আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 81)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 81)



হরকত ছাড়া:

فرح المخلفون بمقعدهم خلاف رسول الله وكرهوا أن يجاهدوا بأموالهم وأنفسهم في سبيل الله وقالوا لا تنفروا في الحر قل نار جهنم أشد حرا لو كانوا يفقهون ﴿٨١﴾




হরকত সহ:

فَرِحَ الْمُخَلَّفُوْنَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلٰفَ رَسُوْلِ اللّٰهِ وَ کَرِهُوْۤا اَنْ یُّجَاهِدُوْا بِاَمْوَالِهِمْ وَ اَنْفُسِهِمْ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ قَالُوْا لَا تَنْفِرُوْا فِی الْحَرِّ ؕ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ اَشَدُّ حَرًّا ؕ لَوْ کَانُوْا یَفْقَهُوْنَ ﴿۸۱﴾




উচ্চারণ: ফারিহাল মুখাল্লাফূনা বিমাক‘আদিহিম খিলা-ফা রাছূলিল্লা-হি ওয়া কারিহূআইঁ ইউজাহিদূ বিআমওয়া-লিহিম ওয়া আনফুছিহিম ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়া কা-লূলা-তানফিরূফিল হাররি কুল না-রু জাহান্নামা আশাদ্দুহাররাল লাও কা-নুইয়াফকাহূন।




আল বায়ান: পেছনে থাকা লোকগুলো আল্লাহর রাসূলের বিপক্ষে বসে থাকতে পেরে খুশি হল, আর তারা অপছন্দ করল তাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং তারা বলল, ‘তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না’। বল, ‘জাহান্নামের আগুন অধিকতর গরম, যদি তারা বুঝত’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮১. যারা পিছনে রয়ে গেল(১) তারা আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ(২) করে বসে থাকতেই আনন্দ বোধ করল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপছন্দ করল এবং তারা বলল, গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলুন, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম(৩), যদি তারা বুঝত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: (তাবুক অভিযানে) যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তারা রসূলের বিরোধিতায় বসে থাকাতেই আনন্দ প্রকাশ করেছিল আর তাদের ধন-সম্পদ ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে তারা অপছন্দ করেছিল। তারা বলেছিল, ‘গরমের মধ্যে অভিযানে বেরিও না’। বল, ‘জাহান্নামের আগুনই তাপে প্রচন্ডতম’। তারা যদি বুঝত!




আহসানুল বায়ান: (৮১) যারা (তাবুক অভিযানে) পশ্চাতে রয়ে গেল, তারা রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকতে আনন্দবোধ করল[1] এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো। অধিকন্তু বলতে লাগল, ‘তোমরা গরমে (জিহাদে) বের হয়ো না।’ তুমি বলে দাও, ‘জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম’; যদি তারা বুঝতে পারত! [2]



মুজিবুর রহমান: রাসূলুল্লাহকে (যুদ্ধে গমনের পর) পিছনে পরে থাকা লোকেরা নিজেদের গৃহে বসে থেকে উল্লাস প্রকাশ করছিল এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করল। অধিকন্ত বলতে লাগলঃ তোমরা এই গরমের মধ্যে বের হয়োনা। তুমি বলে দাও -জাহান্নামের আগুন অধিকতর গরম, কত ভাল হত যদি তারা বুঝতে পারত!



ফযলুর রহমান: (তাবূক অভিযানে অংশগ্রহণ না করে) আল্লাহর রসূলের পেছনে থেকে-যাওয়া লোকগুলো বসে বসে আনন্দ করেছে এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জেহাদ করতে অপছন্দ করেছে আর বলেছে, “গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না।” বল, “জাহান্নামের আগুন আরো অনেক বেশি গরম;” যদি তারা বুঝত!



মুহিউদ্দিন খান: পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহর রাহে জেহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচন্ডতম। যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত।



জহুরুল হক: যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিল তারা আল্লাহ্‌র রসূলের পশ্চাতে তাদের বসে থাকাতেই আনন্দবোধ করলো, আর তাদের ধনদৌলত ও তাদের জানপ্রাণ দিয়ে আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম করতে তারা বিমুখ ছিল, আর তারা বলেছিল -- "এই গরমের মধ্যে বেরিয়ো না।" তুমি বলো -- "জাহান্নামের আগুন আরো বেশী গরম।" যদি তারা বুঝতে পারতো!



Sahih International: Those who remained behind rejoiced in their staying [at home] after [the departure of] the Messenger of Allah and disliked to strive with their wealth and their lives in the cause of Allah and said, "Do not go forth in the heat." Say, "The fire of Hell is more intensive in heat" - if they would but understand.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮১. যারা পিছনে রয়ে গেল(১) তারা আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ(২) করে বসে থাকতেই আনন্দ বোধ করল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপছন্দ করল এবং তারা বলল, গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলুন, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম(৩), যদি তারা বুঝত।


তাফসীর:

(১) আয়াতে উল্লেখিত مخلفون শব্দটি مخلف এর বহুবচন। অর্থ- পরিত্যক্ত। অর্থাৎ যাকে পরিহার করা ও পিছনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। [বাগভী; কুরতুবী] এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এরা নিজেরা একথা মনে করে আনন্দিত হচ্ছে যে, আমরা নিজেদেরকে বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিতে পেরেছি এবং জিহাদে শামিল হতে হয়নি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ তা'আলা তাদের এহেন সম্মান পাবার যোগ্য মনে করেননি। কারণ তারা হয় মুসলিমদের ক্ষতি করত না হয় তাদের অন্তর অপবিত্র হওয়ার কারণে জিহাদের সৌভাগ্য তাদের নসীব হয়নি। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] কাজেই এরা জিহাদ বর্জনকারী নয়; বরং জিহাদ থেকে বর্জিত। কারণ, রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বর্জনযোগ্য মনে করেছেন। [কুরতুবী]


(২) আয়াতে উল্লেখিত خلاف শব্দের দুটি অর্থ হতে পারে, একঃ পেছনে বা পরে, আবু ওবায়দা রহমাতুল্লাহ আলাইহি এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। তাতে এর মর্মার্থ দাঁড়ায় এই যে, এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিহাদে চলে যাবার পর তাঁর পেছনে রয়ে যেতে পারল বলে আনন্দিত হচ্ছে যা বাস্তবিক পক্ষে আনন্দের বিষয়ই নয়। দ্বিতীয় অর্থ এক্ষেত্রে خلاف অর্থ مخالفت তথা বিরোধিতাও হতে পারে। অর্থাৎ এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিরোধিতা করে ঘরে বসে রইল। আর শুধু নিজেরাই বসে রইল না; বরং অন্যান্য লোকদেরকেও এ কথাই বুঝাল যে, “গরমের সময়ে জিহাদে বেরিয়ো না”। [বাগভী; কুরতুবী ইবন কাসীর; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর; জালালাইন; ফাতহুল কাদীর]


(৩) একথা পূর্বেই জানা গেছে যে, তাবুক যুদ্ধের অভিযান এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়েছিল, যখন প্রচন্ড গরম পড়ছিল। [ইবন কাসীর] আল্লাহ তা'আলা তাদের এ কথার উত্তরদান প্রসঙ্গে বলেছেন (قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا) অর্থাৎ এই হতভাগারা এ সময়ের উত্তাপ তো দেখছে এবং তা থেকে বাঁচার চিন্তা করছে। মূলত এর ফলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের না-ফরমানীর দরুন যে জাহান্নামের আগুনে সম্মুখীন হতে হবে সে কথা ভাবছেই না তাহলে কি মওসুমের এ উত্তাপ জাহান্নামের উত্তাপ অপেক্ষা বেশী? জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, তোমাদের এ আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তরভাগের একভাগ। বলা হল যে, হে আল্লাহর রাসূল! এতটুকুই তো যথেষ্ট।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ আগুনের চেয়েও সেটা উনসত্তর গুণ বেশী, প্রতিটির উত্তাপই এর মত।  [বুখারী ৩২৬৫; মুসলিম: ২৮৪৩] জাহান্নামের আগুনের আরও আন্দাজ পাওয়া যায় এ হাদীস থেকে, যাতে জুতা ও পিতা থাকবে, কিন্তু তার উত্তাপে তার মগজ এমনভাবে উৎরাতে থাকবে যেমন পাতিল উনুনের তাপে উতরায়। সে জাহান্নামীদের কাউকে তার চেয়ে বেশী শাস্তিপ্রাপ্ত মনে করবে না। অথচ সে সবচেয়ে হাল্কা আযাবপ্রাপ্ত। [বুখারী: ৬৫৬২; মুসলিম: ২১৩]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮১) যারা (তাবুক অভিযানে) পশ্চাতে রয়ে গেল, তারা রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকতে আনন্দবোধ করল[1] এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো। অধিকন্তু বলতে লাগল, ‘তোমরা গরমে (জিহাদে) বের হয়ো না।’ তুমি বলে দাও, ‘জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম’; যদি তারা বুঝতে পারত! [2]


তাফসীর:

[1] এখানে সেই মুনাফিকবদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যারা তাবুক যুদ্ধে শরীক হয়নি এবং মিথ্যা অজুহাত পেশ করে না যাওয়ার অনুমতি নিয়েছিল। خِلاف এর অর্থ হল পিছন অথবা বিরুদ্ধাচরণ। অর্থাৎ, রসূল (সাঃ)-এর চলে যাওয়ার পর তাঁর পিছনে অথবা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে মদীনাতে বসে থাকল।

[2] অর্থাৎ, যদি তাদের এটা জানা থাকত যে, দোযখের আগুনের উষ্ণতার তুলনায় দুনিয়ার (গ্রীষ্মের) উষ্ণতা কিছুই নয়, তাহলে তারা কখনই পিছনে থাকত না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, দুনিয়ার এই আগুন জাহান্নামের আগুনের ৭০ অংশের একাংশ। অর্থাৎ, জাহান্নামের আগুনের উষ্ণতা দুনিয়ার আগুনের থেকে ৬৯ গুণ বেশী। (বুখারীঃ সৃষ্টি রচনা অধ্যায় জাহান্নামের বিবরণ পরিচ্ছেদ) হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সে আগুন হতে রক্ষা করো।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮১-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে সে সকল মুনাফিকদেরর কথা আলোচনা করা হচ্ছে যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও তাবুক যুদ্ধে শরীক হয়নি এবং মিথ্যা অজুহাত পেশ করে না যাওয়ার অনুমতি নিয়েছিল। এ জিহাদে না গিয়ে তারা খুব খুশী। خِلاَفٌ এর অর্থ পিছন অথবা বিরুদ্ধাচরণ। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চলে যাওয়ার পর তার পিছনে বা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে মদীনাতে বসে থাকল।



(قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا)



বল:‎ ‘জাহান্নামের আগুন ভীষণ উত্তপ্ত’ অর্থাৎ যদি তাদের এটা জানা থাকত যে, জাহান্নামের আগুনের উষ্ণতার তুলনায়- দুনিয়ার (গ্রীষ্মের) গরমের উষ্ণতা কিছুই না তাহলে তারা কখনই পিছনে থাকত না। তাবুক যুদ্ধ গ্রীষ্মকালীন গরমে সংঘঠিত হয়েছিল। এ সকল মুনাফিকরা গরমের ভয়ে যুদ্ধে যায়নি। হাদীসে এসেছে: দুনিয়ার এ আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তরাংশের একাংশ মাত্র। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৬৫)



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: জাহান্নামীদের মধ্যে সর্বনিম্ন যে শাস্তি দেয়া হবে তা হল আগুনের দু’টি জুতা পরিধান করিয়ে দেয়া হবে, জুতার তাপে তার মাথা টগবগ করবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২১১)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: যদি আমি তোমাকে তাবুক যুদ্ধ হতে এ সকল মুনাফিকদের কাছে মদীনাতে ফিরিয়ে আনি তাহলে মুনাফিকদের বলে দিও যে, তারা কখনো তোমার সাথে আর কোন যুদ্ধে শরীক হতে পারবে না। কেননা তারা প্রথমবারেই যায়নি। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوْا بِه۪ٓ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَّنَذَرُهُمْ فِيْ طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ)



“তারা যেমন প্রথমবারে তাতে ঈমান আনেনি আমিও তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেব এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াতে দেব।”(সূরা আনআম ৬:১১০)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তোমরা যখন গনীমতের মাল সংগ্রহ করতে যাবে তখন পেছনে পড়ে থাকা (বেদুঈনরা) তোমাদেরকে অবশ্যই বলবে, আমাদেরকেও তোমাদের সাথে যেতে দাও। এরা আল্লাহর কথা বদলে দিতে চায়। বল: তোমরা কখনো আমাদের সাথে যেতে পারবে না, আল্লাহ আগেই এ কথা বলে দিয়েছেন। তখন তারা বলবে: তোমরাই বরং আমাদের সাথে হিংসা করছ’ (যদিও হিংসার কোনো কথা নয় ), বরং এরা সঠিক কথা কমই বুঝে।”(সূরা ফাতহ ৪৮:১৫)



(فَلْيَضْحَكُوْا قَلِيْلًا....)



‘অতএব তারা যেন কম হাসে এবং বেশি বেশি কাঁদে- অর্থাৎ কম কম হাসা ও বেশি বেশি কাঁদার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ নাবী (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তাহলে তোমরা কম কম হাসতে আর বেশি বেশি কাঁদতে। আর খোলা মাঠে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ফরিয়াদ করে আশ্রয় কামনা করতে। অতঃপর বর্ণনাকারী আবূ যার (রাঃ) বলেন: হায়! আমি যদি গাছ হয়ে যেতাম, তাহলে আমাকে কেটে ফেলা হত (ফলে কোন হিসাব হত না)। (তিরমিযী হা: ২৩১২, ইবনু মাযাহ হা: ৪১৯০, সহীহ)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আনুগত্য বর্জন করায় খুশী হওয়া মুনাফিকের আলামত। অনুরূপভাবে তাদের আনুগত্যকে অপছন্দ করাও মুনাফিকের আলামত।

২. বেশি বেশি হাসি অপছন্দনীয়।

৩. স্বেচ্ছায় আনুগত্য বর্জন করলে আনুগত্য থেকে চিরতরে বঞ্চিত হয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছেন যারা তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন করেনি এবং বাড়ীতে বসে থাকায় আনন্দিত হয়েছিল। আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করা তাদের কাছে ছিল অপছন্দনীয়।

তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “এই কঠিন গরমের সময় কোথায় যাবে?” তাবুকের যুদ্ধে বের হওয়ার সময়টা এমনই ছিল যে, একদিকে গরম ছিল অত্যন্ত কঠিন, অপরদিকে ফলগুলো সব পেকে গিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন, তোমরা তোমাদের দুষ্কর্মের মাধ্যমে যে দিকে যাচ্ছ, তার মধ্যে এর চেয়ে বহুগুণ গরমের প্রখরতা রয়েছে। তা হচ্ছে জাহান্নামের আগুন। দুনিয়ার আগুনতো ঐ আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

মুসনাদে আহমাদে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এই আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। অধিকন্তু এই আগুনকে সমুদ্রের পানি দ্বারা দু’বার নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ করা না হলে তোমরা এ আগুন দ্বারা কোনই উপকার লাভ করতে পারতে না।”

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা এক হাজার বছর (জাহান্নামের) আগুনকে উত্তপ্ত করেন, তখন তা লাল বর্ণ ধারণ করে। তারপর আবার এক হাজার বছর উত্তপ্ত করেন, তখন তা সাদা হয়ে যায়। এরপর পুনরায় এক হাজার বছর তাপ দেন তখন তা কালো বর্ণ ধারণ করে। আর ওটা রাতের আঁধারের মত ভীষণ কালো হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেনঃ “আমি জানি না যে, ইয়াহইয়া (রঃ) ছাড়া অন্য কেউ এটাকে মার’ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।”)

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) (২:২৪) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “(জাহান্নামের) আগুনকে এক হাজার বছর উত্তপ্ত করা হয়, তখন তা সাদা হয়ে যায়। তারপর আরো এক হাজার বছর তাপ দেয়া হয়, তখন তা লাল বর্ণ ধারণ করে। তারপর আরো এক হাজার বছর উত্তপ্ত করা হয়, তখন তা রাতের আঁধারের মত কালো হয়ে যায়। ওর শিখায় কোন ঔজ্জ্বল্য অবশিষ্ট নেই।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

একটি হাদীসে এসেছে যে, জাহান্নামের আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ যদি পূর্ব দিকে থাকে তবে ওর উষ্ণতা পশ্চিম দিক পর্যন্ত পৌছে যাবে। (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাম্মাম ইবনে নাজীহ্ (রঃ)-এর হাদীস থেকে বর্ণনা করেছেন) আবু ইয়ালার (রঃ) একটি দুর্বল রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, যদি এই মসজিদে এক লক্ষ বা এর চেয়েও বেশী লোক থাকে এবং কোন জাহান্নামী এখানে এসে শ্বাস গ্রহণ করে তবে ওর উষ্ণতায় মসজিদ ও মসজিদে অবস্থিত সমস্ত লোক পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, জাহান্নামে যে লোকটির শাস্তি সবচেয়ে হাল্কা হবে তা হবে এই যে, তার পায়ে আগুনের জুতা পরানো হবে, যার ফলে তার মাথার খুলি টগবগ করে ফুটতে থাকবে। সে তখন মনে করবে যে, তাকেই সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তি দেয়া হচ্ছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে ওটাই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা হাল্কা শাস্তি। কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে- “নিশ্চয়ই ওটা (জাহান্নামের অগ্নি) হচ্ছে জ্বলন্ত হলকা যা চর্ম পর্যন্ত খসিয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের মাথার উপর ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দেয়া হবে, যার ফলে তাদের পেটের সমস্ত জিনিস এবং চামড়া ঝলসে যাবে। তারপর লোহার হাতুড়ী দ্বারা তাদের মস্তক পিষ্ট করা হবে। তারা যখন সেখান থেকে বের হতে চাইবে তখন তাদেরকে সেখানেই ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বলা হবে- দাহনকারী শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর।” অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করেছে আমি তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করবো, যখন তাদের (গায়ের) চামড়া ঝলসে যাবে তখন আমি ওর পরিবর্তে অন্য চামড়া আনয়ন করবো, যেন তারা পূর্ণভাবে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “(হে নবী!) তুমি বলে দাও- জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম, কি ভাল হতো যদি তারা বুঝতে পারতো!” অর্থাৎ যদি তারা এটা অনুধাবন করতো যে, জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা অত্যন্ত বেশী, তবে অবশ্যই গ্রীষ্মের মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও খুশী মনে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধে গমন করতো এবং নিজেদের জান ও মাল আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না।

আরবের একজন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার জীবনকে ঠাণ্ডা ও গরম হতে বাঁচানোর চেষ্টায় কাটিয়ে দিয়েছো, অথচ তোমার উচিত ছিল যে, তুমি আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে, তাহলে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে।”

এখন আল্লাহ তা'আলা এই মুনাফিকদের সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করছেন যে, অল্পদিন তারা এই নশ্বর জগতে হাসি-তামাশা ও আমোদ আহলাদ করে জীবনটা কাটিয়ে দিক, অতঃপর ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী জীবনে তাদেরকে শুধু কাঁদতেই হবে যা কখনো শেষ হবে না।

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা ক্রন্দন কর। যদি তোমাদের ক্রন্দন না আসে তবে ক্রন্দনের ভান কর। কেননা, জাহান্নামবাসীরা কাঁদতে থাকবে, এমন কি কেঁদে তাদের গণ্ডদেশে নদীর মত গর্ত হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত অশ্রু শুকিয়ে যাবে। অতঃপর তাদের চক্ষুগুলো রক্ত বর্ষণ করতে শুরু করবে। তাদের চক্ষু দিয়ে এতো বেশী অশ্রু ও রক্ত বর্ষিত হবে যে, কেউ যদি ওর উপর দিয়ে নৌকা চালানোর ইচ্ছে করে তবে চালাতে পারবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা আল মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর কাঁদতে থাকবে। এতো বেশী কাঁদবে যে, অশ্রু শেষ হবার পর পুঁজ বের হতে থাকবে। ঐ সময় জাহান্নামের দারোগা তাদেরকে ডাক দিয়ে বলবেঃ “ওরে হতভাগ্যের দল! করুণার জায়গাতে তো তোমরা কখনো ক্রন্দন করনি। এখন এখানে কান্নাকাটি করা বৃথা।” তখন তারা উচ্চৈঃস্বরে চীকার করে জান্নাতবাসীদের নিকট ফরিয়াদ করবেঃ “হে জান্নাতবাসিগণ! হে পিতা, মাতা ও পুত্রদের দল! আমরা কবর থেকে পিপাসার্ত অবস্থায় উঠেছিলাম। তারপর হাশরের ময়দানেও পিপাসার্ত রয়েছিলাম এবং আজ পর্যন্ত এখানেও পিপাসার্ত অবস্থায় রয়েছি। সুতরাং আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। কিছু পানি আমাদের দিকে বহিয়ে দাও এবং যে আহার্য আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে দান করেছেন তার থেকে আমাদেরকে কিছু দান কর।” চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা এভাবে (কুকুরের মত) চীষ্কার করতে থাকবে। চল্লিশ বছর পর তাদেরকে উত্তর দেয়া হবেঃ “তোমাদেরকে এ অবস্থাতেই অবস্থান করতে হবে।” শেষ পর্যন্ত তারা সমস্ত কল্যাণ থেকে নিরাশ হয়ে যাবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।