আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 21)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 21)



হরকত ছাড়া:

وقال الذي اشتراه من مصر لامرأته أكرمي مثواه عسى أن ينفعنا أو نتخذه ولدا وكذلك مكنا ليوسف في الأرض ولنعلمه من تأويل الأحاديث والله غالب على أمره ولكن أكثر الناس لا يعلمون ﴿٢١﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَ الَّذِی اشْتَرٰىهُ مِنْ مِّصْرَ لِامْرَاَتِهٖۤ اَکْرِمِیْ مَثْوٰىهُ عَسٰۤی اَنْ یَّنْفَعَنَاۤ اَوْ نَتَّخِذَهٗ وَلَدًا ؕ وَ کَذٰلِکَ مَکَّنَّا لِیُوْسُفَ فِی الْاَرْضِ ۫ وَ لِنُعَلِّمَهٗ مِنْ تَاْوِیْلِ الْاَحَادِیْثِ ؕ وَ اللّٰهُ غَالِبٌ عَلٰۤی اَمْرِهٖ وَ لٰکِنَّ اَکْثَرَ النَّاسِ لَا یَعْلَمُوْنَ ﴿۲۱﴾




উচ্চারণ: ওয়া কা-লাল্লাযিশ তারা-হু মিম মিসরা লিমরাআতিহীআকরিমী মাছওয়াহু ‘আছাআইঁ ইয়ানফা‘আনাআও নাত্তাখিযাহূওয়ালাদাওঁ ওয়া কাযা-লিকা মাক্কান্না-লিইঊছুফা ফিল আরদি ওয়া লিনু‘আলিল মাহূমিন তা’বীলিল আহা-দীছি ওয়াল্লা-হু গা-লিবুন ‘আলাআমরিহী ওয়ালা-কিন্না আকছারা-ন্না-ছি লা-ইয়া‘লামূন।




আল বায়ান: আর মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘এর থাকার সুন্দর সম্মানজনক ব্যবস্থা কর। আশা করা যায়, সে আমাদের উপকার করবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করব’ এবং এভাবেই আমি যমীনে ইউসুফকে প্রতিষ্ঠিত করলাম এবং যেন আমি তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেই। আল্লাহ নিজ কর্ম সম্পাদনে প্রবল; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. আর মিসরের যে ব্যক্তি তাকে কিনেছিল, সে তার স্ত্রীকে বললঃ এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে বা আমরা একে পুত্ররূপেও গ্রহণ করতে পারি(১)। আর এভাবেই আমরা ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম(২); এবং যাতে আমরা তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেই(৩)। আর আল্লাহ তার কাজ সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না(৪)।




তাইসীরুল ক্বুরআন: মিসরের যে লোক তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘তার থাকার সুব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে কিংবা তাকে আমরা পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করে নিতে পারি।’ এভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম তাকে স্বপ্ন ব্যাখ্যার কিছু জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর কাজের ব্যাপারে পূর্ণ কর্তৃত্বশীল। কিন্তু অধিকাংশ লোকই (তা) জানে না।




আহসানুল বায়ান: (২১) মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে[1] বলল, ‘সম্মানজনকভাবে এর থাকবার ব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপে গ্রহণ করব।’ আর এভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম[2] তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।



মুজিবুর রহমান: মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বললঃ সম্মানজনকভাবে এর থাকার ব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্র রূপেও গ্রহণ করতে পারি এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়।



ফযলুর রহমান: মিসরের যে ব্যক্তি তাকে কিনে নিয়েছিল সে তার স্ত্রীকে বলল, “ওর থাকার জন্য সম্মানজনক ব্যবস্থা কর। সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে। কিংবা আমরা তাকে (নিজেদের) পুত্র বানিয়ে রাখব।” এভাবেই আমি পৃথিবীতে ইউসুফকে প্রতিষ্ঠিত করি, যাতে আমি তাকে স্বপ্নের তাবির শিক্ষা দিতে পারি। আর আল্লাহ তো তাঁর কাজে বিজয়ী হয়ে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।



মুহিউদ্দিন খান: মিসরে যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বললঃ একে সম্মানে রাখ। সম্ভবতঃ সে আমাদের কাছে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব। এমনিভাবে আমি ইউসুফকে এদেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম এবং এ জন্যে যে তাকে বাক্যাদির পূর্ণ মর্ম অনুধাবনের পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষা দেই। আল্লাহ নিজ কাজে প্রবল থাকেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।



জহুরুল হক: আর মিশরীয় যে তাঁকে কিনেছিল সে তার স্ত্রীকে বললে -- "সম্মানজনকভাবে এর থাকবার জায়গা কর, হয়ত সে আমাদের উপকারে আসবে, অথবা তাকে আমরা পুত্ররূপে গ্রহণ করতে পারি।" আর এইভাবে আমরা ইউসুফের জন্য বাসস্থান ঠিক করে দিলাম সে-দেশে, যেন তাঁকে শেখাতে পারি ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা সন্বন্ধে। আল্লাহ্ তাঁর কাজকর্মে সর্বেসর্বা, কিন্তু অধিকাংশ লোকেই জানে না।



Sahih International: And the one from Egypt who bought him said to his wife, "Make his residence comfortable. Perhaps he will benefit us, or we will adopt him as a son." And thus, We established Joseph in the land that We might teach him the interpretation of events. And Allah is predominant over His affair, but most of the people do not know.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২১. আর মিসরের যে ব্যক্তি তাকে কিনেছিল, সে তার স্ত্রীকে বললঃ এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে বা আমরা একে পুত্ররূপেও গ্রহণ করতে পারি(১)। আর এভাবেই আমরা ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম(২); এবং যাতে আমরা তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেই(৩)। আর আল্লাহ তার কাজ সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না(৪)।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে মিসরে ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বললঃ ইউসুফের বসবাসের সুন্দর বন্দোবস্ত কর। ইবনে কাসীর বলেনঃ যে ব্যক্তি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে ক্রয় করেছিলেন, তিনি ছিলেন মিসরের অর্থমন্ত্রী। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ দুনিয়াতে তিন ব্যক্তি অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং চেহারা দেখে শুভাশুভ নিরূপণকারী প্রমাণিত হয়েছেন। প্রথম- আযীযে মিসর। তিনি স্বীয় নিরূপণ শক্তি দ্বারা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর গুণাবলী অবহিত হয়ে স্ত্রীকে উপরোক্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়- ঐ কন্যা, যে মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তার পিতাকে বলেছিলঃ পিতা, তাকে কর্মচারী রেখে দিন। কেননা, উত্তম কর্মচারী ঐ ব্যক্তি, যে সবল, সুঠাম ও বিশ্বস্ত হয়। [আল-কাসাসঃ ২৬] তৃতীয়-আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ফারূকে আযম রাদিয়াল্লাহু আনহুকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করেছিলেন। [তাবারী; ইবনে কাসীর]


(২) অর্থাৎ যেভাবে ইউসুফকে কুপ থেকে বের করে আযীযে মিসর পর্যন্ত পৌছে দিলাম তেমনিভাবে তাকে আমি যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]


(৩) (وَلِنُعَلِّمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ) এখানে শুরুতে واو কে عطف এর অর্থ নিলে এ অর্থেরই একটি বাক্য উহ্য মেনে নেয়া হবে। অর্থাৎ আমি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে প্রতিষ্ঠিত করেছি। যাতে তিনি এ সময়টুকুতে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। আহকাম বিষয়ক ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিষয়ক সব জ্ঞান অর্জন করার সুযোগই তিনি লাভ করতে পারবেন। সুতরাং এভাবে তাকে আমরা বাক্যাদির পরিপূর্ণ মর্ম অনুধাবনের পদ্ধতি শিক্ষা দেই [সা’দী] অথবা এ বাক্যটি পূর্ববতী বাক্যের কারণ হিসেবে এসেছে অর্থাৎ তাকে আমি যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠা দান করেছি, যার ভূমিকা হিসাবে আমি তাকে স্বপ্নের তা'বীর শিক্ষা দিয়েছি। [বাগভী] বস্তুতঃ তিনি এর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। অথবা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের পূর্ব ঘোষিত বাণী, আল্লাহ আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন। এ কথাটির সত্যয়ণ হিসেবে আমি আপনাকে যমীনে প্রতিষ্ঠিত করেছি। [কুরতুবী]


(৪) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কর্মে প্রবল ও শক্তিমান। তিনি যা ইচ্ছে তা করতে পারেন। [ইবন কাসীর] কেউই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে গিয়ে কোন কাজ হাসিল করতে পারে না। কোন কিছু করতে হলে তিনি তো শুধু বলেন ‘হও’ আর সাথে সাথে তা হয়ে যায়। [কুরতুবী] এর উদাহরণ হিসেবে কেউ কেউ বলেন, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম চেয়েছিলেন যেন ইউসুফের স্বপ্ন তার ভাইয়েরা না জানে, কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যে, তারা জানুক, সুতরাং তাই হয়েছে। ইউসুফের ভাইয়েরা চেয়েছিল ইউসুফকে হত্যা করতে, কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যে, সে বেঁচে থাকবে এবং কর্ণধার হবে, বাস্তবে হয়েছেও তাই। ইউসুফের ভাইয়ের চেয়েছিল ইয়াকুবের মন থেকে ইউসুফের কথা ঘুচে যাক কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যে, তা জাগরুক থাকুক।

সুতরাং ইয়াকুব সর্বক্ষণ ইউসুফের কথাই বলেছিল। তারা চাইলে যে, তাদের পিতাকে চোখের পানি দিয়ে ধোঁকা দিবে, কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যে, ইয়াকুব তাদের কথায় বিশ্বাস করবেন না, ফলে তাই হলো। আযীয পত্নী চেয়েছিল ইউসুফকে দোষারোপ করতে কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যে, তিনি দোষমুক্ত ঘোষিত হবেন, ফলে আযীযের মুখ থেকে আযীয পত্নীই দোষী সাব্যস্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ পেলেন। ইউসুফ চাইলেন যে, শরাব পরিবেশনকারী তার কথা বাদশাহকে বলে তাকে বিমুক্ত করে দিক, কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যে, শরাব পরিবেশনকারী তা ভুলে যাক, ফলে তাই হলো। এসবই প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তার ইচ্ছায় প্রবল। [কুরতুবী] কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলা ইউসুফ আলাইহিস সালামের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অত্যন্ত প্রবল। তিনি নিজে ইউসুফের কর্মকাণ্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তার কোন ব্যাপার অন্যের উপর ন্যস্ত করেন নি। যাতে করে তার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রকারীর যড়যন্ত্র সফল হতে না পারে। [বাগভী]

তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক এ সত্য বোঝে না। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে অধিকাংশ বলে সকল মানুষকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ, কেউই গায়েব জানে না। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে অধিকাংশই উদ্দেশ্য, কারণ, কোন কোন নবী-রাসূলকে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কোন কাজের হিকমত সম্পর্কে পূর্ব থেকে অবহিত করেন। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে অধিকাংশ মানুষ বলে মুশরিক এবং যারা তাকদীরের উপর ঈমান রাখে না তাদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২১) মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে[1] বলল, ‘সম্মানজনকভাবে এর থাকবার ব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপে গ্রহণ করব।’ আর এভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম[2] তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।


তাফসীর:

[1] বলা হয় যে, সে সময় মিসরের বাদশাহ ছিলেন রাইয়ান বিন অলীদ এবং মিসরের ‘আযীয’ যিনি ইউসুফকে খরিদ করেছিলেন, তিনি বাদশার খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর স্ত্রীর নাম অনেকে রাঈল এবং অনেকে যুলাইখা বলেছেন। আর আল্লাই ভালো জানেন।

[2] অর্থাৎ, যেমন আমি ইউসুফ (আঃ)-কে কূপ থেকে, যালেম ভাইদের কবল থেকে পরিত্রাণ দিলাম, অনুরূপ আমি ইউসুফকে মিসরের ভূখন্ডে একটি উৎকৃষ্ট বাসস্থান প্রদান করলাম।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর:



সিরিয়া থেকে মিসরে যাওয়ার পথে একটি ব্যবসায়ী কাফেলা পথ ভুল করে জঙ্গলের মধ্যে উক্ত পরিত্যক্ত কূপের নিকটে এসে তাঁবু ফেলে। (কুরতুবী, আল বিদায়াহ ১/১৮৯) তারা পানির সন্ধানে কূপে বালতি নিক্ষেপ করল। وَارِدٌ বলা হয় কাফেলার সে ব্যক্তিদেরকে যারা যাত্রীদের পানি ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে কাফেলার আগে আগে চলে। বালতির রশি ধরে ইউসুফ (عليه السلام) উপরে উঠে এলেন। কাফেলার সবাই এরূপ এক সুদর্শন বালক দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে উঠল যে, কী সুখবর! এ যে এক গোলাম বা সুদর্শন বালক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিরাজের রাতে ইউসুফ (عليه السلام) কে দেখে বলেছিলেন:



قَدْ اُعْطِيَ شَطْرَ الْحُسْنِ



তাঁকে অর্ধেক সৌন্দর্য দেয়া হয়েছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৪৯)



বিষয়টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও সবকিছুই ছিল আল্লাহর পূর্ব পরিকল্পিত। ইউসুফ (عليه السلام) কে উদ্ধার করার জন্যই আল্লাহ উক্ত কাফেলাকে তারেদ ভুলক্রমে এখানে এনেছেন। আবূ বকর ইবনু আইয়াশ বলেন: ইউসুফ (عليه السلام) তিনদিন কূপের মধ্যে ছিলেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



بِضَاعَةً অর্থ বাণিজ্যিক পণ্য, وَأَسَرُّوْهُ অর্থ তারা তাকে লুকিয়ে ফেলল, অর্থাৎ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ইউসুফ (عليه السلام) কে তারা লুকিয়ে ফেলল। কিন্তু কারা লুকিয়ে ফেলল? এ নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায় (১) মুজাহিদ, সুদ্দী ও ইবনু জারীর বলেন, পানি সংগ্রহকারীরা লুকিয়ে রেখেছিল যাতে কাফেলার সবাই জানতে না পারে, কারণ জানতে পারলে সবাই শরীক দাবী করবে। কাফেলার লোক জিজ্ঞেস করলে বলব: কূপের মালিক আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে যাতে মিসরে নিয়ে বিক্রি করে দিই। (২) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক লুকিয়ে রেখেছিল আর ইউসুফ (عليه السلام) নিজেও তার বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন এ ভয়ে যে, হয়তো তাকে হত্যা করে ফেলবে। ইমাম শাওকানী বলেন: উত্তম কথা হল কাফেলার লোকেরা গোপন রেখেছিল যাতে স্বজনরা এসে খোঁজাখুঁজি না করে। কারণ যেহেতু কূপে পড়েছিল সেহেতু নিশ্চয়ই এ এলাকার হবে। সুতরাং তারা তাঁকে পেয়ে সাথে সাথে গোপন করে নিল যাতে কাফেলার সমস্ত লোক শরীক দাবী করে না বসে অথবা তাঁর আত্মীয়-স্বজন খবর পেয়ে যেন তাঁকে ফিরিয়ে নিতে না আসে।



ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা কাফেলার কাছে বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে বলল: ছেলেটি আমাদের পলাতক গোলাম। তোমরা ওকে আমাদের কাছ থেকে কিনে নিতে পার। কাফেলা নামে মাত্র কয়েকটি দিরহাম দিয়ে সস্তা মূল্যে ইউসুফকে কিনে নিল। যেহেতু ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা বলেছে এটা আমাদের পালিয়ে আসা গোলাম, তাই কাফেলা কিনার পর তাদের থেকে একটি লিখিত নেয় যাতে করে কেউ দাবী না করতে পারে। এর দ্বারা ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইদের দুটি উদ্দেশ্য ছিল। এক যাতে ইউসুফ তার বাপ-ভাইদের নাম করে পুনরায় বাড়ি ফিরে আসার সুযোগ না পায়। দুই যাতে ইউসুফ দেশান্তরী হয়ে যায় ও অন্যের ক্রীতদাস হয়ে জীবন যাপন করে। কত নিষ্ঠুর হলে ভাইয়েরা ভায়ের প্রতি এরূপ আচরণ করতে পারে, কল্পনা করা যায় কি!



মিসরের অর্থমন্ত্রীর গৃহে ইউসুফ (عليه السلام):



ইউসুফ (عليه السلام) কে তার ভাইদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে ক্রয় করে নিয়ে ব্যবসারী কাফেলা তাকে বিক্রির জন্য মিসরের বাজারে উপস্থিত করল। বালক ইউসুফের রূপ-সৌন্দর্য দেখে বিত্তশালীরা হাটে রীতিমত দামের প্রতিযোগিতা শুরু করল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এ মর্যাদাবান ব্যক্তিকে মর্যাদার স্থানে সমুন্নত করবেন। তাই ইউসুফের প্রতি মিসরের অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টিপাত করালেন। সকল খরিদদারকে ডিঙিয়ে মিসরের তৎকালীন অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী ক্বিৎফীর (قطفير) তাকে বহু মূল্য দিয়ে খরিদ করে নিলেন। ক্বিৎফীর ছিলেন নিঃসন্তান।



মিসরের অর্থমন্ত্রীর উপাধি ছিল ‘আযীয’ বা ‘আযীযে মিসর’। ইউসুফকে ক্রয় করে এনে তিনি তাকে স্বীয় স্ত্রীর হাতে অর্পণ করলেন এবং বললেন, একে উত্তমভাবে লালন-পালন কর। এর জন্য উত্তম থাকার উত্তম ব্যবস্থা কর। ভবিষ্যতে আমাদের কল্যাণে আসতে পারে অথবা আমরা সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে নেব। যেহেতু তাদের কোন সন্তান ছিল না। সে সময়ে মিসরের বাদশা ছিল রাইয়ান বিন অলীদ এবং আযীযে মিসর (মিসরের মন্ত্রী) যিনি ইউসুফ (عليه السلام) কে ক্রয় করেন তার স্ত্রীর নাম কেউ বলে রাঈল, আবার কেউ বলে যুলাইখা। তবে যুলাইখা নামেই প্রসিদ্ধ। রাজ প্রাসাদে ইউসুফ (عليه السلام) এর মিসরীয় জীবন শুরু হল।



এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام)-কে মিসরের ভূখণ্ডে একটি উৎকৃষ্ট বাসস্থান প্রদান করলেন, যেমন জালিম ভাই ও কূপ থেকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা এভাবেই তাঁর কার্য সম্পাদন করলেন এবং তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ বয়সে উপনীত হলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে নবুওয়াত দান করলেন এবং তাকে প্রজ্ঞা শিক্ষা দিলেন। সৎকর্মপরায়ণদেরকে আল্লাহ তা‘আলা এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. রাখে আল্লাহ তা‘আলা মারে কে? ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা তাঁকে মারার চেষ্টা করলেও আল্লাহ তা‘আলা রাখবেন বিধায় মারা সম্ভব হয়নি।

২. ইউসুফ (عليه السلام) কে পৃথিবীর মানুষের অর্ধেক সৌন্দর্য দেয়া হয়েছে।

৩. যারা আল্লাহ পথে অবিচল থাকে আল্লাহ এভাবেই তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন।

৪. যে যুবক আল্লাহর পথে জীবনকে পরিচালনা করে আল্লাহ তাকে ইলম ও হিকমত দান করেন।

৫. স্বাধীন ব্যক্তিকে ক্রয়-বিক্রয় করা হারাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২১-২২ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, মিসরের যে লোকটি হযরত ইউসুফ (আঃ) কে ক্রয় করেছিলেন, আল্লাহ তাঁর অন্তরে তাঁর মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের ভাল জাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি হযরত ইউসুফের (আঃ) চেহারায় নূরাণী ঔজ্জ্বল্যের ভাব লক্ষ্য করেই বুঝে ফেলে ছিলেন যে, তার মধ্যে মঙ্গল ও যোগ্যতা নিহিত রয়েছে। লোকটি ছিলেন মিসরের উযীর। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর নাম ছিল কিত্‌ফীর। আর মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) বলেন যে, তাঁর নাম ছিল ইতফীর ইবনু রাওহীব। আর তিনিই হচ্ছেন আযীয। তিনি মিসরের কোষাগারের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ঐ সময় মিসরের বাদশাহ ছিলেন রাইয়ান ইবনু ওয়ালীদ। তিনি আমালীকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মিসরের আযীযের স্ত্রীর নাম ছিল রাঈল বিনতু রাআ’বীল। কেউ কেউ তার নাম যুলাইখাও বলেছেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মিসরের যে লোকটি হযরত ইউসুফকে (আঃ) ক্রয় করেছিলেন তাঁর নাম ছিল মালিক ইবনু যাআর ইবনু কারীব ইবনু আনাক ইবনু মাদইয়ান ইবনু ইবরাহীম। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআ’লারই রয়েছে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, পরিণামদর্শী ও বুদ্ধি বলে অনুমান করতে ও বুঝে নিতে সক্ষম তিন ব্যক্তি অতীত হয়েছেন। প্রথম হচ্ছেন মিসরের এই আযীয, যিনি হযরত ইউসুফকে (আঃ) এক নযর দেখা মাত্রই তাঁর মর্যাদা বুঝে ফেলেন। তাই বাড়ীতে তাকে নিয়ে গিয়েই স্বীয় স্ত্রীকে বলেনঃ “সম্মানজনকভাবে এর থাকবার ব্যবস্থা কর।”

দ্বিতীয়া হচ্ছেন (হযরত শুআ’ইবের আঃ) ঐ মেয়েটি যিনি (হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে) তাঁর পিতাকে বলেছিলেনঃ হে পিতঃ! আপনি একে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসাবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত (আর এই ব্যক্তির মধ্যে এই গুণ বিদ্যমান রয়েছে)।’

তৃতীয় হচ্ছেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)। তিনি দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণের সময় খিলাফতের দায়িত্বভার হযরত উমার ইবনু খত্তাবের (রাঃ) হাতে অর্পণ করে যান।

আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ যেমন আমি ইউসুফকে (আঃ) তার ভাইদের যুলুম হতে রক্ষা করেছি তেমনি তাকে যমীনে অর্থাৎ মিসরে প্রতিষ্ঠিত করেছি। কেননা আমার ইচ্ছা পূর্ণ হবার ছিল যে, আমি তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দান শিক্ষা দেবো। আল্লাহর ইচ্ছাকে কে রোধ করতে পারে? কে পারে তার বিরোধিতা করতে? তিনি সবারই উপর ব্যাপক ক্ষমতাবান। তার সামনে সবাই অক্ষম ও অপারগ। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা অবগত নয়। তারা না মানে তার কলাকৌশল, না রয়েছে তাদের তাঁর সূক্ষ্মদর্শিতা সম্পর্কে কোন অবগতি। তারা তাঁর হিকমত বুঝে উঠতেই পারে না।

হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছলেন এবং তাঁর বিবেক-বুদ্ধি পূর্ণতা প্রাপ্ত হলো তখন মহান আল্লাহ তাঁকে নুবওয়াত দান করলেন এবং তাঁকে তাঁর বিশিষ্ট বান্দারূপে মনোনীত করলেন। এটা কোন নতুন কথা নয়। এভাবেই আল্লাহ তাআ’লা সকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান প্রদান করে থাকেন।

হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ঐ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল তেত্রিশ বছর। যহ্‌হাক (রঃ) বলেন যে, ঐ সময় তাঁর বয়স বিশ বছর হয়েছিল। হযরত হাসান (রঃ) চল্লিশ বছর বলেছেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ঐ সময় তিনি পঁচিশ বছর বয়স্ক ছিলেন। সুদ্দী (রঃ) ত্রিশ বছর বলেছেন। আর সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেছেন আঠারো বছর। ইমাম মা’লিক (রঃ) রাবী’আ' ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রঃ) এবং শা’বী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা যৌবনে পদার্পণ করা বুঝানো হয়েছে। এছাড়া আরো উক্তি রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।