সূরা ইউসুফ (আয়াত: 24)
হরকত ছাড়া:
ولقد همت به وهم بها لولا أن رأى برهان ربه كذلك لنصرف عنه السوء والفحشاء إنه من عبادنا المخلصين ﴿٢٤﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ هَمَّتْ بِهٖ ۚ وَ هَمَّ بِهَا لَوْ لَاۤ اَنْ رَّاٰ بُرْهَانَ رَبِّهٖ ؕ کَذٰلِکَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوْٓءَ وَ الْفَحْشَآءَ ؕ اِنَّهٗ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِیْنَ ﴿۲۴﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ হাম্মাত বিহী ওয়া হাম্মা বিহা-লাওলা-আর রাআ-বুরহা-না রাব্বিহী কাযা-লিকা লিনাসরিফা ‘আনহুছছূআ ওয়াল ফাহশাআ ইন্নাহূমিন ‘ইবা-দিনাল মুখলাসীন।
আল বায়ান: আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হল, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হত, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ* প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. আর সে মহিলা তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং তিনিও তার প্রতি আসক্ত(১) হয়ে পড়তেন যদি না তিনি তার রবের নিদর্শন দেখতে পেতেন।(২) এভাবেই (তা হয়েছিল), যাতে আমরা তার থেকে মন্দকাজ ও অশ্লীলতা দূর করে দেই(৩)। তিনি তো ছিলেন আমাদের মুখলিস বা বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: সেই মহিলা তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল আর সে (ইউসুফ)ও তার প্রতি আসক্ত হয়েই যেত যদি সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন না দেখত। আমি তা দেখিয়েছিলাম তাকে অসৎ কর্ম ও নির্লজ্জতা থেকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে, সে ছিল বিশুদ্ধ-হৃদয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
আহসানুল বায়ান: (২৪) নিশ্চয় সেই মহিলা তার প্রতি আসক্তা হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত;[1] যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।[2] তাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম।[3] অবশ্যই সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের একজন।
মুজিবুর রহমান: সেই রমণীতো তার প্রতি আসক্ত হয়ে ছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার রবের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত। তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিল আমার বিশুদ্ধ চিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
ফযলুর রহমান: আসলে ঐ মহিলা তাকে নিয়ে কুচিন্তা করেছিল। আর সেও তাকে নিয়ে কুচিন্তা করত যদি না সে তার প্রভুর নিদর্শন দেখতে পেত। এভাবেই (তাকে নিদর্শন দেখানো) হয়েছিল, যাতে আমি তার থেকে অন্যায় আর অপকর্ম দূরে রাখতে পারি। সে তো আমার মনোনীত বান্দাদেরই অন্যতম।
মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিল এবং সেও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করত। যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করত। এমনিবাবে হয়েছে, যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নিলজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।
জহুরুল হক: আর সে নারী নিশ্চয়ই তাঁর প্রতি আসক্ত হয়েছিল, আর তিনিও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তেন যদি না তিনি তাঁর প্রভুর স্পষ্ট- প্রমাণ প্রত্যক্ষ করতেন। এইভাবে আমরা যেন তাঁর কাছ থেকে হটিয়ে দিতে পারি মন্দকাজ ও অশ্লীলতা। নিঃসন্দেহ তিনি ছিলেন আমাদের একান্ত অনুরক্ত দাসদের অন্যতম।
Sahih International: And she certainly determined [to seduce] him, and he would have inclined to her had he not seen the proof of his Lord. And thus [it was] that We should avert from him evil and immorality. Indeed, he was of Our chosen servants.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৪. আর সে মহিলা তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং তিনিও তার প্রতি আসক্ত(১) হয়ে পড়তেন যদি না তিনি তার রবের নিদর্শন দেখতে পেতেন।(২) এভাবেই (তা হয়েছিল), যাতে আমরা তার থেকে মন্দকাজ ও অশ্লীলতা দূর করে দেই(৩)। তিনি তো ছিলেন আমাদের মুখলিস বা বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
তাফসীর:
(১) আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, উল্লেখিত মহিলাটি অর্থাৎ আযীয-পত্নী তো পাপকাজের কল্পনায় বিভোরই ছিল, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মনেও মানবিক স্বভাববশতঃ কিছু কিছু অনিচ্ছাকৃত ঝোক সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা ঠিক সেই মুহুর্তে স্বীয় যুক্তি-প্রমাণ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে তুলে ধরেন, যদ্দরুন সেই অনিচ্ছাকৃত ঝোঁক ক্রমবর্ধিত হওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল এবং তিনি মহিলার নাগপাশ ছিন্ন করে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগলেন।
এ আয়াতে هَمَّ শব্দটি (মনে উদিত হওয়ার অর্থে) ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও আযীয পত্নী উভয়ের প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে। কেবলমাত্র কোন খারাপ কাজের কথা মনে উদিত হলেই গোনাহ হয় না। [ইবনুল কাইয়্যেম, রাওদাতুল মুহিব্বীনঃ ২৯৮] মোটকথা, ইউসুফ আলাইহিস সালাম থেকে এমন কিছু হয়নি যা গোনাহ বলে বিবেচিত হতে পারে। [ইবন তাইমিয়্যা: মাজমু ফাতাওয়া]
বরং আল্লাহ স্বয়ং তার নবী ইউসুফকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদেরকে বলেনঃ আমার বান্দা যখন কোন পাপ কাজের ইচ্ছা করে, তখনি তা লিখে ফেলো না, যতক্ষণ সে তা করে না বসে। তারপর যদি আল্লাহর ভয়ে তা পরিত্যাগ করে, তখন পাপের পরিবর্তে তার আমলনামায় একটি নেকী লিখে দাও এবং যদি পাপকাজটি করেই ফেলে তবে একটি গোনাহই লিপিবদ্ধ কর। আর যদি কোন সৎকাজের ইচ্ছা করে কিন্তু তা করল না, তবুও তার জন্য একটি নেকী লিখে দাও। তারপর যখন সে তা সম্পাদন করে তখন তার জন্য দশগুণ থেকে সাতশ’ গুণ বর্ধিত করে লিখে দাও। [বুখারীঃ ৭৫০১, মুসলিমঃ ১২৮]
মোটকথা এই যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে যে কল্পনা অথবা ঝোঁক সৃষ্টি হয়েছিল, তা গোনাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। অতঃপর এর বিপক্ষে কাজ করার দরুন আল্লাহ তা'আলার কাছে তার মর্যাদা আরো বেড়ে গেছে। [ইবনুল কাইয়্যেম, রাওদাতুল মুহিব্বীন: ২৯৮] কোন কোন মুফাসসিরের মতে (لَوْلَا أَنْ رَأَىٰ بُرْهَانَ رَبِّهِ) এ অংশটি পরে উল্লেখ করা হলেও তা আসলে অগ্রে রয়েছে। অতএব, আয়াতের অর্থ এই যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মনেও কল্পনা সৃষ্টি হত, যদি তিনি আল্লাহর প্রমাণ অবলোকন না করতেন। কিন্তু পালনকর্তার প্রমাণ অবলোকন করার কারণে তিনি এ কল্পনা থেকে বেঁচে গেলেন। এ বিষয়বস্তুটি সঠিক, কিন্তু কোন কোন তাফসীরবিদ এ অগ্র-পশ্চাৎকে ব্যাকরণিক ভুল আখ্যা দিয়েছেন। [তাবারী; ইবন কাসীর; ইবন তাইমিয়্যা, মাজমু ফাতাওয়া ১০/১০১, ২৯৬-২৯৭, ৭৪০]
(২) স্বীয় পালনকর্তার যে প্রমাণ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর দৃষ্টির সামনে এসেছিল, তা কি ছিল কুরআনুল কারীম তা ব্যক্ত করেনি। এ কারণেই এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। তাফসীরবিদ ইবনে কাসীর সেসব উক্তি উদ্ধৃত করার পর যে মন্তব্য করেছেন, তা সব সুধীজনের কাছেই সর্বাপেক্ষা সাবলীল ও গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেছেনঃ কুরআনুল কারীম যতটুকু বিষয় বর্ণনা করেছে, ততটুকু নিয়েই ক্ষান্ত থাকা দরকার। অর্থাৎ ইউসুফ আলাইহিস সালাম এমন কিছু দেখেছেন, যদ্দরুন তার মন থেকে সীমালংঘন করার সামান্য ধারণাও বিদূরিত হয়ে গেছে। এ বস্তুটি কি ছিল তা নিশ্চিতরূপে নির্দিষ্ট করা যায় না।
(৩) অর্থাৎ তার রবের প্রমাণ দেখা ও গুনাহ থেকে রক্ষা পাওয়া আমার দেয়া সুযোগ ও পথ প্রদর্শনের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। কেননা, আমরা নিজের এ নির্বাচিত বান্দাটি থেকে অসৎবৃত্তি ও অশ্লীলতা দূর করতে চাচ্ছিলাম। যেভাবে আমরা তাকে এ অশ্লীলতা থেকে ফিরিয়ে রেখেছিলাম তেমনি আমরা তাকে এর পরেও অসৎবৃত্তি ও অশ্লীলতা থেকে ফিরিয়ে রাখব। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৪) নিশ্চয় সেই মহিলা তার প্রতি আসক্তা হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত;[1] যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।[2] তাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম।[3] অবশ্যই সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের একজন।
তাফসীর:
[1] কোন কোন মুফাসসির এর এই মর্মার্থ বর্ণনা করেছেন যে, (لَولاَ أَن رَّأى بُرْهَانَ رَبِّهِ) বাক্যটির পূর্ব বাক্য (وَهَمَّ بِهَا) এর সাথে কোন সম্পর্ক নেই; বরং তার উত্তর ঊহ্য আছে। অর্থাৎ বাক্যটি হল এরূপ لَولاَ أنْ رَأى بُرْهَانَ رَبِّهِ لَفَعَلَ مَا هَمَّ بِهِ অর্থ হবে, ‘‘যদি ইউসুফ আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ না করত, তাহলে যে কাজের সংকল্প সে করেছিল তা করে বসত।’’ এই অর্থই অধিকাংশ মুফাসসিরগণের তফসীর সমর্থন করে। আর যাঁরা তা لَولاَ শব্দের সাথে জুড়ে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, (সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত; যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত। অর্থাৎ) ইউসুফ (আঃ) (নিদর্শন দেখার ফলে মন্দের) কোন সংকল্পই করেননি। কিন্তু পূর্বেকার তফসীরবিদগণ তা আরবীর বর্ণনাভঙ্গির পরিপন্থী বলেছেন এবং এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)ও সংকল্প করে ফেলেছিলেন, কিন্তু প্রথমতঃ এই সংকল্প ও ইচ্ছা এখতিয়ারী ছিল না; বরং আযীযের স্ত্রীর প্রলোভন ও চাপ তাতে প্রভাবশীল ছিল। দ্বিতীয়তঃ কোন পাপ করার ইচ্ছা করাটা পবিত্রতার পরিপন্থী নয়; বরং পাপ কাজে লিপ্ত হওয়া পবিত্রতার পরিপন্থী। (ফাতহুল কাদীর, ইবনে কাসীর) কিন্তু সত্যানুসন্ধানী মুফাসসিরগণ এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, যদি আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট প্রমাণ না দেখতেন, তবে ইউসুফ (আঃ)ও পাপের সংকল্প করে নিতেন। অর্থাৎ, তিনি তাঁর প্রভুর স্পষ্ট প্রমাণ দেখেছিলেন, ফলে আযীযের স্ত্রীর নিকটবর্তী হওয়ার ইচ্ছাই করেননি। বরং পাপের দিকে আহবান শুনেই مَعَاذَ الله বলেছিলেন। অবশ্য পাপ-ইচ্ছা না করার অর্থ এ নয় যে, তাঁর মনে কোন কামনা ও বাসনাই জাগ্রত হয়নি। মনের ভিতর পাপের কামনা ও বাসনা জাগা, আর তার ইচ্ছা করে নেওয়া দু’টি আলাদা জিনিস। প্রকৃতত্ব এই যে, যদি কারো মনের ভিতর একেবারেই কামনা ও বাসনা না জাগে, তাহলে এমন ব্যক্তির এরূপ পাপকর্ম থেকে বিরত থাকা কোন কৃতিত্ব নয়। কৃতিত্ব তো তখনই হবে, যখন মনের মাঝে চাহিদা ও বাসনা সৃষ্টি হবে এবং মানুষ তার উপর নিয়ন্ত্রণ এনে তা থেকে বিরত থাকবে। ইউসুফ (আঃ) এরূপই পরিপূর্ণ ধৈর্য ও সহ্যের নযীরবিহীন কৃতিত্ব পেশ করেছেন।
[2] প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী এখানে لَولاَ শব্দটির জওয়াব (উত্তর) ঊহ্য আছে, আর তা হল (لَفَعَلَ مَا هَمَّ بِه) অর্থাৎ, যদি ইউসুফ (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিদর্শন প্রত্যক্ষ না করতেন, তবে তিনি যা ইচ্ছা করেছিলেন, তা করে বসতেন। উক্ত নিদর্শন কি ছিল? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। উদ্দেশ্য হল যে, প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এমন কোন জিনিস তাকে দেখানো হয়েছিল যে, তা প্রত্যক্ষ করে তিনি যৌন-কামনা সংবরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বরগণকে এইভাবেই হিফাযত করে থাকেন।
[3] অর্থাৎ, যেরূপ আমি ইউসুফ (আঃ)-কে নিদর্শন দেখিয়ে, কুকর্ম বা তার ইচ্ছা থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম, অনুরূপ আমি তাকে সর্ববিষয়ে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করেছি। কারণ সে আমার মনোনীত ও বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এখন ইউসুফ (عليه السلام)-এর জন্য এক নতুন পরীক্ষা শুরু হল। কিন্তু ইউসুফ (عليه السلام) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ধৈর্যের পরিচয় দেন। আযীযে মিসর (মিসরের মন্ত্রীর) স্ত্রী (যুলাইখা)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইউসুফ (عليه السلام)-এর যতত্ন ও সুন্দর বাসস্থানসহ সম্মানের সাথে রাখার জন্য, কিন্তু সে স্ত্রী ইউসুফ (عليه السلام) এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়ে, ক্রমে ক্রমে তাঁকে ফুসলাতে থাকে তার সাথে অপকর্ম করার জন্য। এমনকি ঐ মহিলা ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করে দিল (বলা হয় সে ঘরের সাতটি দরজা ছিল) এবং ইউসুফ (عليه السلام)-কে বলল: এসো আমরা কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি। তখন ইউসুফ (عليه السلام) তার এই রকম কামনা-বাসনা দেখে তাকে বললেন: আমি আপনার এই রকম অসৎ উদ্দেশ্য থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং বললেন, দেখুন! আপনার স্বামী আমাকে উত্তমরূপে রেখেছেন এবং আমার সাথে খুবই সদয় ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যিনি আমার সাথে এত ভাল আচরণ করেন ও আমাকে সম্মান করেন তার সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না, এটি সম্ভব নয়। আর বিশ্বাসঘাতক কখনো সফলকাম হয়না, বরং সে কল্যাণ লাভে বঞ্চিত হয়। স্ত্রীলোকটি তাঁর এসব কথা-বার্তায় কান না দিয়ে বরং নিজের কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে মত্ত ছিল। সে তাঁকে আহ্বান জানালো।
মহিলার এসব কথা বার্তা ও আসক্তি দেখে ইউসুফও সে মহিলার প্রতি ঝুঁকে পড়তেন যদি না তাঁর রবের নিদর্শন দেখতেন।
(وَھَمَّ بِھَا لَوْلَآ اَنْ رَّاٰ بُرْهَانَ رَبِّه)
‘এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।’
এই নিদর্শনের ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে মত পার্থক্য থাকলেও সঠিক কথা হল, আল্লাহ তা‘আলার ভয়, যে মনিব তাঁকে আশ্রয় দান করেছেন তার মর্যাদা রক্ষা এবং নিজেকে জুলুম করা থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি এরূপ কাম চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকলেন। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর থেকে মন্দ এবং অশ্লীলতাকে দূরীভুত করলেন এজন্য যে, তিনি একজন সৎ বান্দা এবং আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত ব্যক্তি অর্থাৎ নাবী। (তাফসীর সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
ইউসুফ (عليه السلام) ঐ মহিলার ডাকে সাড়া না দিয়ে বের হবার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন তখন মহিলাটিও তাকে ধরার জন্য তাঁর পিছনে ছুটল এবং ইউসুফ (عليه السلام) এর জামাটি পিছন দিক থেকে ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। এই অবস্থায় উভয়ে দরজার নিকট পৌঁছে যান। দরজায় পৌঁছতেই দেখেন যে, ঐ মহিলার স্বামী দরজার নিকট বিদ্যমান। স্বামীকে দেখা মাত্রই সে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলে: ‘যে আপনার স্ত্রীর সাথে অপর্কমে লিপ্ত হতে চায় তার জন্য কারগারে প্রেরণ বা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে?’
ইউসুফ (عليه السلام) যখন দেখলেন যে, মহিলাটি সমস্ত দোষ তাঁর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে তখন তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বলেন: প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আপনার স্ত্রীই আমাকে অপকর্মের জন্য আহ্বান করছিল কিন্তু আমি তার ডাকে সাড়া না দিয়ে দরজার দিকে ছুটে আসছিলাম তখন সেও আমার পিছনে ছুটে আসল। তখন মহিলার স্বামী বলল: তুমি যে এ দোষ থেকে মুক্ত তার প্রমাণ কী? যদি প্রমাণ না নিয়ে আসতে পারো তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।
তখন আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের ব্যবস্থা করে দিলেন। মহিলার বাড়ির একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু ফায়সালা দিল যে, যদি ইউসুফের জামা পেছন দিক দিয়ে ছেঁড়া থাকে তাহলে ইউসুফ সত্যবাদী মহিলাটি মিথ্যাবাদী আর যদি সামনের দিকে ছেঁড়া থাকে তাহলে মহিলাটি সত্যবাদী, ইউসুফ মিথ্যাবাদী। এখানে ফায়সালাকে شَهِدَ (সাক্ষ্য দিল) শব্দে এ জন্য বুঝানো হয়েছে যে, তখনও বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন ছিল। এ সাক্ষ্যদাতা কে ছিল এ নিয়ে ইমাম কুরতুবী চারটি মত উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে দুটি মত প্রসিদ্ধ (১) এ সাক্ষীদাতা ছোট একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু, মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় কথা বলেছেন। সুহাইলী বলেন, এটাই সঠিক, কারণ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: মায়ের কোলে তিনজন শিশু কথা বলেছে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৫০) তন্মধ্যে ইউসুফ (عليه السلام) এর সাক্ষ্যদাতা একজন বলে উল্লেখ করেছেন। (২) এ সাক্ষীদাতা একজন দূরদর্শী জ্ঞানী ব্যক্তি, আযীযে মিসর তার থেকে পরামর্শ নিতেন। শেষোক্ত মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য। (কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
অতঃপর যখন মহিলার স্বামী দেখলেন যে, ইউসুফের জামা পেছন দিক দিয়ে ছেঁড়া তখন আযীয অর্থাৎ মহিলার স্বামী বুঝতে পারলেন যে, ইউসুফই সত্যবাদী এবং ঐ মহিলা ইউসুফকে অপবাদ দিয়েছে। তখন মহিলার স্বামী বললেন: তোমাদের চক্রান্ত খুবই কঠিন। তুমি যেভাবে ব্যক্ত করেছিলে মনে হয় যেন তুমিই পবিত্র, সে অপরাধী। এখানে নিজ স্ত্রীর কুস্বভাব দেখে নারী জাতি সম্পর্কে মন্তব্য করলেন যে “নিশ্চয়ই এটা তোমাদের চক্রান্ত”। তবে এ মন্তব্য সকল নারী জাতির ক্ষেত্রে সঠিক নয়। সুতরাং তা সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং এর ভিত্তিতে নারী মাত্রই সকলকে চক্রান্তকারী বলা কুরআনের উদ্দেশ্য নয়। যেমন অনেকে উক্ত বাক্য দ্বারা নারীদের সম্পর্কে এরূপ কথা বলে থাকে। আযীয ইউসুফ (عليه السلام) কে সান্ত্বনা দিলেন এবং এ কথা প্রচার করতে বারণ করলেন। তার স্ত্রীকে অপরাধের কারণে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কেউ কোন পাপ কাজের দিকে আহ্বান করলে তাতে সাড়া না দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় চাইতে হবে এবং অন্যায়কারীকে সদুপোদেশ দিতে হবে।
২. ন্যায় ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে আল্লাহ তা‘আলা বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এটা আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্রুতি।
৩. কিয়ামতের দিন সে যুবক আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে যে যুবককে সুন্দরী রমণী অপকর্ম করার আহ্বান করলে বলে আমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করি।
৪. যুবকদেরকে অন্যায় কাজে জড়িত করার জন্য কতক নারীরাই অগ্রগামী।
৫. যারা পাপ থেকে বিরত থাকতে চায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দেন।
৬. যে কোন বিষয় যাচাই বাছাই করে ফায়সালা করা উচিত।
৭. বেগানা মহিলার সাথে একাকিত্বের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত হলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এই স্থানে গুরুজনদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) এবং পূর্ববর্তী গুরুজনদের একটি দল হতে এ সম্পর্কে কিছু উক্তি বর্ণিত হয়েছে, যা ইবনু জারীর (রঃ) এবং আরো কেউ রিওয়াইয়াত করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। বলা হয়েছে যে, ঐ নারীর প্রতি হযরত ইউসুফের (আঃ) কামনা নফসের খট্কা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বাগাভীর (রঃ) হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (ফেরেশতাদেরকে) বলে থাকেনঃ ‘আমার বান্দা যখন কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে তখন তোমরা ওর জন্যে পুণ্য লিখে নাও। অতঃপর সে যদি ঐ আমল করে ফেলে তবে ওর দশ গুন পূণ্য লিখে ফেল। আর যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে এবং তা করে না ফেলে তবে ওর জন্যে পূণ্য লিখে নাও। কেননা, সে আমার (শাস্তির ভয়ের) কারণেই ওটা ছেড়ে দিয়েছে আর যদি সে ঐ কাজ করে বসে তবে তোমরা ঐ পরিমাণই পাপ লিখে নাও।” এই হাদীসের শব্দগুলি আরও কয়েক রকমের রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি রয়েছে।
একটি উক্তি এও রয়েছে যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) তাকে (আযীযের স্ত্রীকে) মারার ইচ্ছা করেছিলেন। তাকে তিনি স্ত্রীরূপে গ্রহণ করার আকাঙ্খা করেছিলেন এরূপও একটি উক্তি আছে। একটি উক্তি রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করতেন যদি না দলীল দেখতেন। কিন্তু দলীল দেখেছিলেন বলে ইচ্ছা করেন নাই। কিন্তু আরবী ভাষার দিক দিয়ে এই উক্তি সম্পর্কে সমালোচনার অবকাশ রয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) প্রমূখ গুরুজন এটা বর্ণনা করেছেন। এতো হলো হযরত ইউসুফের (আঃ) ইচ্ছা সম্পর্কীয় কথা। এখন যে দলীল তিনি দেখেছিলেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), সাঈদ (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু সীরীন (রঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা’ (রঃ) আবু সালিহ (রঃ), যহ্হাক (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) ছবি সামনে দেখতে পান, তিনি যেন স্বীয় অঙ্গুলী মুখে পুরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, তিনি হযরত ইউসুফের (আঃ) বক্ষে হাত মারেন। আওফী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) সামনে তাঁর মনিবের (আযীযের) খেয়ালী ছবি প্রতিফলিত হয়েছিল।
মুহাম্মদ ইবনু কা'ব আল কারাযী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) ঘরের ছাদের দিকে চক্ষু উঠিয়ে দেখেন যে, তাতে লিখিত রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “সাবধান! ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় এটা বড়ই নির্লজ্জতাপূর্ণ এবং আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী কাজ, আর এটা খুবই খারাপ পথ।” (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
কারাযী (রঃ) এও বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) যে দলীল (বুরহান) দেখেছিলেন তা ছিল আল্লাহর কিতাবের তিনটি আয়াত। ঐ গুলি হচ্ছে: (আরবি)
আবু হিলাল (রঃ) কারাযীর (রঃ) মতই উক্তি করেছেন। তবে তিনি (আরবি) এই চতুর্থ আয়াতটি অতিরিক্ত মিলিয়ে দিয়েছেন।
ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, দেয়ালে তিনি আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত দেখেছিলেন যা তাঁকে ব্যভিচার হতে বিরত রেখেছিল। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেনঃ সঠিক কথা এই যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্য হতে কোন একটি নিদর্শন দেখেছিলেন যা তাকে কামনা চরিতার্থ করতে বাধা দিয়েছিল। সেটা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) ছবিও হতে পারে, বাদশা’র ছবিও হতে পারে অথবা এটাও হতে পারে যে, তিনি লিখিত কিছু দেখেছিলেন যা তাঁকে দুষ্কর্ম থেকে বাধা দিয়েছিল।
এমন কোন স্পষ্ট দলীল নেই যে, আমরা কোন নির্দিষ্ট জিনিষের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি। সুতরাং আমাদের জন্যে সঠিক পন্থা এটাই যে, আমরা এটাকে সাধারণের উপর ছেড়ে দেই, যেমন মহান আল্লাহর উক্তি সাধারণই রয়েছে।
আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেমন ভাবে আমি ইউসুফকে (আঃ) একটি দলীল দেখিয়ে দুষ্কর্ম থেকে ঐ সময় রক্ষা করেছি, তেমনিভাবে তার অন্যান্য কাজেও তাকে সাহায্য করতে থেকেছি এবং তাকে মন্দ ও নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। তার উপর আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।