আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 77)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 77)



হরকত ছাড়া:

قالوا إن يسرق فقد سرق أخ له من قبل فأسرها يوسف في نفسه ولم يبدها لهم قال أنتم شر مكانا والله أعلم بما تصفون ﴿٧٧﴾




হরকত সহ:

قَالُوْۤا اِنْ یَّسْرِقْ فَقَدْ سَرَقَ اَخٌ لَّهٗ مِنْ قَبْلُ ۚ فَاَسَرَّهَا یُوْسُفُ فِیْ نَفْسِهٖ وَ لَمْ یُبْدِهَا لَهُمْ ۚ قَالَ اَنْتُمْ شَرٌّ مَّکَانًا ۚ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا تَصِفُوْنَ ﴿۷۷﴾




উচ্চারণ: কা-লূ ইয়ঁইয়াছরিকফাকাদ ছারাকা আখূল্লাহূমিন কাবলু ফাআছাররাহা-ইঊছুফুফী নাফছিহী ওয়ালাম ইউবদিহা-লাহুম কা-লা আনতুম শাররুম মা-কা-নাওঁ- ওয়াল্লা-হু আ‘লামুবিমা-তাসিফূন।




আল বায়ান: তারা বলল, ‘যদি সে চুরি করে থাকে, তবে ইতঃপূর্বে তার এক ভাই চুরি করেছিল’। ইউসুফ বিষয়টি নিজের কাছে গোপন রাখল, তাদের কাছে প্রকাশ করল না, সে (মনে মনে) বলল, ‘তোমাদের অবস্থান তো নিকৃষ্টতর, তোমরা যা বলছ, সে সম্পর্কে আল্লাহ ভালভাবেই অবগত’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৭. তারা বলল, সে যদি চুরি করে থাকে তবে তার সহোদরও তো আগে চুরি করেছিল(১)। কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখলেন এবং তাদের কাছে প্রকাশ করলেন না; তিনি (মনে মনে) বললেন, তোমাদের অবস্থা তো হীনতর এবং তোমরা যা বলছ সে সম্বন্ধে আল্লাহই অধিক অবগত।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: ইউসুফের ভাইয়েরা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে (তবে তা অসম্ভব নয়, কেননা) এর পূর্বে তার সহোদর ভাইও চুরি করেছিল। তখন ইউসুফ এ ব্যাপারটি তার মনেই গোপন রাখল, তা তাদের কাছে প্রকাশ করল না। সে (মনে মনে) বলল- তোমাদের অবস্থান তো আরো নিকৃষ্টতম, তোমরা যা বলছ সে সম্পর্কে আল্লাহ খুব ভালভাবেই অবগত।




আহসানুল বায়ান: (৭৭) তারা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে, তাহলে তার (সহোদর) ভাইও তো ইতিপূর্বে চুরি করেছিল।’[1] কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল এবং তাদের কাছে প্রকাশ করল না। সে (মনে মনে) বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো হীনতর[2] এবং তোমরা যা বলছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।’



মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ সে যদি চুরি করে থাকে তার (সহোদর) ভাইওতো ইতোপূর্বে চুরি করেছিল, এতে ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল এবং তাদের কাছে প্রকাশ করলনা। সে মনে মনে বললঃ তোমাদের অবস্থাতো হীনতর এবং তোমরা যা বলছ সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।



ফযলুর রহমান: ইউসুফের ভাইয়েরা বলল, “সে যদি চুরি করে থাকে তাহলে তার এক ভাইও (ইউসুফ) ইতিপূর্বে চুরি করেছিল।” ইউসুফ তখন কথাটি নিজের মনে গোপন রাখল, তাদের কাছে প্রকাশ্যে বলল না। সে (মনে মনে) বলল, “তোমাদের অবস্থান খুব নিকৃষ্ট। আর তোমরা যা বলছ সে সম্পর্কে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল অবগত আছেন।”



মুহিউদ্দিন খান: তারা বলতে লাগলঃ যদি সে চুরি করে থাকে, তবে তার এক ভাইও ইতিপূর্বে চুরি করেছিল। তখন ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে রাখলেন এবং তাদেরকে জানালেন না। মনে মনে বললেনঃ তোমরা লোক হিসাবে নিতান্ত মন্দ এবং আল্লাহ খুব জ্ঞাত রয়েছেন, যা তোমরা বর্ণনা করছ;



জহুরুল হক: তারা বললে -- "যদি সে চুরি করে থাকে তার ভাইও তো এর আগে চুরি করেছিল।" তখন ইউসুফ এটি নিজের অন্তরেই গোপন রেখেছিলেন এবং তিনি তা তাদের কাছে প্রকাশ করেন নি। তিনি বললেন -- "তোমরা আরও হীন অবস্থাতে রয়েছ, আর আল্লাহ্ ভাল জানেন তোমরা যা আরোপ করছ সে-সন্বন্ধে।"



Sahih International: They said, "If he steals - a brother of his has stolen before." But Joseph kept it within himself and did not reveal it to them. He said, "You are worse in position, and Allah is most knowing of what you describe."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭৭. তারা বলল, সে যদি চুরি করে থাকে তবে তার সহোদরও তো আগে চুরি করেছিল(১)। কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখলেন এবং তাদের কাছে প্রকাশ করলেন না; তিনি (মনে মনে) বললেন, তোমাদের অবস্থা তো হীনতর এবং তোমরা যা বলছ সে সম্বন্ধে আল্লাহই অধিক অবগত।(২)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ সে যদি চুরি করে থাকে তাতে আশ্চর্যের কি আছে! তার এক ভাই ছিল, সেও এমনিভাবে ইতিপূর্বে চুরি করেছিল। উদ্দেশ্য এই যে, সে আমাদের সহোদর ভাই নয়- বৈমাত্রেয় ভাই, তার এক সহোদর ভাই ছিল, সে-ও চুরি করেছিল। ইউসুফভ্রাতারা এখন স্বয়ং ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর প্রতি চুরির অপবাদ আরোপ করল। [তাবারী; ইবন কাসীর; সা’দী]


(২) অর্থাৎ ইউসুফ আলাইহিস সালাম মনে মনে বললেনঃ তোমাদের স্তর ও অবস্থাই মন্দ যে, জেনেশুনে ভাইদের প্রতি চুরির দোষারোপ করছ। আরও বললেনঃ তোমাদের কথা সত্য কি মিথ্যা সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই অধিক জানেন। [তাবারী; ইবন কাসীর] কুরতুবী বলেন, প্রথম বাক্যটি মনে মনে বলেছেন এবং দ্বিতীয় বাক্যটি সম্ভবতঃ জোরেই বলেছেন। [কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭৭) তারা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে, তাহলে তার (সহোদর) ভাইও তো ইতিপূর্বে চুরি করেছিল।’[1] কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল এবং তাদের কাছে প্রকাশ করল না। সে (মনে মনে) বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো হীনতর[2] এবং তোমরা যা বলছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।’


তাফসীর:

[1] এটা তারা নিজেদের পবিত্রতা ও সাধুতা প্রকাশ করার জন্য বলেছিলেন। কেননা ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীন উভয়ই তাঁদের সহোদর ভাই ছিলেন না বরং বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন। কতিপয় ব্যাখ্যাকারী ইউসুফ (আঃ)-এর চুরির ব্যাপারে দুটি রহস্যময় কথা উল্লেখ করেছেন, যা কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর ভিত্তিশীল নয়। বিশুদ্ধ কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, তাঁরা নিজেদেরকে তো নেহাত সাধুতা ও সচ্চরিত্রের অধিকারী প্রমাণ করলেন। আর ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীনকে হীন চরিত্রের সাব্যস্ত করলেন এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁদেরকে চোর ও বেঈমান প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করলেন।

[2] ইউসুফ (আঃ)-এর এই উক্তি থেকেও স্পষ্ট হয় যে, তাঁরা তাঁর সম্বন্ধে চুরি করার কথা উল্লেখ করে স্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ আরোপের কাজ করেছিলেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৯-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) কর্তৃক তার সহদর ভাই বিন ইয়ামীনকে তার নিকট আটক রাখার যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তারই বর্ণনা দিচ্ছেন। বিস্তারিত বর্ণনা তাফসীর ইবনু কাসীর রয়েছে; যার সারসংক্ষেপ হলো এই যে, ইউসুফ (عليه السلام)-এর ভাইয়েরা যখন বিন ইয়ামীন-সহ মিসরে আগমন করে ইউসুফ (عليه السلام)-এর নিকট প্রবেশ করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) সহোদর ভাই (বিনয়ামীন) কে নিজের কাছে রাখলেন এবং বললেন: আমিই তোমার আপন ভাই ইউসুফ, সুতরাং তারা আমার সাথে যে আচরণ করেছে সে জন্য দুঃখ করো না। আমি তোমাকে আমার নিকট রাখার জন্য চেষ্টা করছি অতঃপর পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক যখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিলেন তখন সহোদর ভাইয়ের মালপত্রের মধ্যে পানপাত্রটি রেখে দেয়া হল। অতঃপর তারা যখন রওনা শুরু করল তখন এক আহ্বায়ক ঘোষণা দিয়ে বলল: হে যাত্রীদল! তোমরা চোর! এ চোর বলা সে ঘোষণাকারীর জন্য সত্য ছিল, কারণ সে এ পরিকল্পনার কথা জানত। একথা শুনে তারা জিজ্ঞেস করল যে, আপনাদের কী হারিয়েছে? তখন তারা বলল: রাজার পান-পাত্র হারিয়েছে। সে ঘোষক বলল: আমি এ কথার জামানত দিচ্ছি যে, তল্লাশি চালানোর পূর্বে যদি কেউ ওটা এনে দেয় তাহলে তাকে এক উট বোঝাই করা খাদ্য দেয়া হবে। ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা যেহেতু এ পরিকল্পনা সস্পর্কে অবগত ছিল না তাই তারা আল্লাহ তা‘আলার শপথ করে বলল: আপনারা তো জানেন আমরা কোন অশান্তি সৃষ্টি করতে আসিনি এবং আমরা চুরিও করি না।



রাজ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চুরির অপরাধে কাউকে আটক করে রাখার বিধান ছিল না। তাই চুক্তি করে নেয়ার দরকার ছিল। বিধায় রাজকর্মচারীরা বলল, যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও, তাহলে তার শাস্তি কী হবে? তারা বলল: যার পণ্যের মাঝে তা পাওয়া যাবে বিনিময়স্বরূপ তাকে রেখে দেয়া হবে।



কারণ ঐ সময়কার শরীয়তের অথবা রাষ্ট্রীয় বিধান ছিল, যদি কেউ চুরি করে তাহলে যার জিনিস চুরি করেছে চোরকে তার হাতে সঁপে দেয়া হত এবং তার গোলাম হিসেবে বিবেচিত হত। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর কর্মচারীরা তাদের মালপত্রে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল, সবশেষে তাঁর সহোদর ভাইয়ের মালপত্রে তা পেয়ে গেল। এই কৌশল অবলম্বন করার জ্ঞান ইউসুফ (عليه السلام) ওয়াহী মারফত পেয়েছেন। এ থেকে বুঝা গেল যে, কোন সঠিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ ধরণের কৌশল অবলম্বন করা বৈধ।



বিনয়ামীন চোর হিসেবে প্রমাণিত হলে তাদের একজন বলল: সে চুরি করে থাকলে এটা আশ্চর্যের কোন বিষয় নয়, কারণ ইতোপূর্বে তার ভাই চুরি করেছিল। অর্থাৎ ইউসুফ (عليه السلام) ছোট বেলায় যখন ফুফুর সাথে থাকতেন, ফুফু ইউসুফকে নিজের কাছে রাখার জন্য যে চুরির ঘটনা সাজিয়েছিলেন সে ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করছিল। যদিও তারা ভালভাবে জানত যে, উক্ত ঘটনা মিথ্যা সাজানো বিষয়। কিন্তু সেটাকে সত্যিকার চুরি বলে আখ্যায়িত করল বিনয়ামীনের প্রতি আক্রোশবশত। ইউসুফ (عليه السلام) তাদের এ কথা শুনে প্রতিবাদ করলেন না, বরং মনে মনে গোপন রাখলেন এবং ধৈর্য ধারণ করলেন।



চুক্তি মোতাবেক যখন বিন ইয়ামীনকে নিয়ে যেতে লাগলেন তখন তারা আপত্তি পেশ করল যে, হে আযীয! (এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল ইউসুফ (عليه السلام), কারণ তিনিই সব কিছুর মূল, মিসরের রাজা শুধু নামে ছিল) এর পিতা অতিশয় বৃদ্ধ সুতরাং আপনি তার স্থলে আমাদের একজনকে রেখে দিন।



পিতা তো বৃদ্ধই ছিলেন, কিন্তু এখানে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেভাবেই হোক না কেন বিনয়ামীনকে মুক্ত করা। কারণ পিতার সাথে অঙ্গীকার করে এসেছে, বিনয়ামীনকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। তাই তারা খুব কাকুতি-মিনতি করল। কিন্তু ইউসুফ (عليه السلام)-এর উদ্দেশ্যই ছিল যে, বিনয়ামীনকে নিজের কাছে রাখা, যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) তাদের প্রস্তাবকে অস্বীকার করলেন এবং বললেন: যে অপরাধী তাকে বাদ দিয়ে অন্যকে পাকড়াও করব এ কাজ থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা তাদের নিকট থেকে বিনয়ামীনকে পাওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেল তখন তারা সকল ভাইয়েরা মিলে পরামর্শ করতে লাগল; এমনকি তাদের মধ্যে যে বয়সে বড় সে বলল: তোমরা কি জান না, তোমাদের পিতা আল্লাহ তা‘আলার নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং পূর্বেও ইউসুফের ব্যাপারে এরূপ করেছ? সুতরাং আমাকে আমার পিতা অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আমি এ দেশ ছাড়ব না। অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা আমার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না দেন। সুতরাং তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরে যাও এবং তাকে প্রকৃত ঘটনা খুলে বল যে, বিনয়ামীন চুরি করবে তা কে জানত? যদি আপনার এ কথা বিশ্বাস না হয় তাহলে আমরা যে জনপদে ছিলাম তার অধিবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করুন অথবা আমরা যে যাত্রীদের সাথে এসেছিলাম তাদের কাছে জিজ্ঞেস করুন। আর আমরা এ ব্যাপারে সত্যবাদী। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) পূর্বে ইউসুফ (عليه السلام) কে হারিয়ে যে কথা বলেছিলেন সে কথাই বললেন যে, এটা তোমাদের সাজানো কাহিনী। সুতরাং তিনি তাদের এ কথা বিশ্বাস করলেন না বরং তিনি পূর্বের মতই ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ও ইউসুফ (عليه السلام) এর জন্য আফসোস করলেন। তাঁর এই নতুন ছেলের শোক তাঁকে পুরাতন শোকের কথা স্মরণ করিয়ে দিল, যার ফলে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়লেন। ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর এই ভেঙ্গে পড়া দেখে তাঁর ছেলেরা চিন্তা করতে নিষেধ করল। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: আমি আমার এসব নিবেদন আল্লাহ তা‘আলার নিকট করছি। সুতরাং ইয়া‘কূব (عليه السلام) তাঁর এসব বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করলেন, ধৈর্য ধারণ করলেন এবং বললেন: আমি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এমন বিষয় জানি যা তোমরা জান না। সুতরাং হে আমার ছেলেরা! তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তাঁর সহোদর ভাইকে খোঁজ কর, আর তোমরা আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কারণ কাফির ব্যতীত কেউ আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হয় না। এটা মু’মিনের একটি দৃষ্টান্ত। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: অন্যতম একটি কবীরাহ গুনাহ হল আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। সূরা হিজরে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَنْ يَّقْنَطُ مِنْ رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّا۬لُّوْنَ)



“কেবল পথভ্রষ্ট লোকেরাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়।” (সূরা হিজর ১৫:৫৬)



সুতরাং কোন কঠিন মুহূর্তে পতিত হলে বা কোন বড় ধরণের গুনাহর কাজ করে ফেললে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না, বরং কঠিন মুহূর্তে ধৈর্যের সাথে আল্লাহর রহমতের আশা করতে হবে এবং কোন গুনাহ হয়ে গেলে তাওবাহ করে আল্লাহর ক্ষমার আশা রাখতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নাম ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করা নিষেধ, কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ব্যক্তি, বস্তুর নামে শপথ করা, কসম খাওয়া শির্ক যা হারাম।

২. কোন বিষয়ে কাজ করতে গেলে আল্লাহ তা‘আলার ওপর আস্থা রাখা আবশ্যক।

৩. যত বড় বিপদই হোক না কেন নিরাশ হওয়া যাবে না।

৪. শরীয়ত সমর্থিত পন্থায় কৌশল অবলম্বন করা বৈধ। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর ভাইকে নিজের নিকট রাখার জন্য কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: বিনইয়ামীনের বস্তার মধ্য হতে পানপাত্র বের হতে দেখে তাঁরা বললেনঃ “দেখুন! এ চুরি করেছে, যেমন ইতিপূর্বে চুরি করেছিল এর সহোদর ভাই ইউসুফ (আঃ)।” ঘটনা এই যে, একবার হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর নানার প্রতিমা গোপনে উঠিয়ে নিয়েছিলেন এবং ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। (এটা সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) কাতাদা’ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)

এটাও বর্ণিত আছে যে, হযরত ইয়াকুবের (আঃ) একজন বড় বোন ছিলেন। তাঁর কাছে তাঁর পিতা হযরত ইসহাকের (আঃ) একটি কোমর বন্ধনী ছিল। ওটা বংশের বড় মানুষের কাছে থাকতো। হযরত ইউসুফ (আঃ) জন্মগ্রহণের পরেই তাঁর ঐ ফুফুর কাছে লালিত পালিত হন। তাঁর ফুফু তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তিনি কিছুটা বড় হলে তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর ফুফুর নিকট থেকে তাঁকে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু তাঁর ফুফু তাঁর বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারবেন না বলে তাঁর পিতার প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করেন। এদিকে তাঁর পিতার তাঁর প্রতি মহব্বতেরও কোন সীমা ছিল না। শেষে বোন তাঁকে বললেনঃ “আচ্ছা ইউসুফ (আঃ) আমার কাছে আরো কিছু দিন থাকুক।” এই সময়ের মধ্যে তাঁর ফুফু তাঁর কোমর বন্ধনীটি গোপনে তার কাপড়ের মধ্যে রেখে দেন। তারপর তল্লাশী হতে শুরু হয়। ঘরের সমস্ত জায়গা খোঁজ করে পাওয়া গেল না। অবশেষে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, ঘরে যারা রয়েছে তাদের সবারই উপর তল্লাশী চালানো হোক। সবারই কাছে খোঁজ করার পরেও তা পাওয়া গেল না। সর্বশেষে হযরত ইউসুফের (আঃ) উপর তল্লাশী চালানো হলো। তার কাছে সেটা পাওয়া গেল। হযরত ইয়াকুবকে (আঃ) এ সংবাদ দেয়া হলে তিনি শরীয়তে ইবরাহীমীর আইন অনুসারে হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তাঁর ফুফুর কাছেই সমর্পণ করলেন। এ ভাবে তাঁর ফুফু তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি হযরত ইউসুফকে (আঃ) ছাড়েন নাই। (এটা মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আবি নাজীহ (রঃ) হতে এবং তিনি মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেন)

হযরত ইউসুফের (আঃ) বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা ওটারই আজ অপবাদ দিলেন, যার উত্তরে হযরত ইউসুফ (আঃ) মনে মনে বললেনঃ “তোমাদের অবস্থা তো হীনতর। বিনইয়ামীনের সহোদর ভাই ইউসুফের (আঃ) চুরির অবস্থা আল্লাহ তাআ’লাই খুব ভালরূপে অবগত আছে।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।