সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 10)
হরকত ছাড়া:
وما جعله الله إلا بشرى ولتطمئن به قلوبكم وما النصر إلا من عند الله إن الله عزيز حكيم ﴿١٠﴾
হরকত সহ:
وَ مَا جَعَلَهُ اللّٰهُ اِلَّا بُشْرٰی وَ لِتَطْمَئِنَّ بِهٖ قُلُوْبُکُمْ ۚ وَ مَا النَّصْرُ اِلَّا مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیْزٌ حَکِیْمٌ ﴿۱۰﴾
উচ্চারণ: ওয়ামা-জা‘আলাহুল্লা-হু ইল্লা-বুশরা-ওয়া লিতাতমাইন্না বিহী কুলূবুকুম ওয়া মান নাসরু ইল্লা-মিন ‘ইনদিল্লা-হি ইন্নাল্লা-হা ‘আযীযুন হাকীম।
আল বায়ান: আর আল্লাহ তো তা করেছেন কেবল সুসংবাদস্বরূপ এবং যাতে এর দ্বারা তোমাদের অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয় এবং সাহায্য তো আল্লাহর পক্ষ থেকেই। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০. আর আল্লাহ এটা করেছেন শুধু সুসংবাদ স্বরূপ এবং যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ এর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে; আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে; নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর আল্লাহ যে এটা করেছিলেন তার উদ্দেশ্য তোমাদেরকে সুসংবাদ দান ছাড়া অন্য কিছু নয় আর যাতে এর মাধ্যমে তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। কেননা, সাহায্য তো একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকেই আসে। আল্লাহ তো মহাপরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞানী।
আহসানুল বায়ান: (১০) আল্লাহ এটা করেন কেবল তোমাদেরকে শুভ সংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এ উদ্দেশ্যে যাতে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট হতেই আসে।[1] নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ এটা করেছিলেন শুভ সংবাদ হিসাবে এবং যাতে তোমাদের চিত্ত আশ্বস্ত হয়। বস্তুতঃ সাহায্যতো শুধু আল্লাহর তরফ থেকেই হয়ে থাকে। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ এটা করেছিলেন কেবল সুসংবাদ হিসেবে, আর যাতে তোমাদের মন প্রশান্ত হয়। আর সাহায্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
মুহিউদ্দিন খান: আর আল্লাহ তো শুধু সুসংবাদ দান করলেন যাতে তোমাদের মন আশ্বস্ত হতে পারে। আর সাহায্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতে পারে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহাশক্তির অধিকারী হেকমত ওয়ালা।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ এটি করেন নি সুসংবাদ দান ছাড়া আর যেন এর দ্বারা তোমাদের হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে, আর সাহায্য তো আসে না আল্লাহ্র কাছ থেকে ছাড়া। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হচ্ছেন মহাশক্তিশালী, পরমজ্ঞানী।
Sahih International: And Allah made it not but good tidings and so that your hearts would be assured thereby. And victory is not but from Allah. Indeed, Allah is Exalted in Might and Wise.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০. আর আল্লাহ এটা করেছেন শুধু সুসংবাদ স্বরূপ এবং যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ এর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে; আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে; নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০) আল্লাহ এটা করেন কেবল তোমাদেরকে শুভ সংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এ উদ্দেশ্যে যাতে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট হতেই আসে।[1] নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, ফিরিশতাদের অবতরণ কেবলমাত্র সুসংবাদ ও তোমাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ছিল। তাছাড়া সত্যিকারে সাহায্য ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে। যিনি ফিরিশতা বিনাও তোমাদের সাহায্য করতে পারতেন। তবে এটা ভাবাও ঠিক নয় যে, ফিরিশতারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, ফিরিশতারাও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং কিছু কাফেরদেরকে হত্যাও করেছিলেন। (দেখুনঃ বুখারী, মুসলিম যুদ্ধ অধ্যায়)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫-১৪ নং আয়াতের তাফসীরঃ
(غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ)
‘নিরস্ত্র দলটি’ অর্থাৎ নিরস্ত্র বলতে এখানে আবূ সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলাকে বুঝানো হয়েছে। النُّعَاسُ অর্থ, তন্দ্রা, شَا۬قُّوْا অর্থ, তারা বিরুদ্ধাচরণ করেছে।
এ আয়াতগুলোতে বদর যুদ্ধের প্রতি ঈঙ্গিত করা হয়েছে।
(وَإِنَّ فَرِيْقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِيْنَ لَكَارِهُوْنَ)
‘অথচ মু’মিনদের এক দল এটা পছন্দ করেনি।’ মু’মিনদের এ অপছন্দনীয়তা শুধু কাফির সেনাদলের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হবার বিষয়ে ছিল। কিছু সাহাবী এ অপছন্দনীয় বিষয়ের কথা প্রকাশও করেছিলেন। কারণ তাদের সাথে কোন অস্ত্র ছিল না। মদীনা থেকে তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা থেকে বের হয়েছেন আবূ সুফিয়ানের কাফেলাকে ধরার জন্য যা শাম থেকে মদীনার পাশ দিয়ে মক্কায় ফিরছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: এটা হল কুরাইশদের কাফেলা। তাতে অনেক সম্পদ রয়েছে। অতএব তাদের দিকে বেরিয়ে পড়। আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এ সম্পদগুলো দান করবেন। তাই তিনশ’র অধিক সাহাবী তেমন কোন অস্ত্র না নিয়ে সমুদ্রের উপকূলের দিকে বেরিয়ে পড়লেন। এ দিকে আবূ সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বের হবার কথা জানতে পেরে যমযম বিন আমর নামক ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করল এ কথা জানানোর জন্য যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা কাফেলাকে আক্রমণ করার জন্য বের হয়েছে। এ খবর শুনে মক্কার এক হাজার সৈন্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসল, আর আবূ সুফিয়ান রাস্তা পরির্বতন করে অন্য রাস্তা দিয়ে চলে গেল। এদিকে মুসলিম বাহিনী ও কাফির বাহিনী বদর নামক জায়গায় মুখোমুখি হল। যার কারণে কিছু সাহাবীর মনে প্রশ্ন জাগে যে, বের হলাম কিসের জন্য আর হল কী?
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন ওয়াহী মারফত জানতে পারলেন, মক্কা থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে একদল কাফির বের হয়েছে, তখন আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে দু’টি দলের (একটি হল আবূ সূফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলা, অন্যটি হল কাফির সৈন্য বাহিনী) একটি আয়ত্ত করতে পারবে বলে প্রতিশ্র“তি দিলেন। হয় কাফির সেনাদলকে পরাজিত করবে অথবা কাফেলাকে দখল করতে পারবে। অধিকাংশ মুসলিমদের আশা ছিল যে কাফেলা দখলে আসুক; কেননা ঐ উদ্দেশ্যে তারা বের হয়েছেন। তাছাড়া কাফির সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করার মত তেমন কোন অস্ত্র তাদের নেই। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবেন। আল্লাহ তা‘আলা এখানে সে কথাই বলছেন:
(وَإِذْ يَعِدُكُمُ اللّٰهُ إِحْدَي الطَّا۬ئِفَتَيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّوْنَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُوْنُ لَكُمْ وَيُرِيْدُ اللّٰهُ أَنْ يُّحِقَّ الْحَقَّ بِكَلِمٰتِه۪ وَيَقْطَعَ دَابِرَ الْكٰفِرِيْنَ)
“স্মরণ কর! যখন আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন যে, দু’ দলের একদল তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে; অথচ তোমরা চাচ্ছিলে যে, নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হোক। আর আল্লাহ চাচ্ছিলেন যে, তিনি সত্যকে তাঁর বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফিরদেরকে নির্মূল করবেন;
(إِحْدَي الطَّا۬ئِفَتَيْنِ)
‘দু’ দলের একদল’ দু’দল বলতে একটি হল আবূ সুফিয়ানের কাফেলা অন্যটি হল মক্কার কাফির বাহিনী।
আব্দুল্লাহ বিন কা‘ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি কা‘ব বিন মালেক (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেসব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে তাবুকের যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। তবে বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারিনি । কিন্তু বদরের যুদ্ধে যারা যোগ দেয়নি তাদেরকে কোন তিরস্কার করা হয়নি। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরাইশ কাফেলার উদ্দেশ্যেই যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা ব্যতীতই আল্লাহ তা‘আলা তাদের (মুসলিমদের) সঙ্গে তাদের দুশমনদের মোকাবেলা করিয়ে দেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯৫১, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৬৯)
(إِذْ تَسْتَغِيثُوْنَ رَبَّكُمْ)
শানে নুযূল:
উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একবার সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে দেখেন তারা মাত্র তিনশত দশজনের কিছু বেশি। আবার কাফিরদের দিকে তাকিয়ে দেখেন, তারা এক হাজারেরও বেশি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কেবলামুখী হয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘হাত তুললেন, তাঁর গায়ে চাদর ছিল। তিনি বলতে লাগলেন: হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছো তা পূর্ণ কর। হে আল্লাহ! তুমি যদি এ মুসলিম দলকে ধ্বংস করে দাও তাহলে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করার আর কেউ থাকবে না। এরূপ সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু’হাত তুলে চাইতে থাকলে একদা নাবী (সাঃ)-এর গায়ের চাদর পড়ে গেল। আবূ বাকর (রাঃ) নাবী (সাঃ)-এর কাছে এসে চাদর ধরে কাধের ওপর তুলে দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে পিছন দিক থেকে ধরে বললেন: হে আল্লাহর নাবী! আল্লাহর কাছে আপনার প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। তিনি স্বীয় ওয়াদা পূর্ণ করবেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ মুসলিম হা: ১৭৬৩, তিরমযী হা: ৩৬৬১)
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি মিকদাদ ইবনু আসওয়াদের এমন একটি বিষয় দেখেছি যা আমি করলে তা দুনিয়ার সব কিছুর তুলনায় আমার নিকট প্রিয় হত। তিনি নাবী (সাঃ)-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি (সাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে দু’আ করছিলেন। এতে মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ (সাঃ) বললেন: মূসা (আঃ)-এর জাতি যেমন বলেছিল যে, “তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর আমরা এখানে বসে রইলাম” (সূরা মায়িদাহ ৫:২৪) আমরা তেমন বলব না, বরং আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে, পেছনে সর্বদিক থেকে যুদ্ধ করব। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন: আমি দেখলাম, নাবী (সাঃ)-এর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং তার কথা তাঁকে খুব আনন্দিত করল। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯৫২)
(وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ)
‘এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট হতেই আসে’ অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُوْمُ الْأَشْهَادُ) “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের ও মু’মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে ও যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে।” (সূরা মু’মিনুন ৪০:৫১)
(إِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسُ أَمَنَةً)
‘স্মরণ কর, যখন তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করলেন’ আল্লাহ তা‘আলা বদর প্রান্তরে মুসলিমদেরকে তিনটি পুরস্কার প্রদান করেছেন। প্রথমত: ফেরেশতা দ্বারা সহযোগিতা করা। দ্বিতীয়ত: উহুদ যুদ্ধের মত বদর যুদ্ধে তন্দ্রা দ্বারা আচ্ছন্ন করা। মুসলিমদের মনে একটি অস্বস্তি ও শরীরে ক্লান্তি এসেছিল, তা দূর করার জন্য। তৃতীয়ত: তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করা। যার ফলে বালুময় মাটিতে চলাচল সহজ হল, ওযু ও গোসল করা সহজ হল এবং শয়তান মু’মিনের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিচ্ছিল যে, তোমরা আল্লাহ তা‘আলার নেক বান্দা হওয়া সত্ত্বেও পানি হতে দূরে অবস্থান করছ, অপবিত্র অবস্থায় যুদ্ধ করলে কিভাবে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য পাবে আর তোমরা পিপাসিত, শত্রুরা পিপাসিত নয় ইত্যাদি দূর করার জন্য।
সর্বোপরি আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের কদমকে যুদ্ধের মাঠে মজবুত করার লক্ষে এসব নেয়ামত দ্বারা সহযোগিতা করলেন।
(أَنِّيْ مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا)
‘আমি তোমাদের সাথে আছি, সুতরাং মু’মিনগণকে অবিচলিত রাখ’। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে জানিয়ে দিলেন, আমি আমার সাহায্য সহযোগিতা দ্বারা তোমাদের সাথে রয়েছি অতএব তোমরা তাদেরকে সহযোগিতা করে ময়দানে অটল রাখ।
‘আল্লাহ সাথে রয়েছেন’ এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় তাদের সাথে মিলে একত্রে যুদ্ধ করছেন। বরং আল্লাহ তা‘আলা সাহায্য-সহযোগিতা দ্বারা তাদের সাথে রয়েছেন। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِلَّا تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللّٰهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِه۪ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللّٰهَ مَعَنَا)
“যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দু’জনের একজন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘চিন্তা কর না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা তাওবাহ ৯:৪০)
আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে সে গর্তে প্রবেশ করেননি (নাউযুবিল্লাহ)। বরং তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের সাথে ছিলেন।
অতএব আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় আরশের উপরে আছেন। আর তাঁর শক্তি, দৃষ্টি ও শ্রবণ সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে, কিছুই তাঁর জ্ঞানায়ত্তের বাইরে নয়।
(فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ..... كُلَّ بَنَانٍ)
‘সুতরাং তোমরা আঘাত কর তাদের স্কন্ধে ও আঘাত কর তাদের প্রত্যেক আঙ্গুলের অগ্রভাগে।’ এখানে আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধের কৌশল শিক্ষা দিলেন, শত্রুদের কোথায় প্রহার করলে সহজে কাবু করা যাবে। তিনি বলেন: শত্রুদের ঘারের ওপর এবং শরীরের প্রত্যেক জোড়ায় জোড়ায় প্রহার কর যাতে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে না পারে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَإِذَا لَقِيْتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَضَرْبَ الرِّقَابِ ط حَتّٰيٓ إِذَآ أَثْخَنْتُمُوْهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ)
“তাই যখন তোমরা কাফিরদের মুখোমুখি হবে তখন (তাদের) গর্দানে আঘাত করাই (প্রথম কাজ) যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে ফেলবে তখন (বন্দীদেরকে) কষে বাঁধবে।’ (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৪)
আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য তাদের এ শাস্তি। তাছাড়া আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে প্রজ্জ্বলিত আগুনের শাস্তি।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সংক্ষিপ্তাকারে বদর যুদ্ধের পেক্ষাপট জানতে পারলাম।
২. বদর যুদ্ধে ফেরেশতা দ্বারা মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা করা হয়েছিল।
৩. মু’মিনদের পুরস্কার ও আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত প্রদানের কারণ জানলাম।
৪. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের সাথে কিভাবে রয়েছেন এর অর্থ জানতে পারলাম।
৫. কাফিরদের জন্য দুনিয়াতে ও পরকালে অশুভ পরিণতি রয়েছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “বদরের দিন নবী (সঃ) স্বীয় সহচরদেরকে গণনা করে দেখলেন যে, তাদের সংখ্যা ছিল তিনশ’র কিছু বেশী। আর মুশরিকদের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি অনুমান করলেন যে, তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও অধিক। নবী (সঃ) কিবলামুখী হয়ে দুআ করতে লাগলেন। তার গায়ে একখানা চাদর ছিল এবং তিনি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন। তিনি বলছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা আজ পুরো করুন। যদি আপনি মুসলমানদের এই ছোট দলটিকে আজ ধ্বংস করে দেন তবে দুনিয়ার বুকে আপনার ইবাদত করার কেউই থাকবে না এবং তাওহীদের নাম ও চিহ্নটুকুও মুছে যাবে।” তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিলেন ও প্রার্থনা জানাচ্ছিলেন, এমন কি তাঁর কাঁধ থেকে চাদরখানা পড়ে যাচ্ছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) এসে চাদরখানা তার কাঁধে উঠিয়ে দিলেন এবং তার পিছনে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কাছে আপনার প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। তিনি স্বীয় ওয়াদা পূর্ণ করবেন।” তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ “যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করছিলে, আর তিনি সেই প্রার্থনা কবুল করেছিলেন, (এবং তিনি বলেছিলেন) আমি তোমাদেরকে এক সহস্র ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করবো, যারা একের পর এক আসবে।” সুতরাং যখন যুদ্ধ সংঘটিত হলো তখন আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের পরাজয় ঘটালেন। তাদের সত্তরজন। নিহত হলো এবং সত্তরজন বন্দী হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে বন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ করলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা তো আপনার চাচাতো ভাই এবং আপনার গোত্রীয় ও বংশীয় লোক। সুতরাং এদেরকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিন। মুক্তিপণের অর্থের মাধ্যমে আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে এবং কাফিরদের উপর জয়যুক্ত হওয়ার শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, আল্লাহ তাআলা হয়তো তাদেরকে হিদায়াত দান করবেন। অতঃপর এরাই আমাদের শক্তি বাড়িয়ে দিবে।” এর পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ)! এ ব্যাপারে তোমার মত কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! হযরত আবু বকর (রাঃ) যে মত পোষণ করেছেন আমি ঐ মত পোষণ করি না। আপনি আমাকে নির্দেশ দিন, আমি আমার আত্মীয় কাফিরদেরকে হত্যা করি এবং আলী (রাঃ)-কে হুকুম দিন তিনি যেন তাঁর ভাই আকীলের গর্দান উড়িয়ে দেন। আর হামযা (রাঃ) যেন তাঁর অমুক ভাইয়ের দেহ দ্বিখণ্ডিত করেন, যাতে আমরা আল্লাহর কাছে এটা প্রমাণ করতে পারি যে, মুশরিকদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোন করুণা নেই। এই বন্দী মুশরিকরা তো কাফিরদের নেতৃস্থানীয় লোক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মতকেই প্রাধান্য দেন এবং ঐ মুশরিক বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেন। হযরত উমার (রাঃ) বলেন, পরদিন সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাড়ীতে হাযির হয়ে দেখি যে, তিনি এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) ক্রন্দন করছেন। আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার ও আপনার সঙ্গীর কাঁদার কারণ কি? যদি কান্না আসে তবে আমিও কাঁদবো, আর যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান করবো, যাতে আপনাদের কান্নায় শরীক হতে পারি। নবী (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা হচ্ছে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়ার কারণে কান্না। আমি এই ভুলের কারণে ঐ শাস্তি প্রত্যক্ষ করছি যা এতো নিকটে রয়েছে যতো নিকটে রয়েছে এই গাছটি।” সেই সময় নবী (সঃ)-এর সম্মুখে একটি গাছ ছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেন- (আরবী) পর্যন্ত। (৮:৬৭-৬৯) সুতরাংগনীমত হালাল করে দেয়া হয়। অতঃপর পরবর্তী বছর যখন উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয় তখন আল্লাহ তা'আলা বদরের দিনের ভুলের প্রতিশোধ এভাবে গ্রহণ করেন যে, মুক্তিপণ নিয়ে সত্তরজন কাফির বন্দীকে ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শাহাদাতবরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তাকে ছেড়ে পলায়ন করেন। তাঁর সামনের চারটি দাত ভেঙ্গে যায় এবং শিরস্ত্রাণ মাথার মধ্যে ঢুকে যায়। তাঁর চেহারা মুবারকের উপর রক্ত গড়িয়ে পড়ে। তখন আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের উপর যখন বিপদ পৌছালো তখন তোমরা বলতে শুরু করলে- এ বিপদ কোথা থেকে আসলো? (হে নবী সঃ)! তুমি বলে দাও- এটা তোমাদের নিজেদের কর্মের ফল অর্থাৎ তোমাদের ফিদইয়া গ্রহণের কারণেই তোমরা এই বিপদের সম্মুখীন হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের উপরই ক্ষমতাবান।” (এটা ইমাম আহমাদ (রাঃ) উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং এটাকে ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রার্থনা করাকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, বদরের দিন নবী (সঃ) অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করছিলেন। তখন হযরত উমার (রাঃ) তাঁর কাছে এসে বললেনঃ “আপনি দুআ’কে সংক্ষিপ্ত করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা তিনি অবশ্যই পূর্ণ করবেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের দিন নবী (সঃ) প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ? আপনার অঙ্গীকার পূর্ণ করার দিকে আমি আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করছি। নতুবা হে আল্লাহ! আপনার ইবাদতকারী আর কেউ থাকবে না।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর হাত ধরে নিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যথেষ্ট হয়েছে।” অতঃপর নবী (সঃ) দাড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “অতি অল্প সময়ের মধ্যেই কাফিররা পরাজিত হয়ে যাবে এবং তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করবে।”
(আরবী) অর্থাৎ ফেরেশতাদের সারি একের পিছনে এক মিলিতভাবে ছিল। আবার (আরবী)-এর অর্থ সাহায্যও হতে পারে। অর্থাৎ ফেরেশতারা সাহায্যের উপর ছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “হযরত জিবরাঈল (আঃ) হাজার ফেরেশতাসহ নবী (সঃ)-এর ডান দিকে ছিলেন, যেদিকে হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। আর হ্যরত মীকাঈল (আঃ) হাজার ফেরেশতাসহ নবী (সঃ)-এর বাম দিকে ছিলেন, যেদিকে আমি ছিলাম।” এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হাজারের সাহায্যের উপর অপর হাজারও ছিলেন। এ জন্যেই কেউ কেউ (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-কে যবর দিয়ে পড়েছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সাথে ছিলেন পাঁচশ জন ফেরে । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একজন মুসলমান একজন মুশরিকের পিছনে লেগে ছিলেন। উপর হতে মুশরিকের মাথায় একটি চাবুক মারার শব্দ শোনা গেল এবং একজন অশ্বারোহীরও পদক্ষেপের শব্দ শ্রুত হলো। তখন দেখা গেলো। যে, মুশরিক মাটিতে পড়ে গেলো। চাবুকের আঘাতে তার মাথা ফেটে গেলো। অথচ কোন মানুষ তাকে লাঠির আঘাত করেনি। যখন পিছনের আনসারী এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছিয়ে দিলো। তখন তিনি বললেনঃ “তুমি সত্য বলেছ। এটা ছিল আসমানী সাহায্য।” এ কথা তিনি তিনবার বলেন। ঐ যুদ্ধে সত্তরজন কাফির নিহত হলো এবং সত্তরজন বন্দী হলো। (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন) হযরত রাফি (রাঃ) বদরী সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন যে, একদা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি বদরী সাহাবীদেরকে কি মনে করেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “বদরী সাহাবীরা মুসলমানদের মধ্যে সর্বোত্তম।” তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “বদরের যুদ্ধে যেসব ফেরেশতা মুসলমানদের সাহায্যের জন্যে এসেছিলেন তাদেরকেও অন্যান্য ফেরেশতাদের অপেক্ষা উত্তম মনে করা হয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যখন হাতিব ইবনে আবি বুলতা (রাঃ)-কে হত্যা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তখন নবী (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ এই হাতিব (রাঃ) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। আর তুমি কি এই খবর রাখো যে, সম্ভবতঃ আল্লাহ তা'আলা বদরী সাহাবীদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন? কেননা, তিনি বলেছেনঃ “তোমরা যা ইচ্ছা তাই আমল কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।”
(আরবী) অর্থাৎ ফেরেশতাদেরকে পাঠানো শুধু তোমাদেরকে সুসংবাদ দেয়ার জন্যে এবং তোমাদের মনে প্রশান্তি আনয়নের জন্যে নতুবা আল্লাহ তা'আলা তো সর্বপ্রকারেই তোমাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। সাহায্যের ব্যাপারে তিনি ফেরেশতাদের মুখাপেক্ষী মোটেই নন। এ সাহায্য তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই সাহায্য ছিল। ফেরেস্তারা ছিল সাহায্যের বাহ্যিক রূপ । যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যখন তোমরা কাফিরদের সম্মুখীন হও, তখন তাদের গর্দানে আঘাত করতে থাক (তাদেরকে হত্যা করতে থাক) এমন কি যখন তাদের রক্তস্রোত বইয়ে দিবে তখন তাদেরকে (বন্দী করে) দৃঢ় রূপে বেঁধে ফেলো, তখন হয়তো বা কোন মুক্তিপণ ছাড়াই তাদেরকে ছেড়ে দেবে, কিংবা মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেবে, যে পর্যন্ত না তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিত্যাগ করে, তোমরা এই নির্দেশ পালন করবে, আর যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তাদের থেকে (যুদ্ধ ছাড়াই) প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন, কিন্তু (যুদ্ধের হুকুম এ কারণেই যে,) যেন তিনি তোমাদের একের দ্বারা অন্যের পরীক্ষা করেন, আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তাদের আমল কখনো বিনষ্ট করবেন না। তিনি তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করবেন এবং তাদের অবস্থা ঠিক রাখবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন এবং তিনি ওটা তাদেরকে চিনিয়ে দেবেন।” আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তো কালের উত্থান ও পতন মাত্র, যাকে আমি মানবমণ্ডলীর মধ্যে আবর্তিত করে থাকি, যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে কতিপয় লোককে শহীদ রূপে গ্রহণ করতে পারেন, আর আল্লাহ অত্যাচারীদেরকে মোটেই পছন্দ করেন না। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে (গুনাহ থেকে) পাক-পবিত্র করেন এবং কাফিরদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস করে দেন।” (৩:১৪০-১৪১) জিহাদের শরঈ দর্শন এটাই যে, আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদেরকে একত্ববাদীদের হাতে শাস্তি প্রদান করেন। ইতিপূর্বে তাদেরকে সাধারণ আসমানী শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হতো। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওমের উপর তুফান এসেছিল, প্রথম আ’দ সম্প্রদায় ঘূর্ণি বাত্যায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং লূত (আঃ)-এর কওমকে পাথর বর্ষিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। হযরত শুআইব (আঃ)-এর কওমের মাথার উপর পাহাড়কে লটকিয়ে দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে পাঠিয়েছিলেন এবং তার শত্রু ফিরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন, আর তার কওমকে নদীতে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করে কাফিরদেরকে হত্যা করা ফরয করে দেয়া হয়েছিল এবং এই নির্দেশই অন্যান্য শরীয়তের মধ্যেও কায়েম রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি পূর্ববর্তী উম্মতদেরকে ধ্বংস করার পর মূসা (আঃ)-কে কিতাব প্রদান করেছিলাম, এতে লোকদের জন্যে বাসীরাত রয়েছে (অর্থাৎ এর মাধ্যমে মানুষের অন্তদৃষ্টি খুলে যাবে)।”
মুমিনদের কাফিরদেরকেও বন্দী করার পরিবর্তে হত্যা করে দেয়া ঐ কাফিরদের কঠিন লাঞ্ছনার বিষয় ছিল। এতে মুমিনদের অন্তরেও প্রশান্তি নেমে আসতো। যেমন এই উম্মতের মুমিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলঃ “ঐ কাফিরদেরকে হত্যাই করে দাও। আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে অপদস্ত করতে ও শাস্তি দিতে চান এবং এ জন্যেও যে, এর ফলে তোমাদের অন্তর ঠাণ্ডা হবে। কেননা, এই অহংকারী কুরায়েশ নেতৃবর্গ মুসলমানদেরকে অত্যন্ত ঘৃণার চক্ষে দেখতো এবং তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতো। সুতরাং যদি এরা নিহত হয়ে লাঞ্ছিত হয় তবে তাদের থেকে এই প্রতিশোধ গ্রহণের ফলে মুসলমানদের অন্তর কতই না ঠাণ্ডা হয়! তাই আবূ জেহেল যখন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেল তখন তার মৃতদেহের বড়ই অবমাননা হলো। যদি বাড়ীতে বিছানায় মরতো তবে তার এই লাঞ্ছনা ও অবমাননা হতো না। অথবা যেমন, আবু লাহাব যখন মারা গেল তখন তার মৃতদেহ এমনভাবে সড়ে পচে গেল যে, তার নিকটতম আত্মীয়েরাও তার মৃতদেহের কাছে আসতে পারছিল না। তারা তাকে গোসল দেয়ার পরিবর্তে দূর থেকে তার মৃতদেহের উপর পানি ছিটিয়ে দিয়েছিল এবং এক গর্তে তাকে দাফন করে ফেলেছিল। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী)। অর্থাৎ সম্মান ও মর্যাদা কাফিরদের জন্যে নয়, বরং দুনিয়া ও আখিরাতে মর্যাদা আল্লাহর জন্যে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জন্যে এবং মুমিনদের জন্যে। তিনি আরো বলেনঃ “আমি পার্থিব জীবনে এবং কিয়ামতের দিন অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে এবং মুমিনদেরকে সাহায্য করবো।” কাফিরদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়ার মধ্যেও মহান আল্লাহর বিশেষ নৈপুণ্য রয়েছে। নতুবা তিনি তো স্বীয় ক্ষমতা বলেই তাদেরকে ধ্বংস করে দিতে পারেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।