আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 23)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 23)



হরকত ছাড়া:

وراودته التي هو في بيتها عن نفسه وغلقت الأبواب وقالت هيت لك قال معاذ الله إنه ربي أحسن مثواي إنه لا يفلح الظالمون ﴿٢٣﴾




হরকত সহ:

وَ رَاوَدَتْهُ الَّتِیْ هُوَ فِیْ بَیْتِهَا عَنْ نَّفْسِهٖ وَ غَلَّقَتِ الْاَبْوَابَ وَ قَالَتْ هَیْتَ لَکَ ؕ قَالَ مَعَاذَ اللّٰهِ اِنَّهٗ رَبِّیْۤ اَحْسَنَ مَثْوَایَ ؕ اِنَّهٗ لَا یُفْلِحُ الظّٰلِمُوْنَ ﴿۲۳﴾




উচ্চারণ: ওয়ারা-ওয়াদাত হুল্লাতী হুওয়া ফী বাইতিহা-‘আন নাফছিহী ওয়া গাল্লাকাতিল আবওয়া-বা ওয়াকা-লাত হাইতা লাকা কা-লা মা‘আ-যাল্লা-হি ইন্নাহূরাববী-আহছানা মাছওয়াইয়া; ইন্নাহূলা-ইউফলিহুজ্জা-লিমূন।




আল বায়ান: আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো’। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩. আর তিনি যে স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলেন সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল, আর বলল, আস(১)। তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি(২), নিশ্চয় তিনি আমার মনিব; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমরা সফলকাম হয় না।(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে (মহিলাটি) তার থেকে অসৎ কর্ম কামনা করল। সে দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো’। সে (ইউসুফ) বলল, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি। তিনি আমার রবব, তিনি আমার থাকার ব্যবস্থা কত উত্তম করেছেন, যালিমরা কক্ষনো সাফল্য লাভ করতে পারে না।




আহসানুল বায়ান: (২৩) সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল, সে তার কাছে (উপযাচিকা হয়ে) যৌন-মিলন কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এস! (আমরা কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি।)’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি (আযীয) আমার প্রভু! তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে স্থান দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’ [1]



মুজিবুর রহমান: সে যে স্ত্রী লোকের গৃহে ছিল সে তার কাছ থেকে অসৎ কাজ কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিল ও বললঃ চলে এসো (আমরা কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি), সে বললঃ আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি (আযীয) আমার প্রভু! তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে থাকতে দিয়েছেন, সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয়না।



ফযলুর রহমান: সে যে মহিলার ঘরে ছিল সে তাকে (কুকর্মে) প্ররোচিত করল এবং দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “এদিকে এসো”। (তখন) সে বলল, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই! তিনি (আপনার স্বামী) আমার মালিক। তিনি আমার বসবাসের সুব্যবস্থা করেছেন। (অতএব, আমি কিছুতেই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করব না।) অন্যায়কারীরা কখনও সফল হয় না।”



মুহিউদ্দিন খান: আর সে যে মহিলার ঘরে ছিল, ঐ মহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল এবং দরজাসমূহ বন্ধ করে দিল। সে মহিলা বললঃ শুন! তোমাকে বলছি, এদিকে আস, সে বললঃ আল্লাহ রক্ষা করুন; তোমার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমা লংঘনকারীগণ সফল হয় না।



জহুরুল হক: আর যে মহিলায় গৃহে তিনি ছিলেন সে তাঁকে কামনা করল তাঁর অন্তরঙ্গতার, আর বন্ধ করে দিলে দরজাগুলো ও বললে -- "এসো হে তুমি!" তিনি বললেন -- "আল্লাহ্ সহায় হোন! আমার প্রভু নিশ্চয়ই আমার আশ্রয়স্থল অতি উত্তম বানিয়েছেন। নিঃসন্দেহ তিনি অন্যায়কারীদের উন্নতি করেন না।"



Sahih International: And she, in whose house he was, sought to seduce him. She closed the doors and said, "Come, you." He said, "[I seek] the refuge of Allah. Indeed, he is my master, who has made good my residence. Indeed, wrongdoers will not succeed."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৩. আর তিনি যে স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলেন সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল, আর বলল, আস(১)। তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি(২), নিশ্চয় তিনি আমার মনিব; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমরা সফলকাম হয় না।(৩)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ যে মহিলার গৃহে ইউসুফ আলাইহিস সালাম থাকতেন, সে তার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ল এবং তার সাথে কু বাসনা চরিতার্থ করার জন্য তাকে ফুসলাতে লাগল। সে গৃহের সব দরজা বন্ধ করে দিল এবং তাকে বললঃ শীঘ্রই এসে যাও, তোমাকে বলছি। (هَيْتَ لَكَ) শব্দের এক অর্থ, আমার কাছে এস, তোমার কাজ সম্পাদনের জন্য। দ্বিতীয় অর্থ, আমি তোমার জন্য প্রস্তুত। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]

প্রথম আয়াতে জানা গিয়েছিল যে, এ মহিলা ছিল আযীযে মিসরের স্ত্রী। কিন্তু এস্থলে কুরআন ‘আযীয-পত্নী’ এই সংক্ষিপ্ত শব্দ ছেড়ে যার গৃহে সে ছিল -এ শব্দ ব্যবহার করেছে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা এ কারণে আরো অধিক কঠিন ছিল যে, তিনি তারই গৃহে- তারই আশ্রয়ে থাকতেন। তার আদেশ উপেক্ষা করা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর পক্ষে সহজসাধ্য ছিল না। [ইবনুল কাইয়্যেম, রাওদাতুল মুহিব্বীন: ২৯৭-৩০০]

আর এজন্যই ঐ সমস্ত লোকদেরকে কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করবে বলে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যারা সুন্দরী-ধনী মহিলার কুপ্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে। এবং তাকে ভয় করে বলে ঘোষণা দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ সাত শ্রেণীর লোকদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা আরশের নীচে ছায়া দেবেন। তন্মধ্যে ঐ ব্যক্তির উল্লেখ করেছেন, যাকে কোন ধনাঢ্য-পদস্থ-সুন্দরী মহিলা খারাপ কর্মকাণ্ডের আহবান জানালে সে আল্লাহকে ভয় করে ঘোষণা দিয়ে তা হতে দূরে থাকে। [বুখারীঃ ৬৬০]


(২) এর বাহ্যিক কারণ ঘটে এই যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন নিজেকে চতুর্দিক থেকে বেষ্টিত দেখলেন, তখন নবীসুলভ ভঙ্গিতে সর্বপ্রথম আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করলেন, তিনি শুধু নিজ ইচ্ছা ও সংকল্পের উপর ভরসা করেননি। এটা জানা কথা যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর আশ্রয় লাভ করে, তাকে কেউ বিশুদ্ধ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। বস্তুতঃ গোনাহ থেকে বাঁচার প্রধান অবলম্বন হল আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।


(৩) তিনি নবীসুলভ বিজ্ঞতা ও উপদেশ প্রয়োগ করে স্বয়ং সেই মহিলাকে উপদেশ দিতে লাগলেন যে, তারও উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং মন্দ বাসনা থেকে বিরত থাকা। তিনি বললেনঃ (إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ) তিনি আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে সুখে রেখেছেন। মনে রেখো, অত্যাচারীরা কল্যাণপ্রাপ্ত হয় না। বাহ্যিক অর্থ এই যে, তোমার স্বামী আযীযে-মিসর আমাকে লালন-পালন করেছেন, আমাকে উত্তম জায়গা দিয়েছেন। অতএব তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহকারী। আমি তার ইযযতে হস্তক্ষেপ করব? এটা জঘন্য অনাচার, অথচ অনাচারীরা কখনো কল্যাণপ্রাপ্ত হয় না। [কুরতুবী]

এভাবে তিনি যেন স্বয়ং সেই মহিলাকেও এ শিক্ষা দিলেন যে, আমি কয়েকদিন লালন-পালনের কৃতজ্ঞতা যখন এতটুকু স্বীকার করি, তখন তোমাকে আরো বেশী স্বীকার করা দরকার। এ ব্যাখ্যা অনুসারে সমস্যা হলো, এখানে ইউসুফ আলাইহিস সালাম আযীযে-মিসরকে স্বীয় রব শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সম্ভবত এর কারণ, এখানে ربي বলে سيدي বা আমার মনিব বোঝানো হয়েছে।

তখন সাধারণ নিয়মানুসারে তা ব্যবহার করার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এর দ্বারা বাহ্যিক নেয়ামতের মালিক বোঝানো উদ্দেশ্য। কারণ মূলতঃ ইউসুফ আলাইহিস সালাম তখন দাস হিসেবেই আযীযে-মিসরের ঘরে অবস্থান করছিলেন। সে হিসেবে তিনি আযীযের স্ত্রীকে এ কথার মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলেন যে, আমার উপর আমার মনিবের অনেক নেয়ামত রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি আমাকে লালন করছেন, আমার পক্ষে আমার মনিবের খেয়ানত করা সম্ভব নয়। আয়াতের দ্বিতীয় তাফসীর হচ্ছে, এখানে إِنَّهُ শব্দের সর্বনামটির দ্বারা আল্লাহকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম আল্লাহকেই রব বলেছেন। বসবাসের উত্তম জায়গাও প্রকৃতপক্ষে তিনিই দিয়েছেন। সেমতে তার অবাধ্যতা সর্ববৃহৎ যুলুম। এরূপ যুলুমকারী কখনো সফল হয় না। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৩) সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল, সে তার কাছে (উপযাচিকা হয়ে) যৌন-মিলন কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এস! (আমরা কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি।)’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি (আযীয) আমার প্রভু! তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে স্থান দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’ [1]


তাফসীর:

[1] এখান থেকে ইউসুফ (আঃ)-এর এক নতুন পরীক্ষা আরম্ভ হল। মিসরের আযীযের স্ত্রী, যাকে তার স্বামী বলেছিল যে, ইউসুফকে সম্মানের সাথে রাখবে, সে ইউসুফ (আঃ)-এর রূপ-সৌন্দর্য দেখে আসক্তা হয়ে পড়ল এবং উপযাচিকা হয়ে তাঁকে ব্যভিচারের দিকে আহবান করতে লাগল। কিন্তু ইউসুফ (আঃ) তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকলেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:



এখন ইউসুফ (عليه السلام)-এর জন্য এক নতুন পরীক্ষা শুরু হল। কিন্তু ইউসুফ (عليه السلام) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ধৈর্যের পরিচয় দেন। আযীযে মিসর (মিসরের মন্ত্রীর) স্ত্রী (যুলাইখা)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইউসুফ (عليه السلام)-এর যতত্ন ও সুন্দর বাসস্থানসহ সম্মানের সাথে রাখার জন্য, কিন্তু সে স্ত্রী ইউসুফ (عليه السلام) এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়ে, ক্রমে ক্রমে তাঁকে ফুসলাতে থাকে তার সাথে অপকর্ম করার জন্য। এমনকি ঐ মহিলা ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করে দিল (বলা হয় সে ঘরের সাতটি দরজা ছিল) এবং ইউসুফ (عليه السلام)-কে বলল: এসো আমরা কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি। তখন ইউসুফ (عليه السلام) তার এই রকম কামনা-বাসনা দেখে তাকে বললেন: আমি আপনার এই রকম অসৎ উদ্দেশ্য থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং বললেন, দেখুন! আপনার স্বামী আমাকে উত্তমরূপে রেখেছেন এবং আমার সাথে খুবই সদয় ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যিনি আমার সাথে এত ভাল আচরণ করেন ও আমাকে সম্মান করেন তার সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না, এটি সম্ভব নয়। আর বিশ্বাসঘাতক কখনো সফলকাম হয়না, বরং সে কল্যাণ লাভে বঞ্চিত হয়। স্ত্রীলোকটি তাঁর এসব কথা-বার্তায় কান না দিয়ে বরং নিজের কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে মত্ত ছিল। সে তাঁকে আহ্বান জানালো।



মহিলার এসব কথা বার্তা ও আসক্তি দেখে ইউসুফও সে মহিলার প্রতি ঝুঁকে পড়তেন যদি না তাঁর রবের নিদর্শন দেখতেন।



(وَھَمَّ بِھَا لَوْلَآ اَنْ رَّاٰ بُرْهَانَ رَبِّه)



‘এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।’



এই নিদর্শনের ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে মত পার্থক্য থাকলেও সঠিক কথা হল, আল্লাহ তা‘আলার ভয়, যে মনিব তাঁকে আশ্রয় দান করেছেন তার মর্যাদা রক্ষা এবং নিজেকে জুলুম করা থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি এরূপ কাম চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকলেন। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর থেকে মন্দ এবং অশ্লীলতাকে দূরীভুত করলেন এজন্য যে, তিনি একজন সৎ বান্দা এবং আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত ব্যক্তি অর্থাৎ নাবী। (তাফসীর সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর)



ইউসুফ (عليه السلام) ঐ মহিলার ডাকে সাড়া না দিয়ে বের হবার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন তখন মহিলাটিও তাকে ধরার জন্য তাঁর পিছনে ছুটল এবং ইউসুফ (عليه السلام) এর জামাটি পিছন দিক থেকে ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। এই অবস্থায় উভয়ে দরজার নিকট পৌঁছে যান। দরজায় পৌঁছতেই দেখেন যে, ঐ মহিলার স্বামী দরজার নিকট বিদ্যমান। স্বামীকে দেখা মাত্রই সে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলে: ‘যে আপনার স্ত্রীর সাথে অপর্কমে লিপ্ত হতে চায় তার জন্য কারগারে প্রেরণ বা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে?’



ইউসুফ (عليه السلام) যখন দেখলেন যে, মহিলাটি সমস্ত দোষ তাঁর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে তখন তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বলেন: প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আপনার স্ত্রীই আমাকে অপকর্মের জন্য আহ্বান করছিল কিন্তু আমি তার ডাকে সাড়া না দিয়ে দরজার দিকে ছুটে আসছিলাম তখন সেও আমার পিছনে ছুটে আসল। তখন মহিলার স্বামী বলল: তুমি যে এ দোষ থেকে মুক্ত তার প্রমাণ কী? যদি প্রমাণ না নিয়ে আসতে পারো তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।



তখন আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের ব্যবস্থা করে দিলেন। মহিলার বাড়ির একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু ফায়সালা দিল যে, যদি ইউসুফের জামা পেছন দিক দিয়ে ছেঁড়া থাকে তাহলে ইউসুফ সত্যবাদী মহিলাটি মিথ্যাবাদী আর যদি সামনের দিকে ছেঁড়া থাকে তাহলে মহিলাটি সত্যবাদী, ইউসুফ মিথ্যাবাদী। এখানে ফায়সালাকে شَهِدَ (সাক্ষ্য দিল) শব্দে এ জন্য বুঝানো হয়েছে যে, তখনও বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন ছিল। এ সাক্ষ্যদাতা কে ছিল এ নিয়ে ইমাম কুরতুবী চারটি মত উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে দুটি মত প্রসিদ্ধ (১) এ সাক্ষীদাতা ছোট একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু, মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় কথা বলেছেন। সুহাইলী বলেন, এটাই সঠিক, কারণ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: মায়ের কোলে তিনজন শিশু কথা বলেছে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৫০) তন্মধ্যে ইউসুফ (عليه السلام) এর সাক্ষ্যদাতা একজন বলে উল্লেখ করেছেন। (২) এ সাক্ষীদাতা একজন দূরদর্শী জ্ঞানী ব্যক্তি, আযীযে মিসর তার থেকে পরামর্শ নিতেন। শেষোক্ত মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য। (কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)



অতঃপর যখন মহিলার স্বামী দেখলেন যে, ইউসুফের জামা পেছন দিক দিয়ে ছেঁড়া তখন আযীয অর্থাৎ মহিলার স্বামী বুঝতে পারলেন যে, ইউসুফই সত্যবাদী এবং ঐ মহিলা ইউসুফকে অপবাদ দিয়েছে। তখন মহিলার স্বামী বললেন: তোমাদের চক্রান্ত খুবই কঠিন। তুমি যেভাবে ব্যক্ত করেছিলে মনে হয় যেন তুমিই পবিত্র, সে অপরাধী। এখানে নিজ স্ত্রীর কুস্বভাব দেখে নারী জাতি সম্পর্কে মন্তব্য করলেন যে “নিশ্চয়ই এটা তোমাদের চক্রান্ত”। তবে এ মন্তব্য সকল নারী জাতির ক্ষেত্রে সঠিক নয়। সুতরাং তা সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং এর ভিত্তিতে নারী মাত্রই সকলকে চক্রান্তকারী বলা কুরআনের উদ্দেশ্য নয়। যেমন অনেকে উক্ত বাক্য দ্বারা নারীদের সম্পর্কে এরূপ কথা বলে থাকে। আযীয ইউসুফ (عليه السلام) কে সান্ত্বনা দিলেন এবং এ কথা প্রচার করতে বারণ করলেন। তার স্ত্রীকে অপরাধের কারণে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কেউ কোন পাপ কাজের দিকে আহ্বান করলে তাতে সাড়া না দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় চাইতে হবে এবং অন্যায়কারীকে সদুপোদেশ দিতে হবে।

২. ন্যায় ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে আল্লাহ তা‘আলা বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এটা আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্রুতি।

৩. কিয়ামতের দিন সে যুবক আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে যে যুবককে সুন্দরী রমণী অপকর্ম করার আহ্বান করলে বলে আমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করি।

৪. যুবকদেরকে অন্যায় কাজে জড়িত করার জন্য কতক নারীরাই অগ্রগামী।

৫. যারা পাপ থেকে বিরত থাকতে চায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দেন।

৬. যে কোন বিষয় যাচাই বাছাই করে ফায়সালা করা উচিত।

৭. বেগানা মহিলার সাথে একাকিত্বের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত হলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআ’লা মিসরের আযীযের সেই স্ত্রী সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যার বাড়ীতে তিনি অবস্থান করছিলেন। মিসরের আযীয তাকে ক্রয় করেছিলেন এবং নিজের ছেলের মত তাকে অতি উত্তমরূপে রেখেছিলেন। তার স্ত্রীকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলেছিলেনঃ “এর যেন কোন প্রকারের কষ্ট না হয়। তাঁকে খুবই সম্মানের সাথে রাখবে।” কিন্তু স্ত্রী হযরত ইউসুফের (আঃ) সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লো এবং তাঁর থেকে অসৎকর্ম কামনা করলো। সুতরাং সে সুন্দর সাজে সজ্জিতা হয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো এবং তাকে তাঁর সাথে কুকর্মে লিপ্ত হওয়ার আহ্‌বান জানালো। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আঃ) কঠোর ভাবে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেনঃ “দেখুন, আপনার স্বামী আমার রব্ব (প্রভু)!” ঐ সময় মিসরবাসীদের পরিভাষায় বড়দের জন্যে এই শব্দ প্রয়োগ করা হতো। তিনি আরো বললেনঃ “আমার প্রতি আপনার স্বামীর বড় অবদান রয়েছে। তিনি অত্যন্ত উত্তমরূপে আমাকে রেখেছেন এবং আমার সাথে খুবই সদয় ব্যবহার করছেন। সুতরাং কি করে আমি তাঁর ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি? জেনে রাখুন যে, যে ব্যক্তি কোন কিছুকে ওর স্বস্থানে না রেখে অন্য স্থানে রাখে সে কল্যাণ লাভে বঞ্চিত হয়ে যায়। সীমালংঘনকারী কখনো সফলকাম হয় না। এটা মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেছেন।

(আরবি) এর কিরআতে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই (আরবি) শব্দের (আরবি) কে যবর, (আরবি) কে জযম এবং (আরবি) কে জবর দিয়ে পড়েছেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কেউ কেউ বলেছেন যে এর অর্থ হচ্ছেঃ সে তাঁকে তার নিজের দিকে আহবান করে। আলী ইবনু আবি তালহা (রঃ), এবং আওফী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর অর্থ হলো: “তুমি আমার কাছে এসো।' যার ইবনু জায়েশ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদা’ (রঃ) এরূপই বলেছেন। আমর ইবনু উবায়েদ (রঃ) হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ শব্দটি সুরইয়ানী ভাষা হতে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে (আরবি)। সুদ্দী (রঃ) বলেছেন যে, (আরবি) এর অর্থ (আরবি) এবং এটা কিবতীদের ভাষা। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা আরবী ভাষা। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) এবং এটা হাওরানিয়া’ ভাষা। কিসাঈ (রঃ) এই কিরআতকেই পছন্দ করতেন এবং বলতেন যে, এটা আহলে হাওরানের ভাষা। এটা হিজাযে এসে গেছে। এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘এসো’। আহলে হাওরানের একজন আলেমকে (আরবি) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, ওটা তাদেরই ভাষা এবং ওটা তিনি জানেন। এই কিরআতকে সমর্থন করে ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) একজন কবির কবিতাকে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। কবি উক্ত কবিতাটি হযরত আলী ইবনু আবি তালিবকে (রাঃ) উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। কবিতাংশটি হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আমরা যখন আমীরুল মু'মিনীনের নিকট আগমন করবো তখন আমি তার কাছে ইরাকের কষ্টের সংবাদ পৌঁছিয়ে দিবো এবং বলবো: নিশ্চয় ইরাক ও ওর অধিবাসী দ্রুত আপনার নিকট গমন করতে চায়, (বা তারা আপনার দিকে ঝুঁকে পড়েছে) সুতরাং আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন।”

এর দ্বিতীয় পঠন (আরবি) ও রয়েছে। প্রথম পঠনের অর্থ ছিল ‘এসো'। আর এই কিরআতের অর্থ হবে ‘আমি তোমার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছি। কোন কোন লোক এই কিরআতকে সম্পূর্নরূপে অস্বীকার করেন। এক কিরআতে (আরবি) ও রয়েছে। এ কিরআতটি গারীব। এক কিরআতে (আরবি) রয়েছে। মদীনাবাসী সাধারণ লোকদের কিরআত এটাই। এই কিরআতের দলীল হিসাবে নিম্নের একটি কবিতাংশও পেশ করা হয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “গ্রোত্রের কোন আহবানকারী যখন (সাহায্যার্থে) বলেঃ ‘এসো তখন আমার কওম দূরে থাকেনা (বরং সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসে)।” হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “কারীদের কিরআতগুলি প্রায় একই অর্থবোধক। সুতরাং তোমাদেরকে যেভাবে শেখানো হয়েছে সে ভাবেই পড়তে থাকো। মতানৈক্য সৃষ্টি এবং প্রতিবাদ করা থেকে দুরে থাকো। এ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘এসো’, ‘সামনে হও’ ইত্যাদি। তারপর তিনি এই শব্দটি পাঠ করেন। কেউ জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটাকে যে অন্যরূপেও পড়া হয়ে থাকে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটাও বিশুদ্ধ। তবে আমি যেভাবে শিখেছি সেভাবেই পাঠ করবো। অর্থাৎ (আরবি) পড়বো, (আরবি) পড়বে না। এই শব্দটি পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, এক বচন, দ্বিবচন এবং বহু বচন সবগুলির জন্যেই একই রকম এসে থাকে। যেমনঃ (আরবি)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।