আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 101)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 101)



হরকত ছাড়া:

وممن حولكم من الأعراب منافقون ومن أهل المدينة مردوا على النفاق لا تعلمهم نحن نعلمهم سنعذبهم مرتين ثم يردون إلى عذاب عظيم ﴿١٠١﴾




হরকত সহ:

وَ مِمَّنْ حَوْلَکُمْ مِّنَ الْاَعْرَابِ مُنٰفِقُوْنَ ؕۛ وَ مِنْ اَهْلِ الْمَدِیْنَۃِ ۟ۛؔ مَرَدُوْا عَلَی النِّفَاقِ ۟ لَا تَعْلَمُهُمْ ؕ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ ؕ سَنُعَذِّبُهُمْ مَّرَّتَیْنِ ثُمَّ یُرَدُّوْنَ اِلٰی عَذَابٍ عَظِیْمٍ ﴿۱۰۱﴾ۚ




উচ্চারণ: ওয়া মিম্মান হাওলাকুম মিনাল আ‘রা-বি মুনা-ফিকূনা ওয়া মিন আহলিল মাদীনাতি মারাদূ‘আলাননিফা-কি লা-তা‘লামুহুম নাহনুনা‘লামুহুম ছানু‘আযযিবুহুম মাররাতাইনি ছুম্মা ইউরাদ্দূনা ইলা-‘আযা-বিন ‘আজীম।




আল বায়ান: আর তোমাদের আশপাশের মরুবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না। আমি তাদেরকে জানি। অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আযাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহাআযাবের দিকে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০১. আর মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশপাশে আছে তাদের কেউ কেউ মুনাফেক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ, তারা মুনাফেকীতে চরমে পৌছে গেছে। আপনি তাদেরকে জানেন না(১); আমরা তাদেরকে জানি। অচিরেই আমরা তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব তারপর তাদেরকে মহাশাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের চতুষ্পার্শ্বে কতক বেদুঈন হল মুনাফিক, আর মাদীনাবাসীদের কেউ কেউ মুনাফিকীতে অনঢ়, তুমি তাদেরকে চেন না, আমি তাদেরকে চিনি, আমি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দেব, (ক্ষুধা বা নিহত হওয়া এবং কবরের শাস্তি) অতঃপর তাদেরকে মহা শাস্তির পানে ফিরিয়ে আনা হবে।




আহসানুল বায়ান: (১০১) মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশেপাশে আছে তাদের মধ্য হতে কতিপয় এবং মদীনাবাসীদের মধ্যে হতেও কতিপয় লোক এমন মুনাফিক্ব রয়েছে; যারা মুনাফিক্বীতে অটল।[1] তুমি তাদেরকে জান না,[2] আমি তাদেরকে জানি। আমি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করব,[3] অতঃপর (পরকালেও) তারা মহা শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।



মুজিবুর রহমান: আর তোমাদের মরুবাসীদের মধ্য হতে কতিপয় লোক এবং মাদীনাবাসীদের মধ্য হতেও কতিপয় লোক এমন মুনাফিক রয়েছে যারা নিফাকের চরমে পৌঁছে গেছে। তুমি তাদেরকে জাননা, আমিই তাদেরকে জানি, আমি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করব, অতঃপর (পরকালেও) তারা মহা শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।



ফযলুর রহমান: তোমাদের আশেপাশের বেদুঈনদের মধ্যে ও মদীনাবাসীদের মধ্যে কিছু কপট লোক আছে। তারা জিদ করে কপটতা করছে। তুমি তাদেরকে চেন না, তবে আমি তাদেরকে চিনি। তাদেরকে আমি দুঞ্চবার শাস্তি দেব, তারপর তাদেরকে ভয়ানক এক শাস্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।



মুহিউদ্দিন খান: আর কিছু কিছু তোমার আশ-পাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনঢ়। তুমি তাদের জান না; আমি তাদের জানি। আমি তাদেরকে আযাব দান করব দু’বার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মহান আযাবের দিকে।



জহুরুল হক: আর বেদুইনদের মধ্যের যারা তোমাদের আশেপাশে আছে তাদের মধ্যে রয়েছে মুনাফিকরা, আবার মদীনার বাসিন্দাদের মধ্যেও -- ওরা কপটতায় নাছোড়বান্দা। তুমি তাদের জানো না, আমরা ওদের জানি। আমরা অচিরেই তাদের দু বার শাস্তি দেবো, তারপর তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠোর শাস্তির দিকে।



Sahih International: And among those around you of the bedouins are hypocrites, and [also] from the people of Madinah. They have become accustomed to hypocrisy. You, [O Muhammad], do not know them, [but] We know them. We will punish them twice [in this world]; then they will be returned to a great punishment.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০১. আর মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশপাশে আছে তাদের কেউ কেউ মুনাফেক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ, তারা মুনাফেকীতে চরমে পৌছে গেছে। আপনি তাদেরকে জানেন না(১); আমরা তাদেরকে জানি। অচিরেই আমরা তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব তারপর তাদেরকে মহাশাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।


তাফসীর:

(১) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, “আর আমরা ইচ্ছে করলে আপনাকে তাদের পরিচয় দিতাম; ফলে আপনি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে আপনি অবশ্যই কথার ভংগিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন [সূরা মুহাম্মাদ: ৩০] এবং বিভিন্ন হাদীসে যে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুযইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ১৪ বা ১৫ জনের নাম জানিয়ে দিয়েছেন সেটার সাথে এ আয়াতের কোন দ্বন্ধ নেই। কারণ, সূরা মুহাম্মাদের আয়াতে তাদের চিহ্ন বলে দেয়া উদ্দেশ্য, সবাইকে জানা নয়। অনুরূপভাবে হাদীসে রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যাদের নাম জানিয়েছেন তা দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হচ্ছে না যে, তিনি সবার নাম ও পরিচয় পূর্ণভাবে জানতেন। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০১) মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশেপাশে আছে তাদের মধ্য হতে কতিপয় এবং মদীনাবাসীদের মধ্যে হতেও কতিপয় লোক এমন মুনাফিক্ব রয়েছে; যারা মুনাফিক্বীতে অটল।[1] তুমি তাদেরকে জান না,[2] আমি তাদেরকে জানি। আমি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করব,[3] অতঃপর (পরকালেও) তারা মহা শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।


তাফসীর:

[1] مَرَدَ এবং تَمَرَّد এর অর্থ হল নরম, মোলায়েম এবং খালি। সুতরাং পাতা নেই এমন ডালকে, দেহে লোম নেই এমন ঘোড়াকে এবং মুখমন্ডলে এখনো দাঁড়ি-মোছ গজায়নি এমন বালককে أَمْرَدُ বলা হয়। যেমন কাঁচকে صَرْحٌ مُمَرَّدٌ অর্থাৎ مُجَرَّدٌ (স্বচ্ছ) বলা হয়। (مَرَدُوْا عَلَى النِّفَاقِ) এর অর্থ হবে ‘تَجَرَّدُوا عَلَى النِّفَاقِ’ অর্থাৎ তারা নিজেদেরকে মুনাফিকির জন্য খালি করে নিয়েছে, অর্থাৎ, খাঁটি মুনাফিকিতে তারা অনড়।

[2] এখানে কত পরিষ্কার বাক্যে নবী (সাঃ)-এর ‘আ-লিমুল গায়ব’ না হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আফসোস! যদি বিদআতীরা কুরআন বুঝার তাওফীক পেত।

[3] কেউ কেউ এর উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন যে, তা হল পৃথিবীর অপমান-লাঞ্ছনা, তারপর আখেরাতের শাস্তি। আবার কেউ কেউ বলেন, পৃথিবীরই দ্বিগুণ শাস্তি।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০০-১০২ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতগুলোতে চারশ্রেণির লোকের বিবরণ প্রদান করা হচ্ছে:



প্রথম শ্রেণি:



মুহাজিরগণ: যারা দীনের স্বার্থে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মক্কা ও অন্যান্য এলাকা থেকে হিজরত করত নিজের সকল কিছু ত্যাগ করে মদীনায় চলে আসেন।



দ্বিতীয় শ্রেণি: আনসারগণ:



এরা মদীনার অধিবাসী ছিলেন। এরা সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহায্য ও সুরক্ষা করেছিলেন। মদীনায় আগত মুহাজিরদের যথাযথ সম্মান করেছিলেন এবং নিজেদের সবকিছু তাদের খিদমতে কুরবান করে দিয়েছিলেন। এ সকল মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ঈমান আনার দিক দিয়ে অগ্রগামী ও প্রথম সারির তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট। তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।



অগ্রগামী ও প্রথম সারির সাহাবী কারা সে ব্যাপারে কয়েকটি মত পাওয়া যায়-



বিশিষ্ট তাবেয়ী শাবী বলেন: ইসলামের সূচনা থেকে হুদায়বিয়ার বছর যারা বাইয়াতে রিদওয়ান পেয়েছেন।



আবূ মূসা আল-আশআরীসহ প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন: যারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে দুই কেবলার দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছেন।



ইমাম শাওকানী (রাঃ) বলেন: উভয় মতই সঠিক হতে পারে। (ফাতহুল কাদীর, ২/৫০৩)



তৃতীয় শ্রেণি:



ঐ সকল ব্যক্তি যারা মুহাজির ও আনসারদের একনিষ্ট অনুসারী, এদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা শর্ত করেছেন (باحسان) অর্থাৎ যারা কথায়, কাজে ও আক্বীদায় তাদের একনিষ্ঠ অনুসারী। একনিষ্ঠতা থাকলেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট, অন্যথায় তাদের ওপর সন্তুষ্ট না।



এ শ্রেণির সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কারা, সে ব্যাপারে অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়।



কেউ বলেছেন: তারা পারিভাষিক অর্থে তাবেয়ীগণ, যারা নাবী (সাঃ)-এর দর্শন লাভ করতে পারেননি। কিন্তু সাহাবাদের অনুসরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।



কেউ বলেছেন: কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মুসলিম আনসার ও মুহাজিরদের একনিষ্ঠ অনুসারী হবে। এতে তাবেয়ীগণও এসে যায়।



আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট, এর অর্থ হল, আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের সৎ কর্ম গ্রহণ করেছেন, মানুষ হিসেবে তাঁদের কৃত-ভুল ত্র“টি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাদের ওপর অসন্তুষ্ট নন।



অতএব দুর্ভোগ তাদের যারা সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, গালি-গালাজ করে এবং কটাক্ষ করে কথা বলে। বিশেষ করে আবূ বকর (রাঃ)কে যিনি সকল সাহাবাদের নেতা, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পরেই যার স্থান।



সকল সাহাবীদের ব্যাপারে আমাদের অন্তর থাকবে সম্পূর্ণ বিদ্বেষহীন আর জবান থাকবে সকল অসংগতিপূর্ণ কথা থেকে মুক্ত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالَّذِيْنَ جَا۬ءُوْ مِنْمبَعْدِهِمْ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِيْنَ سَبَقُوْنَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِيْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَآ إِنَّكَ رَؤُوْفٌ رَّحِيْمٌ)



“যারা তাদের পরে এসেছে (পৃথিবীতে) তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইদেরকে ক্ষমা কর যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে এবং মু’মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (সূরা হাশর ৫৯:১০)



যেমন নাবী (সাঃ) বলেন: তোমরা আমার সাহাবাদের গালি-গালাজ কর না, ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় করে তাহলে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক (আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় দান করার সমান) পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৪১)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা অবগত করছেন যে, মদীনার আশেপাশে মরুবাসী ও মদীনাতে কতিপয় মুনাফিক রয়েছে যারা নিফাকীতে অটল।



(سَنُعَذِّبُهُمْ مَّرَّتَيْنِ)



‘আমি তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব’ - হাসান বসরী (রাঃ) বলেন: দুনিয়াতে শাস্তি ও কবরের শাস্তি।



আবদুর রহমান বিন জায়েদ বলেন: দুনিয়ার শাস্তি হল, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি। তখন তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন-



(فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَآ أَوْلَادُهُمْ ط إِنَّمَا يُرِيْدُ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كٰفِرُوْنَ)



“সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন আশ্চর্য না করে, আল্লাহ তার দ্বারাই তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান। তারা কাফির থাকা অবস্থায় তাদের আত্মা দেহত্যাগ করবে।”(সূরা তাওবাহ ৯: ৫৫)



এসব মুসিবত হল তাদের জন্য দুনিয়ার শাস্তি আর মু’মিনদের জন্য পুণ্য। পরকালের শাস্তি হল জাহান্নাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ يُرَدُّوْنَ إِلٰي عَذَابٍ عَظِيْمٍ)



“পরে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে মহাশাস্তির দিকে।”



চতুর্থ শ্রেণি:



যারা সৎ আমল করেছে এবং পাপ কাজও করেছে। আবার পাপ কাজের কথা স্বীকারও করেছে। আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল দয়ালু। এ আয়াত অবতীর্ণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, জাবের (রাঃ) বলেন: যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তারা ছয়জন: ১. আবূ লুবাবা, ২. আউস বিন খিযাম, ৩. সালাবা বিন ওয়াদিয়া ৪. কাব বিন মালিক, ৫. মুরারা বিন রবী এবং হিলাল বিন উমাইয়া।



আবূ লুবাবা, আউস ও সালাবা এসে নিজেদেরকে মাসজিদে নববীতে বাঁধল সাথে সকল সম্পদও নিয়ে আসল। তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এসব গ্রহণ করুন আপনার জন্য সবকিছু বরাদ্দ করে রেখেছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন:



لا أحلهم حتي يكون قتال



তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সনদ মজবুত, লুবাবুন নুকূল. পৃঃ ১৫০)



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আজ রাতে দুজন আগুন্তুক আমার নিকট আগমন করে এবং আমাকে এমন এক শহর পর্যন্ত নিয়ে যা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা নির্মিত ছিল। সেখানে আমি এমন কতগুলো লোক দেখতে পেলাম যাদের দেহের অর্ধাংশ খুবই সুন্দর ছিল এবং বাকি অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত। ওদিকে তাকাতেই বললো: তোমরা এই নদীতে ডুব দিয়ে এসো। তারা ডুব দিয়ে যখন বের হয়ে আসল তখন তাদের দেহের সর্বাংশ সুন্দর দেখালো। আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে বলল: এটা হল জান্নাতে আদন। এটা আপনার মঞ্জিল। অতঃপর তারা বলল: এই যে কতগুলো লোক দেখলেন যাদের দেহের অর্ধাংশ ছিল খুবই সন্দুর এবং বাকি অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত, তারা ঐ সমস্ত লোক যারা নেক আমলের সাথে বদ আমলও মিশিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৭৪)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কল্যাণ কাজে অগ্রবর্তী হওয়ার ফযীলত।

২. অন্যান্যদের ওপর সাহাবাদের ফযীলত।

৩. সাহাবাদের প্রতি আমাদের কেমন আক্বীদাহ বিশ্বাস ও আচরণ দেখানো প্রয়োজন তা জানতে পারলাম।

৪. অন্যান্য মু’মিনগণ যখন সাহাবাদের মত আক্বীদাহ গ্রহণ ও আমল করবে তাদের ফযীলত কেমন তাও জানতে পারলাম।

৫. যারা সৎ আমলের সাথে অসৎ আমল করেছে আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করবেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে খবর দিচ্ছেন- মদীনার চতুষ্পর্শ্বে অবস্থানকারী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে কতকগুলো লোক মুনাফিক রয়েছে এবং স্বয়ং মদীনায় বসবাসকারীদের মধ্যে কিছুসংখ্যক মুসলমানও প্রকৃতপক্ষে মুনাফিক। তারা কপটতা থেকে বিরত থাকছে না। বলা হয় (আরবী) (২২:৩) এবং আরো বলা হয়। (আরবী) অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার (আরবী) এই উক্তি এবং (আরবী) (৪৭:৩০) এই উক্তির মধ্যে কোনই বৈপরীত্য নেই। কেননা, এটা এই প্রকারের জিনিস যে, এর মাধ্যমে তাদের গুণাবলী চিহ্নিত করা হয়েছে, যেন তাদেরকে চেনা যায়। এর অর্থ এটা নয় যে, নবী (সঃ) নির্দিষ্টভাবে সমস্ত মুনাফিককেই চিনতেন। তিনি মদীনাবাসীদের মধ্যে শুধুমাত্র ঐ কতিপয় মুনাফিককেই চিনতেন যারা রাত-দিন তার সাথে উঠা-বসা করতো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তিনি তাদেরকে দেখতেন। নিম্নের রিওয়ায়াতটির দ্বারাও এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, জুবাইর (রাঃ) বলেনঃ “আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকগুলো ধারণা করে যে, মক্কায় তারা কোনই প্রতিদান পায়নি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জুবাইর (রাঃ)! তোমাদেরকে তোমাদের (কর্মের) প্রতিদান অবশ্যই দেয়া হবে, শুধু মক্কায় নয়, এমন কি যদিও তোমরা শৃগালের গর্তেও বাস কর না কেন।” অতঃপর তিনি আমার দিকে মাথা ঝাকিয়ে গোপনীয়ভাবে বললেনঃ “আমার সাহাবীদের মধ্যে কিছু কিছু মুনাফিকও রয়েছে।” ভাবার্থ এই যে, কোন কোন মুনাফিক এরূপ এরূপ সুরে কথা বলে থাকে যা মোটেই সত্য নয়। সুতরাং এটাও এই ধরনেরই কথা ছিল যা জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) শুনেছিলেন।

(আরবী) (৯:৭৪) অংশের তাফসীরে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সঃ) হুযাইফা (রাঃ)-কে ১৪ বা ১৫ জন লোকের নাম বলে দিয়েছিলেন যারা প্রকৃতপক্ষে মুনাফিক ছিল। এই বিশিষ্টকরণ এটা দাবী করে না যে, তিনি সমস্ত মুনাফিকেরই নাম জানতেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন।

হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) তারজুমাতু আবি উমার আল বাইরূতী’ এর মধ্যে ইসনাদসহ রিওয়ায়াত করে বলেছেনঃ হারমালা’ নামক একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বলেঃ “ঈমান তো এখানে রয়েছে।” ঐ সময় সে তার জিহ্বার দিকে ইশারা করে। তারপর বলেঃ “আর নিফাক বা কপটতা থাকে এখানে।” এ কথা বলার সময় সে অন্তরের দিকে ইশারা করে। আল্লাহর নাম কিন্তু সে খুব কমই নেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তার জিহ্বাটিকে যিকরকারী বানিয়ে দিন, তার অন্তরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করে দিন, তার মধ্যে আমার প্রতি মহব্বত পয়দা করুন, যারা আমাকে ভালবাসে, তার মধ্যে তাদের প্রতি ভালবাসা দিয়ে দিন এবং তাদের সমস্ত কাজ উত্তম করে দিন।” সাথে সাথে তার সমস্ত কপটতা দূর হয়ে গেল এবং সে বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার অধিকাংশ সঙ্গী মুনাফিক এবং আমি তাদের নেতা ছিলাম। আমি তাদেরকে আপনার কাছে ধরে আনবো কি?” নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যে স্বেচ্ছায় আমার কাছে আসবে, আমি তার জন্যে। আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো। আর যে নিফাককেই আঁকড়ে ধরে থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে দেখে নিবেন। তুমি কারো গোপন তথ্য প্রকাশ করো না।” (এ হাদীসটি শায়েখ আবূ উমার বায়রূতী (রঃ) আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)

আবু আহমাদ হাকিমও (রঃ) এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন। এই আয়াতের ব্যাপারে কাতাদা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ লোকদের কি হয়েছে যারা কৃত্রিমভাবে মানুষের ব্যাপারে নিজেদের নিশ্চিত জ্ঞান প্রকাশ করে বলে যে, অমুক ব্যক্তি জান্নাতী ও অমুক ব্যক্তি জাহান্নামী? অথচ যদি স্বয়ং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়আচ্ছা বলতো, তোমরা জান্নাতী, না জাহান্নামী? তখন তারা বলে- আমরা এটা জানি না। অথচ যারা অন্যদের সম্পর্কে বলতে পারে যে, তারা জান্নাতী কি জাহান্নামী, তারা তো নিজেদের সম্পর্কে আরো ভাল জানতে পারবে। আসলে তারা এমন কিছু দাবী করছে যে দাবী নবীরাও করেননি।”

আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি করছে তা আমি জানি না।” (২৬:১১২) আল্লাহ তা'আলার নবী শুআইব (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট তোমাদের জন্যে কল্যাণ রয়েছে যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো । আর আমি তোমাদের উপর রক্ষক নই।” (১১ ঃ ৮৬) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এখানে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জান না, আমি তাদেরকে জানি।”

এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ) জুমআর খুতবার উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন এবং বললেনঃ “ হে অমুক অমুক ব্যক্তি! তোমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাও। কেননা, তোমরা মুনাফিক।” সুতরাং তারা অত্যন্ত লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। ঐ সময় উমার (রাঃ) মসজিদের দিকে আসছিলেন। তখন উমার (রাঃ) মনে করলেন যে, হয়তো জুমআর সালাত শেষ হয়ে গেছে তাই লোকেরা ফিরে আসছে। সুতরাং তিনি খুবই লজ্জিত হলেন এবং লজ্জাবশতঃ নিজেকে ঐলোকগুলো হতে গোপন করতে লাগলেন। আর ওদিকে ঐ লোকগুলো মনে করলো যে, উমারও (রাঃ) হয়তো তাদের নিফাকের কথা জেনে ফেলেছেন, তাই তারাও নিজেদেরকে উমার (রাঃ) থেকে গোপন করতে লাগলো। মোটকথা, উমার (রাঃ) যখন মসজিদে আসলেন তখন তিনি জানতে পারলেন যে, তখনও জুমআর সালাত পড়া হয়নি। একজন মুসলিম তাকে খবর জানিয়ে দিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) খুশী থাকুন যে, আজ আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে অপমানিত করেছেন।” ইবনে আব্বাস (রাঃ)! বলেন যে, এভাবে মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে প্রথম শাস্তি এবং দ্বিতীয় শাস্তি হবে কবরের শাস্তি।

সাওরীও (রঃ) ইসনাদসহ একথাই বলেছেন। মুজাহিদ (রঃ) (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হত্যা ও বন্দী। অন্য এক রিওয়ায়াতে ক্ষুধা ও কবরের আযাব অর্থ নেয়া হয়েছে। অতঃপর বড় আযাবের দিকে ফিরানো হবে। ইবনে জুরাইজ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এর দ্বারা দুনিয়ার আযাব ও কবরের আযাব বুঝানো হয়েছে। অতঃপর “আযাবে আযীম” অর্থাৎ জাহান্নামের শাস্তিতে জড়িয়ে দেয়া হবে। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়ার শাস্তি ও কবরের শাস্তি। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, দুনিয়ার শাস্তি হচ্ছে ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততির ফিত্নার শাস্তি। অতঃপর তিনি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি পাঠ করে শুনালেন- (আরবী) অর্থাৎ তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে, আল্লাহ চান যে, এগুলোর মাধ্যমে পার্থিব জীবনেই তিনি তাদেরকে আযাবে জড়িয়ে ফেলেন।` (৯:৫৫) কেননা এই বিপদসমূহ তাদের জন্যে শাস্তি কিন্তু মুমিনদের জন্যে প্রতিদানের কারণ। আর আখিরাতের শাস্তি দ্বারা জাহান্নামের শাস্তি বুঝানো হয়েছে।

মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, প্রথম শাস্তি দ্বারা বুঝানো হচ্ছে ঐ শাস্তি যা ইসলাম প্রসার লাভ করার মাধ্যমে তাদের উপর পতিত হয়েছিল এবং সীমাহীন দুঃখ ও আফসোস তাদের উপর জারী হয়েছিল। দ্বিতীয় শাস্তি হচ্ছে। কবরের শাস্তি। আর “আযাবে আযীম” (বড় শাস্তি) হচ্ছে ঐ শাস্তি যা আখিরাতে তারা ভোগ করবে এবং তা চিরস্থায়ীভাবে ভোগ করতে থাকবে।

সাঈদ (রঃ) কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণনা করে বলেছেন যে, নবী (সঃ) হ্যাইফা (রাঃ)-এর কানে কানে বলেছিলেনঃ “বারোজন মুনাফিক রয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের জন্যে ‘দাবীলা’ যথেষ্ট। তা হচ্ছে জাহান্নামের একটি অগ্নিশিখা যা তাদের স্কন্ধে লেগে যাবে এবং বক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ পেটের ব্যথা ও অভ্যন্তরীণ রোগে মৃত্যুবরণ করবে। আর বাকী ছয়জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হবে।”

সাঈদ (রঃ) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, যখন কেউ মারা যেতো এবং উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর দৃষ্টিতে সে সন্দেহযুক্ত হতো তখন তিনি হুযাইফা (রাঃ)-এর দিকে তাকাতেন। তিনি ঐ মৃতের জানাযার সালাত আদায় করলে তিনিও পড়তেন এই বিশ্বাস করে যে, ঐ মৃতব্যক্তি ঐ বারোজন মুনাফিকের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর হুযাইফা (রাঃ) জানাযার সালাত না পড়লে তিনিও পড়তেন না। জানা গেছে যে, উমার (রাঃ) হুযাইফা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাকে বলুন, ঐ বারোজনের মধ্যে আমি একজন নই তো?” হুযাইফা (রাঃ) উত্তরে তাকে বলেনঃ “আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। কিন্তু আপনি ছাড়া আমি আর কারো যিম্মাদারী নিচ্ছি না।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।