সূরা ইউসুফ (আয়াত: 25)
হরকত ছাড়া:
واستبقا الباب وقدت قميصه من دبر وألفيا سيدها لدى الباب قالت ما جزاء من أراد بأهلك سوءا إلا أن يسجن أو عذاب أليم ﴿٢٥﴾
হরকত সহ:
وَ اسْتَبَقَا الْبَابَ وَ قَدَّتْ قَمِیْصَهٗ مِنْ دُبُرٍ وَّ اَلْفَیَا سَیِّدَهَا لَدَا الْبَابِ ؕ قَالَتْ مَا جَزَآءُ مَنْ اَرَادَ بِاَهْلِکَ سُوْٓءًا اِلَّاۤ اَنْ یُّسْجَنَ اَوْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ ﴿۲۵﴾
উচ্চারণ: ওয়াছ তাবাকাল বা-বা ওয়া কাদ্দাত কামীসাহূমিন দুবুরিওঁ ওয়া আলফাইয়া-ছাইয়িদাহালাদাল বা-বি কা-লাত মা-জাযাউ মান আরা-দা বিআহলিকা ছূআন ইল্লাআইঁ ইউছজানা আও ‘আযা-বুন আলীম।
আল বায়ান: আর তারা উভয়ে দরজার দিকে দৌড়ে গেল এবং মহিলা পেছন হতে তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। আর তারা মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলা বলল, ‘যে লোক তোমার পরিবারের সাথে মন্দকর্ম করতে চেয়েছে, তাকে কারাবন্দি করা বা যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দেয়া ছাড়া তার আর কী দন্ড হতে পারে’?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৫. আর তারা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল এবং স্ত্রীলোকটি পিছন হতে তার জামা ছিড়ে ফেলল, আর তারা দু’জন স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। স্ত্রীলোকটি বলল, যে তোমার পরিবারের সাথে মন্দ কাজ করার ইচ্ছা করে তার জন্য কারাগারে প্রেরণ বা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কি দণ্ড হতে পারে?
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা উভয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল আর স্ত্রীলোকটি পিছন হতে তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। এ সময় স্ত্রীলোকটির স্বামীকে তারা দু’জনে দরজার কাছে পেল। মহিলাটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সাথে অপকর্ম করতে চায় তাকে জেলে পাঠানো অথবা ভয়াবহ শাস্তি ছাড়া উপযুক্ত দন্ড কী আর দেয়া যেতে পারে?’
আহসানুল বায়ান: (২৫) তারা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল[1] এবং মহিলাটি পিছন হতে (তাকে টেনে রুখতে গিয়ে) তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। তারা মহিলাটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলাটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সাথে কুকর্ম কামনা করে, তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক শাস্তি ব্যতীত কি দন্ড হতে পারে?’ [2]
মুজিবুর রহমান: তারা উভয়ে দৌড়ে দরযার দিকে গেল এবং স্ত্রী লোকটি পিছন হতে তার জামা ছিড়ে ফেলল, তারা স্ত্রী লোকটির স্বামীকে দরযার কাছে দেখতে পেল। স্ত্রী লোকটি বললঃ যে তোমার পরিবারের সাথে কু-কাজ কামনা করে তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক শাস্তি ব্যতীত আর কি দন্ড হতে পারে?
ফযলুর রহমান: তারা দুজনেই দরজার কাছে দৌড়ে গেল। আর মহিলা পেছন থেকে তার (ইউসুফের) জামা ছিঁড়ে ফেলল। তারা দুজনে দরজার কাছে (গিয়ে) মহিলার স্বামীকে দেখতে পেল। তখন মহিলা (তার স্বামীকে) বলল, “তোমার স্ত্রীর সাথে যে অন্যায় কাজ করতে চেয়েছিল, তাকে কারারুদ্ধ করা অথবা যন্ত্রণাদায়ক কোন শাস্তি দেওয়া ছাড়া তার আর কী দণ্ড হতে পারে?
মুহিউদ্দিন খান: তারা উভয়ে ছুটে দরজার দিকে গেল এবং মহিলা ইউসুফের জামা পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল। উভয়ে মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলা বললঃ যে ব্যক্তি তোমার পরিজনের সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে, তাকে কারাগারে পাঠানো অথবা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া ছাড়া তার আর কি শাস্তি হতে পারে?
জহুরুল হক: আর তারা দুজনেই দরজার দিকে দৌড়লো, আর সে তাঁর জামা পেছনের দিক থেকে ছিড়ে ফেঁললো, আর তারা দুজনে দরজার নিকটে দেখা পেল তার স্বামীর। সে বললে -- "যে তোমার পরিবারের সঙ্গে কুকর্ম কামনা করে তার পরিণাম কারাদন্ড বা মর্মন্তুদ শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে?"
Sahih International: And they both raced to the door, and she tore his shirt from the back, and they found her husband at the door. She said, "What is the recompense of one who intended evil for your wife but that he be imprisoned or a painful punishment?"
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৫. আর তারা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল এবং স্ত্রীলোকটি পিছন হতে তার জামা ছিড়ে ফেলল, আর তারা দু’জন স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। স্ত্রীলোকটি বলল, যে তোমার পরিবারের সাথে মন্দ কাজ করার ইচ্ছা করে তার জন্য কারাগারে প্রেরণ বা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কি দণ্ড হতে পারে?
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৫) তারা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল[1] এবং মহিলাটি পিছন হতে (তাকে টেনে রুখতে গিয়ে) তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। তারা মহিলাটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলাটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সাথে কুকর্ম কামনা করে, তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক শাস্তি ব্যতীত কি দন্ড হতে পারে?’ [2]
তাফসীর:
[1] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এ নারী মন্দকর্মের ইচ্ছায় অটল, তখন তিনি বাইরে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে পালাতে লাগলেন, আর তাঁকে ধরার জন্য সে নারীও তাঁর পশ্চাতে দৌড়তে লাগল। এইভাবে উভয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল।
[2] অর্থাৎ স্বামীকে দেখেই সে (নারী) সতী-সাধী সেজে গেল এবং ইউসুফকে সর্বপ্রকার দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর জন্য শাস্তিও ঠিক করে ফেলল। অথচ প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ এর বিপরীত ছিল। দোষী সে নিজেই ছিল। আর ইউসুফ (আঃ) একেবারে নিষ্পাপ ছিলেন। তিনি সেই কুকর্ম থেকে বাঁচতে আগ্রহী ও সচেষ্ট ছিলেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এখন ইউসুফ (عليه السلام)-এর জন্য এক নতুন পরীক্ষা শুরু হল। কিন্তু ইউসুফ (عليه السلام) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ধৈর্যের পরিচয় দেন। আযীযে মিসর (মিসরের মন্ত্রীর) স্ত্রী (যুলাইখা)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইউসুফ (عليه السلام)-এর যতত্ন ও সুন্দর বাসস্থানসহ সম্মানের সাথে রাখার জন্য, কিন্তু সে স্ত্রী ইউসুফ (عليه السلام) এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়ে, ক্রমে ক্রমে তাঁকে ফুসলাতে থাকে তার সাথে অপকর্ম করার জন্য। এমনকি ঐ মহিলা ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করে দিল (বলা হয় সে ঘরের সাতটি দরজা ছিল) এবং ইউসুফ (عليه السلام)-কে বলল: এসো আমরা কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি। তখন ইউসুফ (عليه السلام) তার এই রকম কামনা-বাসনা দেখে তাকে বললেন: আমি আপনার এই রকম অসৎ উদ্দেশ্য থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং বললেন, দেখুন! আপনার স্বামী আমাকে উত্তমরূপে রেখেছেন এবং আমার সাথে খুবই সদয় ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যিনি আমার সাথে এত ভাল আচরণ করেন ও আমাকে সম্মান করেন তার সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না, এটি সম্ভব নয়। আর বিশ্বাসঘাতক কখনো সফলকাম হয়না, বরং সে কল্যাণ লাভে বঞ্চিত হয়। স্ত্রীলোকটি তাঁর এসব কথা-বার্তায় কান না দিয়ে বরং নিজের কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে মত্ত ছিল। সে তাঁকে আহ্বান জানালো।
মহিলার এসব কথা বার্তা ও আসক্তি দেখে ইউসুফও সে মহিলার প্রতি ঝুঁকে পড়তেন যদি না তাঁর রবের নিদর্শন দেখতেন।
(وَھَمَّ بِھَا لَوْلَآ اَنْ رَّاٰ بُرْهَانَ رَبِّه)
‘এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।’
এই নিদর্শনের ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে মত পার্থক্য থাকলেও সঠিক কথা হল, আল্লাহ তা‘আলার ভয়, যে মনিব তাঁকে আশ্রয় দান করেছেন তার মর্যাদা রক্ষা এবং নিজেকে জুলুম করা থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি এরূপ কাম চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকলেন। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর থেকে মন্দ এবং অশ্লীলতাকে দূরীভুত করলেন এজন্য যে, তিনি একজন সৎ বান্দা এবং আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত ব্যক্তি অর্থাৎ নাবী। (তাফসীর সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
ইউসুফ (عليه السلام) ঐ মহিলার ডাকে সাড়া না দিয়ে বের হবার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন তখন মহিলাটিও তাকে ধরার জন্য তাঁর পিছনে ছুটল এবং ইউসুফ (عليه السلام) এর জামাটি পিছন দিক থেকে ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। এই অবস্থায় উভয়ে দরজার নিকট পৌঁছে যান। দরজায় পৌঁছতেই দেখেন যে, ঐ মহিলার স্বামী দরজার নিকট বিদ্যমান। স্বামীকে দেখা মাত্রই সে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলে: ‘যে আপনার স্ত্রীর সাথে অপর্কমে লিপ্ত হতে চায় তার জন্য কারগারে প্রেরণ বা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে?’
ইউসুফ (عليه السلام) যখন দেখলেন যে, মহিলাটি সমস্ত দোষ তাঁর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে তখন তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বলেন: প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আপনার স্ত্রীই আমাকে অপকর্মের জন্য আহ্বান করছিল কিন্তু আমি তার ডাকে সাড়া না দিয়ে দরজার দিকে ছুটে আসছিলাম তখন সেও আমার পিছনে ছুটে আসল। তখন মহিলার স্বামী বলল: তুমি যে এ দোষ থেকে মুক্ত তার প্রমাণ কী? যদি প্রমাণ না নিয়ে আসতে পারো তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।
তখন আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের ব্যবস্থা করে দিলেন। মহিলার বাড়ির একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু ফায়সালা দিল যে, যদি ইউসুফের জামা পেছন দিক দিয়ে ছেঁড়া থাকে তাহলে ইউসুফ সত্যবাদী মহিলাটি মিথ্যাবাদী আর যদি সামনের দিকে ছেঁড়া থাকে তাহলে মহিলাটি সত্যবাদী, ইউসুফ মিথ্যাবাদী। এখানে ফায়সালাকে شَهِدَ (সাক্ষ্য দিল) শব্দে এ জন্য বুঝানো হয়েছে যে, তখনও বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন ছিল। এ সাক্ষ্যদাতা কে ছিল এ নিয়ে ইমাম কুরতুবী চারটি মত উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে দুটি মত প্রসিদ্ধ (১) এ সাক্ষীদাতা ছোট একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু, মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় কথা বলেছেন। সুহাইলী বলেন, এটাই সঠিক, কারণ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: মায়ের কোলে তিনজন শিশু কথা বলেছে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৫০) তন্মধ্যে ইউসুফ (عليه السلام) এর সাক্ষ্যদাতা একজন বলে উল্লেখ করেছেন। (২) এ সাক্ষীদাতা একজন দূরদর্শী জ্ঞানী ব্যক্তি, আযীযে মিসর তার থেকে পরামর্শ নিতেন। শেষোক্ত মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য। (কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
অতঃপর যখন মহিলার স্বামী দেখলেন যে, ইউসুফের জামা পেছন দিক দিয়ে ছেঁড়া তখন আযীয অর্থাৎ মহিলার স্বামী বুঝতে পারলেন যে, ইউসুফই সত্যবাদী এবং ঐ মহিলা ইউসুফকে অপবাদ দিয়েছে। তখন মহিলার স্বামী বললেন: তোমাদের চক্রান্ত খুবই কঠিন। তুমি যেভাবে ব্যক্ত করেছিলে মনে হয় যেন তুমিই পবিত্র, সে অপরাধী। এখানে নিজ স্ত্রীর কুস্বভাব দেখে নারী জাতি সম্পর্কে মন্তব্য করলেন যে “নিশ্চয়ই এটা তোমাদের চক্রান্ত”। তবে এ মন্তব্য সকল নারী জাতির ক্ষেত্রে সঠিক নয়। সুতরাং তা সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং এর ভিত্তিতে নারী মাত্রই সকলকে চক্রান্তকারী বলা কুরআনের উদ্দেশ্য নয়। যেমন অনেকে উক্ত বাক্য দ্বারা নারীদের সম্পর্কে এরূপ কথা বলে থাকে। আযীয ইউসুফ (عليه السلام) কে সান্ত্বনা দিলেন এবং এ কথা প্রচার করতে বারণ করলেন। তার স্ত্রীকে অপরাধের কারণে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কেউ কোন পাপ কাজের দিকে আহ্বান করলে তাতে সাড়া না দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় চাইতে হবে এবং অন্যায়কারীকে সদুপোদেশ দিতে হবে।
২. ন্যায় ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে আল্লাহ তা‘আলা বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এটা আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্রুতি।
৩. কিয়ামতের দিন সে যুবক আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে যে যুবককে সুন্দরী রমণী অপকর্ম করার আহ্বান করলে বলে আমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করি।
৪. যুবকদেরকে অন্যায় কাজে জড়িত করার জন্য কতক নারীরাই অগ্রগামী।
৫. যারা পাপ থেকে বিরত থাকতে চায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দেন।
৬. যে কোন বিষয় যাচাই বাছাই করে ফায়সালা করা উচিত।
৭. বেগানা মহিলার সাথে একাকিত্বের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত হলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৫-২৯ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফ (আঃ) এবং আযীযের স্ত্রীর অবস্থার খবর দিচ্ছেন যে, যখন মহিলাটি তাঁকে কু-কাজের দিকে আহ্বান করে তখন তিনি নিজেকে রক্ষা করার জন্যে দরজার দিকে দৌড় দেন। আর মহিলাটিও তাঁকে ধরার জন্যে তাঁর পিছনে ছুটে আসে। পিছন থেকে তাঁর জামাটি সে ধরে নেয় এবং তার দিকে টানতে থাকে। এর ফলে হযরত ইউসুফ (আঃ) পিছনের দিকে প্রায় পড়ে যান আর কি। কিন্তু তিনি খুব শক্তির সাথে সামনের দিকে দৌড়ে যান। এতে তার জামার পিছনের দিক ছিঁড়ে যায়। এই অবস্থায় উভয়ে দরজার উপর পৌঁছে যান। দরজার উপর পৌঁছেই তাঁরা দেখতে পান যে, মহিলাটির স্বামী তথায় বিদ্যমান রয়েছেন। স্বামীকে দেখা মাত্রই সে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলেঃ “যে আপনার স্ত্রীর সাথে (অর্থাৎ আমার সাথে) কুকর্মে লিপ্ত হতে চায় তার জন্যে কারাগারে প্রেরণ বা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কি দণ্ড হতে পারে?” হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, মহিলাটি সমস্ত দোষ তারই উপর চাপিয়ে দিচ্ছে তখন তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে বলেনঃ “প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আপনার স্ত্রীই আমাকে কুকার্যের দিকে আহ্বান করেছিল। আমি তার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পালিয়ে আসছিলাম এবং সেও আমার পিছনে পিছনে দৌড়ে আসছিল। আমার জামাটি সে পিছন দিক থেকে টেনে ধরেছিল। দেখুন, আমার জামার পিছন দিক ছিঁড়ে গিয়েছে।” ঐ মহিলাটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলো এবং আযীযকে বললো: “ইউসুফের (আঃ) ছিন্ন জামাটি দেখুন। যদি ওটার সামনের দিকে ছেড়া থাকে তবে নিশ্চিত রূপে জানবেন যে, আপনার স্ত্রী সত্য কথা বলেছে এবং ইউসুফ (আঃ) মিথ্যাবাদী। আর যদি তার জামাটির পিছন দিকে ছেড়া থাকে তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আপনার স্ত্রী মিথ্যা বলেছে এবং ইউসুফ (আঃ) সত্যবাদী।
সাক্ষীটি বড় মনুষ ছিল কি ছোট ছেলে ছিল এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাক্ষীটির মুখে দাড়ি ছিল এবং সে বাদশাহর একজন বিশিষ্ট লোক ছিল। অনুরূপভাবে মুজাহিদ (রঃ) ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা’ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ), প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, সে একজন (বয়োঃপ্রাপ্ত) পুরুষ লোক ছিল। সে ছিল মহিলাটির চাচাতো ভাই। মহিলাটি ছিল সে সময়ের বাদশাহ রাইয়ান ইবনু ওয়ালীদের ভাগিনেয়ী। (আরবি) সম্পর্কে আওফী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, সাক্ষীটি ছিল দোলনার শিশু।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “শিশু অবস্থায় চারজন কথা বলেছে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তাদের মধ্যে তিনি ইউসুফের (আঃ) সাক্ষীকে একজন বলে উল্লেখ করেন।
সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “শৈশবাবস্থায় চারজন কথা বলেছে। (১) ফিরআউনের কন্যা মাশতার পূত্র, (২) ইউসুফের (আঃ) সাক্ষী, (৩) জুরাইজের সা’হিব (সাক্ষী), এবং (৪) হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ)।। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটা ছিল আল্লাহর হুকুম মাত্র, ওটা কোন মানুষই ছিল না। কিন্তু এটা খুবই গরীব বা দুর্বল উক্তি।
আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবি) অর্থাৎ সাক্ষীর সাক্ষ্য অনুসারে যুলাইখার স্বামী আযীয যখন দেখলেন যে, ইউসুফের (আঃ) জামাটির পিছনের দিক ছেড়া রয়েছে তখন তার কাছে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, ইউসুফ (আঃ) সত্যবাদী এবং তাঁর স্ত্রী যুলাইখা মিথ্যাবাদী। সে ইউসুফের (আঃ) উপর অপবাদ দিয়েছে। সুতরাং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিনি বলে উঠলেনঃ “হে যুলাইখা! এটা তোমাদের স্ত্রীলোকদের প্রবঞ্চণা ও চাতুরী ছাড়া কিছুই নয়। এই তরুণ যুবককে তুমি অপবাদ দিয়েছে এবং তাঁর উপর মিথ্যা দোষ চাপিয়েছো। তুমি তাঁকে তোমার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছিলে। এরপর তিনি হযরত ইউসুফকে (আঃ) সান্ত্বনা ও স্নেহের সুরে বলেনঃ “তুমি এ ঘটনাকে ভুলে যাও। এই জঘন্য ঘটনার আলোচনারই কোন প্রয়োজন নেই। তুমি এটা কারো সামনে বর্ণনা করো না।” অতঃপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে উপদেশের সুরে বললেনঃ “তুমি তোমার এই পাপের জন্যে আল্লাহ তাআ’লার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।” তিনি খুব কোমল হুদয়ের লোক ছিলেন এবং ছিলেন খুব সহজ ও সরল প্রকৃতির লোক। অথবা হয়তো তিনি মনে করেছিলেন যে, স্ত্রীলোক ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য। সে এমন কিছু দেখেছে যার উপর ধৈর্য ধারণ করা তার উপর কঠিন হয়েছে। এজন্যেই তিনি তাকে হিদায়াত করলেনঃ “তুমি তোমার এই পাপকার্য হতে তওবা কর। সরাসরি তুমিই অপরাধিনী। অথচ তুমি দোষ চাপাচ্ছ অন্যের উপর।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।