আল কুরআন


সূরা আবাসা (আয়াত: 33)

সূরা আবাসা (আয়াত: 33)



হরকত ছাড়া:

فإذا جاءت الصاخة ﴿٣٣﴾




হরকত সহ:

فَاِذَا جَآءَتِ الصَّآخَّۃُ ﴿۫۳۳﴾




উচ্চারণ: ফাইযা-জাআতিসসা-খখাহ।




আল বায়ান: অতঃপর যখন বিকট আওয়াজ* আসবে,




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. অতঃপর যখন তীক্ষ্ণ আওয়াজ আসবে(১),




তাইসীরুল ক্বুরআন: অবশেষে যখন কান-ফাটানো শব্দ আসবে;




আহসানুল বায়ান: ৩৩। অতঃপর যখন (কিয়ামতের) ধ্বংস-ধ্বনি এসে পড়বে। [1]



মুজিবুর রহমান: যখন ঐ ধ্বংস ধ্বনি এসে পড়বে;



ফযলুর রহমান: অতঃপর যখন প্রচণ্ড শব্দ (কেয়ামত) এসে পড়বে,



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর যেদিন কর্ণবিদারক নাদ আসবে,



জহুরুল হক: তারপর যেদিন কান-ফাটানো আওয়াজ আসবে --



Sahih International: But when there comes the Deafening Blast



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৩. অতঃপর যখন তীক্ষ্ণ আওয়াজ আসবে(১),


তাফসীর:

(১) আয়াতে বর্ণিত الصاخة শব্দটির মূল অর্থ হলো, “এমন কঠোর ডাক যার ফলে মানুষ শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলে।” এখানে কিয়ামতের দ্বিতীয় শিংগাধ্বনির কথা বলা হয়েছে। যা পুনরুত্থানের শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া বোঝায়। এই বিকট আওয়ায বুলন্দ হবার সাথে সাথেই মরা মানুষেরা জীবিত হয়ে উঠবে এবং কেয়ামতের মাঠে উপস্থিত হবে। [মুয়াস্‌সার, জালালাইন]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৩৩। অতঃপর যখন (কিয়ামতের) ধ্বংস-ধ্বনি এসে পড়বে। [1]


তাফসীর:

[1] কিয়ামতকে صاخّة শ্রবণশক্তি হরণকারী ধ্বংস-ধ্বনি এই জন্য বলা হয়েছে যে, এটা অতি ভয়ংকর আওয়াজের সাথে সংঘটিত হবে এবং তা কর্ণকে বধির করে ফেলবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৩-৪২ নম্বর আয়াতের তাফসীর:



কিয়ামত দিবসে মানুষের যে অবস্থা হবে যেমন একজন অন্যজন হতে পলায়ন করবে, কেউ কাউকে দেবে না, সে কথাসহ দু’শ্রেণির মানুষের কথা এখানে আলোচনা করা হয়েছে যাদের একশ্রেণির চেহারা উজ্জ্বল হবে আরেক শ্রেণির চেহারা হবে ধূলায় ধূসরিত।



الصَّاخَّةُ কিয়ামতের একটি অন্যতম নাম। কিয়ামতকে الصَّاخَّةُ বা শ্র্রবণশক্তি হরণকারী ধ্বংস ধ্বনি এ জন্য বলা হয় যে, এটা অতি ভয়ংকর আওয়াজের সাথে সংঘটিত হবে এবং তা কর্ণকে বধির করে ফেলবে।



(لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ....)



অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির এমন অবস্থা হবে যার কারণে সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :



تُحْشَرُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا، قَالَتْ عَائِشَةُ : فَقُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَي بَعْضٍ؟ فَقَالَ : الأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يُهِمَّهُمْ ذَاكِ



তোমাদেরকে হাশর করানো হবে নগ্ন পায়ে, হেঁটে হেঁটে, উলঙ্গ ও খতনাবিহীন অবস্থায়। আয়িশাহ (রাঃ) বললেন : হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদের একজন কি অন্যজনের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না? তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : কিয়ামতের বিষয় এত কঠিন যে, তার দিকে মানুষ মনস্থও করতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা. ৬৫২৭) অন্য বর্ণনায় রয়েছে তখন নাবী (সাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করলেন। (তিরমিযী হা. ১১৬৪৭, সহীহ।)





(ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ)



সহাস্য ও প্রফুল্ল। তাদের অন্তরের খুশির কারণে চেহারা এরূপ প্রফুল্ল হবে। যাদের আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তাদের এরূপ উজ্জ্বল চেহারা হবে।



غَبَرَةٌ ধূলায় ধূসর। ترهقها অর্থ غشاها বা আচ্ছন্ন করে নেবে। অর্থাৎ যারা কাফির ও পাপাচারী তাদের চেহারা এরূপ হবে।



(الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ)



অর্থাৎ তাদের অন্তর কাফির আর কাজকর্ম খারাপ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:





(إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوْا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوْآ إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا)



“তুমি যদি তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা তোমার‎ বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং যারা জন্ম লাভ করবে তারা হবে দুষ্কৃতকারী ও কাফির।” (সূরা নূহ ৭১: ২৭)





আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কিয়ামতের দিন ভাই তার ভাইয়ের থেকে, পিতা-মাতা তার সন্তান থেকে পলায়ন করবে।

২. কিয়ামতের দিন এমন পরিস্থিতি হবে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকক্ষ।

৩. ডান হাতে আমলনামা প্রাপ্ত ব্যক্তিদের চেহারা কিয়ামতের দিন উজ্জ্বল ও হাসিখুশি হবে।

৪. যারা বাম হাতে আমলনামা পাবে তাদের চেহারা ধূলায় ধূসরিত হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৩-৪২ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) কিয়ামতের একটি নাম। এ নামের কারণ এই যে, কিয়ামতের শিংগার আওয়াজ ও শোরগোলে কানের পর্দা ফেটে যাবে। সেদিন মানুষ তার নিকটাত্মীয়দেরকে দেখবে কিন্তু তাদেরকে দেখে পালিয়ে যাবে। কেউ কারো কোন কাজে আসবে না। স্বামী তার স্ত্রীকে দেখে বলবেঃ আমি পৃথিবীতে তোমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছিলাম? স্ত্রী উত্তরে বলবেঃ নিঃসন্দেহে আপনি আমার সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছিলেন। আমাকে খুবই ভালবাসতেন। এ কথা শুনে স্বামী বলবেঃ আজ আমার একটি মাত্র পুণ্যের প্রয়োজন, তাহলেই আমি আজকের এই মহা বিপদ থেকে মুক্তি পেতে পারি। ঐ একটি পুণ্য তুমি আমাকে দাও। স্ত্রী বলবেঃ আপনি তো সামান্য জিনিসই চেয়েছেন, কিন্তু আমি যে অক্ষম! আজ পুণ্যের আমার নিজেরই একান্ত প্রয়োজন। আশংকা করছি আমিও বিপদে পড়ি না কি? কাজেই পুণ্য দেয়া সম্ভব নয়। পুত্র পিতার সাথে দেখা করে একই রকম আবেদন-নিবেদন জানাবে এবং একই রকম জবাব পাবে।

সহীহ্ হাদীসে শাফাআত প্রসঙ্গে বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ বড় বড় পয়গাম্বরদের কাছে জনগণ শাফাআতের জন্যে আবেদন জানাবে, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকেই বলবেনঃ “ইয়া নাফসী, ইয়া নাফসী!' এমনকি হ্যরত ঈসা রুহুল্লাহ্ (আঃ) পর্যন্ত বলবেনঃ আজ আল্লাহ্ তা'আলার কাছে নিজের প্রাণ ছাড়া অন্য কারো জন্যে আমি কিছুই বলবো না। এমনকি যার গর্ভ থেকে আমি ভূমিষ্ট হয়েছি সেই মা জননী হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর জন্যেও কিছু বলবো না। মোটকথা, বন্ধু বন্ধুর কাছ থেকে, আত্মীয় আত্মীয়ের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ও বিব্রত থাকবে। অন্যের প্রতি কেউ ক্ষেপ করবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা নগ্নপদে, নগ্নদেহে খত্নাবিহীন অবস্থায় আল্লাহ্র কাছে জমায়েত হবে।” এ কথা শুনে তার এক স্ত্রী বলেনঃ “হে আল্লাহ্র রাসূল (সঃ)! তাহলে তো অন্যের লজ্জাস্থানের প্রতি চোখ পড়বে!” রাসূলুল্লাহ্ বললেন! ঐ মহা প্রলয়ের দিনে সব মানুষ এতো ব্যস্ত থাকবে যে, অন্যের প্রতি তাকানোর সুযোগ কারো থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, অতঃপর আল্লাহর নবী (সঃ) (আরবি) আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।

অন্য এক বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ স্ত্রী ছিলেন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)। হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি নিবেদিত হোক! আমি আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করছি, আপনি তার উত্তর দিন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “জানা থাকলে অবশ্যই উত্তর দিবো।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “মানুষের হাশর কিভাবে হবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তর দিলেনঃ

আল্লাহর নবী (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “নগ্নপায়ে ও নগ্নদেহে।” কিছুক্ষণ পর হযরত আয়েশা জিজ্ঞেস করলেনঃ “মহিলারাও কি ঐ অবস্থায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” এ কথা শুনে উম্মুল মুমিনীন দুঃখ করতে লাগলেন। তখন আল্লাহর নবী (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! এই আয়াতটি শোননা, তারপর পোশাক পরিধান করা না করা নিয়ে তোমার কোন আফসোস বা দুঃখ থাকবে না।” হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন্ আয়াত?” জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করলেন।

অন্য এক বর্ণনায় উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা (রাঃ) -এর জিজ্ঞেস করার কথা উল্লিখিত হয়েছে। সব মানুষ নগ্নপায়ে, নগ্নদেহে খত্নাবিহীন অবস্থায় হাশরের মাঠে সমবেত হবে। কেউ কান পর্যন্ত ঘামের মধ্যে ডুবে যাবে, কারো মুখ পর্যন্ত ঘাম পৌছবে তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এই আয়াত তিলাওয়াত করেন।

এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সেখানে লোকদের দুটি দল হবে। এক দলের চেহারা আনন্দে চমকাতে থাকবে। তাদের মন নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্ত থাকবে। তাদের মুখমণ্ডল সুদর্শন এবং উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারা হবে জান্নাতি দল। আর একটি দল হবে জাহান্নামীদের। তাদের চেহারা মসিলিপ্ত, কালিমাময় ও মলিন থাকবে।

হাদীস শরীফে আছে যে, তাদের ঘাম হবে তাদের জন্যে লাগামের মত। তারা ধূলি-মলিন অবস্থায় পড়ে থাকবে। এরা সেই দল যাদের মনে কুফরী ছিল এবং আমল ছিল পাপে পরিপূর্ণ। যেমন অন্য এক জায়গায় আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা জন্ম দিতে থাকবে শুধু দুষ্কৃতিকারী কাফির।” (৭১:২৭)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।