসীর:
ইবনু আব্বাস বলেন; (كَلِمَةً طَيِّبَةً) দ্বারা উদ্দেশ্য لَا اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ তথা ‘আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই’ এ সাক্ষ্য দেয়া। এ কালেমা তায়্যিবাকে উপমা দেয়া হয়েছে একটি উৎকৃষ্ট গাছের সাথে, আর সে (شَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ) বা উৎকৃষ্ট গাছটি হল খেজুর গাছ।
একটু খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাব সাধারণত ঝড় তুফানে অনেক গাছ-পালা পড়ে যায় ভেঙ্গে যায়, উপড়ে যায়। কিন্তু খেজুর গাছ জমিনে এত মজবুতভাবে থাকে যে, যত শক্তিশালী ঝড় আসুক না কেন সহজেই তা ভেঙ্গে পড়ে না এবং উপড়েও পড়ে না। আল্লাহ তা‘আলা কালেমা তায়্যিবাকে এ খেজুর গাছের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ খেজুর গাছের গোড়া ও ভিত্তি যেমন মজবুত এবং উপরের শাখা-প্রশাখা আকাশে ছড়ানো ছিটানো, তার ফল-মূল দিয়ে সবাই উপকৃত হয় তেমনি কালেমা তায়্যিবাহ যার অন্তরে প্রবেশ করেছে সে মু’মিনের ঈমানের বিরুদ্ধে যতই ঝড় তুফান আসুক না কেন তার অন্তর থেকে কখনো ঈমান দূরভিত হয় না আর তার শাখা-প্রশাখা সৎ আমলগুলো আকাশের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। আল্লাহ তা‘আলা তা সাদরে গ্রহণ করেন।
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ছিলাম, তিনি আমাদেরকে বললেন: আমাকে এমন একটি গাছের সংবাদ দাও যার পাতা শীত-গ্রীষ্ম কোন কালেই ঝড়ে পড়ে না এবং সব মওসুমেই ফল দেয়, ওই গাছের মতই মু’মিনের উদাহরণ। ইবনু উমার (রাঃ) বললেন আমার ইচ্ছা হল যে বলে দিই তা খেজুর গাছ। কিন্তু সেখানে আমার পিতা উমার, আবূ বকর রয়েছেন। তারা চুপ আছেন, তাই আমিও চুপ রইলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: সেটা হল খেজুর গাছ। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৯৮)
খেজুর গাছের সাথে মু’মিনের দৃষ্টান্ত হল উপকারীতা ও বরকতের দিক থেকে। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা উদাহরণ পেশ করেন যাতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
(كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ)
বা কুবাক্য দ্বারা কুফরীকে বুঝানো হয়েছে। যারা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করে তাদের তুলনা হল ঐ তিক্ত মাকাল ফলের বৃক্ষের সাথে যার শিকড় জমিনের ওপরে থাকে। একটু টান দেয়া মাত্রই এটা উঠে যায়, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই। কাফিরদের দৃষ্টান্তও অনুরূপ। তারা যে আমল করে তা আকাশে পৌঁছায় না এবং আল্লাহ তা‘আলার দরবারেও গৃহীত হয় না। তাদের আমল সম্পূর্ণ বাতিল। তারা এ আমল দ্বারা কোন উপকার লাভ করতে পারে না।
(يُثَبِّتُ اللّٰهُ الَّذِينَ...)
এ আয়াতের ব্যখ্যায় ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন: বারা বিন আযেব (রাঃ) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তিকে যখন কবরে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন সে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত (সত্য) কোন মা‘বূদ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার রাসূল। এটাই হল আল্লাহ তা‘আলার বাণী, যারা বিশ্বাসী তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা শাশ্বত বাণী দ্বারা দুনিয়াতে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৯৯)
অর্থাৎ মু’মিনরা যেমন দুনিয়াতে কালেমা তায়্যিবাহর ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত, তারা যখন কবরে যাবে আর তাদেরকে রব, দীন ও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে তখন সঠিক উত্তরের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ অনেক হাদীসের কিতাবে রয়েছে একজন ব্যক্তিকে যখন কবরস্থ করা হয় তখন তার কাছে দুুজন ফেরেশতা আগমন করে এবং তাকে উঠিয়ে বসানোর পর জিজ্ঞাসা করে, তোমার রব কে? সে মু’মিন হলে উত্তর দিবে, আমার রব আল্লাহ তা‘আলা। তারপর জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমার দীন কী? সে মু’মিন হলে বলবে: ইসলাম। তারপর বলবে, ইনি কে? সে বলবে, আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
অতঃপর আকাশ থেকে আওয়াজ আসবে আমার বান্দা সত্য বলেছে, তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও, তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও এবং জান্নাতের দিকে দরজা খুলে দাও। পক্ষান্তরে কাফির হলে অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত হবে।
কবরের আযাব ও মু’মিনদের পরিত্রাণ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসহ বিস্তারিত আলোচনা তাফসীর ইবনু কাসীরে রয়েছে। সুতরাং যারা দুনিয়াতে সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তারা কবরেও ঈমানের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে।
আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়:
১. উত্তম কথার উপমা উত্তম জিনিসের সাথেই হয়।
২. মু’মিনদেরকে খেজুর গাছের সাথে উপকার ও বরকতের দিক থেকে তুলনা করা হয়েছে ।
৩. মু’মিনদের আমল সর্বদা আকাশে নিয়ে যাওয়া হয়।
৪. কবরের আযাব প্রমাণিত হল, মু’মিনরা ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে, অন্যরা পারবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, লা ইলালাহ ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই) এর সাক্ষ্য দেয়াই বুঝানো হয়েছে কালেমায়ে তায়্যেবা দ্বারা। আর উত্তম ও পবিত্র বৃক্ষ দ্বারা মুমিনকে বুঝানো হয়েছে। এর মূল দৃঢ়, অর্থাৎ মুমিনের অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রয়েছে। এর শাখা রয়েছে ঊর্ধ্বে অর্থাৎ মুমিনের তাওহীদ বা একত্ববাদের কালেমার কারণে তার আমলগুলি আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। আরো বহু মুফাসির হতে এটাই বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুমিনের আমল, কথা ও সৎ কার্যাবলী। মুমিন খেজুর বৃক্ষের ন্যায়। প্রত্যেক দিন সকালে ও সন্ধ্যায় তার আমলগুলি আকাশে উঠে যায়।
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে একটি খেজুর গুচ্ছ আনয়ন করা হলে তিনি (আরবি) এই অংশটুকু পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ওটা খেজুর বৃক্ষ।”
হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে ছিলাম। তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “ওটা কোন্ গাছ যা মুসলমানের মত, যার পাতা ঝরে পড়ে না, গ্রীষ্ম কালেও না শীতকালেও না; যা সব মওসুমেই ফল ধারণ করে থাকে?” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি মনে মনে বললাম যে, বলে দিইঃ ওটা খেজুর গাছ। কিন্তু আমি দেখলাম যে, মজলিসে হযরত আবু বকর (রাঃ) , হযরত উমার (রাঃ) রয়েছেন। এবং তাঁরা নীরব আছেন, কাজেই আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ওটা হচ্ছে খেজুরের গাছ।” এখান থেকে বিদায় হয়ে আমি আমার পিতা হযরত উমারকে (রাঃ) এটা বললে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! যদি তুমি এই উত্তর দিয়ে দিতে তবে এটা আমার কাছে সমস্ত কিছু পেয়ে যাওয়ার অপেক্ষাও প্রিয় ও পছন্দনীয় ছিল।” (এ হাদিসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “আমি মদীনায় হযরত ইবনু উমারের (রাঃ) সঙ্গ লাভ করি। আমি তাঁকে একটি মাত্র হাদীস ছাড়া কোন হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করতে শুনি নাই। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে বসেছিলাম, এমন সময় তাঁর কাছে খেজুর গাছের ভিতরের মজ্জা আনয়ন করা হয়। তখন তিনি বলেনঃ “গাছের মধ্যে এমন এক গাছ রয়েছে যা মুসলমানের মত।” আমি তখন বলবার ইচ্ছা করলাম যে, আমিই হলাম কওমের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ (তাই, আমি বললাম না)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ওটা হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ।” অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, ঐ সময় উত্তরদাতাদের খেয়াল বন্য গাছ পালার দিকে গিয়েছিল।
হযরত কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সম্পদশালী লোকেরা তো মর্যাদায় খুব বেড়ে গেল!” যদি দুনিয়ার সমস্ত কিছু নিয়ে স্কুপ করে দেয়া হয় তবুও কি তা আকাশ পর্যন্ত পেঁৗছতে পারবে? (কখনই না) তোমাকে কি এমন আমলের কথা বলবো যার মূল দৃঢ় এবং শাখা গুলি আকাশে (চলে গেছে)?” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ওটা কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ এবং আলহামদু লিল্লাহ প্রত্যেক ফরয নামাযের পর দশ বার করে পাঠ করো তা হলেই এটা হবে এমন আমল যার মূল মযবুত এবং শাখা আকাশে।” হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন ঐ পবিত্র গাছ জান্নাতে রয়েছে। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ওটা প্রত্যেক মওসূমে ফলদান করে অর্থাৎ-সকাল-সন্ধ্যায় প্রতি মাসে বা প্রতি দু’মাসে অথবা প্রতি ছ’মাসে বা প্রতি সাত মাসে অথবা প্রতি বছরে। কিন্তু শব্দগুলির বাহ্যিক ভাবার্থ তো হচ্ছেঃ “মুমিনের দৃষ্টান্ত ঐ বৃক্ষের মত যার ফল সব সময় শীতে, গ্রীষ্মে, দিনে, রাতে নেমে থাকে। অনুরূপভাবে মু'মিনের নেক আমল দিনরাত সব সময় আকাশে উঠে থাকে।”
আল্লাহ তাআলা মানুষের শিক্ষা, উপদেশ ও অনুধাবনের জন্যে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে থাকেন।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা মন্দ কালেমা অর্থাৎ কাফিরের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন, যার কোন মূল নেই এবং যা দৃঢ় নয়। এর দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে ‘হানযাল গাছের সাথে, যাকে ‘শারইয়ান' বলা হয়। হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওটা হান্যাল গাছ। এই রিওয়াইয়াতটি মার’ রূপেও এসেছে। এর মূল ভূ-পৃষ্ঠ হতে বিচ্ছিন্ন যার কোন স্থায়িত্ব নেই। অনুরূপভাবে কুফরী মূলহীন ও শাখাহীন। কাফিরের কোন ভাল কাজ উপরে উঠে না এবং তার থেকে কিছু কবুলও হয় না।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।