আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 84)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 84)



হরকত ছাড়া:

ولا تصل على أحد منهم مات أبدا ولا تقم على قبره إنهم كفروا بالله ورسوله وماتوا وهم فاسقون ﴿٨٤﴾




হরকত সহ:

وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمْ عَلٰی قَبْرِهٖ ؕ اِنَّهُمْ کَفَرُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ مَا تُوْا وَ هُمْ فٰسِقُوْنَ ﴿۸۴﴾




উচ্চারণ: ওয়ালা-তুসালিল ‘আলাআহাদিম মিনহুম মা-তা আবাদাওঁ ওয়ালা-তাকুম ‘আলা-কাবরিহী ইন্নাহুম কাফারূবিল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী ওয়ামা-তূওয়াহুম ফা-ছিকূ ন।




আল বায়ান: আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার উপর তুমি জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের উপর দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৪. আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না(১); তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের কেউ মারা গেলে তুমি কক্ষনো তাদের জন্য (জানাযার) নামায পড়বে না, আর তাদের কবরের পাশে দন্ডায়মান হবে না। তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সঙ্গে কুফুরী করেছে আর বিদ্রোহী পাপাচারী অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।




আহসানুল বায়ান: (৮৪) ওদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার উপর কখনো (জানাযার) নামায পড়বে না এবং তার কবরের কাছেও দাঁড়াবে না;[1] তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং তারা অবাধ্য অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। [2]



মুজিবুর রহমান: আর ভবিষ্যতে তাদের (মুনাফিকদের) কোন লোক মারা গেলে তার (জানাযার) সালাত তুমি কখনই আদায় করবেনা এবং তাদের কাবরের পাশে কখনও দাঁড়াবেনা। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং তারা কুফরী অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করেছে।



ফযলুর রহমান: তাদের (মোনাফেকদের) মধ্যে কেউ মারা গেলে তুমি তার জন্য কখনও দোয়া করবে না (জানাযা নামায পড়বে না); তার কবরের পাশে দাঁড়াবেও না। (কারণ) তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অবিশ্বাস করেছে এবং ফাসেক (অবাধ্য) অবস্থায় মারা গিয়েছে।



মুহিউদ্দিন খান: আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও নামায পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং রসূলের প্রতিও। বস্তুতঃ তারা না ফরমান অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে।



জহুরুল হক: আর তাদের মধ্যের একজনের জন্যেও, সে মারা গেলে, তুমি কখনো নামায পড়বে না, আর তার কবরের পাশেও দাঁড়াবে না। নিঃসন্দহে তারা আল্লাহ্‌তে ও তাঁর রসূলে অবিশ্বাস করেছে, আর তারা মরেছে যখন তারা ছিল দুষ্কৃতিপরায়ণ।



Sahih International: And do not pray [the funeral prayer, O Muhammad], over any of them who has died - ever - or stand at his grave. Indeed, they disbelieved in Allah and His Messenger and died while they were defiantly disobedient.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৪. আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না(১); তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।


তাফসীর:

(১) এ আয়াত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, কোন কাফেরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তার সমাধিতে দাঁড়ানো কিংবা তা যেয়ারত করতে যাওয়া জায়েয নয়। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পরে রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম আর কোন মুনাফিকের জানাযায় হাজির হতেন না এবং তাদের কবরের পাশেও দাঁড়াতেন না। [ইবন কাসীর] আবু কাতাদা বলেন, রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালামের কাছে যখন কোন জানাযা হাজির হতো, তখন তিনি তার সম্পর্কে লোকদের জিজ্ঞেস করতেন, তারা যদি ভালো বলে সত্যায়ন করত তখন তিনি তার উপর সালাত আদায় করতেন। পক্ষান্তরে যদি তারা তার সম্পর্কে অন্য কিছু বলতো, তখন তিনি বলতেন, তোমরা এটাকে নিয়ে কি করবে কর, তিনি নিজে সালাত আদায় করতেন না। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৯৯]

অথচ যদি ঈমানদার হতেন, তাহলে রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম তার জন্য দোআ করার জন্য কবরের পাশে দাঁড়াতেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, যে কেউ জানাযার সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকবে তার জন্য এক কীরাত, আর যে কেউ সালাত শেষ হওয়ার পর দাফন পর্যন্ত থাকবে তার জন্য দুই কীরাত। বলা হল, কেমন দুই কীরাত? তিনি বললেন, তার ছোটটি ওহুদ পাহাড়ের সমতুল্য। [বুখারী: ১৩২৫; মুসলিম: ৯৪৫] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম যখন দাফন শেষ করতেন, তখন তার কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা চাও, আর তার জন্য স্থিতি বা দৃঢ়তার জন্য দো'আ কর; কেননা তাকে এখন প্রশ্ন করা হচ্ছে। [আবু দাউদ: ৩২২১]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৪) ওদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার উপর কখনো (জানাযার) নামায পড়বে না এবং তার কবরের কাছেও দাঁড়াবে না;[1] তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং তারা অবাধ্য অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে। [2]


তাফসীর:

[1] এই আয়াত যদিও মুনাফিক্বদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তবুও এর নির্দেশ ব্যাপক। প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপরেই হয়ে থাকে, সে এরই অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, যখন আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু হয়ে গেল, তখন তার ছেলে আব্দুল্লাহ (যে মুসলিম ছিল এবং তার নাম বাপের মতই ছিল) রসূলের (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে বলল, (বরকতস্বরূপ) আপনি আপনার কামীস (জামা)টা আমাকে দিন, যাতে আমার পিতাকে কাফন স্বরূপ পরিয়ে দিই এবং আপনি তার জানাযার নামাযও পড়ে দিন। মহানবী (সাঃ) নিজের কামীস খানা দিয়ে দিলেন এবং তার জানাযার নামায পড়ানোর জন্যও উপস্থিত হলেন। উমার (রাঃ) নবী (সাঃ)-কে বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা এমন লোকের জানাযা পড়তে নিষেধ করেছেন, তাহলে আপনি কেন এর ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনার দু’আ করবেন?’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা আমাকে এর এখতিয়ার দান করেছেন। অর্থাৎ, বাধা দেননি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যদি তুমি ৭০ বার তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না।’ আমি তার জন্য ৭০ বার অপেক্ষা অধিক ক্ষমা প্রার্থনা করব।’’ সুতরাং তিনি তার জানাযার নামায পড়ালেন। আল্লাহ তাআলা তৎক্ষণাৎ এই আয়াত অবতীর্ণ করে বললেন, আগামীতে মুনাফিক্বদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দু’আ কোনক্রমেই করা যাবে না।  (বুখারী, সূরা বারাআতের ব্যাখ্যা, মুসলিম মুনাফিক্বদের বিবরণ)

[2] এটা ছিল জানাযার নামায ও ক্ষমা প্রার্থনা নিষেধ হওয়ার কারণবিশেষ। যার অর্থ হল যাদের মৃত্যু কুফরী, শিরক ও মুনাফিক্বীর উপর হবে, তাদের না জানাযা নামায পড়া হবে, আর না তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা জায়েয হবে। এক হাদীসে তো এমনও এসেছে যে, নবী (সাঃ) যখন কবরস্থানে পৌঁছলেন তখন জানা গেল যে, আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে দাফন করে দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর তিনি তাকে কবর থেকে বের করতে আদেশ করলেন। তিনি তাকে নিজের হাঁটুর উপর রেখে তার উপর নিজ মুখের (বরকতময়) থুথু মারলেন। অতঃপর তাঁর কামীস তাকে পরিয়ে দিলেন। (বুখারীঃ কামীস পরিধান পরিচ্ছেদ, জানাযা অধ্যায়, মুসলিমঃ মুনাফিক্বদের মন্দ গুণাবলী পরিচ্ছেদ) কিন্তু এ সব তার কোন কাজে আসেনি। এ হতে জানা গেল যে, যে ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে, তার জন্য পৃথিবীর বড় বড় ব্যক্তিত্বের ক্ষমা প্রার্থনার দু’আ এবং সুপারিশ কোন উপকারে আসবে না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮৪-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



সাহাবী ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবদুল্লাহ বিন উবাই মারা গেলে তার পুত্র আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে আবেদন করল, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর গায়ের জামাটি যেন তার পিতার কাফনের জন্য দান করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তা দিলেন। অতঃপর জানাযায় সালাত পড়ার অনুরোধ জানালো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জানাযা পড়ানোর জন্য দাঁড়ালে পিছন দিক থেকে উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জামা টেনে ধরেন এবং বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি তার জানাযা পড়াবেন না। আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে মুনাফিকদের জানাযা পড়াতে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বললেন:



(اِسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ ط إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِيْنَ مَرَّةً فَلَنْ يَّغْفِرَ اللّٰهُ لَهُمْ ط ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِه۪ط وَاللّٰهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفٰسِقِيْنَ )



“তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর‎ অথবা ক্ষমা প্রার্থনা না কর‎ একই কথা; তুমি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না। এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।”(সূরা তাওবাহ ৯: ৮০)



উমার (রাঃ) বললেন: সে মুনাফিক। বর্ণনাকারী বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জানাযা পড়ালেন তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৭০, সহীহ মুসলিম হা: ২৪০০)



এটা ছিল জানাযার সালাত ও ক্ষমা প্রার্থনা নিষেধ হওয়ার কারণ বিশেষ। যার অর্থ হল: যাদের মৃত্যু কুফরী, শির্ক ও নিফাকের ওপর হবে তাদের জানাযা পড়া যাবে না, ক্ষমা প্রার্থনাও করা জায়েয হবে না।



জাবের ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবদুল্লাহ বিন উবাইকে কবরে দাফন করার পর তার কাছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আগমন করলেন। তাকে কবর থেকে বের করার আদেশ দিলেন। তিনি তাকে নিজের হাটুর ওপর রেখে তার মুখে নিজের মুখের থুথু দিলেন এবং তাঁর জামা পরিধান করিয়ে দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫৭৯৫)



কিন্তু এ সবকিছু আল্লাহ তা‘আলার আযাব থেকে রক্ষার্থে তার কোন কাজে আসেনি। এ থেকে জানা গেল, ঈমান না থাকলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তার জন্য ক্ষমা চাইলেও কোন উপকারে আসবে না।



(وَّلَا تَقُمْ عَلٰي قَبْرِه)



‘এবং তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়াবে না’ অর্থাৎ মুনাফিকদের ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য তাদের কবরের পাশে দাঁড়াবেন না। কোন সাহাবী মারা গেলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ঈমানের ওপর অটল থাকার জন্য দু’আ করতেন। (আবূ দাঊদ হা: ৩২২১, সহীহ)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কাফিরদের জানাযা পড়া হারাম।

২. কাফির মুশরিকদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চাওয়া নিষেধ।

৩. ঈমানদার ছাড়া কোন ব্যক্তি পরকালে নাজাত পাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন মুনাফিকদের সাথে কোনই সম্পর্ক না রাখেন, তাদের কেউ মারা গেলে যেন তার জানাযার নামায না পড়ান এবং তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা বা দুআ করার উদ্দেশ্যে যেন তার কবরের কাছে না দাঁড়ান। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর সাথে কুফরী করেছে এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গেছে।

এ আয়াতটি মুনাফিকদের নেতা ও ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালের ব্যাপারে বিশেষভাবে অবতীর্ণ হলেও এটা ব্যাপক ও সাধারণ হুকুম। যার মধ্যেই নিফাক বা কপটতা পাওয়া যাবে তারই ব্যাপারে এই হুকুম প্রযোজ্য হবে। সহীহ বুখারীতে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা গেলে তার পুত্র আব্দুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর দরবারে হাযির হয়ে আবেদন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার কাফনের জন্যে আপনার গায়ের জামাটি দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে জামাটি দিয়ে দেন। অতঃপর তিনি নবী (সঃ)-কে তাঁর পিতার জানাযার নামায পড়াবার জন্যে অনুরোধ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ আবেদনও কবুল করেন এবং তার জানাযা পড়াবার জন্যে দাড়িয়ে যান। তখন উমার (রাঃ) তার কাপড়ের অঞ্চল টেনে ধরে বলেনঃ “আপনি এর জানাযার নামায পড়াবেন? অথচ আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এ থেকে নিষেধ করেছেন!”

রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছেন- ‘তুমি তাদের (মুনাফিকদের) জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর বা নাই কর (সমান কথা), যদি তুমি তাদের জন্যে সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। সুতরাং আমি সত্তরেরও অধিক বার ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” উমার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ লোকটি তো মুনাফিক ছিল।” তথাপিও রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায পড়ালেন। তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অন্য রিওয়ায়াতে আছে যে, ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর জানাযার নামায পড়ান এবং আমরাও তার সাথে নামায পড়ি। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।”

ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা যায় তখন তার জানাযার নামায পড়াবার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডাকা হয়। তিনি নামাযের জন্যে দাঁড়িয়ে গেলে আমি সফ’ বা সারির মধ্য থেকে বের হয়ে তার সামনে হাযির হই এবং বলি, আপনি কি আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর জানাযার নামায পড়াবেন? অথচ অমুক দিন সে এ কথা বলেছিল এবং অমুক দিন ঐ কথা বলেছিল। তিনি তার কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হেসে সবই শুনতে থাকেন। অবশেষে তিনি বলেনঃ “হে উমার! আমাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা প্রার্থনা করার ইখতিয়ার দিয়েছেন। আমি যদি জানতে পারি যে, সত্তরের অধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার পাপরাশি ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবো তবে অবশ্যই আমি সত্তরেরও অধিকবার তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” এ কথা বলে তিনি তার জানাযার নামায পড়ান, জানাযার সাথেও চলেন এবং দাফন কার্যেও শরীক থাকেন। উমার (রাঃ) বলেনঃ “এরপর আমার এই ঔদ্ধত্যপনার কারণে আমি দুঃখ করতে লাগলাম যে, এসব ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) খুব ভাল জানেন। সুতরাং এরূপ হঠকারিতা করা আমার পক্ষে মোটেই উচিত হয়নি। অল্পক্ষণ পরেই এ দু'টি আয়াত অবতীর্ণ হয়ে যায়। এরপরে শেষ জীবন পর্যন্ত নবী (সঃ) না কোন মুনাফিকের জানাযার নামায পড়িয়েছেন, না তার কবরে এসে দুআ' ইসতিগফার করেছেন।” (হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা যায় তখন তার পুত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কছে এসে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমার পিতার জানাযা না পড়ান তবে এটা চিরদিনের জন্যে আমাদের পক্ষে দুর্ভাগ্যের কারণ হবে।” তিনি যখন হাযির হন তখন উবাইকে কবরে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি বললেনঃ “এর পূর্বেই কেন আমাকে নিয়ে আসনি?” অতঃপর তাকে কবর থেকে উঠিয়ে নেয়া হলো। তখন তিনি তার সারা দেহে নিজের মুখের থুথু দিয়ে দম করলেন। আর তাকে জামাটি পরিয়ে দিলেন। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সহীহ বুখারীতে আব্দল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এর কাছে এমন সময় আগমন করেন যখন তাকে কবরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি তাকে কবর থেকে বের করার নির্দেশ দেন। সুতরাং তাকে কবর হতে বের করা হয়। তিনি তাকে স্বীয় জানুদ্বয়ের উপর রাখেন এবং তার উপর থুথু দিয়ে দম করেন। অতঃপর তাকে নিজের জামাটি পরিয়ে দেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, মৃত্যুর পূর্বে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নিজেই অসিয়ত করে গিয়েছিল যেন তার জানাযা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পড়িয়ে দেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “আমার পিতা অসিয়ত করে গেছেন যে, আপনি যেন তার জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। তার এ অসিয়তও রয়েছে যে, আপনার জামা দ্বারা যেন তাকে কাফন পরানো হয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেই মাত্র তার জানাযা শেষ করেছেন, তখনই জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতগুলো নিয়ে অবতীর্ণ হন। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাপড়ের অঞ্চল ধরে তাঁর সালাতের ইচ্ছার সময়েই তাঁকে এ আয়াত শুনিয়ে দেন। কিন্তু এই রিওয়ায়াতটি দুর্বল। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই রোগাক্রান্ত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার কাছে যাওয়ার নিবেদন করে ডেকে পাঠায়। তিনি তার নিকট গমন করেন। নবী (সঃ) তাকে বলেনঃ “ইয়াহুদীদের প্রেম তোমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।” সে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন ধমক ও তিরস্কারের সময় নয়। বরং আমার আকাক্ষা এই যে, আপনি আমার জন্যে দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং যখন আমি মারা যাব তখন আপনার জামা দ্বারা আমাকে কাফন পরাবেন।” সুতরাং তার মৃত্যুর পর তার ছেলে আব্দুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তার জামাটি চাইলেন, যেন তা দ্বারা স্বীয় পিতার কাফন বানাতে পারেন।

কোন কোন গুরুজন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে জামা প্রদানের কারণ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, আব্বাস (রাঃ) যখন আগমন করেন তখন তার জন্যে একটি জামা চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি খুব লম্বা চওড়া দেহ বিশিষ্ট লোক ছিলেন বলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর জামা ছাড়া অন্য কারো জামা তার গায়ে ঠিক হয়নি। তখন তার জামাটিই তাঁকে দেয়া হয়। এরই প্রতিদান হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এর কাফনের জন্যে তার জামাটি দান করেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন মুনাফিকের জানাযা পড়াননি এবং কারো জন্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি।

মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জানাযার জন্যে ডাকা হতো তখন তিনি ঐ মৃতব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। জনগণ তার সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করলে তিনি গিয়ে তার জানাযা পড়াতেন। আর যদি তার সম্পর্কে এরূপ ওরূপ কথা তার কানে আসতো তবে তিনি স্পষ্টভাবে যেতে অস্বীকার করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তিকালের পর উমার (রাঃ)-এর নীতি এই ছিল যে, যার জানাযা হুযাইফা (রাঃ) পড়তেন, তিনিও তার জানাযায় শরীক হতেন। আর হুযাইফা (রাঃ) যার জানাযা পড়তেন না, তিনিও পড়তেন না। কেননা রাসূলুল্লাহ হুযাইফা (রাঃ)-কে মুনাফিকদের নাম নির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছিলেন। ঐ নামগুলো শুধু তাঁরই জানা ছিল। এ জন্যেই তাঁকে “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশ্বস্তজন” আখ্যা দেয়া হয়েছে। এমন কি একদিন এটাও ঘটেছিল যে, উমার (রাঃ) এক ব্যক্তির জানাযার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, এমন সময় হুযাইফা (রাঃ) তাঁকে চিমটি কেটে এ থেকে বিরত রাখেন।

মুনাফিকদের ব্যাপারে জানাযা এবং ক্ষমা প্রার্থনা থেকে মুসলিমদেরকে বিরত রাখা এই বিষয়েরই দলীল যে, মুসলিমদের ব্যাপারে এ দুটো বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে মৃতদের জন্যেও পূর্ণ উপকার রয়েছে এবং জীবিতদের জন্যেও পূর্ণ প্রতিদান রয়েছে, যেমন বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জানাযায় হাযির হয়ে সালাত আদায় করা পর্যন্ত তথায় উপস্থিত থাকে তার জন্যে রয়েছে এক কীরাত (সওয়াব)। আর যে ব্যক্তি দাফন করা পর্যন্ত হাযির থাকে তার জন্যে রয়েছে দু’কিরাত (সওয়াব)।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “কীরাত কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “সবচেয়ে ছোট কীরাত হচ্ছে উহুদ পাহাড়ের মত।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, মৃতব্যক্তির দাফনকার্য শেষ করার পর তিনি তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সাহাবীদেরকে হুকুম করতেনঃ “তোমাদের সাথীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং কবরে তার অটল ও স্থির থাকার দুআ কর। এই সময় কবরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।