আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 76)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 76)



হরকত ছাড়া:

فبدأ بأوعيتهم قبل وعاء أخيه ثم استخرجها من وعاء أخيه كذلك كدنا ليوسف ما كان ليأخذ أخاه في دين الملك إلا أن يشاء الله نرفع درجات من نشاء وفوق كل ذي علم عليم ﴿٧٦﴾




হরকত সহ:

فَبَدَاَ بِاَوْعِیَتِهِمْ قَبْلَ وِعَآءِ اَخِیْهِ ثُمَّ اسْتَخْرَجَهَا مِنْ وِّعَآءِ اَخِیْهِ ؕ کَذٰلِکَ کِدْنَا لِیُوْسُفَ ؕ مَا کَانَ لِیَاْخُذَ اَخَاهُ فِیْ دِیْنِ الْمَلِکِ اِلَّاۤ اَنْ یَّشَآءَ اللّٰهُ ؕ نَرْفَعُ دَرَجٰتٍ مَّنْ نَّشَآءُ ؕ وَ فَوْقَ کُلِّ ذِیْ عِلْمٍ عَلِیْمٌ ﴿۷۶﴾




উচ্চারণ: ফাবাদাআ বিআও‘ইইয়াতিহিম কাবলা বি‘আই আখীহি ছুম্মাছতাখরাজাহা-মিওঁ বি‘আই আখীহি কাযা-লিকা কিদনা-লিইঊছুফা মা-কা-না লিইয়া‘খুযা আখাহু ফী দীনিল মালিকি ইল্লা আইঁ ইয়াশাআল্লা-হু নারফা‘উ দারাজা-তিম মান্নাশাউ ওয়া ফাওকা কুল্লি যী ‘ইলমিন ‘আলীম।




আল বায়ান: তারপর সে তার ভাইয়ের পাত্রের পূর্বে তাদের পাত্রগুলো দিয়ে (তল্লাশী) শুরু করল, তারপর সেটি তার ভাইয়ের পাত্র থেকে বের করল, এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া বাদশাহ্র আইনে সে তার ভাইকে রেখে দিতে পারত না, আমি যাকে ইচ্ছা তার মর্যাদা উঁচু করে দেই এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর রয়েছে একজন মহাজ্ঞানী।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৬. অতঃপর তিনি তার সহোদরের মালপত্র তল্লাশির আগে তাদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগলেন(১) পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করলেন।(২) এভাবে আমরা ইউসুফের জন্য কৌশল করেছিলাম।(৩) রাজার আইনে তার ভাইকে আটক করা সঙ্গত হতোনা, আল্লাহ্‌ ইচ্ছা না করলে। আমরা যাকে ইচ্ছে মর্যাদায় উন্নীত করি। আর প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে সর্বজ্ঞানী।(৪)




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর ইউসুফ তার নিজ ভাইয়ের মালপত্র তল্লাশির আগে অন্যদের মাল তল্লাশি শুরু করল। অতঃপর সেটি তার নিজ ভাইয়ের মালপত্র থেকে বের করল। এভাবে আমি ইউসুফের জন্য পরিকল্পনা করেছিলাম। রাজার আইন অনুযায়ী সে তার সহোদর ভাইকে আটক করতে পারত না-আল্লাহর ইচ্ছে ব্যতীত। আমি যার জন্য ইচ্ছে করি মর্যাদা উচ্চ করি, প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে আছেন একজন সর্বজ্ঞ।




আহসানুল বায়ান: (৭৬) অতঃপর সে তার (সহোদর) ভ্রাতার মালপত্র তল্লাশি করার পূর্বে ওদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগল, পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করল।[1] এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম।[2] আল্লাহ ইচ্ছা না করলে রাজার আইনে তার সহোদরকে সে (দাস বানিয়ে) আটক করতে পারত না।[3] আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি।[4] আর প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে অধিক জ্ঞানী।[5]



মুজিবুর রহমান: অতঃপর সে তার (সহোদর) ভাইয়ের মালপত্র তল্লাশির পূর্বে তাদের মাল-পত্র তল্লাশি করতে লাগল, পরে তার সহোদরের মাল-পত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করল। এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করেছিলাম, রাজার আইনে তার সহোদরকে সে আটক করতে পারতনা, আল্লাহ ইচ্ছা না করলে। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি, প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছেন সর্বজ্ঞানী।



ফযলুর রহমান: অতঃপর ইউসুফ তার (আপন) ভাইয়ের থলির পূর্বে সৎভাইদের থলি দিয়ে (তল্লাশি) শুরু করল। তারপর তার ভাইয়ের থলি থেকে পানপাত্রটি বের করল। এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল অবলম্বন করি। আল্লাহর ইচ্ছা না হলে সে রাজার আইনে নিজের ভাইকে (দাস বানিয়ে) রাখতে পারত না। আমি যাকে চাই উচ্চ মর্যাদা দান করি। আর সকল জ্ঞানীর ওপরে আছেন এক মহাজ্ঞানী।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর ইউসুফ আপন ভাইদের থলের পূর্বে তাদের থলে তল্লাশী শুরু করলেন। অবশেষে সেই পাত্র আপন ভাইয়ের থলের মধ্য থেকে বের করলেন। এমনিভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। সে বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না, কিন্তু আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন। আমি যাকে ইচ্ছা, মর্যাদায় উন্নীত করি এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে আছে অধিকতর এক জ্ঞানীজন।



জহুরুল হক: অতঃপর তিনি তাদের মালপত্রে আর করলেন তাঁর ভাইয়ের মালের আগে, তারপর তিনি তা বের করলেন তাঁর ভাইয়ের মালপত্র থেকে। এইভাবেই আমরা ইউসুফের জন্য পরিকল্পনা করেছিলাম। তাঁর পক্ষে রাজার আইন অনুসারে তাঁর ভাইকে রাখা সম্ভব ছিল না যদি না আল্লাহ্ ইচ্ছা করতেন। আমরা যাকে ইচ্ছা করি স্তরে স্তরে উন্নত করি। আর প্রত্যেক জ্ঞানবানদের উপরে রয়েছেন সর্বজ্ঞানময়।



Sahih International: So he began [the search] with their bags before the bag of his brother; then he extracted it from the bag of his brother. Thus did We plan for Joseph. He could not have taken his brother within the religion of the king except that Allah willed. We raise in degrees whom We will, but over every possessor of knowledge is one [more] knowing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭৬. অতঃপর তিনি তার সহোদরের মালপত্র তল্লাশির আগে তাদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগলেন(১) পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করলেন।(২) এভাবে আমরা ইউসুফের জন্য কৌশল করেছিলাম।(৩) রাজার আইনে তার ভাইকে আটক করা সঙ্গত হতোনা, আল্লাহ্– ইচ্ছা না করলে। আমরা যাকে ইচ্ছে মর্যাদায় উন্নীত করি। আর প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে সর্বজ্ঞানী।(৪)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ সরকারী তল্লাশীকারীরা প্রকৃত ষড়যন্ত্র ঢেকে রাখার জন্য প্রথমেই অন্য ভাইদের আসবাবপত্র তালাশ করল। প্রথমেই বিনইয়ামীনের আসবাবপত্র খুলল না, যাতে তাদের সন্দেহ না হয়। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]


(২) অর্থাৎ সব শেষে বিনইয়ামীনের আসবাবপত্র খোলা হলে তা থেকে শাহী পাত্রটি বের হয়ে এল। তখন ভাইদের অবস্থা দেখে কে? লজ্জায় সবার মাথা হেট হয়ে গেল। তারা বিনইয়ামীনকে খারাপ কথা বলতে লাগল। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]


(৩) অর্থাৎ এমনিভাবে আমি ইউসুফের খাতিরে কৌশল করেছি। এ সমগ্র ধারাবাহিক ঘটনাবলীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইউসুফের সমর্থনে সরাসরি কোন কৌশলটি অবলম্বন করা হয়েছিল তা অবশ্যি এখানে ভেবে দেখার মতো বিষয়। একথা সুস্পষ্ট যে, পেয়ালা রাখার কৌশলটি ইউসুফ নিজেই করেছিলেন। এটাও সুস্পষ্ট, সরকারী কর্মচারীদের চুরির সন্দেহে কাফেলাকে আটকানোও একটি নিয়ম মাফিক কাজ ছিল, যা এ ধরনের অবস্থায় সব সরকারী কর্মচারীই করে থাকে। তাহলে আল্লাহর সেই কৌশল কোনটি? উপরের আয়াতের মধ্যে অনুসন্ধান চালালে এ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন জিনিসই এর ক্ষেত্র হিসেবে পাওয়া যেতে পারে না যে, সরকারী কর্মচারীরা নিয়ম বিরোধীভাবে নিজেরাই সন্দেহপূর্ণ অপরাধীদের কাছে চুরির শাস্তি জিজ্ঞেস করলো এবং জবাবে তারাও এমন শাস্তির কথা বললো যা ইবরাহিমী শরীয়াতের দৃষ্টিতে চোরকে দেয়া হতো। এর ফলে দুটি লাভ হলো।

প্রথমত ইউসুফ ইবরাহিমী শরীআতকে কার্যকর করার সুযোগ পেলেন এবং দ্বিতীয়ত নিজের ভাইকে হাজতে পাঠাবার পরিবর্তে তিনি নিজের কাছে রাখতে পারলেন। তিনি বাদশাহর আইনানুযায়ী ভাইকে গ্রেফতার করতে পারতেন না। কেননা, মিসরের আইনে চোরের এই শাস্তি ছিল না। কিন্তু তারা এখানে ইউসুফভ্রাতাদের কাছ থেকেই ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর শরীআতানুযায়ী চোরের বিধান জেনে নিয়েছিল। এ বিধান দৃষ্টে বিনইয়ামীনকে আটকে রাখা বৈধ হয়ে গেল। এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল।


(৪) অর্থাৎ আমি যাকে ইচ্ছা, উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করে দেই, যেমন এ ঘটনায় ইউসুফের মর্যাদা তার ভাইদের তুলনায় উচ্চ করে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরেই তদপেক্ষা অধিক জ্ঞানী বিদ্যমান রয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, আমরা জ্ঞান ও ঈমানের দিক দিয়ে সৃষ্টজীবের মধ্যে একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করে থাকি। [কুরতুবী] হাসান বসরী বলেন, একজন যত বড় জ্ঞানীই হোক, তার তুলনায় আরো অধিক জ্ঞানী থাকে। মানবজাতির মধ্যে যদি কেউ এমন হয় যে, তার চাইতে অধিক জ্ঞানী আর নেই, তবে এ অবস্থায়ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-এর জ্ঞান সবারই ঊর্ধ্বে। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭৬) অতঃপর সে তার (সহোদর) ভ্রাতার মালপত্র তল্লাশি করার পূর্বে ওদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগল, পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করল।[1] এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম।[2] আল্লাহ ইচ্ছা না করলে রাজার আইনে তার সহোদরকে সে (দাস বানিয়ে) আটক করতে পারত না।[3] আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি।[4] আর প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে অধিক জ্ঞানী।[5]


তাফসীর:

[1] প্রথমে অন্য ভাইদের মালপত্রের তল্লাশি নিল এবং শেষে বিনয়্যামীনের মালপত্র দেখল, যাতে করে তাদের সন্দেহ না হয় যে, এটা কোন সুপরিকল্পিত কৌশল।

[2] অর্থাৎ, আমি ইউসুফকে অহীর মাধ্যমে এই কৌশলটি বুঝিয়ে দিলাম। এ থেকে জানা গেল যে, কোন সঠিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ ধরনের কৌশল-পথ অবলম্বন করা বৈধ; যার বাহ্যিক রূপ বাহানা ও ফন্দি, এই শর্তে যে উক্ত পথ যেন কোন শরয়ী নিয়মের পরিপন্থী না হয়। (ফাতহুল কাদীর)

[3] অর্থাৎ রাজার যে আইন তথা নিয়ম মিসরে প্রচলিত ছিল, সেই মোতাবেক বিনয়্যামীনকে এভাবে আটকানো সম্ভব ছিল না, তাই তারা যাত্রীদলকেই জিজ্ঞেস করল যে, বল, এই অপরাধের দন্ড কি হওয়া উচিত?

[4] যেমন নিজ দয়া ও অনুগ্রহে ইউসুফকে সুউচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।

[5] অর্থাৎ প্রত্যেক জ্ঞানী থেকে বড় কোন না কোন জ্ঞানী থাকে। সুতরাং কোন জ্ঞানী যেন এই ধোকায় নিপতিত না হয় যে, আমিই এই যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। কতক মুফাসসিরীন বলেছেন, এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর একজন সর্বজ্ঞানী অর্থাৎ মহান আল্লাহ আছেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৯-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) কর্তৃক তার সহদর ভাই বিন ইয়ামীনকে তার নিকট আটক রাখার যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তারই বর্ণনা দিচ্ছেন। বিস্তারিত বর্ণনা তাফসীর ইবনু কাসীর রয়েছে; যার সারসংক্ষেপ হলো এই যে, ইউসুফ (عليه السلام)-এর ভাইয়েরা যখন বিন ইয়ামীন-সহ মিসরে আগমন করে ইউসুফ (عليه السلام)-এর নিকট প্রবেশ করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) সহোদর ভাই (বিনয়ামীন) কে নিজের কাছে রাখলেন এবং বললেন: আমিই তোমার আপন ভাই ইউসুফ, সুতরাং তারা আমার সাথে যে আচরণ করেছে সে জন্য দুঃখ করো না। আমি তোমাকে আমার নিকট রাখার জন্য চেষ্টা করছি অতঃপর পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক যখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিলেন তখন সহোদর ভাইয়ের মালপত্রের মধ্যে পানপাত্রটি রেখে দেয়া হল। অতঃপর তারা যখন রওনা শুরু করল তখন এক আহ্বায়ক ঘোষণা দিয়ে বলল: হে যাত্রীদল! তোমরা চোর! এ চোর বলা সে ঘোষণাকারীর জন্য সত্য ছিল, কারণ সে এ পরিকল্পনার কথা জানত। একথা শুনে তারা জিজ্ঞেস করল যে, আপনাদের কী হারিয়েছে? তখন তারা বলল: রাজার পান-পাত্র হারিয়েছে। সে ঘোষক বলল: আমি এ কথার জামানত দিচ্ছি যে, তল্লাশি চালানোর পূর্বে যদি কেউ ওটা এনে দেয় তাহলে তাকে এক উট বোঝাই করা খাদ্য দেয়া হবে। ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা যেহেতু এ পরিকল্পনা সস্পর্কে অবগত ছিল না তাই তারা আল্লাহ তা‘আলার শপথ করে বলল: আপনারা তো জানেন আমরা কোন অশান্তি সৃষ্টি করতে আসিনি এবং আমরা চুরিও করি না।



রাজ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চুরির অপরাধে কাউকে আটক করে রাখার বিধান ছিল না। তাই চুক্তি করে নেয়ার দরকার ছিল। বিধায় রাজকর্মচারীরা বলল, যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও, তাহলে তার শাস্তি কী হবে? তারা বলল: যার পণ্যের মাঝে তা পাওয়া যাবে বিনিময়স্বরূপ তাকে রেখে দেয়া হবে।



কারণ ঐ সময়কার শরীয়তের অথবা রাষ্ট্রীয় বিধান ছিল, যদি কেউ চুরি করে তাহলে যার জিনিস চুরি করেছে চোরকে তার হাতে সঁপে দেয়া হত এবং তার গোলাম হিসেবে বিবেচিত হত। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর কর্মচারীরা তাদের মালপত্রে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল, সবশেষে তাঁর সহোদর ভাইয়ের মালপত্রে তা পেয়ে গেল। এই কৌশল অবলম্বন করার জ্ঞান ইউসুফ (عليه السلام) ওয়াহী মারফত পেয়েছেন। এ থেকে বুঝা গেল যে, কোন সঠিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ ধরণের কৌশল অবলম্বন করা বৈধ।



বিনয়ামীন চোর হিসেবে প্রমাণিত হলে তাদের একজন বলল: সে চুরি করে থাকলে এটা আশ্চর্যের কোন বিষয় নয়, কারণ ইতোপূর্বে তার ভাই চুরি করেছিল। অর্থাৎ ইউসুফ (عليه السلام) ছোট বেলায় যখন ফুফুর সাথে থাকতেন, ফুফু ইউসুফকে নিজের কাছে রাখার জন্য যে চুরির ঘটনা সাজিয়েছিলেন সে ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করছিল। যদিও তারা ভালভাবে জানত যে, উক্ত ঘটনা মিথ্যা সাজানো বিষয়। কিন্তু সেটাকে সত্যিকার চুরি বলে আখ্যায়িত করল বিনয়ামীনের প্রতি আক্রোশবশত। ইউসুফ (عليه السلام) তাদের এ কথা শুনে প্রতিবাদ করলেন না, বরং মনে মনে গোপন রাখলেন এবং ধৈর্য ধারণ করলেন।



চুক্তি মোতাবেক যখন বিন ইয়ামীনকে নিয়ে যেতে লাগলেন তখন তারা আপত্তি পেশ করল যে, হে আযীয! (এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল ইউসুফ (عليه السلام), কারণ তিনিই সব কিছুর মূল, মিসরের রাজা শুধু নামে ছিল) এর পিতা অতিশয় বৃদ্ধ সুতরাং আপনি তার স্থলে আমাদের একজনকে রেখে দিন।



পিতা তো বৃদ্ধই ছিলেন, কিন্তু এখানে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেভাবেই হোক না কেন বিনয়ামীনকে মুক্ত করা। কারণ পিতার সাথে অঙ্গীকার করে এসেছে, বিনয়ামীনকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। তাই তারা খুব কাকুতি-মিনতি করল। কিন্তু ইউসুফ (عليه السلام)-এর উদ্দেশ্যই ছিল যে, বিনয়ামীনকে নিজের কাছে রাখা, যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) তাদের প্রস্তাবকে অস্বীকার করলেন এবং বললেন: যে অপরাধী তাকে বাদ দিয়ে অন্যকে পাকড়াও করব এ কাজ থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা তাদের নিকট থেকে বিনয়ামীনকে পাওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেল তখন তারা সকল ভাইয়েরা মিলে পরামর্শ করতে লাগল; এমনকি তাদের মধ্যে যে বয়সে বড় সে বলল: তোমরা কি জান না, তোমাদের পিতা আল্লাহ তা‘আলার নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং পূর্বেও ইউসুফের ব্যাপারে এরূপ করেছ? সুতরাং আমাকে আমার পিতা অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আমি এ দেশ ছাড়ব না। অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা আমার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না দেন। সুতরাং তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরে যাও এবং তাকে প্রকৃত ঘটনা খুলে বল যে, বিনয়ামীন চুরি করবে তা কে জানত? যদি আপনার এ কথা বিশ্বাস না হয় তাহলে আমরা যে জনপদে ছিলাম তার অধিবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করুন অথবা আমরা যে যাত্রীদের সাথে এসেছিলাম তাদের কাছে জিজ্ঞেস করুন। আর আমরা এ ব্যাপারে সত্যবাদী। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) পূর্বে ইউসুফ (عليه السلام) কে হারিয়ে যে কথা বলেছিলেন সে কথাই বললেন যে, এটা তোমাদের সাজানো কাহিনী। সুতরাং তিনি তাদের এ কথা বিশ্বাস করলেন না বরং তিনি পূর্বের মতই ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ও ইউসুফ (عليه السلام) এর জন্য আফসোস করলেন। তাঁর এই নতুন ছেলের শোক তাঁকে পুরাতন শোকের কথা স্মরণ করিয়ে দিল, যার ফলে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়লেন। ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর এই ভেঙ্গে পড়া দেখে তাঁর ছেলেরা চিন্তা করতে নিষেধ করল। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: আমি আমার এসব নিবেদন আল্লাহ তা‘আলার নিকট করছি। সুতরাং ইয়া‘কূব (عليه السلام) তাঁর এসব বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করলেন, ধৈর্য ধারণ করলেন এবং বললেন: আমি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এমন বিষয় জানি যা তোমরা জান না। সুতরাং হে আমার ছেলেরা! তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তাঁর সহোদর ভাইকে খোঁজ কর, আর তোমরা আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কারণ কাফির ব্যতীত কেউ আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হয় না। এটা মু’মিনের একটি দৃষ্টান্ত। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: অন্যতম একটি কবীরাহ গুনাহ হল আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। সূরা হিজরে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَنْ يَّقْنَطُ مِنْ رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّا۬لُّوْنَ)



“কেবল পথভ্রষ্ট লোকেরাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়।” (সূরা হিজর ১৫:৫৬)



সুতরাং কোন কঠিন মুহূর্তে পতিত হলে বা কোন বড় ধরণের গুনাহর কাজ করে ফেললে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না, বরং কঠিন মুহূর্তে ধৈর্যের সাথে আল্লাহর রহমতের আশা করতে হবে এবং কোন গুনাহ হয়ে গেলে তাওবাহ করে আল্লাহর ক্ষমার আশা রাখতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নাম ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করা নিষেধ, কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ব্যক্তি, বস্তুর নামে শপথ করা, কসম খাওয়া শির্ক যা হারাম।

২. কোন বিষয়ে কাজ করতে গেলে আল্লাহ তা‘আলার ওপর আস্থা রাখা আবশ্যক।

৩. যত বড় বিপদই হোক না কেন নিরাশ হওয়া যাবে না।

৪. শরীয়ত সমর্থিত পন্থায় কৌশল অবলম্বন করা বৈধ। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর ভাইকে নিজের নিকট রাখার জন্য কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭৩-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ নিজেদের উপর চুরির অপবাদ শুনে কান খাড়া করে দেন এবং বলেনঃ “আপনারা আমাদের পরিচয় পেয়ে গেছেন এবং আমাদের অভ্যাস ও চরিত্র সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আমরা ভূপৃষ্ঠে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইনে এবং চুরি করার অভ্যাসও আমাদের নেই। তাদের এ কথা শুনে সরকারী কর্মচারীগণ বললো: “যদি তোমাদের মধ্যে কেউ চোর সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং তোমরা মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হও তবে তার শাস্তি কি হবে?” তারা উত্তরে বললেনঃ “দ্বীনে ইবরাহীমের (আঃ) বিধান অনুযায়ী এর শাস্তি এই যে, যার মাল সে চুরি করেছে তারই কাছে তাকে সমর্পণ করতে হবে। আমাদের শরীয়তের ফায়সালা এটাই।” এতে হযরত ইউসুফের (আঃ) উদ্দেশ্য সফল হয়ে গেল। সুতরাং তিনি তাদের তল্লাশী নেয়ার নির্দেশ দিলেন। প্রথমে তার বৈমাত্রেয় ভাইদের তল্লাশী নেয়া হলো। অথচ তাঁর এটা জানা ছিল যে, তাঁদের মালপত্রের মধ্যে পেয়ালা নেই। কিন্তু যাতে তাদের এবং অন্যান্য লোকদের মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক না হয় এ কারণেই তিনি এরূপ করলেন। যখন তার বৈমাত্রেয় ভাইদের মালপত্রের উপর তল্লাশী চালানোর পর পেয়ালা পাওয়া গেল না তখন বিনইয়ামীনের মাল পত্রের উপর তল্লাশী চালানো হলো। তাঁর মালপত্রের মধ্যে তা রাখা ছিল বলে তাঁর বস্তার মধ্যে থেকে তা বেরিয়ে পড়লো। সুতরাং তাঁকে বন্দী করে নেয়া হলো। এই ব্যবস্থাই ছিল আল্লাহ পাকের হিকমতের ফল যা তিনি হযরত ইউসুফ (আঃ) এবং বিনইয়ামীন প্রভৃতির উপযোগিতার জন্যেই তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। কেননা, মিসরের বাদশাহর আইন অনুসারে চোর সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও হযরত ইউসুফ (আঃ) বিনইয়ামীনকে রাখতে পারতেন না। কিন্তু স্বয়ং ভ্রাতাগণ এই ফায়সালা করেছিলেন বলেই তিনি তা জারি করে দেন। হযরত ইবরাহীমের (আঃ) শরীয়তে চোরের শাস্তি কি তা তাঁর জানা ছিল বলেই তিনি তার ভাইদের কাছে ফায়সালা চেয়েছিলেন। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি।’ যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার তাদেরকে আল্লাহ মর্যাদায় উন্নীত করে থাকেন।”(৫৮: ১১)

প্রত্যেক জ্ঞানবানের উপরে রয়েছেন আর একজন জ্ঞানবান এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআ’লাই হচ্ছেন সর্বজ্ঞানী। জ্ঞানের সূচনা তাঁর থেকেই এবং তাঁর কাছেই রয়েছে জ্ঞানের শেষ সীমা। হযরত আবদুল্লাহর (রাঃ) কিরআতে (আরবি) এইরূপ রয়েছে। অর্থাৎ ‘প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর একজন মহাজ্ঞানী রয়েছেন।’





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।