আল কুরআন


সূরা ইউনুস (আয়াত: 42)

সূরা ইউনুস (আয়াত: 42)



হরকত ছাড়া:

ومنهم من يستمعون إليك أفأنت تسمع الصم ولو كانوا لا يعقلون ﴿٤٢﴾




হরকত সহ:

وَ مِنْهُمْ مَّنْ یَّسْتَمِعُوْنَ اِلَیْکَ ؕ اَفَاَنْتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ وَ لَوْ کَانُوْا لَا یَعْقِلُوْنَ ﴿۴۲﴾




উচ্চারণ: ওয়া মিনহুম মাইঁ ইয়াছতামি‘ঊনা ইলাইকা আফাআনতা তুছমিউস সুম্মা ওয়া লাও কা-নূ লা-ইয়া‘কিলূন।




আল বায়ান: আর তাদের মধ্যে কিছু আছে, যারা তোমার প্রতি মনোযোগ দিয়ে শুনে। তবে কি তুমি বধিরকে শোনাবে, তারা না বুঝলেও?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪২. আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ আপনার দিকে কান পেতে রাখে। তবে কি আপনি বধিরকে শুনাবেন, তারা না বুঝলেও?(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: এদের মধ্যে কেউ কেউ তোমার কথা শুনার ভান করে। তাহলে তুমি কি বধিরকে শুনাবে, তারা না বুঝলেও?




আহসানুল বায়ান: (৪২) আর তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা তোমার (কথার) প্রতি কান পেতে রাখে। তবে কি তুমি বধির লোকদেরকে শুনাবে; যদিও তাদের বোধশক্তি না থাকে? [1]



মুজিবুর রহমান: আর তাদের কতক এমন আছে যারা তোমার (কথার) প্রতি কান পেতে রাখে। কিন্তু কি তুমি বধিরদেরকে শোনাবে, যদি তাদের বোধশক্তি না থাকে?



ফযলুর রহমান: তাদের মধ্যে কেউ কেউ তোমার কথা শ্রবণ করে। কিন্তু তারা যদি না বোঝে তবে কি আর তুমি (এই) বধিরদেরকে (কথা) শোনাতে পারবে?



মুহিউদ্দিন খান: তাদের কেউ কেউ কান রাখে তোমাদের প্রতি; তুমি বধিরদেরকে কি শোনাবে যদি তাদের বিবেক-বুদ্ধি না থাকে!



জহুরুল হক: আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ তোমার কথা শোনে। তুমি কি বধিরকে শোনাতে পারো, -- পরন্ত তারা বুদ্ধিশুদ্ধি রাখে না?



Sahih International: And among them are those who listen to you. But can you cause the deaf to hear, although they will not use reason?



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪২. আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ আপনার দিকে কান পেতে রাখে। তবে কি আপনি বধিরকে শুনাবেন, তারা না বুঝলেও?(১)


তাফসীর:

(১) শ্রবণ কয়েক রকমের হতে পারে। পশুরা যেমন আওয়াজ শোনে তেমনি এক ধরনের শ্রবণ আছে। তাদের কথাও আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন। [যেমন দেখুন, সূরা আল-বাকারাহ: ১৭১] আবার আর এক ধরনের শ্রবণ হয়, যার মধ্যে অর্থের দিকে নজর থাকে এবং এমনি ধরনের একটা প্রবণতা দেখা যায় যে, যুক্তিসংগত কথা হলে মেনে নেয়া হবে। তাদের কথাও আল্লাহ কুরআনের অন্যত্র উল্লেখ করেছেন [যেমন দেখুন, সূরা আল-আনআমঃ ৩৬] তবে যারা কোন প্রকার বদ্ধ ধারণা বা অন্ধ বিদ্বেষে আক্রান্ত থাকে এবং যারা আগে থেকেই ফায়সালা করে বসে থাকে যে, নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আকীদা-বিশ্বাস ও পদ্ধতিসমূহের বিরুদ্ধে এবং নিজের প্রবৃত্তির আশা-আকাংখা ও আগ্রহ বিরোধী কথা যত যুক্তিসংগতই হোক না কেন মেনে নেবো না, তারা সবকিছু শুনেও আসলে কিছুই শোনে না। তাদের কথাও আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। [যেমন দেখুন, সূরা আয-যুখরুফ ২২–২৩]

তেমনিভাবে যারা দুনিয়ায় পশুদের মত উদাসীন জীবন যাপন করে, চারদিকে বিচরণ করা ছাড়া আর কিছুতেই যাদের আগ্রহ নেই অথবা যারা প্রবৃত্তির স্বাদ-আনন্দের পেছনে এমন পাগলের মতো দৌড়ায় যে, তারা নিজেরা যা কিছু করছে তার ন্যায় বা অন্যায় হবার কথা চিন্তা করে না তারা শুনেও শোনে না। এদেরকে আল্লাহ পশুর সাথে তুলনা করেছেন। [যেমন, সূরা আল-আরাফ: ১৭৯] এ ধরনের লোকদের কান বধির হয় না কিন্তু মন বধির হয়। এ ধরনের বধির লোকদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শোনাতে পারবেন না বলে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন। এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্তুনা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ যেভাবে আপনি যাদের শ্রবণেন্দ্রিয় নেই তাদেরকে শোনাতে পারেন না তেমনিভাবে তাদেরকেও হিদায়াতের দিকে নিয়ে আসতে পারবেন না। আর আল্লাহও তাদের উপর লিখে দিয়েছেন যে, তারা ঈমান আনবে না। [কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪২) আর তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা তোমার (কথার) প্রতি কান পেতে রাখে। তবে কি তুমি বধির লোকদেরকে শুনাবে; যদিও তাদের বোধশক্তি না থাকে? [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, সামনে তারা কুরআন শ্রবণ করে, কিন্তু কুরআন শ্রবণ যেহেতু হিদায়াতের উদ্দেশ্যে নয়, ফলে তাদের কোন লাভ হয় না। যেমন একজন (কালা) বধিরের কোন লাভ হয় না। বিশেষ করে বধির যদি অবুঝ হয়। কারণ বধির জ্ঞানী হলে ইঙ্গিত বা ইশারা দ্বারা কিছু বুঝে নিতে পারে। কিন্তু এরা তো জ্ঞানহীন বধিরের মত, এরা তো বিলকুল অবুঝ বধির।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা কিছু মিথ্যুকদের ব্যাপারে সংবাদ দিচ্ছেন যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে মিথ্যা বলে। তারা রাসূলের নিকট এসে তাঁর কথা-বার্তা শ্রবণ করে, কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করে কিন্তু তারা তা হিদায়েতের উদ্দেশ্যে শ্রবণ করে না, বরং কথার ভুল ধরার জন্য এবং প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর জন্য, ফলে তাদের কোনই লাভ হয় না। যেমন একজন বধিরের কোন লাভ হয় না। কারণ কী বলা হচ্ছে তা সে শুনতে পায় না। অনুরূপভাবে কতক লোক রয়েছে যারা অন্তর্নিহিত দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে তোমার সুন্দর আচরণ, সৎ চরিত্র অবলোকন করে কিন্তু তাতেও তাদের কোন ফায়দা হয় না। কারণ তারা চোখ থাকতেও অন্ধ। যার কারণে তারা হিদায়াত গ্রহণ করে না। সুতরাং তাদেরকে আপনি এড়িয়ে চলুন যেমন একজন চিকিৎসক তার রুগীকে এড়িয়ে চলে, যখন রুগী ডাক্তারের কথা শুনে না। আর তাদের এ সমস্ত কৃতকর্মের ফলাফল আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আখিরাতে দান করবেন। তিনি কারো প্রতি বিন্দু পরিমাণও জুলুম করবেন না। বরং মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে, যার ফলে তারা সঠিক পথের অনুসরণ করে না। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে আমার বান্দা! আমি নিজের প্রতি জুলুম করা হারাম করে নিয়েছি এবং তা তোমাদের জন্যও হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম করো না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭৭)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. চোখ দিয়ে ভাল জিনিস দেখতে হবে এবং কান দিয়ে ভালো কথা শ্রবণ করতে হবে।

২. কোন কিছু সঠিক উদ্দেশ্যে শ্রবণ বা দর্শন করলে সে উদ্দেশ্য হাসিল হয়।

৩. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার প্রতি কোন জুলুম করবেন না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেন-যদি এই মুশরিকরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে তুমিও তাদের প্রতি ও তাদের কার্যকলাপের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ কর এবং স্পষ্টভাবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে । আমি তোমাদের মা'বুদগুলোকে কখনই স্বীকার করবো না।

ইবরাহীম খলীল (আঃ) ও তাঁর অনুসারীরা তাদের মুশরিক কওমকে বলেছিলেনঃ “আমরা তোমাদের হতে এবং তোমাদের মা’রূদগণ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত।” মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (আঃ)-কে আরো বলেন-কুরায়েশদের মধ্যেই কতক লোক এমনও রয়েছে যে, তারা তোমার উত্তম কথা ও পবিত্র কুরআন শুনে থাকে এবং তা তাদের হৃদয়গ্রাহী হয়। এটাই ছিল তাদের জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু এর পরেও তারা সঠিক পথে আসে না। এতে তোমার কোনই ত্রুটি নেই। কেননা, তুমি বধিরদেরকে শুনাতে সক্ষম নও এবং তাদেরকে হিদায়াত করারও শক্তি তোমার নেই, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত করার ইচ্ছা করেন। আবার তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা গভীর দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকাতে থাকে। তোমার নির্মল নিষ্কলুষ চরিত্র, সুন্দর অবয়ব এবং নবুওয়াতের প্রমাণাদি (যার মাধ্যমে চক্ষুষ্মন লোকেরা উপকৃত হতে পারে) স্বচক্ষে অবলোকন করে। কিন্তু এরপরেও কুরআনের হিদায়াত দ্বারা মোটেই উপকৃত হয় না, যেমন বিদ্বান ও অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপকার লাভ করে থাকে। এরূপ মুমিন লোকেরা যখন তোমার দিকে তাকায় তখন তারা অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়। পক্ষান্তরে যখন কাফিররা তোমার দিকে তাকায় তখন তারা ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারা তোমাকে দেখে উপহাস করে।

আল্লাহ তা'আলা কারো উপর বিন্দুমাত্র অত্যাচার করেন না। কেউ শুনে এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়। আবার অন্য কেউ শুনে, দেখে, অথচ অন্ধ ও বধির হয়ে যায় । সে চোখ থাকতেও অন্ধ এবং কান থাকতেও বধির। তার অন্তঃকরণ রয়েছে, কিন্তু তা মৃত। কেউ লাভবান হলো, আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তা সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি সবারই কাছে পুংখানুপুংখরূপে হিসাব গ্রহণ করবেন, কিন্তু তাঁর কাছে কেউ কোন হিসাব চাইতে পারে না। আল্লাহ তো বান্দার উপর যুলুম করেন না। কিন্তু বান্দা নিজেই নিজের উপর যুলুম করে থাকে। হাদীসে কুদসীতে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে আমার বান্দারা! আমি নিজের উপর যুলুম করাকে হারাম করেছি এবং তোমাদের উপরও এটা হারাম করে দিলাম। সুতরাং তোমরা একে অপরের উপর যুলুম করবে না। তোমাদের কার্যাবলী আমি দেখে যাচ্ছি। আমি তোমাদের প্রতিটি কাজের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। যে ভাল প্রতিদান প্রাপ্ত হবে সে যেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর যে ব্যক্তি শাস্তি প্রাপ্ত হবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে।`





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।