সূরা আর-রাদ (আয়াত: 27)
হরকত ছাড়া:
ويقول الذين كفروا لولا أنزل عليه آية من ربه قل إن الله يضل من يشاء ويهدي إليه من أناب ﴿٢٧﴾
হরকত সহ:
وَ یَقُوْلُ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَوْ لَاۤ اُنْزِلَ عَلَیْهِ اٰیَۃٌ مِّنْ رَّبِّهٖ ؕ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ یُضِلُّ مَنْ یَّشَآءُ وَ یَهْدِیْۤ اِلَیْهِ مَنْ اَنَابَ ﴿ۖۚ۲۷﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয়াকূলুল্লাযীনা কাফারূলাওলাউনযিলা ‘আলাইহি আ-য়াতুম মির রাব্বিহী কুল ইন্নাল্লা-হা ইউদিল্লুমাইঁ ইয়াশাউ ওয়া ইয়াহদীইলাইহি মান আনা-ব।
আল বায়ান: আর যারা কুফরী করেছে, তারা বলে, ‘তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন কেন নাযিল হয় না’? বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি তাঁর দিকে পথ দেখান’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৭. আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, তার রবের কাছ থেকে তার কাছে কোন নিদর্শন নাযিল হয় না কেন?(১) বলুন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যারা তার অভিমুখী তিনি তাদেরকে তার পথ দেখান।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা বলে, ‘তার কাছে তার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন?’ বল, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছে গুমরাহ করেন, আর যে তাঁর অভিমুখী তাকে সত্য পথে পরিচালিত করেন।’
আহসানুল বায়ান: (২৭) যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ তুমি বল, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তিনি তাদেরকেই তাঁর পথ দেখান যারা তাঁর অভিমুখী;
মুজিবুর রহমান: যারা কুফরী করেছে তারা বলেঃ তার রবের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হয়না কেন? তুমি বলঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তিনি তাদেরকে তাঁর পথ দেখান যারা তাঁর অভিমুখী।
ফযলুর রহমান: কাফেররা বলে, “তার কাছে তার প্রভুর পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন আসেনি কেন?” বল, “আল্লাহ যাকে চান বিভ্রান্তিতে রাখেন এবং যে ফিরে আসে (তওবা করে) তিনি তাকে তাঁর দিকে পথ দেখান।”
মুহিউদ্দিন খান: কাফেররা বলেঃ তাঁর প্রতি তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন কেন অবতীর্ণ হলো না? বলে দিন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে, মনোনিবেশ করে, তাকে নিজের দিকে পথপ্রদর্শন করেন।
জহুরুল হক: আর যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা বলে -- "কেন তাঁর কাছে তাঁর প্রভুর কাছ থেকে একটি নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না?" বলো -- "নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ ভ্রান্তপথে যেতে দেন যাকে তিনি ইচ্ছে করেন, আর তাঁর দিকে পরিচালিত করেন যে ফেরে;
Sahih International: And those who disbelieved say, "Why has a sign not been sent down to him from his Lord?" Say, [O Muhammad], "Indeed, Allah leaves astray whom He wills and guides to Himself whoever turns back [to Him] -
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৭. আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, তার রবের কাছ থেকে তার কাছে কোন নিদর্শন নাযিল হয় না কেন?(১) বলুন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যারা তার অভিমুখী তিনি তাদেরকে তার পথ দেখান।(২)
তাফসীর:
(১) আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে তারা যে ধরণের নিদর্শন চাচ্ছে সেটা দিতে পারেন। [ইবন কাসীর] এমনকি হাদীসে এসেছে, যখন মক্কার কাফের কুরাইশরা চাইলো যে, আমাদের জন্য সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে পরিণত করে দিন। আমাদের জন্য ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করে দিন। মক্কার পাশ থেকে পাহাড়গুলো সরিয়ে নিয়ে যান। যাতে সেখানে বাগান ও নদী-নালা পূর্ণ হয়ে যায়। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলের কাছে ওহী পাঠালেন যে, হে মুহাম্মাদ! আপনি চাইলে আমি তাদেরকে তা প্রদান করব।
কিন্তু তারপর যদি তারা কুফরি করে তবে তাদেরকে এমন শাস্তি দেব যা আমি সৃষ্টিকুলের কাউকে কোনদিন দেইনি। আর যদি আপনি চান যে, আমি রহমত ও তাওবার দরজা খুলে দেই তবে তা-ই করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বরং তাদের জন্য রহমত ও তাওবার দরজা খোলা হোক। [মুসনাদে আহমাদ ১/২৪২] [ইবন কাসীর] সুতরাং নিদর্শন পাওয়াই বড় কথা নয়, হিদায়াত নসীব হওয়াই বড় কথা। তাই তো আল্লাহ তাদের জন্য নিদর্শন না দিয়ে রহমত ও তাওবার রাস্তা খোলা রেখেছেন। পরবর্তীতে মক্কাবাসীদের অনেকেই সে রহমতে ধন্য হয়।
(২) অর্থাৎ যে নিজেই আল্লাহর দিকে রুজু হয় না বরং তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, হিদায়াত গ্রহণ করতে চায় না, তাকে জোর করে সত্য-সঠিক পথ দেখানো আল্লাহর রীতি নয়। যারা আল্লাহর পথের সন্ধান করে ফিরছে তারা নিদর্শন দেখতে পাচ্ছে এবং নিদর্শনসমূহ দেখেই তারা সত্য পথের সন্ধান লাভ করছে। তোমাদের কাছে যদি যাবতীয় নিদর্শনও আনা হয় তবুও তোমরা ঈমান আনবে না। [দেখুন, মুয়াসসার; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “নিদর্শনাবলী ও ভীতি প্রদর্শন অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের উপকারে আসে না। [সূরা ইউনুসঃ ১০১]
অন্য আয়াতে এসেছে, “নিশ্চয়ই যাদের বিরুদ্ধে আপনার রবের বাক্য সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না, যদিও তাদের কাছে সবগুলো নিদর্শন আসে, এমনকি তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখতে পাবে।” [সূরা ইউনুসঃ ৯৬–৯৭] আল্লাহ আরো বলেনঃ “আমি তাদের কাছে ফিরিশতা পাঠালেও এবং মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাযির করলেও আল্লাহর ইচ্ছে না হলে তারা কখনো ঈমান আনবে না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। [সূরা আল-আনআমঃ ১১১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৭) যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ তুমি বল, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তিনি তাদেরকেই তাঁর পথ দেখান যারা তাঁর অভিমুখী;
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৭-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা কাফের-মুশরিকদের উক্তি সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা বলে পূর্ববর্তী নবীদের মত এই নবীর উপর কোন নিদর্শন বা মু‘জিযাহ অবতীর্ণ করা হয় না কেন? কোন মুজিযাহ নিয়ে আসলে আমরা ঈমান আনতাম, কিন্তু এটা তাদের মুখের বুলি। যত মু‘জিযাই প্রকাশ করা হোক না কেন তারা ঈমান আনবে না। মক্কার কাফের-মুশরিকরা যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল: যদি সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করতে পারেন, পাহাড়ি জমিকে চাষাবাদ ভূমিতে পরিণত করতে পারেন, তবে আমরা ঈমান আনব। তখন আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানিয়ে দিলেন আমি তাদেরকে এসব প্রদান করব, কিন্তু এর পরেও যদি তারা ঈমান না আনে তাহলে তাদের এমন শাস্তি দিব যা পৃথিবীর কাউকে দেইনি। তুমি যদি চাও তাহলে তাই করব নচেৎ তাদের জন্য রহমত ও তাওবার দরজা খোলা রাখব। (মুসনাদে আহমাদ হা: ২১৬৬, সনদ সহীহ) আর এ সম্পর্কে সূরা ইউনুসের ২০ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
(قُلْ إِنَّ اللّٰهَ يُضِلُّ... )
অর্থাৎ হিদায়াত করার প্রকৃত মালিক আল্লাহ তা‘আলা। হিদায়াত কোন নাবী-রাসূলদের হাতেও নয় এবং কোন ওলী-আউলিয়াদের হাতেও নয়। এরা কেবল হিদায়াতের পথ দেখাতে পারেন। কারো হিদায়াত পাওয়া ও না পাওয়া মু‘জিযাহ দেখার উপর নির্ভরশীল নয়। মুজিযাহ দেখালে ঈমান আনব, আর মুজিযাহ না দেখালে ঈমান আনব না বিষয়টি এমন নয়। বরং যারা ঈমান আনবে না তাদেরকে যতই মু‘জিযাহ দেখানো হোক না কেন তাতে কোন ফায়দা হবে না। কারণ তারা আল্লাহ তা‘আলা অভিমুখী হতে চায় না, সত্য গ্রহণের আগ্রহ নেই। আর যারা মূলত ঈমান আনার তাদেরকে মু‘জিযাহ দেখানোর প্রয়োজন হয় না। তারা শুনামাত্রই বিশ্বাস করে। তারা আল্লাহ তা‘আলার দিকে অভিমুখী হতে চায়। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের নিদর্শন উল্লেখ করে বলেন: আল্লাহ তা‘আলার যিকির করার মাধ্যমে মু’মিনদের অন্তর প্রশান্ত হয়। অর্থাৎ অন্তরের অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা দূর হয়ে তৃপ্তি, শান্তি ও স্থিরতা ফিরে আসে।
যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হল সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, তাসবীহ, তাহলীল, কুরআন তেলাওয়াত ও সকল সুন্নাতী দু‘আ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন বিপদে পড়লে বা মনে অস্থিরতা অনুভব করলে সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। যিকির বলতে হালকায়ে যিকির বা সকলে উচ্চ আওয়াজে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, তারপর ইল্লালাহ, তারপর আল্লাহ তা‘আলা, অতঃপর হু ইত্যাদি নয়। এগুলো সুন্নাতী যিকির নয়, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদের থেকে এরূপ পদ্ধতিতে যিকির করার প্রমাণ নেই। বরং উঁচু আওয়াজের সাথে যিকির করা নিষেধ রয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৯২, সহীহ মুসলিম হা: ২৭০৪) এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’কে খণ্ড করতে করতে শেষে হু বলা সম্পূর্ণ শরীয়ত গর্হিত কাজ। কুরআন ও সহীহ সুন্নাতে কোথাও এভাবে যিকিরের কথা উল্লেখ নেই, বরং কালেমা তাইয়্যেবাকে সম্পূর্ণ পড়তে বলা হয়েছে। হাদীসে এসেছে সর্বোত্তম যিকির হল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৮৩) বলা হয়নি প্রথমে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তারপর ইল্লাল্লাহ তারপর আল্লাহ তা‘আলা তারপর হু ইত্যাদি। সুতরাং যে কোন ইবাদত করতে হবে শরীয়তের নির্দেশিত পন্থায়, নিজের কাছে যা ভাল মনে হবে বা অন্য কারো তৈরি করা পদ্ধতি অনুসরণ করে নয়।
তারপর বলা হয়েছে যারা ঈমান আনবে এবং সৎ আমল করবে তাদের জন্য রয়েছে তুবা ও শুভ পরিণাম।
طُوْبٰي এর একাধিক অর্থ রয়েছে; কল্যাণ, পুণ্য, কারামত, ঈর্ষা, জান্নাতের বিশেষ গাছ অথবা বিশেষ জায়গা। সবকটির অর্থ কাছাকাছি, অর্থাৎ জান্নাতের উত্তম স্থান ও তার সুখ শান্তি। ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. হিদায়াত দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।
২. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার যিকির করার মাধ্যমে অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।
৩. একমাত্র মু’মিনদের জন্যই শুভ পরিণাম, অন্যদের জন্য নয়।
৪. যিকিরসহ অন্য যে কোন ইবাদত শরীয়তসম্মত পন্থায় পালন করতে হবে অন্যথায় তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৭-২৯ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা মুশরিকদের উক্তি সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা বলেঃ পূর্ববর্তী নবীদের মত এই নবী (হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের কথা মত কোন মুজিযা উপস্থাপন করেন না কেন? এ সম্পর্কে পূর্ণ আলোচনা ইতিপূর্বে কয়েকবার হয়ে গেছে যে, আল্লাহর এ ক্ষমতা তো আছেই, কিন্তু এর পরেও যদি এরা ঈমান না আনে তবে তারা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
হাদীসে এসেছেঃ মক্কার লোকেরা যখন হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বললো যে, যদি তিনি সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করতে পারেন, মক্কা ভূমিতে নদী প্রবাহিত করতে পারেন এবং পাহাড়ী যমীনকে চাষযোগ্য জমিতে পরিবর্তিত করতে পারেন তবে তারা ঈমান আনবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীর (সঃ) কাছে ওয়াহী পাঠালেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি তাদেরকে এগুলো প্রদান করবো, কিন্তু এরপরেও যদি তারা ঈমান না আনে তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যা ইতিপূর্বে কারো উপর প্রদান করি নাই। যদি তুমি চাও তবে এটাই করি, নচেৎ তুমি তাদের জন্যে তাওবা ও রহমতের দরজা খোলা রাখতে পার।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় পন্থাটি পছন্দ করলেন।
এটা সত্য কথাই যে, পথ প্রদর্শন করা ও পথ ভ্রষ্ট করা আল্লাহ তাআ’লারই কাজ। ওটা কোন মু'জিযা দেখার উপর নির্ভরশীল নয়। বেঈমানদের জন্যে মু’জিযা দেখানো ও ভয় প্রদর্শন করা অর্থহীন। যার উপর শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, সে সমস্ত নিদর্শন দেখালেও ঈমান আনবেনা। তবে শাস্তি দেখে নেয়ার পর তো পুরোপুরি ঈমানদার হয়ে যাবে, কিন্তু তখনকার ঈমান আনয়ন নিষ্ফল হবে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি আমি তাদের উপর ফেরেশতা অবতীর্ণ করতাম এবং তাদের সাথে মৃতেরা কথা বলতে, আর তাদের কাছে আমি সমস্ত গুপ্ত জিনিস প্রকাশ করে দিতাম তবুও তারা ঈমান আনতো না, তবে আল্লাহ যাকে চান সেটা অন্য কথা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তাদেরকেই সুপথ প্রদর্শন করেন যারা তাঁর অভিমুখী। যাদের অন্তরে ঈমান জমজমাট হয়ে গেছে, যাদের অন্তর আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারা তাঁর যিকর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে থাকে, তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবিকই আল্লাহর যিকর মনের প্রশান্তির কারণই বটে। এটা ঈমানদার ও সৎ লোকদের জন্যে খুশী ও চক্ষু ঠাণ্ডা হওয়ার কারণ। তাদের পরিণাম ভাল। তারা মুবারকবাদ পাওয়ার যোগ্য।
সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হাবশী ভাষায় জান্নাতের ভূমিকে বলে। আর সাঈদ ইবনু মাসজু’ (রঃ) বলেন যে, হিন্দী ভাষায় (আরবি) হচ্ছে একটি জান্নাতের নাম। অনুরূপভাবে সুদ্দী (রঃ) ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হচ্ছে জান্নাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন জান্নাত সৃষ্টি করেন এবং তার থেকে ফারেগ হন তখন তিনি (আরবি) এই কথাটি বলেন।
শাহ্র ইবনু হাউশির (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের মধ্যে একটি গাছের নামও তূবা। সমস্ত জান্নাতে এর শাখা গুলি ছড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেক ঘরে এর শাখা বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা এটাকে নিজের হাতে রোপণ করেছেন। মুক্তার দানা দিয়ে তিনি ওটা জন্মিয়েছেন এবং আল্লাহর হুকুমেই ওটা বর্ধিত হয়েছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে। ওরই মূল হতে জান্নাতী মধু, সূরা, পানি এবং দুধের নহর প্রবাহিত হয়। (এটা ইবন্য জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীর বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফূ’ রূপে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি বৃক্ষ রয়েছে যা একশ’ বছরের পথের দুরত্ব ব্যাপী ছড়িয়ে আছে। এরই গুচ্ছ হতে জান্নাতীদের পোষাক বের হয়ে থাকে।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলেঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আপনাকে দেখেছে এবং আপনার উপর ঈমান এনেছে তাকে মুবারকবাদ।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, তাকে মুবারকবাদ তো বটেই, তবে দ্বিগুণ মুবারকবাদ ঐ ব্যক্তিকে যে আমাকে দেখে নাই, অথচ আমার উপর ঈমান এনেছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)
একটি লোক জিজ্ঞেস করলো: “তূবা কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তূবা হচ্ছে একটি জান্নাতী গাছ যা একশ’ বছরের পথ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। জান্নাতীদের পোষাক ওরই শাখা থেকে বের হয়ে থাকে।”
হযরত সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যে, সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত ওর ছায়ায় চলতে থাকবে তবুও তা শেষ হবে না।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, চলার গতিও দ্রুত এবং সওয়ারীও দ্রুতগামী। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সহীহ বুখারীতে (আরবি) (এবং সম্প্রসারিত ছায়া) এই আয়াতের তাফসীরেও এটাই রয়েছে। অন্য হাদীসে আছে সত্তর বছর বা একশ’ বছর।
ঐ গাছটির নাম হচ্ছে ‘শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী গাছ)। সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওর একটি শাখার ছায়ায় একজন সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং শত শত আরোহী ওর একটি শাখার নীচে অবস্থান করতে পারে। তাতে সোনার ফড়িং রয়েছে। ওর ফলগুলি বড় বড় মটকা বা মৃৎ পাত্রের সমান।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আবু উমামা আল বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের যে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে তাকেই ‘তূবা’ বা বৃক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তার জন্যে ওর শাখাগুলি খুলে দেয়া হবে। সে তখন ওগুলির যেটা ইচ্ছা সেটাই গ্রহণ করবে। ইচ্ছা করলে সাদাটা নিবে, ইচ্ছা করলে নিবে লালটা, ইচ্ছা করলে হলদেটা নিবে এবং ইচ্ছা হলে কালোটা নিবে। ওগুলি হবে অত্যন্ত সুন্দর, নরম ও উত্তম।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা তৃবা গাছকে হুকুম করবেনঃ “আমার বান্দাদের জন্যে তুমি উত্তম জিনিসগুলি ফেলতে থাকো”। তখন তা হতে ঘোড়া ও উট বর্ষিত হতে শুরু করবে। ওগুলি সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত থাকবে, জ্বিন, লাগাম কষা থাকবে ইত্যাদি।
ইবনু জারীর (রঃ) এখানে অহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রঃ) প্রমুখাৎ একটি অতি বিস্ময়কর ও অদ্ভূদ ‘আসর' এনেছেন। অহাব ইবনু মুনাববাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি গাছ রয়েছে যার ছায়ায় আরোহী একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে, তবুও তা শেষ হবে না। তার সতেজতা ও শ্যামলতা উন্মুক্ত বাগানের ন্যায়। ওর পাতাগুলি অতি চমৎকার। ওর শাখা গুলি আম্বর, ওর কঙ্করগুলি ইয়াকূত, ওর মাটি কপূর, ওর কাদা মিশক। ওর মূল হতে মদ্যের, দুধের এবং মধুর নহর প্রবাহিত হচ্ছে। ওর নীচে জান্নাতীদের মজলিস অনুষ্ঠিত হবে। জান্নাতীরা ওর নীচে উপবিষ্ট থাকবে এমতাবস্থায় ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উষ্ট্রীর পাল নিয়ে আগমন করবেন। উষ্ট্ৰীসমূহের যিঞ্জীরগুলি সোনা দ্বারা নির্মিত হবে। ওগুলির চেহারা প্রদীপের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। ওদের ললাম রেশমের মত নরম হবে। ওদের উপর ইয়াকূতের মত গদি থাকবে যাতে সোনা জড়ানো থাকবে। ওর উপর রেশমের ঝুল থাকবে। ফেরেশতাগন ঐ উষ্ট্রীগুলি ঐ জান্নাতী লোকদের সামনে পেশ করবেন এবং বলবেনঃ “এই সওয়ারীগুলি আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহ আপনাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তারা তখন ঐ উষ্ট্ৰীগুলির উপর সওয়ার হয়ে যাবে। উষ্ট্রীগুলির চলন গতি হবে পক্ষীর ন্যায় দ্রুত। জান্নাতীরা একে অপরের সাথে মিলিতভাবে চলবে এবং পরস্পর কথা বলতে বলতে যাবে। এক উন্ত্রীর কানের সাথে অপর উন্ত্রীর কান মিলিত হবে না। উষ্ট্ৰীগুলি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে চলবে। পথে যে গাছ পড়বে তা আপনা আপনি সরে যাবে, যেন কেউ তার সাথী থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে। এই ভাবে তারা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তাআ’লা নিজের চেহারার উপর হতে পর্দা সরিয়ে ফেলবেন। তারা (জান্নাতীরা) তাদের প্রতিপালকের চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলবেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি শান্তি, আপনার থেকেই শান্তি এবং মহিমা ও মর্যাদা আপনারই প্রাপ্য। তাদের এই কথার উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আমি শান্তি, আমার থেকেই শান্তি এবং আমার করুণা ও প্রেম তোমাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে। আমার ঐ বান্দাদেরকে মুবারকবাদ, যারা আমাকে না দেখেই ভয় করেছে এবং আমার নির্দেশ মেনে চলেছে।” জান্নাতীরা তখন বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার যথাযোগ্য ইবাদত করতে পারিনি এবং পুরোপুরিভাবে আপনাকে মর্যাদা দিতে পারিনি। সুতরাং আমাদেরকে আপনার সামনে সিজদা করার অনুমতি দিন।” আল্লাহ তাআ’লা তাদের একথার জবাবে বলবেনঃ “এটা পরিশ্রমের জায়গা নয় এবং ইবাদতেরও জায়গা নয়। এটা তো শুধু সুখ শান্তি ও ভোগ বিলাসের জায়গা। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু মজা উপভোগ ও আমোদ প্রমোদের দিন এসেছে। যা ইচ্ছা চাও, পাবে। তোমাদের যে-ই যা চাইবে তাকে আমি তাই প্রদান করবো।” সুতরাং তারা চাইবে। যে সবচেয়ে কম চাইবে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি দুনিয়ায় যা সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে আপনার বান্দা হায় হায় করেছিল, আমি চাই যে, দুনিয়ার সৃষ্টির শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দুনিয়ায় আপনি যত কিছু সৃষ্টি করেছিলেন আমাকে তা সবই প্রদান করুন। আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ তুমি কিছুই চাও নাই। নিজের মর্যাদার তুলনায় তুমি খুবই কম চেয়েছ। আমার দানের কোন কমি আছে কি? আচ্ছা, তুমি যা চাইলে তাই দিচ্ছি।” তারপর তিনি ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “আমার বান্দাদের মনে যে জিনিষের কোন দিন কোন আকাখাও জাগেনি এবং তারা কখনো কল্পনাও করেনি, তাদেরকে তাই প্রদান কর।” তখন তাদেরকে তা দেয়া হবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ হয়ে যাবে। তারা সেখানে যা পাবে তা হচ্ছেঃ দ্রুতগামী ঘোড়া, প্রতি চার জনের জন্যে মণিমাণিক্যের আসন, প্রতি আসনের উপর সোনার একটা ডেরা এবং প্রতিটি ডেরায় জান্নাতী বিছানা। বিছানায় বড় বড় চক্ষু বিশিষ্টা দুটো করে হূর থাকবে। প্রত্যেক হুর জান্নাতী পোষাক পরিধান করে থাকবে। তাতে জান্নাতের সমস্ত রং থাকবে এবং সমস্ত সুগন্ধি থাকবে। ঐ ডেরা বা তাঁবুর বাহির থেকে তাদের চেহারা এতো উজ্জ্বল দেখাবে যে, যেন তারা বাইরেই বসে আছে। তাদের পায়ের গোছার ভিতরের মজ্জা বাহির হতে দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যেন লাল মাণিক্যের ডোরা পরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা উপর থেকে দেখা যাবে। প্রত্যেকে একে অপরের উপর নিজের মর্যাদা এইরূপ মনে করবে যেই রূপ সূর্যের মর্যাদা থাকে পাথরের উপর। জান্নাতীরা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের সাথে প্রেমালাপে লিপ্ত হয়ে পড়বে। তারা দুজন তাকে দেখে বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কল্পনাও করি নাই যে, তিনি আমাদেরকে আপনার মত স্বামী দান করবেন। এরপর আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশক্রমে ঐরূপ সারিবদ্ধভাবে সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে তারা ফিরে যাবে এবং নিজ নিজ মনযিলে পৌঁছে যাবে। সুবহানাল্লাহ! পরম দয়ালু, দাতা আল্লাহ তাআ’লা তাদের জন্যে কতইনা নিয়ামত মওজুদ করে রেখেছেন।
সেখানে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে উঁচু উঁচু অট্টালিকা থাকবে, ওগুলি নির্মিত হবে খাঁটি মণি মুক্তা দ্বারা। দরজাগুলি হবে সোনার তৈরী। ওর মধ্যেকার আসনগুলি হবে মণিমাণিক্য দ্বারা নির্মিত, বিছানাগুলি হবে নরম ও মোটা রেশমের তৈরী। ওর মিম্বরগুলি হবে নূরের তৈরী যার ঔজ্জ্বল্য সূর্যের ঔজ্জ্বল্যকেও হার মানাবে। তাদের প্রাসাদ থাকবে ইল্লীনের উপর। তা নির্মিত হবে মণিমাণিক্য দ্বারা তা এতো উজ্জ্বল হবে যে, ওর ঔজ্জ্বল্যে চক্ষু ঝলসে যাবে। কিন্তু আল্লাহর করুণার কারণে চোখের জন্যে তা সহনীয় হয়ে যাবে। যে প্রাসাদগুলি লাল ইয়াকূতের হবে সেগুলিতে সবুজ রেশমী বিছানা বিছানো থাকবে। আর যেগুলি হলদে ইয়াকূতের হবে ওগুলির বিছানা হবে লাল মখমল, যাতে পান্না ও সোনা জড়ানো থাকবে। ওর আসনগুলির পায়া হবে মণিমুক্তার। ওর উপর মুক্তারই ছাদ হবে। ওর শিখর হবে প্রবালের। তাদের সেখানে পৌছার পূর্বেই আল্লাহর প্রদত্ত উপঢৌকন তথায় পৌঁছে যাবে। সাদা ইয়াকূতী ঘোড়া সেবকদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, যাদের সামনে রৌপ্য বসানো থাকবে। তাদের আসনের উপর উচ্চমানের নরম ও মোটা রেশমের গদি বিছানো থাকবে। তারা এই সব ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে আড়ম্বরের সাথে বেহেশতের দিকে রওয়ানা হবে এবং গিয়ে দেখবে যে, তাদের ঘরের পার্শ্বে আলোকময় মিম্বরগুলির উপর ফেরেশতাগণ তাদেরকে অভ্যর্থনার জন্যে বসে রয়েছেন। তাঁরা তাদেরকে আঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা করবেন এবং মুবারকবাদ জানাবেন। আর তাদের সাথে করমর্দন করবেন। তারপর তারা নিজেদের ঘরে প্রবেশ করবে এবং সেখানে আল্লাহর নিয়ামতরাশি বিদ্যমান পাবে। নিজেদের প্রাসাদের পার্শ্বে তারা সুদৃশ্য দু’টি জান্নাত দেখতে পাবে এবং ও দু’টি ফলে ফুলে ভরপুর থাকবে। ঐ দু'টি জান্নাতে দু’টি নহর পূর্ণ গতিতে প্রবাহিত হবে। সেখানে সর্ব প্রকারের সুস্বাদু ফল থাকবে এবং তাঁবুতে পবিত্ৰাত্মা সুদৃশ্য পর্দানশীন হুর থাকবে। যখন এই জান্নাতীরা সেখানে পৌঁছে সুখে শান্তিতে অবস্থান করবে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! তোমরা আমার ওয়াদা সত্যরূপে পেয়েছ কি? তোমরা আমার পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হয়ে খুশী হয়েছ কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! হাঁ, আমরা খুশী হয়েছি। আমাদের খুশীর কোন ইয়ত্তা নেই। আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ “যদি আমার সন্তুষ্টি না থাকতো তবে আমি আমার এই মেহমান খানায় তোমাদেরকে কি করে প্রবেশ করিয়েছি? কি করে আমি তোমাদেরকে আমার দর্শন দান করেছি। আমার ফেরেশতারা তোমাদের সাথে করমর্দন করেছে কেন? তোমরা সন্তুষ্ট থাকো। সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস কর। আমি তোমাদেরকে মুবারকবাদ জানাই। তোমরা আরাম আয়েশ, সুখ শান্তি ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকো। আমার নিয়ামতরাজি কমে যাওয়া ও শেষ হওয়ার নয়।” তখন তারা বলবেঃ “একমাত্র আল্লাহ তাআ’লাই প্রশংসার যোগ্য, তিনি আমাদের দুঃখ ও চিন্তা দূর করে দিয়েছেন এবং আমাদেরকে এমন জায়গায় পৌঁছিয়েছেন যেখানে আমাদের দুঃখ ও কষ্ট বলতে কিছুই নেই। এটা তারই অনুগ্রহ। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (এ আর টি বড়ই বিস্ময়কর এবং খুবই গরীবও বটে। তবে এর কিছু শাহেদও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের আসটি বর্ণিত হলো)
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সর্বশেষে জান্নাতে যাবে তাকে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “আমার কাছে চাও।” সে চাইতে থাকবে এবং আল্লাহ তাআ’লা দিতে থাকবেন। শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থনা পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার কোন চাহিদাই আর বাকী থাকবে না। তখন আল্লাহ নিজেই তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেনঃ “এটা চাও, ওটা চাও।” সে তখন চাইবে ও পাবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা তাকে বলবেনঃ “এ সব কিছু আমি তোমাকে দিয়েছি এবং এই পরিমাণই আরো দশবার দিয়েছি।”
হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষ এবং জ্বিন সবাই যদি একটি ময়দানে দাঁড়িয়ে যায় এবং আমার কাছে প্রার্থনা করে ও চায়, আর আমি প্রত্যেকেরই সমস্ত চাহিদা পূরণ করে দিই, তবে আমার সাম্রাজ্যের ততটুকুই কমবে যতটুকু সমুদ্রের পানি কমে যখন তাতে সুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। (অর্থাৎ সমুদ্রের পানিতে পুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নিলে তার অগ্রভাগে যেটুকু পানি উঠে, তাতে সমুদ্রের যেটুকু পানি কমে, আল্লাহ তাআ’লার ধনভান্ডারের ততটুকুই কমে অর্থাৎ কিছুই কমে না)।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে দীর্ঘভাবে বর্ণিত হয়েছে)
খা’লিদ ইবনু মা’দান (রঃ) বলেনঃ জান্নাতের একটি গাছের নাম তূবা। তাতে স্তন রয়েছে, যা থেকে জান্নাতীদের শিশুরা দুধ পান করে থাকে। যে গর্ভবতী নারীর পেটের সন্তান অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে গিয়েছে সেই সন্তান কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত জান্নাতের নহরে অবস্থান করে। অতঃপর তাকে চল্লিশ বছর বয়স্ক করে উঠানো হবে এবং সে পিতা মাতার সাথে বেহেশতে থাকবে। (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।