সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 31)
হরকত ছাড়া:
وإذا تتلى عليهم آياتنا قالوا قد سمعنا لو نشاء لقلنا مثل هذا إن هذا إلا أساطير الأولين ﴿٣١﴾
হরকত সহ:
وَ اِذَا تُتْلٰی عَلَیْهِمْ اٰیٰتُنَا قَالُوْا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَآءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هٰذَاۤ ۙ اِنْ هٰذَاۤ اِلَّاۤ اَسَاطِیْرُ الْاَوَّلِیْنَ ﴿۳۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইযা-তুতলা-‘আলাইহিম আ-য়া-তুনা-কা-লূকাদ ছামি‘না-লাও নাশাউ লাকুলনামিছলা হা-যা ইন হা-যা ইল্লা আছা-তীরুল আওওয়ালীন।
আল বায়ান: আর তাদের উপর যখন আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে, শুনলাম তো। যদি আমরা চাই, তাহলে এর অনুরূপ আমরাও বলতে পারি। এতো পিতৃ-পুরুষদের কল্প-কাহিনী ছাড়া কিছু না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. আর যখন তাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে, আমরা তো শুনলাম, ইচ্ছে করলে আমরাও এর মত করে বলতে পারি, এগুলো তো শুধু পুরোনো দিনের লোকদের উপকথা।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের কাছে যখন আমার আয়াত পাঠ করা হয় তখন তারা বলে, ‘শুনলাম তো, ইচ্ছে করলে এ রকম কথা আমরাও বলতে পারি, এগুলো তো আগে কালের কেচ্ছা কাহিনী ছাড়া আর কিছুই না।’
আহসানুল বায়ান: (৩১) আর যখন তাদের নিকট আমার আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এর অনুরূপ বলতে পারি, এ তো পূর্ববর্তীদের উপকথা ছাড়া কিছু নয়।’
মুজিবুর রহমান: তাদেরকে যখন আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনানো হয় তখন তারা বলেঃ আমরা শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এর অনুরূপ বলতে পারি, নিঃসন্দেহে এটা পুরাকালের উপাখ্যান ছাড়া কিছু নয়।
ফযলুর রহমান: যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে, “আমরা শুনেছি। ইচ্ছা করলে আমরাও এরকম বলতে পারি। এ তো আগেকার মানুষের গল্প-কাহিনি ছাড়া আর কিছু নয়।”
মুহিউদ্দিন খান: আর কেউ যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে তবে বলে, আমরা শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এমন বলতে পারি; এ তো পূর্ববর্তী ইতিকথা ছাড়া আর কিছুই নয়।
জহুরুল হক: আর যখন তাদের কাছে আমাদের বাণী পড়ে শোনানো হয় তারা বলে -- "আমরা ইতিমধ্যেই শুনেছি, আমরাও ইচ্ছা করলে এর ন্যায় অবশ্যই বলতে পারি, এ তো পুরাকালের উপকথা বৈ নয়"।
Sahih International: And when Our verses are recited to them, they say, "We have heard. If we willed, we could say [something] like this. This is not but legends of the former peoples."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩১. আর যখন তাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে, আমরা তো শুনলাম, ইচ্ছে করলে আমরাও এর মত করে বলতে পারি, এগুলো তো শুধু পুরোনো দিনের লোকদের উপকথা।(১)
তাফসীর:
(১) এটা ছিল কাফের কুরাইশদের মুখের কথা। তারা কুরআনের বিপরীতে কিছুই আনতে পারেনি। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। এটা বলে তারা নিজেদেরকে ধোঁকায় ফেলছিল এবং আত্মপ্রসাদ লাভ করছিল। [ইবন কাসীর] কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আয়াতখানা নদর ইবন হারেসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। [তাবারী; বগভী] সে জাহেলী যুগে ইরানের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও ইয়াহুদী ও নাসারাদের বিভিন্ন কাহিনী আয়ত্ব করেছিল। রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরআনে কোন জাতি সম্পর্কে বলতেন তখন সে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন আজেবাজে কাহিনী রচনা করত এবং তার সঙ্গী-সাথীদের বলতঃ আমার গল্প মুহাম্মাদ যা নিয়ে এসেছে তার থেকে উত্তম। [বাগভী]
বদরের যুদ্ধে মিকদাদ 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মিথ্যাচার, অপবাদ, ঠাট্টা বিদ্রুপের শাস্তি স্বরূপ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। কাফেরগণ প্রায়ই এ কুরআনকে গল্প বলে প্রচার করতে চেষ্টা করত এবং এর বিপরীত কিছু নিয়ে আসার দাবী করত কিন্তু তারা তা আনতে পারত না। [ইবন কাসীর] সুরা আল-ফুরকানের ৫ ও ৬ নং আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা তাদের এ সমস্ত হঠকারিতাপূর্ণ কথা উল্লেখ করে তার জবাব দিয়েছেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩১) আর যখন তাদের নিকট আমার আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এর অনুরূপ বলতে পারি, এ তো পূর্ববর্তীদের উপকথা ছাড়া কিছু নয়।’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩১-৩৫ নং আয়াতের তাফসীরঃ
এখানে আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের অবাধ্যতা ও গোঁড়ামির বর্ণনা দিচ্ছেন। তারা বলে আমরা ইচ্ছা করলে কুরআনের মত এরূপ কথা বানিয়ে বলতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلٰٓي أَنْ يَّأْتُوْا بِمِثْلِ هٰذَا الْقُرْاٰنِ لَا يَأْتُوْنَ بِمِثْلِه۪ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيْرًا )
“বল : ‘যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন্ন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এটার অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।’(সূরা বানী ইসরাইল ১৭: ৮৮)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَلَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِيْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ﺸ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِيْنَ)
“অনন্তর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনও করতে পারবে না, তা হলে তোমরা সেই জাহান্নামকে ভয় কর যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর যা তৈরি করে রাখা হয়েছে কাফিরদের জন্য।”(সূরা বাক্বারাহ ২:২৪)
(أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ)
‘সেকালের লোকেদের উপকথা ছাড়া কিছুই না।’ অর্থাৎ পূর্ববর্তীদের উপকথা, অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلٰي عَلَيْهِ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا , قُلْ أَنْزَلَهُ الَّذِيْ يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ ط إِنَّه۫ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا)
“তারা বলে: ‘এগুলো তো সে কালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।’ বল: ‘এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় অদৃশ্যের রহস্য অবগত আছেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’(সূরা ফুরকান ২৫:৫-৬)
وَإِذْ قَالُوا اللّٰهُمَّ إِنْ كَانَ هٰذَا.........
‘স্মরণ কর, যখন তারা বলছিল, ‘হে আল্লাহ! এটা যদি তোমার পক্ষ হতে সত্য হয়’ অর্থাৎ তারা দ্রুত শাস্তি কামনা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَالُوْا رَبَّنَا عَجِّلْ لَّنَا قِطَّنَا قَبْلَ يَوْمِ الْحِسَابِ)
“তারা বলে: হে আমাদের প্রতিপালক! বিচারের দিনের পূর্র্বেই আমাদের প্রাপ্য অংশ আমাদেরকে শীঘ্রই দিয়ে দিন।”(সূরা সোয়াদ ৩৮:১৬)
৩৩ নং আয়াতের শানে নুযূল:
(وَمَا كَانَ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيْهِمْ)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আবূ জাহল বলল: হে আল্লাহ! এ কুরআন যদি তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয় তাহলে আমাদের ওপর পাথর বর্ষণ কর অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দাও। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৯, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৯৬)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাদেরকে তিনি কেন শাস্তি দেবেন না! কারণ তারা মাসজিদে হারাম থেকে মানুষকে বাধা দেয়। তারা তো এ মাসজিদের তত্ত্বাবধায়ক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তারাই ঐ সকল লোক, যারা কুফরী করেছে ও তোমাদেরকে মাসজিদুল হারাম থেকে ফিরিয়ে রেখেছে এবং কুরবানীর উটগুলোকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে দেয়নি। যদি (মক্কায়) এমন মু’মিন নর ও নারী না থাকত যাদের কথা তোমরা জান না আর অজ্ঞতাবশত তোমরা তাদেরকে পদদলিত করে ফেলবে এবং এতে তোমরাও তাদের পক্ষ থেকে কষ্ট পাবে (এ আশঙ্কা না থাকলে যুদ্ধ বন্ধ করা হতো না)। (যুদ্ধ এ জন্য বন্ধ করা হয়েছে) যাতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে তাঁর রহমতে শামিল করে নেন। ঐ মু’মিনরা যদি (কাফিরদের থেকে) আলাদা অবস্থায় থাকত তাহলে (মক্কায়) যারা কাফির ছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই কঠিন শাস্তি দিতাম।”(সূরা ফাতহ ৪৮:২৫)
মাসজিদের তত্ত্বাবধায়ক হবে একমাত্র ঈমানদারগণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “মুশরিকরা যখন নিজেরাই নিজেদের কুফরী স্বীকার করে তখন তারা আল্লাহর মাসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে- এমনটি হতে পারে না। তারা এমন যাদের সমস্ত কর্ম ব্যর্থ হয়ে গেছে এবং তারা অগ্নিতেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তারাই তো আল্লাহর মাসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে এবং সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারা হবে সৎ পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।”(সূরা তাওবাহ ৯:১৭-১৮)
(إِلَّا مُكَا۬ءً وَتَصْدِيَةً)
‘কা‘বা ঘরের নিকট শুধু শিস ও হাততালি দেয়াই ছিল তাদের সালাত’ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: কুরাইশরা উলঙ্গ অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করত ও মুখে আঙ্গুল দিয়ে শিস দিত এবং দু’হাত দ্বারা তালি বাজাত। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
এরূপ করাকে তারা ইবাদত ও পুণ্যের কাজ মনে করত। যেমন আজকাল কিছু সুফীরা তাদের আস্তানায় ঢোল-তবলা বাজায় এবং বলে, এটাই আমাদের ইবাদত ও সালাত।
সুতরাং নিজের কাছে যা ভাল মনে হবে তা-ই ইবাদত, আর যা ভাল মনে হবে না তা ইবাদতের বাইরে- এমন কথা ইবাদতের মাপকাঠি নয় বরং ইবাদতের মাপকাঠি হল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ যাকে ইবাদত বলে আখ্যায়িত করবে তাই ইবাদত বলে গণ্য হবে তা- নিজের মনোপুত হোক আর না-ই হোক।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের চ্যালেঞ্জ বহাল থাকবে; এর মত কেউ কিছু তৈরি করতে পারবে না।
২. কোন নাবীর বর্তমানে তিনি না চাইলে তাঁর জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা আযাব দেন না।
৩. মাসজিদে কেবল ঈমানদাররাই ইবাদত করবে, দেখা শোনা করবে এবং তদারকি করবে।
৪. মাসজিদে শিস দেয়া, হাতে তালি দেয়া নিষেধ। তবে সালাতে ভুল হলে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য মহিলাদের হাতে তালি দিয়ে সংকেত দেয়া বৈধ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা'আলা কুরায়েশদের কুফরী ও একগুঁয়েমীর সংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা কুরআন কারীম শ্রবণ করে কিরূপ মিথ্যা দাবী করছে। তারা বলছে“আমরা যে কুরআন শুনলাম, ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি।” তাদের এ দাবী একেবারে ভিত্তিহীন এবং এটা হচ্ছে কার্যবিহীন কথা। কেননা, এ ব্যাপারে কুরআন পাকে বার বার চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে যে, তারা কুরআনের সূরার মত একটি সূরা আনয়ন করুক তো? কিন্তু তারা তাতে সক্ষম হয়নি। এরূপ কথা বলে তারা নিজেদেরকে প্রতারিত করছে, আর প্রতারিত করছে। তাদের বাতিলের অনুসারীদেরকে। কথিত আছে যে, এই উক্তি করেছিল নাযার ইবনে হারিস। ঐ বেদ্বীন ব্যক্তি পারস্যে গিয়েছিল এবং তথাকার ইরানী বাদশাহ রুস্তম ও ইসফিনদিয়ারের কাহিনী পড়েছিল। যখন সে সেখান থেকে ফিরে আসে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাত প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে কুরআন কারীম পাঠ করে শুনাতেন। যখন তিনি মজলিস শেষ করতেন তখন ঐ দুরাচার নাযার ইবনে হারিস বসে পড়তে এবং ইরানী বাদশাহদের ইতিহাস বর্ণনা করে বলতোঃ “আচ্ছা বলতো, উত্তম-গল্পকথক কে? আমি, না মুহাম্মাদ (সঃ)?” অতঃপর বদর যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে যখন বিজয় দান করলেন এবং মক্কার কতগুলো মুশরিক বন্দী হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে হত্যাযযাগ্য বলে ঘোষণা করেন এবং তাকে হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) তাকে বন্দী করেছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনজন বন্দীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা হচ্ছে- (১) উকবা ইবনে আবি মুঈত, (২) তাঈমা ইবনে আদী এবং (৩) নাযার ইবনে হারিস।
নাযার ছিল হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর বন্দী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তার হত্যার নির্দেশ দেন তখন হযরত মিকদাদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা তো আমার বন্দী। সুতরাং একে তো আমারই পাওয়া উচিত।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে আল্লাহর কিতাবের উপর বিরূপ মন্তব্য করেছে। সুতরাং তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” হযরত মিকদাদ (রাঃ) স্বীয় কয়েদীর দিকে পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে তিনি প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি স্বীয় অনুগ্রহে মিকদাদ (রাঃ)-কে বহু কিছু প্রদান করুন!” তখন হযরত মিকদাদ (রাঃ) বলে উঠলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জিদ করে চাওয়ার উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, আপনি আমার জন্যে প্রার্থনা করবেন।” এই নাযারের ব্যাপারেই (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) তাঈমার স্থলে মুঈম ইবনে আদীর নাম বলেছেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা, বদরের দিন মুতঈম ইবনে আদী জীবিতই ছিল না। এ জন্যেই সেই দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আজ যদি মুতঈম ইবনে আদী জীবিত থাকতো এবং এই নিহতদের মধ্যকার কারো জন্যে প্রার্থনা করতো তবে আমি তাকে এই কয়েদী দিয়ে দিতাম।” তাঁর এ কথা বলার কারণ ছিল এই যে, সে তাঁকে ঐ সময় রক্ষা করেছিল যখন তিনি তায়েফের অত্যাচারীদের পিছু ছেড়ে দিয়ে মক্কার পথে ফিরে আসছিলেন। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। অর্থাৎ ঐ সব পুস্তক ও সংকলন যেগুলো শিক্ষা করে জনগণকে শুনানো হয়ে থাকে। আর এগুলো হচ্ছে শুধু কিস্সা ও কাহিনী। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা (কাফিররা) বলে- এই কুরআন তো পূর্ববর্তীদের মিথ্যা কাহিনী মাত্র যেগুলোকে লিখে নেয়া হয়েছে এবং দিন-রাত্রি পাঠ করে শুনানো হচ্ছে। হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশসমূহের ও পৃথিবীর গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন, আর তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (২৫:৫-৬) অর্থাৎ যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাদের তাওবা ককূল করতঃ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন।
ঘোষিত হচ্ছে- “যখন তারা (কাফিররা) বলেছিল- হে আল্লাহ! এটা (এই কুরআন ও নবুওয়াত) যদি আপনার পক্ষ হতে সত্য হয় তবে আকাশ থেকে আমাদের উপর প্রস্তর বর্ষণ করুন অথবা আমাদের উপর কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এনে দিন।” এই প্রার্থনা ছিল তাদের পূর্ণ অজ্ঞতা, মূখতা এবং বিরোধিতার কারণে। তাদের এই নির্বুদ্ধিতার কারণেই তাদের দুর্নাম হচ্ছে। তাদের তো নিম্নরূপ প্রার্থনা করা উচিত ছিলঃ “হে আল্লাহ! এই কুরআন যদি আপনার পক্ষ থেকেই এসে থাকে তবে ওর অনুসরণ করার তাওফীক আমাদেরকে দান করুন!” কিন্তু তারা নিজেদের জীবনের উপর শাস্তি কিনে নেয় এবং শাস্তির জন্যে তাড়াহুড়া করে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তারা তোমার কাছে শাস্তির জন্যে তাড়াহুড়া করছে, যদি এর জন্যে একটা দিন নির্দিষ্ট না থাকতো তবে হঠাৎ করেই তাদের উপর শাস্তি এসে পড়তো এবং তারা কিছু বুঝতেই পারতো না।” আল্লাহ তা'আলা তাদের কথা আরো বলেনঃ (আরবী) (৩৮:১৬)এবং আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক আবেদনকারী সেই আযাব সম্বন্ধে আবেদন করে যা সংঘটিত হবে কাফিরদের উপর, যার কোন প্রতিরোধকারী নেই। যা আল্লাহর তরফ হতে ঘটবে, যিনি ধাপসমূহের (আসমান সমূহের) অধিপতি।” (৭০:১-৩) পূর্ব যুগীয় উম্মতদের মূর্খ ও অজ্ঞ লোকেরাও অনুরূপ কথাই বলেছিল। হযরত শুআইব (আঃ)-এর কওম তাকে বলেছিলঃ “হে শুআইব (আঃ)! যদি তুমি সত্যবাদী হও তবে আমাদের উপর আকাশ নিক্ষেপ কর।” অথবা “হে আল্লাহ! যদি এটা আপনার পক্ষ হতে সত্য হয় তবে আমাদের উপর আকাশ হতে পাথর বর্ষণ করুন!” আবু জেহেল ইবনে হিশামও এ কথাই বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! এটা যদি আপনার পক্ষ হতে সত্য হয় তবে আকাশ থেকে আমাদের উপর পাথর বর্ষণ করুন অথবা আমাদের কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এনে দিন!” তখন (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন) অর্থাৎ (হে নবী সঃ!) তুমি তাদের মধ্যে থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এটা আল্লাহর অভিপ্রায় নয়, আর আল্লাহ এটাও চান না যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন।” অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ . . . (আরবী) অর্থাৎ “আমার কাছে তোমরা একা একা আসবে যেমন আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম।” (৬:৯৪) আতা (রঃ) বলেন যে, এই বিষয়ের দশটি আয়াত কুরআন পাকে রয়েছে। হযরত বুরাইদা (রাঃ) বলেনঃ উহুদের যুদ্ধে আমি দেখেছি যে, হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) ঘোড়ার উপর সওয়ার অবস্থায় বলতে রয়েছেন- “হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সঃ) যা বলেছেন তা যদি সত্য হয় তবে ঘোড়াসহ আমাকে যমীনে ধ্বংসিয়ে দিন।” (এটা ঐ সময়ের কথা যখন আমর ইবনুল আস (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেননি)
এই উম্মতের মূখ লোকদেরও এরূপ উক্তিই ছিল। আল্লাহ পাক স্বীয় আয়াতের পুনরাবৃত্তি করছেন এবং তাদের উপর তার রহমতের কথা উল্লেখ করছেনঃ “হে নবী! তুমি তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এটা আল্লাহর অভিপ্রায় নয় এবং আল্লাহ এটাও চান না যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন।” মুশরিকরা বায়তুল্লাহর তাওয়াফের সময় বলতো- (আরবী) অর্থাৎ “আমরা আপনার নিকট হাযির আছি, হে আল্লাহ! আপনার নিকট আমরা হাযির আছি। আপনার কোন অংশীদার নেই। আমরা আপনার নিকট উপস্থিত আছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলতেনঃ “এখানেই ক্ষান্ত হও, আর কিছুই বলল না।” কিন্তু ঐ মুশরিকরা সাথে সাথেই বলে উঠতো- (আরবী) অর্থাৎ “আপনার একজন শরীকও রয়েছে, আপনি তারো মালিক এবং সে যা কিছুর মালিক, তারো মালিক আপনি।” এর সাথেই তারা বলতো- (আরবী) অর্থাৎ “আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তারা দু’টি কারণে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। প্রথম হচ্ছে নবী (সঃ)-এর বিদ্যমানতা এবং দ্বিতীয় হচ্ছে তাদের ক্ষমা প্রার্থনা। এখন নবী (সঃ) তো বিদায় গ্রহণ করেছেন। কাজেই বাকী আছে শুধু ক্ষমা প্রার্থনা। (এটা ইবনে আবি হাতিম তাখরীজ করেছেন)
কুরায়েশরা পরস্পর বলাবলি করতো- “আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আমাদের মধ্যে মর্যাদাবান বানিয়েছেন। দিনের বেলায় তারা আল্লাহর ব্যাপারে ঔদ্ধত্যপনা প্রকাশ করতো এবং রাত্রিকালে অনুতপ্ত হয়ে বলতো-(আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে ক্ষমা করুন!” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। নবীরা যে পর্যন্ত জনপদ হতে বেরিয়ে না যান সেই পর্যন্ত কওমের উপর শাস্তি আসে না। তাদের মধ্যে কতকগুলো লোক এমনও ছিল যারা পূর্ব থেকেই ঈমান আনয়ন করেছিলেন। তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং নামায পড়তেন। তারা ছিলেন মুসলমান। নবী (সঃ)-এর হিজরতের পরেও তারা মক্কাতেই রয়ে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার জনপদ পরিত্যাগ করে চলে যাওয়ার পরেও যে মক্কাবাসীর উপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়নি তার কারণ ছিল এই যে, তখনও কতক মুসলমান মক্কায় অবস্থান করছিলেন। তাঁরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। ফলে মক্কাবাসী শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ আমার উম্মতের জন্যে নিরাপত্তার দু’টি কারণ রেখেছেন। প্রথম হচ্ছে তাদের মধ্যে আমার উপস্থিতি। আর দ্বিতীয় হচ্ছে তাদের ক্ষমা প্রার্থনা। সুতরাং আমার দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণের পরেও ক্ষমা প্রার্থনা কিয়ামত পর্যন্ত লোকদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) তাঁর সুনানে বর্ণনা করেছেন) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শয়তান বলেছিল- “হে আল্লাহ! আপনার মর্যাদার কসম! যে পর্যন্ত আপনার বান্দাদের দেহে রূহ থাকবে সেই পর্যন্ত আমি তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে থাকবো।” তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমার ইস্যুতের কসম! যে পর্যন্ত তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে সেই পর্যন্ত আমিও তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকবো।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।