সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 102)
হরকত ছাড়া:
وآخرون اعترفوا بذنوبهم خلطوا عملا صالحا وآخر سيئا عسى الله أن يتوب عليهم إن الله غفور رحيم ﴿١٠٢﴾
হরকত সহ:
وَ اٰخَرُوْنَ اعْتَرَفُوْا بِذُنُوْبِهِمْ خَلَطُوْا عَمَلًا صَالِحًا وَّ اٰخَرَ سَیِّئًا ؕ عَسَی اللّٰهُ اَنْ یَّتُوْبَ عَلَیْهِمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۰۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া আ-খারূনা‘তারাফুবিযুনূবিহিম খালাতূ‘আমালান সা-লিহাওঁ ওয়া আ-খারা ছাইয়িআন ‘আছাল্লা-হু আইঁ ইয়াতূবা ‘আলাইহিম ইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।
আল বায়ান: আর অন্য কিছু লোক তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে, সৎকর্মের সঙ্গে তারা অসৎকর্মের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবূল করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০২.আর অপর কিছু লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা এক সৎকাজের সাথে অন্য অসৎকাজ মিশিয়ে ফেলেছে: আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করবেন(১); নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর অন্য কতক লোক তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা একটি সৎ কাজের সাথে আরেকটি মন্দ কাজকে মিশ্রিত করেছে, আশা করা যায় আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন, অবশ্যই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু।
আহসানুল বায়ান: (১০২) আরো কতক লোক আছে যারা নিজেদের অপরাধসমূহ স্বীকার করেছে,[1] যারা সৎকর্মের সাথে অসৎকর্ম মিশ্রিত করেছে।[2] আশা রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন।[3] নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।
মুজিবুর রহমান: এবং আরও কতকগুলি লোক আছে যারা নিজেদের অপরাধসমূহ স্বীকার করেছে, যারা মিশ্রিত ‘আমল করেছিল, কিছু ভাল, আর কিছু মন্দ, আশা রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতি করুণা দৃষ্টি করবেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।
ফযলুর রহমান: আর একদল লোক আছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে। তারা ভাল কাজের সাথে খারাপ কাজ মিশিয়ে ফেলেছিল (অর্থাৎ ভালমন্দ দুঞ্চরকম কাজই করেছিল।) আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।
মুহিউদ্দিন খান: আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।
জহুরুল হক: আর অন্যরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা এক ভালো কাজের সাথে মন্দ অপরটি মিশিয়ে ফেলেছে। হতে পারে আল্লাহ্ তাদের দিকে ফিরবেন। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।
Sahih International: And [there are] others who have acknowledged their sins. They had mixed a righteous deed with another that was bad. Perhaps Allah will turn to them in forgiveness. Indeed, Allah is Forgiving and Merciful.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০২.আর অপর কিছু লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা এক সৎকাজের সাথে অন্য অসৎকাজ মিশিয়ে ফেলেছে: আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করবেন(১); নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
(১) যে দশজন মুমিন বিনা ওযরে তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণে বিরত ছিলেন তাঁদের সাত জন মসজিদের খুঁটির সাথে নিজেদের বেঁধে নিয়ে মনের অনুতাপ অনুশোচনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এদের উল্লেখ রয়েছে এ আয়াতে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, দশজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। এদের মধ্যে সাতজন নিজেদেরকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে এসে জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা, যারা নিজেদেরকে খুঁটির সাথে বেঁধেছে? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, এরা আবু লুবাবা ও তার কিছু সাথী। যারা আপনার সাথে যাওয়া থেকে পিছনে ছিল। তারা নিজেদেরকে নিজেরা বেঁধে নিয়েছে এ বলে যে, যে পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে আমাদের বাঁধন খুলে দিবেন এবং আমাদের ওযর কবুল করবেন, ততক্ষণ আমাদেরকে যেন কেউ না খুলে দেয়।
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমিও তাদের বাঁধন খুলব না, তাদের ওযর গ্রহণ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজেই তাদের ছেড়ে দেন বা ওযর গ্রহণ করেন। তারা আমার থেকে বিমুখ ছিল, মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করতে যায়নি। যখন তাদের কাছে এ কথা পৌছল তারাও বলল, আমরাও আল্লাহর শপথ নিজেদেরকে ছাড়িয়ে নেব না, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা না করেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে ছাড়িয়ে নেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
ঘটনা যদিও সুনির্দিষ্ট তথাপি এর দাবী ব্যাপক। যারাই ভাল ও মন্দ আমলের মধ্যে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে তাদের ক্ষেত্রেই এ আয়াত প্রযোজ্য। যেমন হাদীসে এসেছে, সামুরা ইবন জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন, গত রাত্রে আমার কাছে দুজন এসেছেন, তারা আমাকে উঠালেন, তারপর আমাকে নিয়ে এমন এক নগরীতে নিয়ে গেলেন যার একটি ইট স্বর্ণের অপরটি রৌপ্যের। সেখানে আমরা কিছু লোক দেখলাম, যাদের শরীরের একাংশ এত সুন্দর যত সুন্দর তুমি মনে করতে পার। আর অপর অংশ এত বিশ্রী যত বিশ্রী তুমি মনে করতে পার। তারা দু'জন তাদেরকে বলল, তোমরা ঐ নালাতে গিয়ে পতিত হও। তারা সেখানে পড়ল। তারপর যখন তারা আমাদের কাছে আসল, দেখলাম যে, তাদের খারাপ অংশ চলে গেছে, অতঃপর ভীষণ সুন্দর হয়ে গেছে। তারা দু'জন আমাকে বলল, এটা হলো জান্নাতে আদন। আর ওখানেই আপনার স্থান। তারা দু’জন বলল, আর যাদেরকে আপনি অর্ধেক সুন্দর আর বাকী অর্ধেক বিশ্রী দেখেছেন, তারা হচ্ছেন, যারা এক সৎকাজের সাথে অন্য অসৎকাজ মিশিয়ে ফেলেছে। [বুখারী ৪৬৭৪]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০২) আরো কতক লোক আছে যারা নিজেদের অপরাধসমূহ স্বীকার করেছে,[1] যারা সৎকর্মের সাথে অসৎকর্ম মিশ্রিত করেছে।[2] আশা রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন।[3] নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।
তাফসীর:
[1] এরা সেই সকল একনিষ্ঠ মুসলিম, যারা কোন ওজর আপত্তি ছাড়াই শুধু শৈথিল্যের কারণে তাবুক অভিযানে নবী (সাঃ)-এর সাথে শরীক হয়নি। তবে পরে তারা আপন ভুল বুঝতে পারে এবং তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করে নেয়।
[2] ‘সৎকর্ম’ বলতে ঐ সকল নেক আমল, যা তারা জিহাদে না যাওয়ার পূর্বে করেছিল। এর ভিতর কিছু যুদ্ধে তাদের অংশ গ্রহণের আমলও ছিল। আর ‘অসৎকর্ম’ থেকে উদ্দেশ্য হল তাবুকের যুদ্ধে তাদের পিছিয়ে থাকা।
[3] আল্লাহর পক্ষ থেকে আশা ও সম্ভাবনার অর্থই হল, তা নিশ্চিত। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে তাদের অপরাধের স্বীকারোক্তিকে তওবার স্থানে রেখে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০০-১০২ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে চারশ্রেণির লোকের বিবরণ প্রদান করা হচ্ছে:
প্রথম শ্রেণি:
মুহাজিরগণ: যারা দীনের স্বার্থে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মক্কা ও অন্যান্য এলাকা থেকে হিজরত করত নিজের সকল কিছু ত্যাগ করে মদীনায় চলে আসেন।
দ্বিতীয় শ্রেণি: আনসারগণ:
এরা মদীনার অধিবাসী ছিলেন। এরা সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহায্য ও সুরক্ষা করেছিলেন। মদীনায় আগত মুহাজিরদের যথাযথ সম্মান করেছিলেন এবং নিজেদের সবকিছু তাদের খিদমতে কুরবান করে দিয়েছিলেন। এ সকল মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ঈমান আনার দিক দিয়ে অগ্রগামী ও প্রথম সারির তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট। তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।
অগ্রগামী ও প্রথম সারির সাহাবী কারা সে ব্যাপারে কয়েকটি মত পাওয়া যায়-
বিশিষ্ট তাবেয়ী শাবী বলেন: ইসলামের সূচনা থেকে হুদায়বিয়ার বছর যারা বাইয়াতে রিদওয়ান পেয়েছেন।
আবূ মূসা আল-আশআরীসহ প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন: যারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে দুই কেবলার দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছেন।
ইমাম শাওকানী (রাঃ) বলেন: উভয় মতই সঠিক হতে পারে। (ফাতহুল কাদীর, ২/৫০৩)
তৃতীয় শ্রেণি:
ঐ সকল ব্যক্তি যারা মুহাজির ও আনসারদের একনিষ্ট অনুসারী, এদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা শর্ত করেছেন (باحسان) অর্থাৎ যারা কথায়, কাজে ও আক্বীদায় তাদের একনিষ্ঠ অনুসারী। একনিষ্ঠতা থাকলেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট, অন্যথায় তাদের ওপর সন্তুষ্ট না।
এ শ্রেণির সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কারা, সে ব্যাপারে অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়।
কেউ বলেছেন: তারা পারিভাষিক অর্থে তাবেয়ীগণ, যারা নাবী (সাঃ)-এর দর্শন লাভ করতে পারেননি। কিন্তু সাহাবাদের অনুসরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
কেউ বলেছেন: কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মুসলিম আনসার ও মুহাজিরদের একনিষ্ঠ অনুসারী হবে। এতে তাবেয়ীগণও এসে যায়।
আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট, এর অর্থ হল, আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের সৎ কর্ম গ্রহণ করেছেন, মানুষ হিসেবে তাঁদের কৃত-ভুল ত্র“টি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাদের ওপর অসন্তুষ্ট নন।
অতএব দুর্ভোগ তাদের যারা সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, গালি-গালাজ করে এবং কটাক্ষ করে কথা বলে। বিশেষ করে আবূ বকর (রাঃ)কে যিনি সকল সাহাবাদের নেতা, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পরেই যার স্থান।
সকল সাহাবীদের ব্যাপারে আমাদের অন্তর থাকবে সম্পূর্ণ বিদ্বেষহীন আর জবান থাকবে সকল অসংগতিপূর্ণ কথা থেকে মুক্ত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالَّذِيْنَ جَا۬ءُوْ مِنْمبَعْدِهِمْ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِيْنَ سَبَقُوْنَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِيْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَآ إِنَّكَ رَؤُوْفٌ رَّحِيْمٌ)
“যারা তাদের পরে এসেছে (পৃথিবীতে) তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইদেরকে ক্ষমা কর যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে এবং মু’মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (সূরা হাশর ৫৯:১০)
যেমন নাবী (সাঃ) বলেন: তোমরা আমার সাহাবাদের গালি-গালাজ কর না, ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় করে তাহলে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক (আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় দান করার সমান) পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৪১)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা অবগত করছেন যে, মদীনার আশেপাশে মরুবাসী ও মদীনাতে কতিপয় মুনাফিক রয়েছে যারা নিফাকীতে অটল।
(سَنُعَذِّبُهُمْ مَّرَّتَيْنِ)
‘আমি তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব’ - হাসান বসরী (রাঃ) বলেন: দুনিয়াতে শাস্তি ও কবরের শাস্তি।
আবদুর রহমান বিন জায়েদ বলেন: দুনিয়ার শাস্তি হল, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি। তখন তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন-
(فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَآ أَوْلَادُهُمْ ط إِنَّمَا يُرِيْدُ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كٰفِرُوْنَ)
“সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন আশ্চর্য না করে, আল্লাহ তার দ্বারাই তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান। তারা কাফির থাকা অবস্থায় তাদের আত্মা দেহত্যাগ করবে।”(সূরা তাওবাহ ৯: ৫৫)
এসব মুসিবত হল তাদের জন্য দুনিয়ার শাস্তি আর মু’মিনদের জন্য পুণ্য। পরকালের শাস্তি হল জাহান্নাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ثُمَّ يُرَدُّوْنَ إِلٰي عَذَابٍ عَظِيْمٍ)
“পরে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে মহাশাস্তির দিকে।”
চতুর্থ শ্রেণি:
যারা সৎ আমল করেছে এবং পাপ কাজও করেছে। আবার পাপ কাজের কথা স্বীকারও করেছে। আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল দয়ালু। এ আয়াত অবতীর্ণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, জাবের (রাঃ) বলেন: যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তারা ছয়জন: ১. আবূ লুবাবা, ২. আউস বিন খিযাম, ৩. সালাবা বিন ওয়াদিয়া ৪. কাব বিন মালিক, ৫. মুরারা বিন রবী এবং হিলাল বিন উমাইয়া।
আবূ লুবাবা, আউস ও সালাবা এসে নিজেদেরকে মাসজিদে নববীতে বাঁধল সাথে সকল সম্পদও নিয়ে আসল। তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এসব গ্রহণ করুন আপনার জন্য সবকিছু বরাদ্দ করে রেখেছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন:
لا أحلهم حتي يكون قتال
তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সনদ মজবুত, লুবাবুন নুকূল. পৃঃ ১৫০)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আজ রাতে দুজন আগুন্তুক আমার নিকট আগমন করে এবং আমাকে এমন এক শহর পর্যন্ত নিয়ে যা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা নির্মিত ছিল। সেখানে আমি এমন কতগুলো লোক দেখতে পেলাম যাদের দেহের অর্ধাংশ খুবই সুন্দর ছিল এবং বাকি অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত। ওদিকে তাকাতেই বললো: তোমরা এই নদীতে ডুব দিয়ে এসো। তারা ডুব দিয়ে যখন বের হয়ে আসল তখন তাদের দেহের সর্বাংশ সুন্দর দেখালো। আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে বলল: এটা হল জান্নাতে আদন। এটা আপনার মঞ্জিল। অতঃপর তারা বলল: এই যে কতগুলো লোক দেখলেন যাদের দেহের অর্ধাংশ ছিল খুবই সন্দুর এবং বাকি অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত, তারা ঐ সমস্ত লোক যারা নেক আমলের সাথে বদ আমলও মিশিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৭৪)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কল্যাণ কাজে অগ্রবর্তী হওয়ার ফযীলত।
২. অন্যান্যদের ওপর সাহাবাদের ফযীলত।
৩. সাহাবাদের প্রতি আমাদের কেমন আক্বীদাহ বিশ্বাস ও আচরণ দেখানো প্রয়োজন তা জানতে পারলাম।
৪. অন্যান্য মু’মিনগণ যখন সাহাবাদের মত আক্বীদাহ গ্রহণ ও আমল করবে তাদের ফযীলত কেমন তাও জানতে পারলাম।
৫. যারা সৎ আমলের সাথে অসৎ আমল করেছে আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করবেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা যখন ঐসব মুনাফিকের অবস্থার বর্ণনা শেষ করলেন যারা মুসলিমদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রয়েছিল এবং যুদ্ধে শরীক হওয়া থেকে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, আর মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল ও সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তখন তিনি ঐ পাপীদের বর্ণনা শুরু করলেন যারা শুধুমাত্র অলসতা ও আরামপ্রিয়তার কারণেই জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে হক পন্থী ও ঈমানদার ছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা বলেন-ঐ মুনাফিকদের ছাড়া অন্যেরা যে জিহাদে শরীক হওয়া থেকে বিরত ছিল তারা নিজেদের দোষ ও অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে। তারা এমনই লোক যে, তাদের ভালো আমলও রয়েছে। আর ঐ সৎ আমলের সাথে কিছু দোষত্রুটিও জড়িয়ে দিয়েছে, যেমন জিহাদে শরীক হওয়া থেকে বিরত থাকা। কিন্তু তাদের এই দোষ-ক্রটিকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর ঐ মুনাফিকদের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তাদের কোন নেক আমলও নেই।
এ আয়াতটি কতকগুলো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও সমস্ত অপরাধী ও পাপী মুমিনদের জন্যেও এটা সাধারণ এবং তাদের সকলের ব্যাপারেই এটা প্রযোজ্য। মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এটা আবু লুবাবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন সে বানু কুরাইযা গোত্রকে বলেছিল যে, (আরবী) ওটা যবেহ করার স্থান এবং স্বীয় হাত দ্বারা সে তার গলার দিকে ইশারা করেছিল। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, দ্বারা আবু লুবাবা ও তার দলকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তালূকের যুদ্ধে না গিয়ে পিছনে রয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন যে, আবু লুবাবার সাথে আরো পাঁচজন বা সাতজন অথবা নয়জন লোক ছিল। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাবূক হতে ফিরে আসেন তখন তারা নিজেদেরকে মসজিদের থামের সাথে বেঁধে ফেলে এবং কসম করে বলে“যে পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে স্বয়ং না খুলবেন সেই পর্যন্ত আমাদেরকে খোলা হবে না।” অতঃপর যখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে খুলে দেন এবং তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অপরাধ ক্ষমা করে দেন।
ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আজ রাত্রে দু’জন আগন্তুক আমার নিকট আগমন করে এবং আমাকে এমন এক শহর পর্যন্ত নিয়ে যায় যা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা নির্মিত ছিল। সেখানে আমি এমন কতগুলো লোক দেখতে পেলাম যাদের দেহের অর্ধাংশ খুবই সুন্দর ছিল। কিন্তু বাকী অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত। ওদিকে তাকাতেই মন চাচ্ছিল না। আমার সঙ্গীদ্বয় তাদেরকে বললোঃ “তোমরা এই নদীতে ডুব দিয়ে এসো।” তারা ডুব দিয়ে যখন বের হয়ে আসলো তখন তাদের। দেহের সর্বাংশ সুন্দর দেখালো। আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে বললোঃ “এটা হচ্ছে জান্নাতে আদন। এটাই হচ্ছে আপনার মনযিল।” অতঃপর তারা বললোঃ “এই যে লোকগুলো, যাদের দেহের অর্ধাংশ ছিল খুবই সুন্দর এবং বাকী অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত, তার কারণ এই যে, তারা নেক আমলের সাথে বদ আমলও মিশিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে সংক্ষেপে এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।