আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 41)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 41)



হরকত ছাড়া:

انفروا خفافا وثقالا وجاهدوا بأموالكم وأنفسكم في سبيل الله ذلكم خير لكم إن كنتم تعلمون ﴿٤١﴾




হরকত সহ:

اِنْفِرُوْا خِفَافًا وَّ ثِقَالًا وَّ جَاهِدُوْا بِاَمْوَالِکُمْ وَ اَنْفُسِکُمْ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِکُمْ خَیْرٌ لَّکُمْ اِنْ کُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ﴿۴۱﴾




উচ্চারণ: ইনফিরূখিফা-ফাওঁ ওয়া ছিকা-লাওঁ ওয়া জা-হিদূবিআমওয়া-লিকুম ওয়া আনফুছিকুম ফী ছাবীলিল্লা-হি যা-লিকুম খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।




আল বায়ান: তোমরা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও এবং তোমাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা অবস্থায় হোক বা ভারি অবস্থায় এবং জিহাদ কর আল্লাহ্‌র পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে!(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যুদ্ধাভিযানে বেরিয়ে পড়, অবস্থা হালকাই হোক আর ভারীই হোক (অস্ত্র কম থাকুক আর বেশি থাকুক) আর আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের মাল দিয়ে আর তোমাদের জান দিয়ে জিহাদ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, তোমরা যদি জানতে!




আহসানুল বায়ান: (৪১) দুর্বল হও অথবা সবল, সর্বাবস্থাতেই তোমরা বের হও[1] এবং আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে।



মুজিবুর রহমান: অভিযানে বের হও স্বল্প সরঞ্জামের সাথেই হোক, অথবা প্রচুর সরঞ্জামের সাথেই হোক এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন সম্পদ ও প্রাণ দ্বারা যুদ্ধ কর, এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে।



ফযলুর রহমান: হালকা ও ভারী (সবল ও দুর্বল) উভয় অবস্থায় অভিযানে বেরিয়ে পড় এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জেহাদ কর। এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গল, যদি তোমরা জানতে!



মুহিউদ্দিন খান: তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জেহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে, এটি তোমাদের জন্যে অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পার।



জহুরুল হক: বেরিয়ে পড় হাল্কাভাবে ও ভারী হয়ে আর তোমাদের ধনসম্পদ ও তোমাদের জানপ্রাণ দিয়ে আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম করো। এটিই তোমাদের জন্য ভালো যদি তোমরা জানতে।



Sahih International: Go forth, whether light or heavy, and strive with your wealth and your lives in the cause of Allah. That is better for you, if you only knew.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪১. অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা অবস্থায় হোক বা ভারি অবস্থায় এবং জিহাদ কর আল্লাহ্–র পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে!(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে তাগিদদানের উদ্দেশ্যে পুনরোল্লেখ করা হয়েছে যে, জিহাদে বের হবার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তোমাদের আদেশ করেন, তখন সর্বাবস্থায় তা তোমাদের জন্য ফরয হয়ে গেল। আর এ আদেশ পালনের জন্য জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করা তোমাদের জন্য বসে থাকা থেকে উত্তম। কেননা এ জিহাদেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর এর মাধ্যমেই আল্লাহর কাছে উচু মর্যাদা পেতে পারে। আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করতে পারে। এভাবেই একজন আল্লাহর সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। [সা’দী] তাদের এ কল্যাণ দুনিয়া ও আখেরাত ব্যাপী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদে বের হবে, সে যদি কেবলমাত্র আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ এবং আল্লাহর বাণীতে ঈমানের কারণেই বের হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ্‌ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জিম্মাদারী নিলেন অথবা সে যে গনীমতের মাল গ্রহণ করেছে তা সহ তাকে তার পরিবারের কাছে ফেরৎ পাঠাবেন। [বুখারী: ৭৪৫৭]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪১) দুর্বল হও অথবা সবল, সর্বাবস্থাতেই তোমরা বের হও[1] এবং আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে।


তাফসীর:

[1] এর নানা অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, একাকী হও কিম্বা দলবদ্ধভাবে, খুশী হয়ে অথবা অখুশী হয়ে, গরীব হও অথবা আমীর, যুবক হও অথবা বৃদ্ধ, পায়ে হেঁটে হোক অথবা সওয়ার হয়ে, সন্তানবান হও অথবা সন্তানহীন, সৈন্যদলের অগ্রে থাকো অথবা পিছনে। ইমাম শওকানী (রঃ) বলেন, আয়াতটি এই সমস্ত অর্থের জন্য ব্যাপক হতে পারে। যেহেতু আয়াতের অর্থ এই যে, ‘‘তোমরা জিহাদে বের হও; চাহে তা তোমাদের জন্য ভারী মনে হোক অথবা হালকা।’’ আর এই অর্থে উল্লিখিত সমস্ত অর্থ এসে যায়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪১-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:



একজন মু’মিন যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন ইমাম জিহাদের জন্য আহ্বান করলে সে তার জান ও মাল নিয়ে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদে বের হয়ে পড়বে।



(اِنْفِرُوْا خِفَافًا وَّثِقَالًا)



‘অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা অবস্থায় হোক অথবা ভারি অবস্থায়’- এ আয়াতের অর্থ বিভিন্ন মুফাসসিরগণ বিভিন্ন রকম করেছেন- মুজাহিদ (রাঃ) বলেন: যুবক হোক, বৃদ্ধ হোক, ধনী হোক, গরীব হোক অভিযানের আহ্বান আসলে বেরিয়ে পড়।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সন্তুষ্ট বা অসস্তুষ্ট অবস্থায়।



হাসান বসরী (রাঃ) বলেন: স্বচ্ছল অবস্থায় হোক বা অস্বচ্ছল অবস্থায় হোক।



এছাড়াও কেউ কেউ বলেছেন: পায়ে হেঁটে হোক বা সওয়ারীতে হোক, সন্তান থাকুক বা না থাকুক, সৈন্য দলের অগ্রে থাকুক বা পিছনে থাকুক ইত্যাদি।



ইমাম শাওকানী (রাঃ) বলেন: আয়াতটি সমস্ত অর্থেই ব্যাপক। যেহেতু আয়াতের অর্থ হল: তোমরা জিহাদে বের হও চাই তোমাদের ভারী মনে হোক অথবা হালকা মনে হোক। এ অর্থের মাঝে উল্লিখিত সমস্ত অর্থই চলে আসে। (ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



(ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ)



‘এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করা দুনিয়া ও আখিরাতের চেয়েও উত্তম।



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা মুজাহিদদের দায়িত্ব নিয়েছেন যে, যদি তাকে মৃত্যু দান করেন তাহলে জান্নাত দেবেন আর বাড়িতে ফিরিয়ে আনলে প্রতিদান বা গনীমতসহ ফিরাবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩১২৩ ) এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ ج وَعَسٰٓي أَنْ تَكْرَهُوْا شَيْئًا وَّهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ج وَعَسٰي أَنْ تُحِبُّوْا شَيْئًا وَّهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ط وَاللّٰهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ)‏



“যুদ্ধ করা তোমাদের ওপর ফরয করে দেয়া হয়েছে। আর হয়ত এটা তোমাদের নিকট অপ্রিয়, তোমরা কোন বিষয়কে অপছন্দ কর যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হতে পারে তোমরা এমন বিষয়কে পছন্দ করছ যা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। মূলত আল্লাহই জানেন আর তোমরা জান না।”(বাকারাহ ২:২১৬)



لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا



‘আশু সম্পদ লাভের সম্ভাবনা থাকলে ও সফর সহজ হলে..’ পূর্বের আয়াতগুলোতে জিহাদের প্রতি যে প্রেরণা দেয়া হয়েছে মূলত তা ছিল তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পৃক্ত হলেও সকল যুগ ও অবস্থায় তা প্রযোজ্য। কেননা শব্দের ব্যাপকতাই ধতর্ব্য, নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ধতর্ব্য নয়।



যারা তাবুক যুদ্ধে নাবী (সাঃ)-এর সাথে যায়নি তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা এখানে ভর্ৎসনা করে বলেছেন: সহজেই গনীমত পাওয়া গেলে ও সফর দূরবর্তী না হলে তারা তোমার সাথে যুদ্ধে যেত, কিন্তু (এ ফসল কাটার মওসুমে) তাদের জন্য শাম (সিরিয়া) সফর করা দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। এখন তোমার কাছে অহেতুক ওজর পেশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা জানেন তারা মিথ্যুক।



(عَفَا اللَّهُ عَنْكَ)



‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন’এখানে নাবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে যে, জিহাদে শরীক না হওয়ার অনুমতিপ্রার্থীদেরকে তাদের ওজরের সত্যতা যাচাই না করেই কেন অনুমতি দিয়ে দিলে? কিন্তু এ তিরস্কারেও স্নেহের প্রভাব বেশি ছিল। এ জন্যই উক্ত ত্র“টির ক্ষমা প্রথমেই স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এ তিরস্কার এ জন্যই করা হয়েছে যে, অনুমতি দেয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ার সাথে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং পূর্ণভাবে সত্যতা যাচাই করে দেখার প্রয়োজন মনেকরা হয়নি। নচেৎ তদন্তের পর সত্যিই যার ওজর আছে তাকে অনুমতি দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার তরফ থেকে তাকে অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِه۪ وَإِذَا كَانُوْا مَعَه۫ عَلٰٓي أَمْرٍ جَامِعٍ لَّمْ يَذْهَبُوْا حَتّٰي يَسْتَأْذِنُوْهُ ط إِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَأْذِنُوْنَكَ أُولٰ۬ئِكَ الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِه۪ ۪ ج فَإِذَا اسْتَأْذَنُوْكَ لِبَعْضِ شَأْنِهِمْ فَأْذَنْ لِّمَنْ شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللّٰهَ ط إِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ)‏



“মু’মিন তো তারাই যারা আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলে ঈমান আনে এবং রাসূলের সঙ্গে সমষ্টিগত ব্যাপারে একত্র হলে তারা অনুমতি ব্যতীত সরে পড়ে না; নিশ্চয়ই‎ যারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে তারাই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাসী। অতএব তারা তাদের কোন কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য তোমার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা তুমি অনুমতি দাও এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমাও প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নূর ২৪:৬২)



সুতরাং জিহাদের ডাক আসলে মু’মিন কোন প্রকার অজুহাত দেখিয়ে বসে থাকতে পারে না, বরং সে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে কিভাবে এ ফযীলতের কাজে অংশ গ্রহণ করা যায়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইমাম যুদ্ধের জন্য আহ্বান করলে একজন মু’মিন যে অবস্থাতেই থাকুক জিহাদে বের হওয়া আবশ্যক, যদি শরীয়তসম্মত কোন কারণ না থাকে।

২. জিহাদ জান ও মাল উভয়টাই দ্বারা হয়।

৩. গনীমত পাওয়া যাবে অথবা কিছু দেয়া হবে এ আশা নিয়ে জিহাদে শরীক হওয়া ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং জিহাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও দীন প্রতিষ্ঠা করা।

৪. ভালবাসার পাত্রকে অপরাধের জন্য ধমক দেয়া শরীয়তসম্মত।

৫. আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং মুজাহিদদের দায়িত্বশীল, তারা দুনিয়াতে কোন সম্পদ বা সম্মান না পেলেও পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁর পিতা হতে, তিনি আবুয যুহা মুসলিম ইবনে সাবীহ (রঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, সূরায়ে বারাআতের এ আয়াতটিই সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। এতে রয়েছে যে, তাবূকের যুদ্ধের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সমস্ত মুসলিমের গমন করা উচিত। আহলে কিতাবদের কাফির রোমকদের সাথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা অবশ্য কর্তব্য। এতে তাদের মনের ইচ্ছা থাক আর নাই থাক এবং এটা তাদের কাছে সহজ কিংবা কঠিনই মনে হাক। বৃদ্ধেরা ও রুগ্ন ব্যক্তিরা বলছিলঃ “আমরা এ যুদ্ধে গমন না করলে পাপ হবে না। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।

বৃদ্ধ ও যুবক সবারই জন্যে এ হুকুম সাধারণ হয়ে গেল। কারো কোন ওযর চললো না। আবু তালহা (রাঃ) এ আয়াতের এই তাফসীরই করেছেন। এই হুকুম পালনার্থে এই মনীষী সিরিয়ার ভূমিতে চলে যান এবং খ্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জীবনদাতা আল্লাহর কাছে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেন। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট রাখুন!

আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, আবু তালহা (রাঃ) একদা (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আমার ধারণায় তো আমাদের প্রতিপালক যুবক বৃদ্ধ সকলকেই জিহাদে অংশগ্রহণের দাওয়াত দিয়েছেন। হে আমার প্রিয় ছেলেরা! তোমরা আমার জন্যে যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রস্তুত কর। আমি সিরিয়ার জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে অবশ্যই যাত্রা শুরু করবো।” তার ছেলেরা তখন তাকে বললেনঃ “আব্বা! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নেতৃত্বাধীন আপনি তার জীবদ্দশায় জিহাদ করেছেন। আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতের আমলেও আপনি মুজাহিদদের সাথে থেকেছেন। উমার (রাঃ)-এর খিলাফত কালেও আপনি একজন বিখ্যাত বীর হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। এখন আপনার জিহাদ করার বয়স আর নেই। সুতরাং আপনি এখন বাড়ীতেই বিশ্রাম করুন। আমরাই আপনার পক্ষ থেকে জিহাদের ময়দানে যোগদান করছি।” কিন্তু তিনি তাদের কথা মানলেন না এবং ঐ মূহুর্তেই জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। সমুদ্র পার হওয়ার জন্যে তিনি নৌকায় আরোহণ করলেন। গন্তব্যস্থানে পৌছাতে তখনও কয়েকদিনের পথ বাকী । সমুদ্রের মাঝপথেই তার প্রাণ পাখী উড়ে যায়। নয় দিন পর্যন্ত নৌকা চলতে থাকে, কিন্তু কোন দ্বীপ পাওয়া গেল না যে সেখানে তাকে দাফন করা যায়। নয় দিন পর যাত্রীরা স্থলভাগে অবতরণ করে এবং তাঁকে দাফন করা হয়। তখন পর্যন্ত মৃতদেহের কোনই পরিবর্তন ঘটেনি।

আরো বহু গুরুজন হতে (আরবী)-এর তাফসীর যুবক ও বৃদ্ধ বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা যুবক হাক, বৃদ্ধ হাক, কাজ থেকে অবসর প্রাপ্ত হাক, কাজের মধ্যে নিয়োজিত থাক, ধনী হাক বা গরীব হাক, ভারী হাক বা হালকা হাক, অভাবী হাক, কারীগর হাক, সুখী হাক বা দুঃখী হাক, পেশাদার হাক বা ব্যবসায়ী হাক, শক্তিশালী হাক বা দুর্বল হাক, যে অবস্থাতেই থাকুক না। কেন, কোন ও্যর না করেই দাঁড়িয়ে যেতে হবে এবং জিহাদের জন্যে যাত্রা শুরু করতে হবে।

এই মাসআলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা হিসেবে ইমাম আবু আমর আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, যদি রোমের ভিতরে আক্রমণ হয় তবে মুসলিমরা হালকা ও সওয়ার অবস্থায় চলবে। আর যদি বন্দরের ধারে আক্রমণ হয় হবে হালকা, ভারী, সওয়ার ও পদব্রজ সব রকমভাবে বের হয়ে যাবে। কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, (আরবী) (৯:১২২) এ আয়াত দ্বারা এই আয়াতটি মানসূখ হয়ে গেছে। এর উপর আমরা ইনশাআল্লাহ পূর্ণভাবে আলোকপাত করবো।

বর্ণিত আছে যে, মিকদাদ (রাঃ) বড় ও মোটা দেহ বিশিষ্ট লোক ছিলেন। সুতরাং তিনি নিজের অবস্থা প্রকাশ করে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু তাঁকে অনুমতি দেয়া হলো না এবং এ আয়াত অবতীর্ণ হলো। তখন এ হুকুম সাহাবীদের কাছে খুবই কঠিন ঠেকলো। আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী) (৯:৯১) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করে উক্ত আয়াতটি মানসূখ করে দেন। অর্থাৎ “ দুর্বল, রুগ্ন, অভাবী, যাদের কাছে খরচ করার কিছুই নেই, তারা যদি আল্লাহর দ্বীন ও রাসূল (সঃ)-এর শরীয়তের পক্ষপাতী ও শুভাকাঙ্ক্ষী হয় তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না হলেও কোন দোষ নেই।”

আবূ আইয়ুব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর তিনি একটি বছর ছাড়া কোন জিহাদেই অনুপস্থিত ছিলেন না। আর তিনি বলতেন যে, আল্লাহ তা'আলা ভারী ও হালকা উভয়কেই যুদ্ধে গমনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর মানুষের অবস্থা তো এ দুটোই হয়ে থাকে।

আবু রাশিদ হিরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অশ্বারোহী মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ)-কে হিমস -এ দেখতে পাই। তার হাড়ের জোড় ছুটে গিয়েছিল (তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন)। তবুও দেখি যে, তিনি শিবিকার উপর সওয়ার হয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারতো শরীয়তসম্মত ওযর রয়েছে। তবুও আপনি এতো কষ্ট করছেন কেন? তিনি উত্তরে আমাকে বললেনঃ “দেখো, সূরাতুল বাউস অর্থাৎ সূরায়ে বারাআত আমাদের সামনে অবতীর্ণ হয়েছে। তাতে হালকা, ভারী অর্থাৎ যুবক ও বৃদ্ধ সকলকেই যুদ্ধে গমনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”

হাইয়ান ইবনে যায়েদ শারআবী (রঃ) বলেন, আমি হিমসের শাসনকর্তা সাফওয়ান ইবনে আমরের সাথে জারাজিমা অভিমুখে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। আমি দামেস্কের একজন অতি বয়স্ক বুযুর্গকে দেখলাম যিনি আক্রমণকারীদের সাথে নিজের উটের উপর সাওয়ার হয়ে আসছেন। তার জ্বগুলো চোখের উপর পড়ে রয়েছে। তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। আমি তার নিকটে গিয়ে বললাম, চাচাজান! আল্লাহ তা'আলার কাছে তো আপনার ওযর করার অবকাশ রয়েছে। একথা শুনে তিনি চোখের উপর থেকে জ্বগুলো সরালেন এবং বললেনঃ “দেখো, আল্লাহ তা'আলা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থাতেই আমাদেরকে জিহাদে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জেনে রেখো, আল্লাহ তা'আলা যাকে ভালবাসেন তাকে তিনি পরীক্ষাও করে থাকেন। অতঃপর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তিনি তার উপর রহমত বর্ষণ করেন। দেখো, আল্লাহর পরীক্ষা শো, সবর, তাঁর যিক্র এবং খাটি তাওহীদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।”

জিহাদের হুকুম দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে ও রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টির কাজে মাল ও জান খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এতেই দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল রয়েছে। পার্থিব মঙ্গল ও লাভ এই যে, সামান্য কিছু খরচ করে বহু গনীমতের মাল লাভ করা যাবে। আর আখিরাতের লাভ এই যে, এর চেয়ে বড় পুণ্য আর নেই। যেমন আল্লাহর নবী (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে জিহাদকারীর জন্যে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন যে, হয় তাকে শহীদ করে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবেন, না হয় গনীমতসহ নিরাপদে বাড়ীতে ফিরিয়ে আনবেন।” এই জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে এমতাবস্থায় যে, ওটা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়, আর তোমরা কোন কিছু হয়তো অপছন্দ করে থাকো অথচ ওটাই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। পক্ষান্তরে তোমরা হয়তো কোন জিনিস পছন্দ করে থাকো অথচ ওটাই তোমাদের জন্যে ক্ষতিকর, আর (কোটা তোমাদের জন্যে ভাল এবং কোন্টা খারাপ তা) আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ “তুমি ইসলাম গ্রহণ কর।” লোকটি বললোঃ “আমার মন যে চায় না।” তখন তিনি তাকে বললেনঃ “মন না চাইলেও তুমি ইসলাম কবূল কর।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।