সূরা আর-রাদ (আয়াত: 26)
হরকত ছাড়া:
الله يبسط الرزق لمن يشاء ويقدر وفرحوا بالحياة الدنيا وما الحياة الدنيا في الآخرة إلا متاع ﴿٢٦﴾
হরকত সহ:
اَللّٰهُ یَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ یَقْدِرُ ؕ وَ فَرِحُوْا بِالْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا ؕ وَ مَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَا فِی الْاٰخِرَۃِ اِلَّا مَتَاعٌ ﴿۲۶﴾
উচ্চারণ: আল্লা-হু ইয়াবছুতু র রিযকালিমাইঁ ইয়াশাউ ওয়া ইয়াকদিরু ওয়া ফারিহূবিলহায়াতিদদুনইয়া-ওয়ামাল হায়া-তুদদুনইয়া- ফিল আ-খিরাতি ইল্লা-মাতা-‘উ।
আল বায়ান: আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন রিযক বাড়িয়ে দেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে উৎফুল্লতায় আছে, অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন খুবই নগণ্য।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৬. আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে তার জীবনোপকরণ বৃদ্ধি করেন এবং সংকুচিত করেন; কিন্তু এরা দুনিয়ার জীবন নিয়েই আনন্দিত, অথচ দুনিয়ার জীবন তো আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ রিযক সম্প্রসারিত করেন যার জন্য ইচ্ছে করেন, আর যার জন্য চান সীমিত পরিমাণে দেন। তারা পার্থিব জীবনে আনন্দে মেতে আছে অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন অতি নগণ্য বস্তু।
আহসানুল বায়ান: (২৬) আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং সংকুচিত করেন।[1] কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত; [2] অথচ ইহজীবন তো পরজীবনের তুলনায় নগণ্য ভোগ মাত্র। [3]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন কিংবা সংকুচিত করেন; কিন্তু তারা পাথির্ব জীবন নিয়েই উল্লসিত, অথচ ইহজীবনতো পরজীবনের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগ মাত্র।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ যার জন্য চান জীবিকা বাড়িয়ে দেন এবং (যার জন্য চান তা) সংকুচিত করেন। তারা পার্থিব জীবন নিয়ে আনন্দ করে, অথচ এই পার্থিব জীবন পরকালের তুলনায় ক্ষণিকের ভোগমাত্র।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা রুযী প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। তারা পার্থিব জীবনের প্রতি মুগ্ধ। পার্থিবজীবন পরকালের সামনে অতি সামান্য সম্পদ বৈ নয়।
জহুরুল হক: আল্লাহ্ জীবিকা বাড়িয়ে দেন যাকে তিনি ইচ্ছে করেন, আর তিনি মাপজোখ করেন। আর তারা পার্থিব জীবনে উল্লসিত। অথচ ইহকালের জীবনটা তো পরকালের তুলনায় যৎসামান্য সুখ-ভোগ বৈ নয়।
Sahih International: Allah extends provision for whom He wills and restricts [it]. And they rejoice in the worldly life, while the worldly life is not, compared to the Hereafter, except [brief] enjoyment.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৬. আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে তার জীবনোপকরণ বৃদ্ধি করেন এবং সংকুচিত করেন; কিন্তু এরা দুনিয়ার জীবন নিয়েই আনন্দিত, অথচ দুনিয়ার জীবন তো আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতের পটভূমি হচ্ছে, সাধারণ মূর্খ ও অজ্ঞদের মতো মক্কার কাফেররাও বিশ্বাস ও কর্মের সৌন্দর্য বা কদৰ্যতা দেখার পরিবর্তে ধনাঢ্যতা বা দারিদ্র্যের দৃষ্টিতে মানুষের মূল্য ও মর্যাদা নিরূপণ করতো। তাদের ধারণা ছিল, যারা দুনিয়ায় প্রচুর পরিমাণ আরাম আয়েশের সামগ্ৰী লাভ করছে তারা যতই পথভ্রষ্ট ও অসৎকর্মশীল হোক না কেন তারা আল্লাহর প্রিয়। আর অভাবী ও দারিদ্র পীড়িতরা যতই সৎ হোক না কেন তারা আল্লাহর অভিশপ্ত। এ ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে বলা হচ্ছে, রিযিক কমবেশী হবার ব্যাপারটা আল্লাহর অন্য নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। সেখানে অন্যান্য অসংখ্য প্রয়োজন ও কল্যাণ-অকল্যাণের প্রেক্ষিতে কাউকে বেশী ও কাউকে কম দেয়া হয়।
এটা এমন কোন মানদণ্ড নয় যার ভিত্তিতে মানুষের নৈতিক ও মানসিক সৌন্দর্য ও কদর্যতার ফায়সালা করা যেতে পারে। মানুষের মধ্যে কে চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ অবলম্বন করেছে এবং কে ভুল পথ, কে উন্নত ও সৎগুণাবলী অর্জন করেছে এবং কে অসৎগুণাবলী -এরি ভিত্তিতে তাদের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের আসল মানদণ্ড নির্ধারণ হওয়া উচিত। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টি আল্লাহ্ তাআলা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্যস্বরূপ যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করি, তা দ্বারা তাদের জন্য সকল মংগল তুরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না।” [আল-মু'মিনূনঃ ৫৫–৫৬]
আয়াতের শেষে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার জীবনের যাবতীয় সামগ্ৰী যে আখেরাতের তুলনায় কিছুই নয় তা বর্ণনা করে বলেছেন যে, “দুনিয়ার জীবন তো আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র।” অন্যত্র এসেছে, “বলুন, পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্য আখেরাতই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” [সূরা আন-নিসাঃ ৭৭]
আরো এসেছে, “কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী।” [সূরা আল-আলাঃ ১৬–১৭] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আখেরাতের তুলনায় দুনিয়া হলো এমন যেন তোমাদের কেউ সমুদ্রে তার এই আঙ্গুল ঢুকিয়ে আনল”, তারপর তিনি নিজের তর্জনীর দিকে ইঙ্গিত করলেন। [মুসলিমঃ ২৮৫৮] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক মরা কান ছোট ছাগলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি তা দেখিয়ে সাহাবায়ে কিরামকে বললেন, আল্লাহর শপথ! এ ছাগলটি যেমন তার মালিকের নিকট মূল্যহীন তেমনি দুনিয়ার মূল্য আল্লাহর নিকট তার ছেয়েও সামান্য। [মুসলিমঃ ২৯৫৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৬) আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং সংকুচিত করেন।[1] কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত; [2] অথচ ইহজীবন তো পরজীবনের তুলনায় নগণ্য ভোগ মাত্র। [3]
তাফসীর:
[1] যখন কাফের এবং মুশরিকদের ব্যাপারে বললেন যে, তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট স্থান, তখন মস্তিষ্কে এই প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে যে, তারা তো পৃথিবীতে হরেক রকমের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করে থাকে। এ কথা খন্ডনের জন্য বললেন যে, পার্থিব উপায়-উপকরণ ও জীবিকার কম-বেশি হওয়ার এখতিয়ার আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি নিজ হিকমত ও ইচ্ছা অনুযায়ী (যা শুধু তিনিই জানেন) কাউকে বেশি এবং কাউকে কম দিয়ে থাকেন। জীবিকার আধিক্য এ কথার প্রমাণ নয় যে, মহান আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট এবং কমতির অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা তার উপর অসন্তুষ্ট।
[2] আল্লাহর অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ পার্থিব সম্পদ পায়, তাহলে তাতে আনন্দ-উল্লাসের কিছু নেই। কেননা তা আল্লাহর পক্ষ হতে অবকাশ মাত্র। কারো জানা নেই যে, অকস্মাৎ কখন এই অবকাশ সময়ের অবসান ঘটবে এবং তাঁর পাকড়াও এসে আক্রমণ করবে।
[3] হাদীসে এসেছে যে, পরকালের অপেক্ষা ইহকালের মূল্য ততটুক, যতটুক কোন ব্যক্তি তার আঙ্গুল সমুদ্রে ডুবায় অতঃপর তা বের করে দেখে যে সমুদ্রের পানির তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটুক পরিমাণ পানি এসেছে? (মুসলিমঃ কিতাবুল জান্নাহ) অন্য এক হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি মৃত ছাগলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তা দেখে বললেন, আল্লাহর শপথ! দুনিয়া আল্লাহর নিকট এটির চাইতেও বেশি তুচ্ছ, যতটা এই মৃত ছাগল তার মালিকদের নিকট সেই সময় তুচ্ছ ছিল, যে সময় তারা তাকে ফেলে দিয়েছিল। (মুসলিম, কিতাবুযযুহ্দি অররিক্বাক)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৫-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَالَّذِیْنَ یَنْقُضُوْنَ عَھْدَ اللہِ...)
পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে মু’মিনদের অন্যতম একটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা যাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন তারা তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। এখানে বিপরীত দোষের অধিকারী ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তাদেরকে যে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নিদের্শ দেয়া হয়েছে তা তারা বজায় রাখে না। এবং তারা জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়। অথচ তারা নিজেদের ব্যাপারে মনে করে যে, তারা ভাল কাজ করছে। মূলত তারা হল মুনাফিক, আর এদের সম্পর্কে সূরা বাক্বারার প্রথম দিকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এরা অভিশপ্ত সম্প্রদায়, আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে নিকৃষ্ট আবাসস্থল। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। সেখান থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে না।
(اَللہُ یَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ یَّشَا۬ئُ وَیَقْدِرُ....)
অত্র আয়াতে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা রিযিক বৃদ্ধি করে দেন আবার যাকে ইচ্ছা সঙ্কীর্ণ করে দেন। পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে; যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে না তথা তাঁর প্রতি ঈমান ও সৎআমলের অঙ্গীকার পূরণ না করে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম স্থান জাহান্নাম। প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়াতে তো কাফের মুশরিকরাই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রয়েছে, তাদের পার্থিব রিযিকের অভাব নেই। তাহলে কি তারাই আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র? প্রকৃত ব্যাপার তা নয়, এরূপ চিন্তা-চেতনাকে খণ্ডনের জন্য আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, পার্থিব উপায় উপকরণ একমাত্র আমার হাতে। আমি যাকে ইচ্ছা যত পরিমাণ রিযিক দিয়ে থাকি। দুনিয়াতে কাউকে সম্পদের প্রাচুর্য দান করা বা ক্ষমতা ও সুখ-শান্তি দান করা এটা প্রমাণ করে না আমি তাদেরকে ভালবাসি। বরং তাদেরকে দুনিয়ার সুখ-সাচ্ছন্দ্য দান করার পিছনে হিকমত রয়েছে। তা হল (১) দুনিয়ার এসব সুখ-সাচ্ছন্দ ক্ষণস্থায়ী, তাই তাদের জন্য দুনিয়ার আরাম-আয়েশ দিয়েই শেষ, আখিরাতে তাদের জন্য জাহান্নাম ছাড়া কিছুই থাকবে না।
(২) দুনিয়ার এসব সুখ-সাচ্ছন্দ্য দ্বারা তাদেরকে অপরাধের অবকাশ দেয়া হয়, আখিরাতে তাদেরকে জাহান্নামে অপমানের সাথে প্রবেশ করানো হবে।
(৩) দুনিয়াটা মু’মিনদের জন্য পরীক্ষাগার, এখানে তারা আরাম আয়েশ ও সুখ-সাচ্ছন্দে বাস করবে, এটা আগমনের উদ্দেশ্য নয়। বরং তারা সকল আরাম আয়েশ ও সুখ-সাচ্ছন্দ্য বর্জন করে এমনকি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি হাসিল করতঃ জান্নাতে স্থান করে নিবে।
(৪) আল্লাহ তা‘আলা সকলকে যদি সমান পরিমাণ রিযিক দিতেন তাহলে জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি হত। কেউ কাউকে পরোয়া করতো না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَوْ بَسَطَ اللّٰهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِه۪ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلٰكِنْ يُّنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَا۬ءُ ط إِنَّه۫ بِعِبَادِه۪ خَبِيْرٌۭبَصِيْرٌ)
“আল্লাহ তাঁর (সকল) বান্দাদের রুযী বাড়িয়ে দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামত পরিমাণেই দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক জানেন ও দেখেন।” (সূরা শুরা ৪২:২৭)
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য যতটুকু পরিমাণ রিযিক উপযুক্ত মনে করেন তাকে ততটুকুই রিযিক দিয়ে থাকেন।
কিন্তু যারা কাফের তারা পার্থিব জীবন ও সুখ-সাচ্ছন্দ্য নিয়েই সন্তুষ্ট। তারা আখিরাতের কথা চিন্তাই করে না। অথচ এ দুনিয়া অতি নগণ্য, যা আখিরাতের তুলনায় কিছুই না।
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيْلٌ ج وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌ لِّمَنِ اتَّقٰي قف وَلَا تُظْلَمُوْنَ فَتِيْلًا)
“বল: ‘পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্য আখিরাতই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।’’ (সূরা নিসা ৪:৭৭) এমনকি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা ছোট কানবিশিষ্ট একটি মৃত ছাগলের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। যখন তারা এ ছাগলটিকে ফেলে দিল তখন তিনি বললেন: আল্লাহ তা‘আলার কসম এই বকরীর বাচ্চার মালিকের কাছে তার যতটুকু মূল্য রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দুনিয়ার মূল্য তার চেয়েও নগণ্য। (সহীহ মুসলিম হা: ২২৭৪)
অনুরূপ অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, “আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া এরূপ সমুদ্রের পানির তুলনায় আঙ্গুলের পানি যেরূপ।” (সহীহ মুসলিম হা: ২১৯৩)
অতএব, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। সুতরাং আখিরাত ছেড়ে দিয়ে দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হওয়াটা বোকামী ব্যতীত আর কিছুই নয়। এই সমস্ত আয়াত ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণীত হয় যে, যারা দুনিয়া ছেড়ে দিয়ে বৈরাগী হয়ে যায় তারা ভ্রান্ত। কারণ ইসলামে তা কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে বলেন: ইসলামের মধ্যে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। (আবূ দাঊদ) অর্থাৎ যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করবে তাদেরকে এই বৈরাগ্যবাদ পরিত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তারা মুসলিম বা ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে। তারা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উম্মত হিসেবে আখিরাতে নাজাত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা মু’মিনের কাজ নয়।
২. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, ক্ষুণত্ন করা যাবে না।
৩. দুনিয়া ছেড়ে আখিরাত এবং আখিরাত ছেড়ে দুনিয়া নিয়ে পড়ে থাকা যাবে না। বরং উভয়টাই চাইতে হবে, তবে সর্বক্ষেত্রে আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।
৪. ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। বৈরাগ্যবাদ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতের খেলাফ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআ’লা বর্ণনা করেছেন যে, যার জীবিকায় তিনি প্রশস্ত করার ইচ্ছা করেন তা তিনি করতে পারেন। আবার যার জীবিকা সংকীর্ণ করার ইচ্ছা করেন সেটাতেও তিনি সক্ষম। এই সব কিছু হিকমত ও ইনসাফের সাথেই হচ্ছে। কাফিররা দুনিয়াকেই আশ্রয় স্থল মনে করে নিয়েছে। তাই তারা আখেরাত থেকে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন। তারা মনে করে নিয়েছে যে, এখানকার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যই আসল ও ভাল। অথচ প্রকৃত পক্ষে এখানে তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছে মাত্র এবং ধীরে ধীরে তাদেরকে পাকড়াও করারই সূচনা হচ্ছে। কিন্তু তাদের কোন অনুভূতিই নেই। মু'মিনরা যে আখেরাত লাভ করবে তার তুলনায় এই দুনিয়া উল্লেখ যোগ্যই নয়। এটা খুবই অস্থায়ী ও নগণ্য জিনিষ। পক্ষান্তরে আখেরাত চিরস্থায়ী ও উত্তম জিনিষ। কিন্তু সাধারণতঃ মানুষ আখেরাতের উপর দুনিয়াকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
বানু ফাহর গোত্রের লোক মুসতাওরিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আখেরাতের তুলনায় দুনিয়াটা ঠিক এই রূপ যেমন তোমাদের কেউ এই অঙ্গুলীটি সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে দেয়, অতঃপর ঐ অঙ্গুলীতে কতটুকু পানি উঠেছে তা তো সে দেখতেই পায়।” ঐ সময় তিনি তাঁর শাহাদত অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করেছিলেন। (অর্থাৎ তার অঙ্গুলীর পানিটুকু সমুদ্রের পানির তুলনায় যেমন, দুনিয়াও আখেরাতের তুলনায় তেমন)। (ইমাম মুসলিম (রঃ এ হাদীসটি স্বীয় ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একদা পথে একটি ছোট কান বিশিষ্ট মৃত ছাগলের বাচ্চাকে পড়ে থাকতে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মন্তব্য করেনঃ “এই বকরীর বাচ্চাটি যাদের ছিল তাদের কাছে এর মূল্য যেমন, আল্লাহ তাআ’লার কাছে এই দুনিয়াটার মূল্য এর চেয়েও বেশি নগণ্য।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।