সূরা আল-মুতাফফিফীন (আয়াত: 29)
হরকত ছাড়া:
إن الذين أجرموا كانوا من الذين آمنوا يضحكون ﴿٢٩﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الَّذِیْنَ اَجْرَمُوْا کَانُوْا مِنَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا یَضْحَکُوْنَ ﴿۫ۖ۲۹﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা আজরামূকা-নূমিনাল্লাযীনা আ-মানূইয়াদহাকূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় যারা অপরাধ করেছে তারা মুমিনদেরকে নিয়ে হাসত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৯. নিশ্চয় যারা অপরাধ করেছে তারা মুমিনদেরকে উপহাস করত(১),
তাইসীরুল ক্বুরআন: পাপাচারী লোকেরা (দুনিয়ায়) মু’মিনদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত।
আহসানুল বায়ান: ২৯। নিশ্চয় যারা অপরাধী তারা মুমিনদেরকে নিয়ে উপহাস করত।[1]
মুজিবুর রহমান: অপরাধীরা মু’মিনদেরকে উপহাস করত,
ফযলুর রহমান: অপরাধীরা মুমিনদেরকে উপহাস করত।
মুহিউদ্দিন খান: যারা অপরাধী, তারা বিশ্বাসীদেরকে উপহাস করত।
জহুরুল হক: যারা অপরাধ করত তারা অবশ্য উপহাস করতো তাদের যারা ঈমান এনেছে,
Sahih International: Indeed, those who committed crimes used to laugh at those who believed.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৯. নিশ্চয় যারা অপরাধ করেছে তারা মুমিনদেরকে উপহাস করত(১),
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ একথা ভাবতে ভাবতে ঘরের দিকে ফিরতো: আজ তো বড়ই মজা। ওমুক মুসলিমকে বিদ্রুপ করে, তাকে চোখা চোখা বাক্যবাণে বিদ্ধ করে বড়ই মজা পাওয়া গেছে এবং সাধারণ মানুষের সামনে তাকে চরমভাবে অপদস্থ করা গেছে। মোটকথাঃ তারা মুমিনদের নিয়ে অপমানজনক কথা-বার্তা, আচার আচরণ, ইশারা-ইঙ্গিত করত আর মজা লাভ করত। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ২৯। নিশ্চয় যারা অপরাধী তারা মুমিনদেরকে নিয়ে উপহাস করত।[1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, পাপীরা তাদেরকে তুচ্ছ ভেবে তাদের সাথে ঠাট্টা-ব্যঙ্গ করত।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৯-৩৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর:
মু’মিন ও পাপাচারীদের প্রতিদানের কথা আলোচনার পর পাপাচারীরা দুনিয়াতে মু’মিনদের সাথে যে আচরণ করত এবং আখিরাতে মুমিনরা তাদের সাথে বদলাস্বরূপ যে আচরণ করবেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
يَضْحَكُوْنَ অর্থাৎ মু’মিনদেরকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করে পাপাচারীরা ঠাট্টা করত, চোখ টিপে ইশারা করে বলত, এরাই পথভ্রষ্ট। সত্যি দেখা যায় যে, মু’মিনরা যখন কোন সৎ আমল করে তখন কাফির তো দূরের কথা একশ্রেণির নামধারী মুসলিমরাও মু’মিনদের নিয়ে ঠাট্টা করে। যা হোক কিয়ামতের দিন মু’মিনরা বদলাস্বরূপ কাফিরদের নিয়ে ঠাট্টা করবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : এ আয়াতগুলো মক্কার মুশরিকদের নেতা ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ, ওকবা বিন আবূ মুআইত, আস বিন ওয়ায়েল প্রমুখ ব্যক্তিদের ব্যাপারে নাযিল হয়। (কুরতুবী)
الغمز অর্থ চোখ, পলক ও ভ্রু দিয়ে ইঙ্গিত করা। অর্থাৎ কাফিররা মু’মিনদেরকে দেখলে চোখ টিপে হাসতো ও কটাক্ষ করত।
(وَاِذَا انْقَلَبُوْٓا اِلٰٓی اَھْلِھِمُ.....)
অর্থাৎ তাদের হাসি-তামাশা ও ঠাট্টা শুধু বাইরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা যখন তাদের পরিবার বা নিজেদের মত কাফিরদের কাছে ফিরে যেত বা একত্রিত হত তখন গরীব ও দুর্বল মু’মিনদের নিয়ে হাসি-তামাশা করত। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলত : এ সব লোকেরা ইসলামের মধ্যে কী পেয়েছে, যার জন্য তারা বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করছে? শত নির্যাতন সহ্য করছে কিন্তু ইসলাম বর্জন করছেনা।
(إِنَّ هٰٓؤُلَا۬ءِ لَضَآلُّوْنَ)
অর্থাৎ কাফিররা মু’মিনদেরকে দেখলে বলতÑ এরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানেও একশ্রেণির মানুষ রয়েছে যারা সঠিক পথের অনুসারীদেরকে এরূপ কাফির, ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের দালাল ইত্যাদি বলে থাকে। সুতরাং সকল যুগেই সত্যিকার মু’মিনদের মাঝে মুর্খ ও শিক্ষিত দুশ্রেণির শত্রু ছিল। মুর্খরা না জেনে শত্রুতা করত আর শিক্ষিত শয়তানরা জেনে শুনে পার্থিব স্বার্থের জন্য ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করত। তাই একজন সত্যিকার মু’মিন শয়তানদের কোন প্রকার উস্কানী, ঠাট্টা ও মশকরাতে কান না দিয়ে সঠিক পথের ওপর বহাল থাকবে এটাই তার ঈমানী দায়িত্ব।
(فَالْيَوْمَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا.....)
অর্থাৎ দুনিয়াতে যে সকল কাফিররা মু’মিনদের নিয়ে বিদ্রƒপ ও ব্যঙ্গ করত তারা আখিরাতে জাহান্নামে যাবে। তাদের দূরবস্থা দেখে মু’মিনরা হাসবে।
يَنْظُرُوْنَ অর্থাৎ মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলার দিকে তাকাবে কাফিরদের এ ধারণাকে বাতিল করার জন্য যে, তারা পথভ্রষ্ট না। বরং তারাই আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। আল্লাহ তা‘আলা এমন বান্দাদের মধ্যে আমাদের শামিল করে নিন। আমীন!
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দুনিয়াতে মু’মিনদের নিয়ে ঠাট্টা করার পরিণতি ভাল নয়।
২. দুনিয়াতে মু’মিনদের সাথে ঠাট্টা করে যে আচরণ করা হবে আখিরাতে তার বদলা মু’মিনরা নিয়ে নেবে।
৩. মু’মিনরা আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৯-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা পাপীদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, পৃথিবীতে তো তারা খুব বাহাদুরী দেখায়, মুমিনদেরকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে, চলাফেরার সময় তিরস্কার ভৎসনা করে, ব্যাঙ্গাত্মক উক্তি করে এবং আরও নানা প্রকার অবমাননাকর উক্তি করে নিজেদের দলের লোকদের কাছে গিয়ে তারা আপত্তিজনক নানা কথা বানিয়ে বলে, যা খুশী তাই করে বেড়ায় কুফরীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলমানদেরকে নানা রকম কষ্ট দেয়। মুসলমানরা তাদের কথায় কান না দেওয়ায় তারা মুসলমানদেরকে ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদেরকে মুমিনদের জন্য দারোগা করে পাঠানো হয়নি। কাজেই কাফিরদের এসব বলার কোনই প্রয়োজন নেই। কাফিরদের কি হয়েছে যে, তারা মুমিনদের পিছনে লেগে থাকে এবং ব্যাঙ্গাত্মক কথাবার্তা বলে বেড়ায়? যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলিস না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলতোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি দয়া করুন, আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে তোমরা এতো ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে যে, ওটা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তোমরা তো তাদেরকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হলো সফলকাম।” (২৩:১০৮-১১১) এ জন্যেই এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আজ কিয়ামতের দিন মুমিনগণ কাফিরদেরকে উপহাস করছে ও সুসজ্জিত আসন হতে তাদেরকে অবলোকন করছে।
এটা স্পষ্টভাবে একথাই প্রমাণ করে যে, এ মুমিনরাই ছিল সুপথ প্রাপ্ত, এরা পথভ্রষ্ট ছিল না, বরং তোমরা নিজেরাই ছিলে পথভ্রষ্ট। অথচ তোমরা এদেরকে পথভ্রষ্ট বলতে। প্রকৃত পক্ষে এ মুমিনগণ ছিল আল্লাহর বন্ধু এবং তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত। এ জন্যেই আজ আল্লাহর দীদার এদের চোখের সামনে রয়েছে, এরা আজ আল্লাহর মেহমান এবং তার দেয়া মর্যাদাসিক্ত উচ্চাসনে সমাসীন।
এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এসব কাফির দুনিয়ার এই মুসলমানদের সাথে যে সব দুর্ব্যবহার করেছে, আজ কি তারা তাদের সেই সব ব্যবহারের পুরোপুরি প্রতিফল পেয়েছে? অবশ্যই পেয়েছে। তাদের পরিহাসের পরিবর্তে আজ তারা পরিহাস লাভ করেছে। এ কাফিররা যে সব মুসলমানকে মর্যাদাহীন বলতো, আল্লাহ আজ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। মোটকথা সমস্ত মানুষই আজ কিয়ামতের দিন নিজেদের কৃতকর্মের পুরোপুরি প্রতিফল প্রাপ্ত হয়েছে। তাদের কাজের বিনিময় তারা পেয়ে গেছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।