আল কুরআন


সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 23)

সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 23)



হরকত ছাড়া:

وأدخل الذين آمنوا وعملوا الصالحات جنات تجري من تحتها الأنهار خالدين فيها بإذن ربهم تحيتهم فيها سلام ﴿٢٣﴾




হরকত সহ:

وَ اُدْخِلَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا بِاِذْنِ رَبِّهِمْ ؕ تَحِیَّتُهُمْ فِیْهَا سَلٰمٌ ﴿۲۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া উদখিলাল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি জান্না-তিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু খা-লিদীনা ফীহা-বিইযনি রাব্বিহিম তাহিইইয়াতুহুম ফীহাছালা-ম ।




আল বায়ান: আর যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে স্থায়ী হবে। তথায় তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩. আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা তাদের রবের অনুমতিক্রমে স্থায়ী হবে, সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা ঈমান আনে আর সৎ কাজ করে তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করা হবে যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। সেখানে তারা তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে চিরকাল থাকবে। সেখানে তাদেরকে শান্তির বার্তা দিয়ে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হবে।




আহসানুল বায়ান: (২৩) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত; সেখানে তারা তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে;[1] সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’। [2]



মুজিবুর রহমান: যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তাদেরকে দাখিল করা হবে জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থানকারী হবে তাদের রবের অনুমতিক্রমে। সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’।



ফযলুর রহমান: আর যারা ঈমান এনেছিল এবং সৎকাজ করেছিল তাদেরকে জান্নাতে স্থান দেওয়া হবে, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। তারা সেখানে তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে চিরকাল থাকবে। সেখানে তাদের অভিবাদন হবে জ্ঞসালাম (শান্তি)ঞ্চ।



মুহিউদ্দিন খান: এবং যারা বিশ্বাস স্থাপণ করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তাদেরকে এমন উদ্যানে প্রবেশ করানো হবে, যার পাদদেশ দিয়ে নির্ঝরিনী সমূহ প্রবাহিত হবে তারা তাতে পালনকর্তার নির্দেশে অনন্তকাল থাকবে। যেখানে তাদের সম্ভাষণ হবে সালাম।



জহুরুল হক: আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করছে তাদের প্রবেশ করানো হবে স্বর্গোদ্যানসমূহে যাদের নিচে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝরনারাজি, সেখানে তারা থাকবে স্থায়ীভাবে তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে। সেখানে তাদের অভিবাদন হবে "সালাম"!



Sahih International: And those who believed and did righteous deeds will be admitted to gardens beneath which rivers flow, abiding eternally therein by permission of their Lord; and their greeting therein will be, "Peace!"



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৩. আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা তাদের রবের অনুমতিক্রমে স্থায়ী হবে, সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’।(১)


তাফসীর:

(১) এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, জান্নাতবাসীদের পরস্পর সাদর সম্ভাষন হবে সালাম। [আদওয়াউল বায়ান] আবার কারও কারও মতে, এ সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে হবে। [বাগভী] অন্যত্র আছে যে, ফেরেশতাগণ জান্নাতবাসীদেরকে এ শব্দে সাদর সম্ভাষণ জানাবে। যেমনঃ “যখন তারা জান্নাতের কাছে উপস্থিত হবে ও এর দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি ‘সালাম', তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্য।” [সূরা আয-যুমারঃ ৭৩] “স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতামাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তারাও, এবং ফিরিশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে, এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি; কত ভাল এ পরিণাম! [সূরা আর-রাদঃ ২৩–২৪] “তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল, তাদেরকে সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে অভিবাদন ও সালাম সহকারে। [সূরা আল-ফুরকানঃ ৭৫] “সেখানে তাদের ধ্বনি হবেঃ হে আল্লাহ্! আপনি মহান, পবিত্র এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবে, সালাম’ এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবেঃ সকল প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহর প্রাপ্য।” [সূরা ইউনুসঃ ১০]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৩) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত; সেখানে তারা তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে;[1] সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’। [2]


তাফসীর:

[1] এটা দুর্ভাগ্যবান ও কাফেরদের মুকাবেলায় সৌভাগ্যবান ও ঈমানদারদের বর্ণনা। এদের উল্লেখ তাদের সাথে এই জন্য করা হয়েছে যে, যাতে মানুষের মধ্যে ঈমানদারদের মত চরিত্র গ্রহণ করার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়।

[2] অর্থাৎ, তাদের পরস্পরের উপহার হবে একে অপরকে সালাম করা। এ ছাড়া ফিরিশতাবর্গও প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তাদেরকে সালাম পেশ করবেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২১-২৩ নং আয়াতের তাফসীর:



برز অর্থ বের হওয়া, অর্থাৎ সকলেই কবর থেকে বের হয়ে হাশরের মাঠে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে উপস্থিত হবে। তখন অধীনস্থ দুর্বল লোকেরা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে বলবে, আমরা তো দুনিয়াতে তোমাদের কথা-বার্তা মেনে চলতাম। আজ তোমরা কি আমাদের থেকে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি সামান্যতম রহিত করতে পারবে? তাদের এ কথার উত্তরে সর্দারগণ বলবে: আমরা সৎ পথে পরিচালিত হলে তোমাদেরকেও সৎ পথে পরিচালিত করতাম। আমরা ভ্রান্ত ছিলাম যার ফলে তোমাদেরকেও ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছি, একথা বলে তারা তথায় বাগ-বিতণ্ডা করবে। কিন্তু কেউ কারো কোন উপকার করতে পারবে না। সুতরাং এসব পথভ্রষ্ট, দুনিয়া লিপ্সু পাপী যারা ধর্মের কোন পরওয়া করে না তাদের অনুসরণ করলে আখিরাতে জাহান্নাম ছাড়া কোন উপায় নেই।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَإِذْ يَتَحَآجُّوْنَ فِي النَّارِ فَيَقُوْلُ الضُّعَفٰٓؤُا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنْتُمْ مُّغْنُوْنَ عَنَّا نَصِيْبًا مِّنَ النَّار ، قَالَ الَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا إِنَّا كُلٌّ فِيْهَآ إِنَّ اللهَ قَدْ حَكَمَ بَيْنَ الْعِبَادِ)‏



“যখন তারা জাহান্নামে পরস্পর ঝগড়ায় লিপ্ত হবে তখন দুর্বলেরা অহংকারীদেরকে বলবে: আমরা তো তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম, এখন কি তোমরা আমাদের হতে জাহান্নামের আগুনের কোন অংশ নিবারণ করতে পারবে? দাম্ভিকেরা বলবে: আমরা সবাই তো জাহান্নামে আছি; নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের ফয়সালা করে ফেলেছেন।” (সূরা মু’মিন ৪০:৪৭-৪৮)



আবদুর রহমান বিন যায়েদ বলেন: জাহান্নামীরা একে অপরকে বলবে, জান্নাতীরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে কান্নাকাটি করে এবং অনুনয় বিনয় করে জান্নাত লাভ করেছে, সুতরাং এসো আমরাও তাঁর সামনে অনুনয়-বিনয় করে আকুল আবেদন জানাই। অতঃপর তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে এবং করজোড়ে নিবেদন করবে কিন্তু সবই নি®ফল হয়ে যাবে। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে জান্নাতবাসীরা ধৈর্যধারণ করেছিল তাই তারা জান্নাতে গিয়েছে, এসো আমরাও আজ নিরবত ধৈর্য ধারণ করি। এভাবে তারা এমন ধৈর্য ধারণ করবে যা ইতোপূর্বে কখনো করেনি। কিন্তু তাও বৃথা যাবে, তখন তারা বলবে হায় হায় ধৈর্য ধারণ করাও বিফলে গেল এবং অনুনয় বিনয় কোন কাজে আসল না।



ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: এসব কথা বার্তা জাহান্নামে যাওয়ার পর হবে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আল্লাহ বলবেন, ‘তোমাদের পূর্বে যে জ্বিন ও মানবদল গত হয়েছে তাদের সাথে তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ কর’। যখনই কোন দল তাতে প্রবেশ করবে তখনই অপর দলকে তারা অভিসম্পাত করবে, এমনকি যখন সকলে তাতে একত্রিত হবে তখন তাদের পরবর্তীগণ পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল; সুতরাং এদেরকে দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দাও। ‘আল্লাহ বলবেন, ‘প্রত্যেকের জন্যই দ্বিগুণ রয়েছে, কিন্তু তোমরা জান না।’ তাদের পূর্ববর্তীগণ পরবর্তীদেরকে বলবে, ‘আমাদের ওপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না, সুতরাং তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন কর।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৩৮-৩৯)



হাশরের ময়দানেও তারা বিবাদ করবে: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা অহঙ্কারকারীদেরকে বলবে: তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মু’মিন হতাম। অহঙ্কারীরা যাদেরকে দুর্বল মনে করত তাদেরকে বলবে: তোমাদের নিকট সৎ পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে তা হতে নিবৃত্ত করেছিলাম? বস্তুতঃ তোমরাই তো ছিলে অপরাধী। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা অহঙ্কারীদেরকে বলবে: প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দেবা-রাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করি, যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে। এবং আমি কাফিরদের গলায় বেড়ী পরিয়ে দেব। তাদেরকে তারা যা করত তারই প্রতিফল দেয়া হবে।” (সূরা সাবা ৩৪:৩১-৩৩)



সুতরাং কিয়ামতের দিন ঐ সমস্ত ক্ষমতাসীন নেতাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে মুক্তি লাভ করা যাবে না। তারাও অস্বীকার করবে, তাই তাদের অনুসরণ বাদ দিয়ে আল্লাহ ও রাসূলের অনুসরণ করা উচিত।



(وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ...)

আল্লাহ তা‘আলা যখন সমস্ত কিছুর মীমাংসা শেষ করবেন আর জান্নাতীরা জান্নাতে ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাবে তখন শয়তান জাহান্নামীদেরকে লক্ষ্য করে বলবে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তথা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলদের প্রতি ঈমান ও সৎ পথের অনুসরণের মধ্যেই মুক্তি নিহিত, তাই সত্য। আর আমি যে ওয়াদা দিয়েছিলাম তা প্রবঞ্চনা, প্রতারণা ছাড়া কিছুই ছিল না।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيْهِمْ ط وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطٰنُ إِلَّا غُرُوْرًا)‏



“(শয়তান) সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে; আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা ছলনামাত্র।” (সূরা নিসা ৪:১২০)



শয়তান আরো বলবে: তোমাদের ওপর আমার কোন আধিপত্য ছিল না, তোমরা অযথা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছো, আমি তোমাদেরকে বাধ্য করিনি, সুতরাং আজ তোমরা আমাকে তিরস্কার না করে নিজেদেরকেই তিরস্কার কর। আজ আমাকে দোষারোপ করে তোমাদের কোনই লাভ হবে না। তোমরা আমাকে জাহান্নাম থেকে যেমন মুক্তি দিতে পারবে না, আমিও তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারব না। ইতোপূর্বে তোমরা আল্লাহ তা‘আলার সাথে যাদেরকে শরীক করতে তাদের সাথে আজ আমি কুফরী করছি।



সুতরাং হে মুসলিম ভাই! যে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, অন্যায়-অবিচার ইত্যাদি আল্লাহ তা‘আলাদ্রোহী কাজ করেই যাচ্ছেন সে শয়তান কিন্তু কিয়ামতের দিন এ ভাষণ দিয়ে বিদায় নেবে। তখন আপনি আফসোস করবেন কিন্তু সে আফসোস কোন কাজে আসবে না। অতএব এখনই সতর্ক হওয়া উচিত, শয়তানের অনুসরণ বাদ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের অনুসরণ করুন।



কারণ যারা ঈমান ও সৎ আমল করবে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। তাদের আরাম-আয়েশ ও সুখ-শান্তির অভাব হবে না, তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে, সেখানে তাদের অভিবাদন হবে সালাম। অর্থাৎ একে অপরকে শান্তির অভিবাদন জানাবে, কোন অসার ও বেহায়াপনা এবং নোংরা কথা বলবে না। তাছাড়া ফেরেশতারাও তাদের কাছে প্রবেশ কালে সালাম দিবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ)‏



“জান্নাতের দারোয়ানরা তাদেরকে বলবে তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর।” (সূরা যুমার ৩৯:৭৩)



এ সম্পর্কে সূরা ইউনুসের ১০ নং আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. হাশরের মাঠে সকলকে একত্রিত করা হবে।

২. হাশরের মাঠে কেউ কারো কোন উপকার করতে পারবে না।

৩. শয়তান মানুষকে যেসব মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিত তা সে স্বীকার করবে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়ে যাবার পর।

৪. শয়তানের অনুসরণ করে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে পরে আফসোস করে লাভ নেই, কারণ সেদিন শয়তানও কোন উপকার করতে পারবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, যখন তিনি বান্দাদের ফায়সালার কাজ শেষ করবেন এবং মুমিনরা জান্নাতে ও কাফিররা জাহান্নামে চলে যাবে, ঐ সময় অভিশপ্ত ইবলীস জাহান্নামের উপর দাঁড়িয়ে জাহান্নামীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ “আল্লাহ তাআলা তোমাদের সাথে যে ওয়াদা অঙ্গীকার করেছিলেন তা ছিল সম্পূর্ণরূপে সত্য। রাসূলদের অনুসরণ ও আনুগত্যই ছিল মুক্তি ও শান্তির পথ। আর আমার ওয়াদা তো ছিল প্রতারণা মাত্র। আমার কথা ছিল দলীল-প্রমাণহীন। তোমাদের উপর আমার কোন জোর যবরদস্তি ও আধিপত্য তো ছিল না। তোমরা অযথা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। আমি তোমাদেরকে যে হুকুম করেছিলাম তা তোমরা মেনে নিয়েছিলে। রাসূলদের সত্য প্রতিশ্রুতি, তাদের দলীল ও যুক্তিপূর্ণ কথা তোমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলে। তাঁদের তোমরা বিরোধিতা করেছিলে, আমার কথামত চলেছিলে। এর পরিণাম তোমরা আজ স্বচক্ষে দেখতে পেলে। এটা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। সুতরাং আজ তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, বরং নিজেদেরকেই দোষারোপ করো। পাপ তোমরা নিজেরাই করেছিল। দলীল-প্রমাণগুলি তোমরা ত্যাগ। করেছিলে। আমার কথাই তোমরা মেনে চলেছিলে। আজকে আমি তোমাদের কোনই কাজে আসবো না। না আজ আমি তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা করতে পারবো, না তোমাদের কোন উপকার করতে পারবো। আমি তোমাদের শিরকের কারণে তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমি আজ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি যে, আমি আল্লাহর শরীক নই। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে আছে, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে আহবান করে, যারা কিয়ামতের দিন তাদের আহবানে সাড়া দিতে পারবে না? বরং তারা তাদের আহবান হতে উদাসীন ও অমনোযোগী থাকবে। কিয়ামতের দিন তারা তাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে।” (৪৬:৫) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে এবং তাদের শত্রু হয়ে যাবে, তারা অত্যাচারী লোক কেন না তারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, বাতিলের অনুসারী হয়েছে এইরূপ অত্যাচারীদের জন্যে বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” (১৯:৮২)।

অতএব, এটা প্রকাশ্য কথা যে, জাহান্নামীদের সাথে ইবলীসের এই কথাবার্তা হবে জাহান্নামে প্রবেশের পর, যাতে তাদের আফসোস ও দুঃখ খুব বেশী হয়। কিন্তু হযরত উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদেরকে আল্লাহ তাআলা একত্রিত করবেন এবং তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দিবেন তখন একটা সাধারণ ভয় ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি হবে।” মু'মিনগণ বলবেঃ “আমাদের ফায়সালা হতে যাচ্ছে, এখন আমাদের সুপারিশের জন্যে দাঁড়াবে কে?” অতঃপর তারা হযরত আদম (আঃ), হযরত নূহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসার (আঃ) কাছে যাবে। হযরত ঈসা (আঃ) বলবেনঃ “তোমরা নবী উম্মীর (সঃ) কাছে গমন কর।” তখন আল্লাহ তাআলা আমাকে। দাঁড়িয়ে যাওয়ার অনুমতি দিবেন। তৎক্ষণাৎ আমার মজলিস হতে পবিত্র এবং উত্তম সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়বে, যার মত উত্তম সুগন্ধি ইতিপূর্বে কেউ কখনো শুকেনি। সুতরাং আমি তখন বিশ্ব প্রতিপালকের কাছে আগমন করবো, আমার মাথার চুল থেকে নিয়ে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলী পর্যন্ত সারাদেহ আলোকোজ্জ্বল হয়ে যাবে। অতঃপর আমি সুপারিশ করবো এবং মহা কল্যাণময় আল্লাহ আমার সুপারিশ কবুল করবেন। এটা দেখে কাফিররা পরস্পর বলাবলি করবেঃ “চলো, আমরাও কাউকে আমাদের সুপারিশকারী বানিয়ে নিয়ে তাকে আমাদের জন্যে সুপারিশ করতে বলি। আর এ কাজের জন্যে আমাদের কাছে ইবলীস ছাড়া আর কে আছে? সে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল। সুতরাং চল, আমরা তার কাছেই যাই এবং আর করি।” অতঃপর তারা ইবলীসের কাছে। গিয়ে বলবেঃ “মুমিনরা সুপারিশকারী পেয়ে গেছে, তুমি আমাদের জন্যে সুপারিশকারী হয়ে যাও। কারণ, তুমিই তো আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলে।” একথা শুনে ঐ অভিশপ্ত শয়তান দাঁড়িয়ে যাবে। তার মজলিস হতে এমন দুর্গন্ধ বের হবে যে, ইতিপূর্বে কারো নাকে এমন জঘন্য দুর্গন্ধ কখনো পৌঁছে নাই।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তারপর সে যা বলবে তাতো উপরে বর্ণিত হলো।

মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন, জাহান্নামীরা যখন বলবেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এখন আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটুক বা আমরা ধৈর্যশীল হয়ে যাই একই কথা; আমাদের কোন নিষ্কৃতি নেই।” (১৪:২১) ঐ সময় ইবলীস তাদেরকে উপরোক্ত কথা বলবে। যখন তারা ইবলীসদের উপরোক্ত বক্তব্য শুনবে তখন তারা নিজেদের জীবনের উপরও ক্রোধান্বিত হয়ে যাবে। তখন তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদের জীবনের উপর যেমন রাগান্বিত হয়েছে, এর চেয়ে অনেক বেশী রাগান্বিত হয়েছিলেন আল্লাহ তাআলা ঐ সময়, যে সময় তোমাদেরকে ঈমানের দিকে ডাক দেয়া হয়েছিল, আর তোমরা সেই ডাকে সাড়া না দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে” ।

হযরত আমির শাবী (রঃ) বলেন, (কিয়ামতের দিন) সমস্ত মানুষের সামনে দু’জন বক্তা বক্তৃতা দেয়ার জন্যে দাঁড়াবে। হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামকে (আঃ) বলবেনঃ তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলেঃ “তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে মা’রূদ রূপে গ্রহণ করো? এই আয়াত থেকে নিয়ে (আরবি) (আল্লাহ বলবেনঃ “এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণ তাদের সত্যতার জন্যে উপকৃত হবে)। (৫:১১৯) এই আয়াত পর্যন্ত এই বর্ণনাই রয়েছে। আর অভিশপ্ত ইবলীস দাঁড়িয়ে বলবেঃ “আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহবান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহবানে সাড়া দিয়েছিলে (শেষ পর্যন্ত)।”

দুষ্ট ও পাপী লোকদের পরিণাম ও তাদের দুঃখ-বেদনা এবং ইবলীসের উত্তরের বর্ণনা দেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ ও পূণ্যবান লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন। মমিন ও সৎকর্মশীল লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। তথায় তারা যথেচ্ছা গমনাগমন করবে, চলবে, ফিরবে এবং পানাহার করবে। চিরদিনের জন্যে তারা সেখানে অবস্থান করবে। সেখানে না তারা। চিন্তিত ও দুঃখিত হবে, না তাদের মন খারাপ হবে, না অস্বস্তি বোধ করবে, না মারা যাবে, না বহিষ্কৃত হবে, না নিয়ামত কমে যাবে। সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’ আর ‘সালাম’। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হবে ও ওর দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবেঃ তোমাদের প্রতি সালাম।” (৩৯:৭৩) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) “প্রত্যেক দরজা দিয়ে ফেরেস্তারা তাদের কাছে প্রবেশ করবে এবং বলবেঃ “তোমাদের প্রতি সালাম।” আর এক আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তাদেরকে সেথায় অভ্যর্থনা করা হবে অভিবাদন ও সালাম সহকারে।” (২৬:২২)

আল্লাহ তাআলা আর এক স্থানে বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেথায় তাদের ধ্বনি হবেঃ হে আল্লাহ! তুমি মহান! তুমি পবিত্র! এবং সেথায় তাদের অভিবাদন হবে, ‘সালাম এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবেঃ প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য।” (১০:১০)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।