আল কুরআন


সূরা ইউনুস (আয়াত: 90)

সূরা ইউনুস (আয়াত: 90)



হরকত ছাড়া:

وجاوزنا ببني إسرائيل البحر فأتبعهم فرعون وجنوده بغيا وعدوا حتى إذا أدركه الغرق قال آمنت أنه لا إله إلا الذي آمنت به بنو إسرائيل وأنا من المسلمين ﴿٩٠﴾




হরকত সহ:

وَ جٰوَزْنَا بِبَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ الْبَحْرَ فَاَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَ جُنُوْدُهٗ بَغْیًا وَّ عَدْوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَدْرَکَهُ الْغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا الَّذِیْۤ اٰمَنَتْ بِهٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِیْلَ وَ اَنَا مِنَ الْمُسْلِمِیْنَ ﴿۹۰﴾




উচ্চারণ: ওয়া জাওয়াযনা-ব্বিানীইছরাঈলাল বাহরা ফাআতবা‘আহুম ফির‘আওনুওয়াজুনূদুহূ বাগইয়াওঁ ওয়া ‘আদওয়ান হাত্তা ইযা-আদরাকাহুল গারাকু কা-লা আ-মানতু আন্নাহূলাইলা-হা ইল্লাল্লাযী আ-মানত বিহী বানূ ইছরাঈলা ওয়া আনা-মিনাল মুছলিমীন।




আল বায়ান: আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯০. আর আমরা বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করলাম।(১) আর ফিরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত সহকারে এবং সীমালংঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। পরিশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল তখন বলল, আমি ঈমান আনলাম যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি বানী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম আর ফির‘আওন ও তার সৈন্য সামন্ত ঔদ্ধত্য ও সীমালঙ্ঘন ক’রে তাদের পেছনে ছুটল, অতঃপর যখন সে ডুবতে শুরু করল তখন সে বলল, ‘আমি ঈমান আনছি যে, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই যাঁর প্রতি বানী ইসরাঈল ঈমান এনেছে, আর আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’




আহসানুল বায়ান: (৯০) আর আমি বানী ইস্রাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলাম,[1] অতঃপর ফিরআউন তার সৈন্যদলসহ অন্যায় ও বিদ্বেষবশতঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল।[2] পরিশেষে যখন সে ডুবতে লাগল, তখন বলতে লাগল, ‘যে কথায় বানী ইস্রাঈল বিশ্বাস করেছে, আমিও তাতে বিশ্বাস করলাম যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’



মুজিবুর রহমান: আর আমি বানী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলাম, অতঃপর ফির‘আউন তার সৈন্যদলসহ তাদের পশ্চাদানুসরণ করল যুলম ও নির্যাতনের উদ্দেশে; এমনকি যখন সে নিমজ্জিত হতে লাগল তখন বলতে লাগলঃ আমি ঈমান এনেছি বানী ইসরাঈল যাঁর উপর ঈমান এনেছে, তিনি ছাড়া অন্য মা‘বূদ নেই এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছি।



ফযলুর রহমান: আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলাম। তখন ফেরাউন ও তার সৈন্যরা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনের উদ্দেশ্যে তাদের পেছনে পেছনে ছুটল। অবশেষে যখন সে ডুবতে লাগল তখন বলল, “আমি বিশ্বাস করেছি যে, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আর আমি মুসলিমদেরই একজন।”



মুহিউদ্দিন খান: আর বনী-ইসরাঈলকে আমি পার করে দিয়েছি নদী। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল, তখন বলল, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোন মা’বুদ নেই তাঁকে ছাড়া যাঁর উপর ঈমান এনেছে বনী-ইসরাঈলরা। বস্তুতঃ আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।



জহুরুল হক: আর ইসরাইলের বংশধরদের আমরা সমূদ্র পার করালাম, আর ফিরআউন ও তার সৈন্যদল তাদের ধাওয়া করল নির্যাতন ও উৎপীড়নের জন্য! শেষে যখন ডুবে যাওয়া তাকে পাকড়াল সে বললে -- "আমি ঈমান আনছি যে ইসরাইলের বংশধরেরা যাঁর প্রতি বিশ্বাস করে তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, আর আমি হচ্ছি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।"



Sahih International: And We took the Children of Israel across the sea, and Pharaoh and his soldiers pursued them in tyranny and enmity until, when drowning overtook him, he said, "I believe that there is no deity except that in whom the Children of Israel believe, and I am of the Muslims."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯০. আর আমরা বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করলাম।(১) আর ফিরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত সহকারে এবং সীমালংঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। পরিশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল তখন বলল, আমি ঈমান আনলাম যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।


তাফসীর:

(১) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেন, তখন তিনি দেখলেন ইয়াহুদীরা আশুরার সাওম পালন করছে। তিনি এ ব্যাপারে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললঃ এ দিন আল্লাহ তা'আলা মূসাকে ফিরআউনের উপর বিজয় দিয়েছিলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমরা মূসার সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে তাদের থেকেও বেশী হকদার। সুতরাং তোমরা এদিনে সওম পালন কর। [বুখারীঃ ৪৬৮০]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯০) আর আমি বানী ইস্রাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলাম,[1] অতঃপর ফিরআউন তার সৈন্যদলসহ অন্যায় ও বিদ্বেষবশতঃ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল।[2] পরিশেষে যখন সে ডুবতে লাগল, তখন বলতে লাগল, ‘যে কথায় বানী ইস্রাঈল বিশ্বাস করেছে, আমিও তাতে বিশ্বাস করলাম যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, সমুদ্র চিরে, তাতে শুষ্ক পথ তৈরী করে দিলাম (যেমন সূরা বাক্বারার ৫০নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং আরো বিস্তারিত আলোচনা সূরা শুআ’রা ৬৩-৬৫ আয়াতে আসবে) এবং তোমাদেরকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিলাম।

[2] অর্থাৎ, আল্লাহর আদেশে অলৌকিকভাবে তৈরী শুষ্ক পথে, যে পথ দিয়ে মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায় সমুদ্র পার হয়েছিলেন, ফিরআউন ও তার সৈন্য-সামন্তও সমুদ্র পার হওয়ার ইচ্ছায় ঐ পথে চলতে আরম্ভ করে। উদ্দেশ্য ছিল যে, মূসা বনী ইস্রাঈলদেরকে আমার দাসত্ব থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য রাতারাতি তাদেরকে নিয়ে পালিয়েছে, পুনরায় তাদেরকে দাসত্বেরবেড়ীতে আবদ্ধ করতে হবে। যখন ফিরআউন ও তার সৈন্য-সামন্ত সেই সামুদ্রিক পথে প্রবেশ করে গেল, তখন আল্লাহ তাআলা সাগরকে পূর্ব নিয়ম অনুযায়ী চলাচলের আদেশ দিলেন। ফলে ফিরআউন সহ তার সৈন্যদল সকলে সাগরে ডুবে মরল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮২-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর:



এই আয়াতগুলোতে মূসা (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী দ্বারা সত্যকে সত্য হিসেবে প্রমাণিত করেছেন। আর এগুলো হল ঐ সকল প্রমাণ ও স্পষ্ট দলীল, যা আল্লাহ তা‘আলা নিজ কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন এবং যা তিনি নাবীগণকে প্রদান করেছেন। অথবা ঐ সকল মু‘জিযা যা আল্লাহ তা‘আলার আদেশে নাবীদের হাতে প্রকাশ হত।



৮৩ নং আয়াতে বলা হচ্ছে যে, ফির‘আউনের সম্প্রদায়ের কিছু লোক মূসা (عليه السلام)-এর নিদর্শন দেখার পর তারা মূসা (عليه السلام)-এর প্রতি ঈমান আনল। বাকিরা ঈমান আনেনি এই ভয়ে যে, ফির‘আউন তাদেরকে শাস্তি দেবে। কারণ ফির‘আউন ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।



পরবর্তীতে মূসা (عليه السلام) তাদেরকে ভয় মুক্ত হবার জন্য আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে বললেন। যদি তোমরা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা কর তবে আল্লাহ তা‘আলার শত্র“ ও তোমাদের শত্র“ ফির‘আউন তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। এবং আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য প্রার্থনা কর। তখন তারা একথা শুনে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করল এবং তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করল এবং ফির‘আউনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। তারা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দু‘আও করেছিল।



আর আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবূল করলেন।



৮৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা ও তার ভাইয়ের প্রতি ওয়াহী করলেন যে, তারা যেহেতু ঈমান এনেছে অতএব তারা ইবাদত করার জন্য যেন যার যার ঘরে একটি করে ইবাদতখানা তৈরী করে নেয়। যাতে করে ইবাদত করার জন্য তোমাদের বাইরে যেতে না হয়। কারণ বাইরে ফির‘আউন ও তার দলবলের অত্যাচারের আশঙ্কা রয়েছে। তখন তারা ইবাদতখানা তৈরী করে নিল।



৮৮ নং আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মূসা (عليه السلام) বললেন, যখন তিনি দেখলেন যে, তাঁর ওয়াজ, নসীহত কোন উপকারে আসছে না তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছে বদদু‘আ করলেন যে, তিনি যেন ফেরাউনের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে দেন এবং ফির‘আউন যেন কঠিন শাস্তি না দেখা পর্যন্ত ঈমান না আনে। অর্থাৎ সে যদিও ঈমান আনে তবে যেন শাস্তি দেখার পর আনে যে ঈমান তার কোন কাজে আসবে না। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবূল করলেন এবং তাদেরকে তাদের বদদু‘আর ওপর অটল থাকার নির্দেশ দিলেন। আর যারা সত্যের অনুসরণ করে না তাদের মত যেন না হয়ে যায় সে ব্যাপারে সতর্ক করলেন এবং তাদেরকে ধৈর্য ধারণ করতে বললেন এবং তারা যেন তার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা হিকমত ও কৌশল অনুযায়ী অবিলম্বে তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।



৯০ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন যে, আমি বাণী ইসরাইলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম। অর্থাৎ সমুদ্র চিরে তাতে শুষ্ক রাস্তা তৈরী করে দিলাম। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَأَوْحَيْنَآ إِلٰي مُوْسٰٓي أَنِ اضْرِبْ بِّعَصَاكَ الْبَحْرَ ط فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيْمِ)



“অতঃপর মূসার প্রতি ওয়াহী করলাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর।’ ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পবর্তসদৃশ হয়ে গেল।” (সূরা শুআরা ২৬:৬৩)



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন যে, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর। যার ফলে ডান দিকের পানি ডান দিকে এবং বাম দিকের পানি বাম দিকে সরে গিয়ে স্থির হয়ে গেল আর মাঝখান দিয়ে রাস্তা তৈরী হয়ে গেল। যা দিয়ে মূসা (عليه السلام) ও তার সৈন্যদল সমুদ্র পার হয়ে চলে গেল। আর ফির‘আউন সম্প্রদায় যখন সমুদ্রের মাঝখানে পৌঁছল এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা দু‘দিকের পানিকে একত্র করে দিলেন ফলে ফির‘আউন ও তার দলবল পানিতে ডুবে মরল।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَاَنْجَیْنَا مُوْسٰی وَمَنْ مَّعَھ۫ٓ اَجْمَعِیْنَﮐﺆ ثُمَّ اَغْرَقْنَا الْاٰخَرِیْنَﮑﺚ)



“এবং আমি মূসা ও তার সঙ্গী সকলকে রক্ষা করলাম। অতঃপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে।” (সূরা শুআরা ২৬:৬৫-৬৬)



আর ঐ ডুবে মরার সময় ফির‘আউন আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান এনেছিল কিন্তু তার ঈমান কোন কাজে আসেনি। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা উত্তর দিচ্ছেন যে, এখন ঈমান এনেছ অথচ এর পূর্বে নাফরমানী করেছ। অতএব এখন ঈমান আনাতে আর কোন লাভ হবে না, কারণ ঈমান আনার সময় চলে গেছে। সে সময় তুমি অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য ও ফাসাদ সৃষ্টিতে রত ছিলে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তার শরীরকে নষ্ট করেননি বরং সযতেত্ন রেখে দিলেন যাতে করে পৃথিবীর সকল অবাধ্য ব্যক্তিরা তার এ শরীর দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং তারা যেন অবাধ্য না হয়। যদি অবাধ্য হয় তাহলে ফেরাউনের মতই অবস্থা হবে। পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা বানী-ইসরাইলকে বসবাস করার জন্য একটি সুন্দর জায়গা দিলেন এবং তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করলেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِيْنَ كَانُوْا يُسْتَضْعَفُوْنَ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا الَّتِيْ بٰرَكْنَا فِيْهَا ط)



“যে সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত (সিরিয়া) রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করেছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৩৭) কিন্তু তারা তৎপরবর্তীতে শত্র“তা ও অহঙ্কারবশত বিবাদ করেছিল। যার ফলে তারা প্রাপ্ত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ফির‘আউনের মত মানুষের ওপর অত্যাচার করা যাবে না।

২. মু’মিন ও মুসলিমদের উচিত আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করা ও তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা।

৩. সালাত পরিত্যাগ করা যাবে না।

৪. ভয়ের সময় বাড়িতে মাসজিদ হিসেবে সালাত পড়া জায়েয।


৫. প্রাণ কণ্ঠাগত হবার পূর্বেই ঈমান আনতে হবে অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করার পূর্বেই।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৯০-৯২ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা ফিরআউন ও তার লোক লশকরের নদীতে নিমজ্জিত হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। বানী ইসরাঈল যখন মূসা (আঃ)-এর সাথে মিসর হতে যাত্রা শুরু করে তখন তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লাখ। ফিরআউনের লোকদের মধ্যে যে কয়েকজন ঈমান এনেছিল তারা এদের সাথে ছিল না। বানী ইসরাঈল ফিরআউনের কওম কিবতীদের নিকট থেকে বহু সংখ্যক অলংকার ঋণ স্বরূপ নিয়েছিল এবং সেগুলো নিয়েই তারা মিসর হতে বেরিয়ে পড়ে। ফলে ফিরআউনের ক্রোধ খুবই বেড়ে যায়। তাই সে তার কর্মচারীদেরকে তার দেশের প্রতিটি অঞ্চলে এই নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করে যে, তারা যেন একটি বিরাট বাহিনী গঠন করে। সুতরাং তার আদেশ মোতাবেক এক বিরাট বাহিনী গঠিত হয় এবং তা নিয়ে সে বানী ইসরাঈলের পশ্চাদ্ধাবন করে। আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য ছিল এটাই। অতএব, ফিরআউনের রাজ্যে যতগুলো ধনাঢ্য ও সম্পদশালী লোক ছিল কেউই তার সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে বাদ পড়লো না। তারা সবাই ফিরআউনের সাথে বেরিয়ে পড়লো। সকালেই তারা বানী ইসরাঈলের নাগাল পেয়ে গেল। উভয় দলের মধ্যে যখন একে অপরকে দেখে নিলো, তখন মূসা (আঃ)-এর সঙ্গীরা তাকে ডাক দিয়ে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা তো প্রায় ধরা পড়েই গেলাম।” এটা ছিল ঐ সময়ের ঘটনা যখন বানী ইসরাঈল নদীর তীরে পৌছে গিয়েছিল এবং ফিরআউন ও তার বাহিনী তাদের পিছনেই ছিল। উভয় দল এমন পর্যায়ে এসে পড়েছিল যে, তাদের মধ্যে প্রায় টক্কর লেগেই যাবে। মূসা (আঃ)-এর লোকেরা তাঁকে বারবার বলতে লাগলোঃ “এখন উপায় কি হবে? ফিরআউনের দলবল থেকে আমরা কিরূপে বাঁচতে পারি? সম্মুখে নদী এবং পিছনে শক্র!” মুসা (আঃ) বললেনঃ “আমাকে তো এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন নদীতে রাস্তা করে দেই। আমরা কখনো ধরা পড়বো না। আমার প্রতিপালকই আমার পরিচালক। যখন নৈরাশ্য শেষ সীমায় পৌছে গেল তখন মহান আল্লাহ নৈরাশ্যকে আশায় পরিবর্তিত করলেন। মূসা (আঃ)-কে তিনি হুকুম করলেনঃ “তোমার লাঠি দ্বারা নদীর পানিতে আঘাত কর।” মূসা (আঃ) তাই করলেন। তখন নদীর পানি পেটে গেল। পানির প্রতিটি খণ্ড এক একটি উঁচু পাহাড়ের রূপ ধারণ করলো। নদীতে বারোটি রাস্তা হয়ে গেল। প্রত্যেক দলের জন্যে হয়ে গেল একটি করে রাস্তা। নদীর মধ্যভাগের সিক্ত মাটিকে শুষ্ক হাওয়া তৎক্ষণাৎ শুকিয়ে দিল। ফলে রাস্তা চলাচলের যোগ্য হয়ে গেল। নদীর রাস্তা সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে গেল। এখন না থাকলো ধরা পড়ার ভয় এবং না থাকলো ডুবে যাওয়ার আশংকা। নদীর পানির প্রাচীরের মধ্যে জানালা হয়ে গিয়েছিল, যাতে প্রতিটি পথের লোক অন্য লোককে দেখতে পায় এবং নিশ্চিত হতে পারে যে, অন্যেরা ধ্বংস হয়ে যায়নি। এভাবে বানী ইসরাঈল নদী পার হয়ে গেল। তাদের শেষ দলটিও যখন নদী পার হয়ে গেল, তখন ফিরআউনের লোক লশকর নদীর এপারে পৌছে গেছে। ফিরআউনের এই সেনাবাহিনীতে শুধু এক লাখ কালো ঘোড়ার আরোহী ছিল। অন্যান্য রং এর অশ্বারোহী তো ছিলই। এর দ্বারা ফিরআউনের সৈন্য সংখ্যার আধিক্যের কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। ফিরআউন এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে ভীষণ আতংকিত হয়ে উঠলো এবং ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, তখন আর মুক্তি লাভের সুযোগ ছিল না। তার ভাগ্যে যা ঘটবার ছিল, তা ঘটে যাওয়ার সময় এসেই পড়েছিল। মূসা (আঃ)-এর দুআ কবুল হয়ে গিয়েছিল। জিবরাঈল (আঃ) একটি ঘোটকীর উপর সওয়ার ছিলেন। তিনি ফিরআউনের ঘোটকের পার্শ্ব দিয়ে গমন করলেন। তাঁর ঘোটকীকে দেখে ফিরআউনের ঘোড়াটি চিহি চিহি শব্দ করে উঠলো। জিবরাঈল (আঃ) তাঁর ঘোটকীকে নদীতে নামিয়ে দিলেন এবং তা দেখে ঘোড়াটিও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ফিরআউন ওকে থামিয়ে রাখতে পারলো না। বাধ্য হয়ে তাকে নদীতে নামতেই হলো। সে তখন তার বীরত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে তার সেনাবাহিনীকে উত্তেজিত করে বললোঃ “বানী ইসরাঈল আমাদের চেয়ে নদীর মধ্যে প্রবেশ করার বেশী হকদার নয়। সুতরাং তোমরা সবাই নদীতে প্রবেশ কর। রাস্তা তো বানানোই রয়েছে। তার এই উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ শুনে তার সেনাবাহিনী নদীতে নেমে পড়লো । মীকাঈল (আঃ) তাদের সবারই পিছনে ছিলেন এবং তাদেরকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাদেরকে এভাবে সামনের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। সবাই যখন নদীর মধ্যে প্রবেশ করলো এবং বানী ইসরাঈল সব পার হয়ে গেল, তখন আল্লাহ তা'আলা নদীকে পরস্পর মিলিয়ে দিলেন। এখন ফিরআউন এবং তার দলবলের কেউই বাঁচলো না। তরঙ্গ উঁচু নীচু হচ্ছিল এবং সেখানে মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গিয়েছিল। ফিরআউনের উপর মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। ঐ সময় সে বলে উঠলোঃ “আমি এখন ঈমান আনছি।” কিন্তু বড়ই আফসোস যে, সে এমন সময় ঈমান আনলো, যখন ঈমান আনয়নে কোনই উপকার ছিল না। আল্লাহ পাক বলেনঃ “সে যখন আমার আযাব আসতে দেখল, তখন বলে উঠলো- আমি এক আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম এবং কুফর ও শিরক পরিহার করলাম। কিন্তু আমার শাস্তি দেখার পর ঈমান আনয়নে কোনই লাভ হয় না। আল্লাহ তা'আলার নীতি এটাই। কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।” তাই ফিরআউনের এ কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “তুমি এখন ঈমান আনছো? অথচ পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তুমি নাফরমানীই করছিলে এবং ফাসাদীদের অন্তর্ভুক্ত রয়েছিলে।” সে লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করছিল। সে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জনগণের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সুতরাং এখন তাকে মোটেই সাহায্য করা হবে না।

আল্লাহ তা'আলা ফিরআউনের (আরবী) -এ কথাটি স্বীয় নবী (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। এটা ছিল ঐ গায়েবের কথাগুলোর অন্তর্ভুক্ত যার খবর তিনি একমাত্র তাকেই দিয়েছিলেন। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন ফিরআউন ঈমানের কালেমাটি মুখে উচ্চারণ করে তখনকার কথা জিবরাঈল (আঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেনঃ “ হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমি নদীর কাদা নিয়ে ফিরআউনের মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম এই ভয়ে যে, হয়তোবা আল্লাহর রহমত তাঁর গযবের উপর জয়লাভ করবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে যে, জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে। বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি যদি সেই সময় আমাকে দেখতেন, তবে দেখতে পেতেন যে, ঐ সময় আমি ফিরআউনের মুখের মধ্যে কাদা ভরে দিচ্ছিলাম এই ভয়ে যে, আল্লাহর রহমত তাকে পেয়ে বসে, সুতরাং তিনি হয়তো তাকে ক্ষমা করে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)

আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব, আজ আমি তোমার মৃতদেহকে উদ্ধার করবো, যেন তুমি তোমার পরবর্তী লোকদের জন্যে উপদেশ গ্রহণের উপকরণ হয়ে থাকো।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানী ইসরাঈলের কতকগুলো লোক ফিরআউনের মৃত্যুর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা দরিয়াকে আদেশ করলেন যে, সে যেন ফিরআউনের পোশাক পরিহিত আত্মাহীন দেহকে যমীনের কোন টিলার উপর নিক্ষেপ করে, যাতে জনগণের কাছে ফিরআউনের মৃত্যুর সত্যতা প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ তারা যেন বুঝতে পারে যে, ওটা হচ্ছে ফিরআউনের আত্মবিহীন দেহ।

মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রকৃতপক্ষে অনেক লোক আমার উপদেশাবলী হতে উদাসীন রয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ লোক আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করে না। কথিত আছে যে, এই ধ্বংস কার্য সংঘটিত হয়েছিল আশুরার দিন (১০ই মুহাররাম)। নবী (সঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন তখন তিনি দেখলেন যে, ইয়াহূদীরা ঐ দিন রোযা রেখে থাকে। তিনি তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেঃ “এই দিনে মূসা (আঃ) ফিরআউনের উপর জয়যুক্ত হয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা ইয়াহূদীদের চাইতে এই রোযা রাখার বেশী হকদার। সুতরাং তোমরা আশুরার দিনে রোযা রাখবে।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।