আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 110)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 110)



হরকত ছাড়া:

لا يزال بنيانهم الذي بنوا ريبة في قلوبهم إلا أن تقطع قلوبهم والله عليم حكيم ﴿١١٠﴾




হরকত সহ:

لَا یَزَالُ بُنْیَانُهُمُ الَّذِیْ بَنَوْا رِیْبَۃً فِیْ قُلُوْبِهِمْ اِلَّاۤ اَنْ تَقَطَّعَ قُلُوْبُهُمْ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌ حَکِیْمٌ ﴿۱۱۰﴾




উচ্চারণ: লা-ইযা-লুবুনইয়া-নুহুমুল্লাযী বানাও রীবাতান ফী কুলূবিহিম ইল্লা-আন তাকাত্তা‘আ কুলূবুহুম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।




আল বায়ান: তাদের নির্মিত গৃহ, তাদের অন্তরে সন্দেহের কারণ হয়ে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১০. তাদের ঘর যা তারা নির্মাণ করেছে তা তাদের অন্তরে সন্দেহের কারণ হয়ে থাকবে- যে পর্যন্ত না তাদের অন্তর ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের তৈরি ঘরটি তাদের অন্তরে সদা-সর্বদা সন্দেহের উদ্রেক করে যাবে যে পর্যন্ত না তাদের হৃদয়গুলো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহা প্রজ্ঞাময়।




আহসানুল বায়ান: (১১০) তাদের এই ইমারত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সদা তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের হৃদয় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।[1] আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।



মুজিবুর রহমান: তাদের এই ইমারাত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সদা তাদের মনে খট্কা সৃষ্টি করতে থাকবে, যে পর্যন্ত তাদের অন্তরই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী।



ফযলুর রহমান: যে ভবনটি (মসজিদে দিরার) তারা নির্মাণ করেছে তা তাদের অন্তরে সর্বদা এক সন্দেহের বস্তু হয়েই থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের অন্তরসমূহ টুকরা টুকরা হয়ে যায় (অর্থাৎ তারা ঐ ভবন নির্মাণের জন্য সারাজীবন সন্দেহের অন্তর্জ্বালায় জ্বলতে থাকবে)। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।



মুহিউদ্দিন খান: তাদের নির্মিত গৃহটি তাদের অন্তরে সদা সন্দেহের উদ্রেক করে যাবে যে পর্যন্ত না তাদের অন্তরগুলো চৌচির হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।



জহুরুল হক: তাদের যে ভবন তারা বানিয়েছে তা তাদের হৃদয়ে অশান্তি সৃষ্টি থেকে বিরত হবে না, যদি না তাদের হৃদয় কুটি কুটি করা হয়। আর আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।



Sahih International: Their building which they built will not cease to be a [cause of] skepticism in their hearts until their hearts are stopped. And Allah is Knowing and Wise.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১১০. তাদের ঘর যা তারা নির্মাণ করেছে তা তাদের অন্তরে সন্দেহের কারণ হয়ে থাকবে- যে পর্যন্ত না তাদের অন্তর ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১১০) তাদের এই ইমারত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সদা তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের হৃদয় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।[1] আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।


তাফসীর:

[1] ‘অন্তর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়’ এর অর্থ হল, মারা যায়। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত এই গৃহ তাদের অন্তরে আরো বেশি সন্দেহ ও মুনাফিকী সৃষ্টি করার কারণ হয়ে থাকবে। যেমন বাছুর পূজারীদের হৃদয়-মনে বাছুর-প্রীতি জমে বসেছিল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০৭-১১০ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতে মুনাফিকদের একটি অত্যন্ত নোংরা ষড়যন্ত্রের কথা বর্ণিত হয়েছে। তা হল, তারা একটি মাসজিদ নির্মাণ করে। কুরআন উক্ত মাসজিদকে “মাসজিদে যিরার” নামে অভিহিত করেছে। তারা নাবী (সাঃ)-কে বলে: বৃষ্টি, ঠাণ্ডা ইত্যাদির কারণে দুর্বল ও অসুস্থ লোকেদের দূরে (মাসজিদে কুবায়) যেতে বড় কষ্ট হয়। তাদের সুবিধার্থে একটি মাসজিদ নির্মাণ করেছি। যদি সেখানে গিয়ে সালাত আদায় করে আপনি উদ্বোধন করে দিতেন তাহলে আমরা বরকত লাভে ধন্য হতাম। নাবী (সাঃ) তখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সালাত আদায় করে উদ্বোধনের প্রতিশ্র“তি দিলেন। কিন্তু ফিরার পথে আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহী দ্বারা মুনাফিকদের অসৎ উদ্দেশ্যের কথা ফাঁস করে দিলেন।



মূলত এ মাসজিদ নির্মাণ করেছে মুসলিমদের ক্ষতিসাধন, কুফরীর প্রচার ও বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে। তারা মিথ্যা শপথ করে নাবী (সাঃ)-কে প্ররোচিত করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাকে তাদের চক্রান্ত ও প্রতারণা থেকে রক্ষার্থে সে মাসজিদে সালাত আদায় করতে নিষেধ করলেন। আর যে মাসজিদ তাক্বওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত সেখানে সালাত আদায় করার উৎসাহ দিলেন।



(لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَي التَّقْوٰي)



‘যে মাসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই স্থাপিত হয়েছে তাক্ওয়ার ওপর’- প্রথম দিনই যে মাসজিদ তাক্বওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটা কোন্টি তা নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়।



কেউ কেউ বলেন: এটা মাসজিদে কুবা, আবার কেউ বলেন: এটা মাসজিদে নববী, সালাফদের কেউ বলেছেন: উভয়টিই উদ্দেশ্য। ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ) বলেন: যদি এ আয়াত দ্বারা মাসজিদে কুবা উদ্দেশ্য হয় তবে কতিপয় হাদীস দ্বারা মাসজিদে নববীকেও



(أُسِّسَ عَلَي التَّقْوٰي)



বলে সমর্থন করা হয়েছে। উভয়ের মাঝে কোন বৈপরিত্য নেই। কারণ মাসজিদে কুবা যদি এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয় তবে মাসজিদে নববী তো আরো বেশি মর্যাদার অধিকারী। মাসজিদে কুবার ফযীলত হিসেবে নাবী (সাঃ) বলেন: মাসজিদে কুবায় সালাত আদায় করা উমরা করার মত। (ইবনু মাযাহ হা: ১৪১১, হাকিম: ১/৪৮৭, গ্রহণযোগ্য)।



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাসজিদে কুবায় আরোহণ করে ও পায়ে হাঁটা অবস্থায় যিয়ারত করতেন। (সহীহ মুসলিম হা: ৫১৫, সহীহ বুখারী হা: ১১৯৩)



(فِيْهِ رِجَالٌ يُّحِبُّوْنَ أَنْ يَّتَطَهَّرُوْا وَاللّٰهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِيْنَ)



‘তথায় এমন লোক আছে যারা পবিত্রতা অর্জন ভালবাসে এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন।’ আয়াতটি কুবাবাসীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা যথাসম্ভব পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করত যার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রশংসা করেছেন (আবূ দাঊদ হা: ৪৪, তিরমিযী হা: ৩১০০, সনদ সহীহ)



অনেকে মনে করে তারা ঢিলা ব্যবহার করতেন, সাথে পানিও ব্যবহার করতেন- এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রশংসা করেছেন। এটা ভুল ধারণা। বরং তারা পানি থাকতে ঢিলা ব্যবহার করতেন না। প্রয়োজনে খাবার পানি ইস্তিঞ্জার জন্য ব্যবহার করতেন।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন ও মুনাফিকদের একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন এমনভাবে যে, এক ব্যক্তি তার ইমারত স্থাপন করেছেন, আল্লাহ-ভীতি ও তাঁর সন্তুষ্টির ওপর। এ ব্যক্তি উত্তম না যে তার ইমারত স্থাপন করেছে পতনমুখী গর্তের কিনারায়। অতঃপর তা তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়? সেই মুনাফিকদের মাসজিদ নির্মাণের কাজও অনুরূপ, অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত তাদের এসব কাজ জাহান্নামে পতিত হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কোন মাসজিদ নির্মাণের দ্বারা মুসলিমদের ক্ষতিসাধন ও ঐক্য বিনষ্ট উদ্দেশ্য হয় তাহলে তাতে সালাত আদায় করা নিষেধ। এমন মাসজিদ ভেঙ্গে ফেলা ওয়াজিব।

২. সৎ আমলে যদি খারাপ নিয়ত থাকে তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত।

৩. যে কোন পন্থায় মুসলিমদের মাঝে দল-উপদল সৃষ্টি করা হারাম।

৪. যে জায়গায় মুর্তিপূজা করা হয় বা আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কাজ করা হয় সেখানে ইবাদত করা হারাম যদিও আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে সে ইবাদত করা হয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, যারা মসজিদের ভিত্তি তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর স্থাপন করেছে, আর যারা মসজিদে যিরার ও মসজিদে কুফর। বানিয়েছে এবং মুমিনদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেছে ও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ঐ মসজিদকে আশ্রয়স্থল করেছে তারা কখনো সমান হতে পারে না। ঐ লোকগুলো তো মসজিদে যিরারের ভিত্তি যেন একটি গহ্বরের কিনারার উপর স্থাপন করেছে, যা ধ্বসে পড়ার উপক্রম, অতঃপর তা তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়েছে। যারা সীমালংঘন করে আল্লাহ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন না। অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আমলকে সংশোধন করেন না।

জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আমি মসজিদে যিরারটি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে যখন তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় তখন তার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল।” ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ “আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, লোকেরা এক জায়গায় গর্ত খনন করে এবং সেখান থেকে তারা ধোঁয়া বের হতে দেখে।” কাতাদাও (রঃ) অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। খালাফ ইবনে ইয়াসীন আল কূফী (রঃ) বলেনঃ “আমি মুনাফিকদের ঐ মসজিদটি দেখেছি যার বর্ণনা আল্লাহ কুরআনে করেছেন, তাতে একটি ছিদ্র রয়েছে যার মধ্য দিয়ে ধূম্র বের হচ্ছে। সেটা আজ আবর্জনা ফেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে।” ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ ঐ ইমারত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সর্বদা তাদের মনে খটকা সৃষ্টি করতে থাকবে। এর কারণে তাদের অন্তরে নিফাকের বীজ বপন করার কাজ চলতে থাকবে। যেমন গো-বৎস পূজারীদের অন্তরে ওর মহব্বত সৃষ্টি হয়েছিল।

অর্থাৎ অবশ্যই যদি তাদের সেই অন্তরই ধ্বংস হয়ে যায় তবে তো কোন কথাই থাকে না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের আমলগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল এবং তিনি ভাল ও মন্দের প্রতিদান দেয়ার ব্যাপারে মহাজ্ঞানী ও বড় বিজ্ঞানময়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।