সূরা হূদ (আয়াত: 85)
হরকত ছাড়া:
ويا قوم أوفوا المكيال والميزان بالقسط ولا تبخسوا الناس أشياءهم ولا تعثوا في الأرض مفسدين ﴿٨٥﴾
হরকত সহ:
وَ یٰقَوْمِ اَوْفُوا الْمِکْیَالَ وَ الْمِیْزَانَ بِالْقِسْطِ وَ لَا تَبْخَسُوا النَّاسَ اَشْیَآءَهُمْ وَ لَا تَعْثَوْا فِی الْاَرْضِ مُفْسِدِیْنَ ﴿۸۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয়া-কাওমি আওফুলমিকয়া-লা ওয়াল মীযা-না বিলকিছতিওয়ালা-তাবখাছুন্না-ছা আশইয়াআহুম ওয়ালা-তা‘ছাও ফিল আরদিমুফছিদীন।
আল বায়ান: ‘আর হে আমার কওম, মাপ ও ওযন পূর্ণ কর ইনসাফের সাথে এবং মানুষকে তাদের পণ্য কম দিও না; আর যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িও না,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৫. হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মাপো ও ওজন করো, লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না এবং যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আমার সম্প্রদায়! মাপ ও ওজন ইনসাফের সঙ্গে পূর্ণ করো, লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য কম দিও না, আর যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িও না।
আহসানুল বায়ান: (৮৫) হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা মাপ ও ওজনকে পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন কর এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না,[1] আর পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়ো না। [2]
মুজিবুর রহমান: আর হে আমার কাওম! তোমরা পরিমাপ ও ওযনকে পুরাপুরিভাবে সম্পন্ন কর এবং লোকদেরকে তাদের দ্রব্যাদিতে কম করনা, আর ভূ-পৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টি করে সীমা অতিক্রম করনা।
ফযলুর রহমান: “আর হে আমার সমপ্রদায়! ন্যায়ের সাথে মাপ ও ওজন পুরোপুরি দিও এবং মানুষকে তাদের জিনিসপত্র কম দিও না আর পৃথিবীতে অনাচার করে বেড়িও না।”
মুহিউদ্দিন খান: আর হে আমার জাতি, ন্যায়নিষ্ঠার সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও ওজন দাও এবং লোকদের জিনিসপত্রে কোনরূপ ক্ষতি করো না, আর পৃথিবীতে ফাসাদ করে বেড়াবে না।
জহুরুল হক: "আর হে আমার সম্প্রদায়! পুরো মাপ ও ওজন দেবে ন্যায়সঙ্গতভাবে, আর কোনো লোককে তাদের বিষয়বস্তুতে বঞ্চিত কর না, আর পৃথিবীতে গর্হিত আচরণ কর না গোলযোগ সৃষ্টিকারী হয়ে।
Sahih International: And O my people, give full measure and weight in justice and do not deprive the people of their due and do not commit abuse on the earth, spreading corruption.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৫. হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মাপো ও ওজন করো, লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না এবং যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।(১)
তাফসীর:
(১) এখানে শু'আইব আলাইহিস সালাম নিজ জাতিকে প্রথমে একত্ববাদের প্রতি আহবান জানালেন কেননা, তারা মুশরিক ছিল। কোন কোন মুফাসসির বলেন, তারা গাছপালার পুজা করত। এজন্যই মাদইয়ানবাসীকে আসহাবুল-আইকা বা জঙ্গলওয়ালা উপাধি দেয়া হয়েছে। আর কোন কোন মুফাসসিরের মতে তাদের বাসস্থানে গাছপালার অবিচ্ছিন্ন ছায়া বিরাজ করছিল বলে তাদেরকে “আসহাবুল আইকাহ” বলা হয়েছে। এহেন কুফরী ও শেরেকীর সাথে সাথে আরেকটি মারাত্মক দোষ ও জঘন্য অপরাধ ছিল যে, আদান-প্রদান ও ক্রয়-বিক্রয় কালে ওজন-পরিমাপে হের-ফের করে লোকের হক আত্মসাৎ করত। শু'আইব আলাইহিস সালাম তাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করলেন। এখানে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য যে, কুফর ও শেরেকীই সকল পাপের মূল। যে জাতি তাতে লিপ্ত, তাদেরকে প্রথমেই তাওহীদের দাওয়াত দেয়া হয়।
সাধারণত: ঈমান আনয়নের পূর্বে আমল ও কায়-কারবারের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয় না। কুরআনে বর্ণিত পূর্ববতী নবীগণ ও তাদের জাতিসমূহের ঘটনাবলী এর প্রমাণ। তবে শুধু দুটি জাতি এমন ছিল, যাদের উপর আযাব নাযিল হওয়ার ব্যাপারে কুফরীর সাথে সাথে তাদের বদ-আমলেরও দখল ছিল। প্রথম, লুত আলাইহিস সালাম এর জাতি যাদের কাহিনী ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় শু'আইব আলাইহিস সালামের জাতি। যাদের উপর আযাব নাযিল হওয়ার জন্য কুফর ও মাপে কম দেয়াকে কারণ হিসাবে নির্দেশ করা হয়েছে। এতে করে বুঝা যায় যে, পুংমৈথুন ও মাপে কম দেয়া আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে জঘন্য ও মারাত্মক অপরাধ। কারণ তা এমন দুটি কাজ যার ফলে সমগ্র মানব জাতির চরম সর্বনাশ সাধিত হয় এবং সারা পৃথিবীতে বিশৃংখলা বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮৫) হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা মাপ ও ওজনকে পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন কর এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না,[1] আর পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়ো না। [2]
তাফসীর:
[1] নবীগণের দাওয়াত দুটি গুরুতত্ত্বপূর্ণ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমঃ আল্লাহর হক আদায় করা এবং দ্বিতীয়ঃ বান্দার হক আদায় করা। ‘তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর’ বাক্য দ্বারা প্রথম এবং ‘তোমরা মাপে ও ওজনে কম করো না’ বাক্য দ্বারা দ্বিতীয় হকের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখন তারই তাকীদস্বরূপ তাদেরকে ইনসাফের সাথে পূর্ণমাত্রায় ওজন ও পরিমাপ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হচ্ছে এবং লোকদেরকে কোন বস্তু কম দেওয়া থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। কারণ আল্লাহ তাআলার নিকট এটা একটা বড় অন্যায় এবং আল্লাহ তাআলা পূর্ণ একটি সূরাতে উক্ত অন্যায়ের জঘন্যতা ও আখেরাতে তার শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ، الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ، وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ অর্থাৎ, মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’’ (সূরা মুত্বাফফিফীন ১-৩)
[2] আল্লাহর অবাধ্যতা করে, বিশেষ করে মানুষের অধিকার নষ্ট করে; যেমন ওজন ও পরিমাপে কম বেশি করাতে পৃথিবীতে অবশ্যই ফাসাদ সৃষ্টি করা হয়, যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৪-৯৫ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
এখানে শুয়াইব (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায়ের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যাদের বসতি ছিল ফিলিস্তিনের মাদইয়ান শহরে। আল্লাহ তা‘আলা মাদইয়ানবাসীর প্রতি নাবী হিসেবে শুয়াইব (عليه السلام) কে প্রেরণ করলেন। তিনিও তাদেরকে প্রথমে পূর্ববর্তী নাবীদের মতই আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের দিকে আহ্বান করলেন এবং এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার জন্য নির্দেশ দিলেন এবং অন্যান্য উপাস্যদেরকে বর্জন করতে বললেন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই। আর তাদেরকে নিষেধ করলেন তারা যেন ওজনে ও পরিমাপে কম না দেয়। তাদের খারাপ আমলের মধ্যে অন্যতম এটিও একটি ছিল। তাদের অভ্যাস ছিল যে, যখন তারা কারো নিকট থেকে কিছু ক্রয় করত তখন ওজনে বেশি নিত এবং যখন কারো নিকট বিক্রয় করত তখন মাপে কম দিত। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে প্রচুর পরিমাণ ধন-সম্পদ দিয়েছেন। তখন শুয়াইব (عليه السلام) তাদের এই পাপ কাজের জন্য আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির ভয় দেখালেন। بِخَيْرٍ বলতে আর্থিক সচ্ছলতাকে বুঝানো হয়েছে।
নাবীগণের দা‘ওয়াত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত (১) আল্লাহ তা‘আলার হক আদায় করা; (২) বান্দার হক আদায় করা। শু‘আইব (عليه السلام) তাদেরকে যে বললেন তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মেপে দেবে ও ওজনকে পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এর দ্বারা মূলত বান্দার হক বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এই কথার তা‘কীদস্বরূপ শু‘আইব (عليه السلام) তাঁর সম্প্রদায়কে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তারা যেন ওজন ও মাপে কম না দেয় এবং মানুষদেরকে যেন তাদের প্রাপ্য বস্তু কম না দেয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলার নিকট এটি একটি বড় ধরনের অপরাধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَیْلٌ لِّلْمُطَفِّفِیْنَﭐﺫ الَّذِیْنَ اِذَا اکْتَالُوْا عَلَی النَّاسِ یَسْتَوْفُوْنَﭑﺘ وَاِذَا کَالُوْھُمْ اَوْ وَّزَنُوْھُمْ یُخْسِرُوْنَﭒﺚ)
“মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে নেয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে, এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।” (সূরা মুত্বাফ্ফিফীন ৮৩:১-৩)
আর তিনি তাদেরকে নিষেধ করলেন তারা যেন জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি না করে। কারণ ওজন ও মাপে কম দিয়ে মানুষের হক নষ্ট করা ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলার অন্তর্ভুক্ত, তাই তিনি তাদেরকে এ ধরনের ফাসাদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করলেন।
(بَقِيَّتُ اللّٰهِ) ‘আল্লাহ প্রদত্ত অবশিষ্ট’ এর অর্থ হল সে মুনাফা যা ওজনে কোন প্রকার কম-বেশি না করে সঠিক মাপে ধার্মিকতার সাথে পণ্য দেয়ার পর অর্জন হয়ে থাকে। যেহেতু তা হালাল ও পবিত্র এবং তাতে বরকত রয়েছে, এ জন্য এ মুনাফাকে আল্লাহ তা‘আলার অবশিষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হয়েছে। আর যদি আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাসী না হয়ে তাঁর নির্দেশ ভঙ্গ করো তাহলে ওজনে যতই কম দাও না কেন তাতে কোন বরকত হবে না। এসব নির্দেশনা দিয়ে শু‘আইব (عليه السلام) বললেন: আমার দায়িত্ব শুধু তোমাদেরকে পৌঁছে দেয়া। মানা না মানা এটা তোমাদের দায়িত্ব, আমি তোমাদের ব্যাপারে কোন পাহারাদার নই। আর তোমাদেরকে বিরত রাখাও আমার পক্ষে সম্ভব নয় যদি তোমরা বিরত না হও।
শু‘আইব (عليه السلام)-এর এই কথার জবাবে তারা বলল; হে শুয়াইব! তোমার ইবাদত কি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছে যে, আমরা আমাদের ঐ সমস্ত উপাস্যদেরকে ছেড়ে দেব যাদের উপাসনা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করত অথবা আমরা আমাদের সম্পদ আমাদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহার করতে পারব না। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে না এবং তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বের করব (অর্থাৎ সম্পদের যাকাত আদায় করা) তা হতে পারে না। সুতরাং এ ধরনের নিয়ম বাতিল।
কোন কোন মুফাসসির বলেছেন: সকল জাতির ধর্মেই যাকাত, ফিতরা এবং সাদকা ইত্যাদি আবশ্যক ছিল। সম্পদ উপার্জনের কিছু নিয়মাবলী ছিল। তাদের কথা শুনে শু‘আইব (عليه السلام) বললেন: যদি আমি আমার প্রভুর পক্ষ থেকে হকের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকি আর তিনি আমাকে উত্তম রিযিক দান করেন তবুও কি আমি তোমাদের কথা মত তোমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছি তার বিপরীত আমল করব। এটা হতে পারে না। আমি তো শুধু আমার সাধ্যমত তোমাদের কল্যাণ করারই ইচ্ছা পোষণ করি। আর তাও আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়। সুতরাং আমি আমার প্রভুর ওপরই ভরসা করলাম। তিনি তাদেরকে আরো সতর্ক করলেন যে, হে আমার সম্প্রদায়! আমার বিরুদ্ধে তামরা এমন কাজ করে বস না যার ফলে তোমাদের ওপর পূর্ববর্তী জাতির মত শাস্তি নেমে আসে, যেমন শাস্তি এসেছিল নূহ, হূদ, সালেহ ও লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের ওপর। আর তোমরা লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায় থেকে বেশি দূরেও নও। সুতরাং তোমরা তোমাদের পাপের কারণে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাও।
শুআইব (عليه السلام)-এর এ কথার জবাবে তারা বলল, হে শুয়াইব! তুমি আমাদেরকে যেসব কথাবার্তা বল তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। সুতরাং তুমি এসব কথা বলা বন্ধ কর। আর তুমি তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল। যদি তোমার আত্মীয় স্বজন না থাকত তবে আমরা তোমাকে পাথর মেরে শেষ করে ফেলতাম। আমরা তোমার গোত্রের লোকদেরকে সম্মান করি, তাই কিছু বলছি না। অতএব তুমি তোমার এসব কথাবার্তা বলা থেকে বিরত হও। তাদের এ কথার জবাবে শু‘আইব (عليه السلام) বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে আমার স্বজনবর্গের কারণে ছেড়ে দিচ্ছ। কিন্তু যে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে নবুওয়াতের মর্যাদা দান করেছেন, তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কোন খেয়াল তোমাদের অন্তরে নেই এবং তাঁকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখে দিয়েছে। এখানে শু‘আইব
(عليه السلام) أعز عليكم مني
আমার থেকে বেশি মর্যাদাবান, এর স্থানে
أعز عليكم من الله
আল্লাহ তা‘আলা থেকে বেশি মর্যাদাবান বলেছেন। এতে একথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, নাবীর অসম্মান করা, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলারই অসম্মান করা। কারণ নাবীগণ আল্লাহ তা‘আলারই প্রেরিত পুরুষ, আর এই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে হকপন্থী উলামাদের অসম্মান করা আসলে আল্লাহ তা‘আলার দীনের অসম্মান করা ও তুচ্ছ জ্ঞান করা। মনে রেখ যে, তোমরা যা কর তা সবই আমার প্রতিপালকের আয়ত্তাধীন। তিনি যখন দেখলেন যে, তাঁর ওয়ায-নসীহতে তাদের কোন উপকার হচ্ছে না তখন তিনি আরো বললেন যে, তোমরা তোমাদের মত কাজ করতে থাক আমিও আমার কাজ করে যাই। অচিরেই জানতে পারবে কাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আসে এবং কারা মিথ্যাবাদী। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর আর আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমান রইলাম। তখন হঠাৎ এক বিকট আওয়াজ ধ্বনিতে তাদের অন্তর ফেটে গেল এবং তারা মৃত্যুবরণ করল। তার পর পরই শুরু হল ভূমিকম্প। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوْا فِيْ دَارِهِمْ جٰثِمِيْنَ)
“সুতরাং তাদেরকে একটি প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প এসে গ্রাস করে নিলো, ফলে তাদের নিজেদের গৃহের মধ্যেই (মৃত অবস্থায় ) উপুড় (অধোমুখী) হয়ে পড়ে রইল।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৯১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
(فَكَذَّبُوْهُ فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوْا فِيْ دَارِهِمْ جٰثِمِيْنَ)
“কিন্তু তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করল, অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল; ফলে তারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৩৭)
এভাবেই তারা অভিশপ্ত অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিল এবং আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে বঞ্চিত হল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ওজন ও পরিমাপে কম দেয়া যাবে না। কারণ এটি বড় ধরনের অপরাধ। আর এতে বরকত নষ্ট হয়ে যায়।
২. হক্ব পন্থী আলেমদেরকে অপমান বা তাদের সাথে বেয়াদবী করা যাবে না। কারণ তাদের সাথে বেয়াদবী করার অর্থই হল আল্লাহ তা‘আলার ধর্মকে তুচ্ছ মনে করা।
৩. সঠিক পথের দায়ীকে অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করা হবে, তাই বলে দাওয়াতী মিশন ছেড়ে দেয়া যাবে না।
৪. আল্লাহ তা‘আলার হক ও বান্দার হক কোনটাই নষ্ট করার সুযোগ নেই। কারণ কিয়ামতের দিন এ ব্যাপারে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৫-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত শুআ’ইব (আঃ) প্রথমে তাঁর কওমকে মাপে ও ওজনে কম করতে নিষেধ করেন। এরপর পরস্পর লেনদেনের সময় ন্যায় পরায়ণতার সাথে পুরোপুরিভাবে মাপ ও ওজন করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও ধ্বংসাত্মক কাজ করতে নিষেধ করছেন। তাঁর কওমের মধ্যে ছিনতাই, ডাকাতি, লুটতরাজ প্রভৃতি বদ অভ্যাস অনুপ্রবেশ করেছিল। তিনি বলেন যে, মানুষের হক নষ্ট করে লাভবান হওয়ার চাইতে আল্লাহ প্রদত্ত লাভ বহুগুণে শ্রেয়। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আল্লাহর এই অসিয়ত তোমাদের জন্যে খুবই কল্যাণকর বটে। শাস্তি দ্বারা মানুষের যেমন ধ্বংস হয়,অনুরূপভাবে রহমতের দ্বারা মানুষের সব কিছু স্থায়ী হয় ও অবশিষ্ট থাকে। ঠিকভাবে ওজন করে এবং পুরোপুরিভাবে মাপ করে হালাল উপায়ে যে লাভ হয় তাতেই বরকত হয়ে থাকে। অশ্লীলতা ও পবিত্রতার মধ্যে সমতা কোথায়? দেখো, আমি সব সময় তোমাদের দেখা শোনা করতে পারি না। আমাকে তোমাদের পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়নি। সুতরাং তোমাদের উচিত, আল্লাহরই ওয়াস্তে ভাল কাজ করা এবং মন্দ কার্য পরিত্যাগ করা। মানুষকে দেখাবার জন্য নয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।