সূরা ইউনুস (আয়াত: 44)
হরকত ছাড়া:
إن الله لا يظلم الناس شيئا ولكن الناس أنفسهم يظلمون ﴿٤٤﴾
হরকত সহ:
اِنَّ اللّٰهَ لَا یَظْلِمُ النَّاسَ شَیْئًا وَّ لٰکِنَّ النَّاسَ اَنْفُسَهُمْ یَظْلِمُوْنَ ﴿۴۴﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল্লা-হা লা-ইয়াজলিমুন্না-ছা শাইয়াওঁ ওয়ালা-কিন্নান্না-ছা আনফুছাহুম ইয়াজলিমূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কিছুমাত্র যুলম করেন না; বরং মানুষই নিজদের উপর যুলম করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৪. নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না(১), বরং মানুষই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অবশ্যই আল্লাহ মানুষদের প্রতি কোন যুলম করেন না, কিন্তু মানুষ নিজেদের প্রতি যুলম ক’রে থাকে।
আহসানুল বায়ান: (৪৪) নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না, পরন্তু মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে। [1]
মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলম করেননা, বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে।
ফযলুর রহমান: আসলে আল্লাহ মানুষকে একটুও জুলুম করেন না; তবে মানুষ নিজেদেরকে জুলুম করে থাকে।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ জুলুম করেন না মানুষের উপর, বরং মানুষ নিজেই নিজের উপর জুলুম করে।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ মানুষের প্রতি কোনো অন্যায় করেন না, কিন্তু মানুষরা তাদের নিজেদেরই প্রতি অন্যায় করে।
Sahih International: Indeed, Allah does not wrong the people at all, but it is the people who are wronging themselves.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৪. নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না(১), বরং মানুষই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে।(২)
তাফসীর:
(১) হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দাগণ! আমি যুলুমকে আমার নিজের উপর হারাম করেছি এবং তা তোমাদের মাঝেও হারাম ঘোষণা করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর যুলুম করো না। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের মধ্যে যাদেরকে আমি হেদায়াত করেছি তারা ব্যতীত সবাই পথভ্রষ্ট। সুতরাং তোমরা আমার কাছেই হেদায়াত চাও আমি তোমাদের হেদায়াত দিব। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের মধ্যে যাকে আমি খাবার খাওয়াই সে ব্যতীত সবাই অভূক্ত, ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাবার চাও আমি তোমাদেরকে খাওয়াব। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের মধ্যে যাকে আমি পরিধান করাই সে ব্যতীত সবাই কাপড়হীন। সুতরাং তোমরা আমার কাছে পরিধেয় বস্তু চাও আমি তোমাদেরকে পরিধান করাব। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা দিন-রাত অপরাধ করে যাচ্ছ আর আমি তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করি। সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা চাও আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা আমার ক্ষতি করার কাছেও পৌছতে পারবে না যে আমার ক্ষতি করবে।
এমনকি তোমরা আমার কোন উপকার করার নিকটবর্তীও হতে পারবে না যে, আমার কোন উপকার তোমরা করে দেবে। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের পূর্বের ও পরের যাবতীয় মানুষ ও জ্বিন একত্র হয়ে তাকওয়ার দিক থেকে একজনের অন্তরে পরিণত হও তাতেও আমার রাজত্বের সামান্য বৃদ্ধি ঘটবে না। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত মানুষ ও জ্বিন একত্র হয়ে অন্যায় করার দিক থেকে একজনের অন্তরে পরিণত হও তাতেও আমার রাজত্বের তথা ক্ষমতার সামান্যও কমতি ঘটবে না। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের পূর্বাপর এবং যাবতীয় মানুষ ও জ্বিন এক মাঠে দাঁড়িয়ে আমার কাছে প্রত্যেকেই চায় তারপর আমি তাদের প্রত্যেককে তার প্রার্থিত বস্তু দেই তাতে আমার ভাণ্ডার থেকে ততটুকুই কমবে যতটুকু সমুদ্রে সুই ঢুকালে কমে। হে আমার বান্দাগণ! এগুলো তো শুধু তোমাদের আমল, আমি তা তোমাদের জন্য সংরক্ষন করে রাখি। তারপর তোমাদেরকে তা পূর্ণভাবে দেব। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ভালকিছু পাবে সে যেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। আর যে অন্য কিছু পায় সে যেন তার নিজেকে ছাড়া আর কাউকে তিরস্কার না করে। [মুসলিমঃ ২৫৭৭]
(২) অর্থাৎ আল্লাহ তো তাদের কানও দিয়েছেন এবং মনও দিয়েছেন। হক ও বাতিলের পার্থক্য দেখার ও বুঝার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন কোন জিনিস তিনি নিজের পক্ষ থেকে তাদের দিতে কার্পণ্য করেননি। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের চোখ কানা করে নিয়েছে, কানে তালা লাগিয়েছে এবং অন্তরকে বিকৃত করে ফেলেছে। ফলে আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দিয়েছেন, যাকে ইচ্ছা অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে পথ দেখিয়েছেন। কিছু অন্ধ চক্ষু চক্ষুষ্মান করেছেন, কিছু বধিরকে শুনিয়েছেন কিছু বদ্ধ অন্তরকে খুলে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কিছু লোককে ঈমান থেকে পথভ্রষ্ট করেছেন। তিনি একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। নিজের রাজত্বে তিনি যা ইচ্ছে তা করতে পারেন। তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন করা যায় না। বরং লোকদেরকে তিনি প্রশ্ন করবেন। কারণ তিনি জ্ঞানী, তিনি প্রজ্ঞাবান, তিনি ইনসাফকারী। [ইবন কাসীর; কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৪) নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না, পরন্তু মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সব রকম যোগ্যতা প্রদান করেছেন; চক্ষু দান করেছেন, যার দ্বারা দর্শন করতে পারে, কর্ণ দান করেছেন, যার দ্বারা শ্রবণ করতে পারে, জ্ঞান ও বুঝার শক্তি দান করেছেন যার দ্বারা হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করতে পারে। কিন্তু যদি সে সেই যোগ্যতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে সঠিক পথ বেছে না নেয়, তাহলে সে নিজেই নিজের উপর অত্যাচার করছে। আল্লাহ তাআলা তো তার উপর কোন অত্যাচার করেননি।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা কিছু মিথ্যুকদের ব্যাপারে সংবাদ দিচ্ছেন যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে মিথ্যা বলে। তারা রাসূলের নিকট এসে তাঁর কথা-বার্তা শ্রবণ করে, কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করে কিন্তু তারা তা হিদায়েতের উদ্দেশ্যে শ্রবণ করে না, বরং কথার ভুল ধরার জন্য এবং প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর জন্য, ফলে তাদের কোনই লাভ হয় না। যেমন একজন বধিরের কোন লাভ হয় না। কারণ কী বলা হচ্ছে তা সে শুনতে পায় না। অনুরূপভাবে কতক লোক রয়েছে যারা অন্তর্নিহিত দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে তোমার সুন্দর আচরণ, সৎ চরিত্র অবলোকন করে কিন্তু তাতেও তাদের কোন ফায়দা হয় না। কারণ তারা চোখ থাকতেও অন্ধ। যার কারণে তারা হিদায়াত গ্রহণ করে না। সুতরাং তাদেরকে আপনি এড়িয়ে চলুন যেমন একজন চিকিৎসক তার রুগীকে এড়িয়ে চলে, যখন রুগী ডাক্তারের কথা শুনে না। আর তাদের এ সমস্ত কৃতকর্মের ফলাফল আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আখিরাতে দান করবেন। তিনি কারো প্রতি বিন্দু পরিমাণও জুলুম করবেন না। বরং মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে, যার ফলে তারা সঠিক পথের অনুসরণ করে না। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে আমার বান্দা! আমি নিজের প্রতি জুলুম করা হারাম করে নিয়েছি এবং তা তোমাদের জন্যও হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম করো না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭৭)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. চোখ দিয়ে ভাল জিনিস দেখতে হবে এবং কান দিয়ে ভালো কথা শ্রবণ করতে হবে।
২. কোন কিছু সঠিক উদ্দেশ্যে শ্রবণ বা দর্শন করলে সে উদ্দেশ্য হাসিল হয়।
৩. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার প্রতি কোন জুলুম করবেন না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেন-যদি এই মুশরিকরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে তুমিও তাদের প্রতি ও তাদের কার্যকলাপের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ কর এবং স্পষ্টভাবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে । আমি তোমাদের মা'বুদগুলোকে কখনই স্বীকার করবো না।
ইবরাহীম খলীল (আঃ) ও তাঁর অনুসারীরা তাদের মুশরিক কওমকে বলেছিলেনঃ “আমরা তোমাদের হতে এবং তোমাদের মা’রূদগণ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত।” মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (আঃ)-কে আরো বলেন-কুরায়েশদের মধ্যেই কতক লোক এমনও রয়েছে যে, তারা তোমার উত্তম কথা ও পবিত্র কুরআন শুনে থাকে এবং তা তাদের হৃদয়গ্রাহী হয়। এটাই ছিল তাদের জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু এর পরেও তারা সঠিক পথে আসে না। এতে তোমার কোনই ত্রুটি নেই। কেননা, তুমি বধিরদেরকে শুনাতে সক্ষম নও এবং তাদেরকে হিদায়াত করারও শক্তি তোমার নেই, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত করার ইচ্ছা করেন। আবার তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা গভীর দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকাতে থাকে। তোমার নির্মল নিষ্কলুষ চরিত্র, সুন্দর অবয়ব এবং নবুওয়াতের প্রমাণাদি (যার মাধ্যমে চক্ষুষ্মন লোকেরা উপকৃত হতে পারে) স্বচক্ষে অবলোকন করে। কিন্তু এরপরেও কুরআনের হিদায়াত দ্বারা মোটেই উপকৃত হয় না, যেমন বিদ্বান ও অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপকার লাভ করে থাকে। এরূপ মুমিন লোকেরা যখন তোমার দিকে তাকায় তখন তারা অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়। পক্ষান্তরে যখন কাফিররা তোমার দিকে তাকায় তখন তারা ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারা তোমাকে দেখে উপহাস করে।
আল্লাহ তা'আলা কারো উপর বিন্দুমাত্র অত্যাচার করেন না। কেউ শুনে এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়। আবার অন্য কেউ শুনে, দেখে, অথচ অন্ধ ও বধির হয়ে যায় । সে চোখ থাকতেও অন্ধ এবং কান থাকতেও বধির। তার অন্তঃকরণ রয়েছে, কিন্তু তা মৃত। কেউ লাভবান হলো, আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তা সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি সবারই কাছে পুংখানুপুংখরূপে হিসাব গ্রহণ করবেন, কিন্তু তাঁর কাছে কেউ কোন হিসাব চাইতে পারে না। আল্লাহ তো বান্দার উপর যুলুম করেন না। কিন্তু বান্দা নিজেই নিজের উপর যুলুম করে থাকে। হাদীসে কুদসীতে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে আমার বান্দারা! আমি নিজের উপর যুলুম করাকে হারাম করেছি এবং তোমাদের উপরও এটা হারাম করে দিলাম। সুতরাং তোমরা একে অপরের উপর যুলুম করবে না। তোমাদের কার্যাবলী আমি দেখে যাচ্ছি। আমি তোমাদের প্রতিটি কাজের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। যে ভাল প্রতিদান প্রাপ্ত হবে সে যেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর যে ব্যক্তি শাস্তি প্রাপ্ত হবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে।`
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।