সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 75)
হরকত ছাড়া:
قال الملأ الذين استكبروا من قومه للذين استضعفوا لمن آمن منهم أتعلمون أن صالحا مرسل من ربه قالوا إنا بما أرسل به مؤمنون ﴿٧٥﴾
হরকত সহ:
قَالَ الْمَلَاُ الَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْا مِنْ قَوْمِهٖ لِلَّذِیْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِمَنْ اٰمَنَ مِنْهُمْ اَتَعْلَمُوْنَ اَنَّ صٰلِحًا مُّرْسَلٌ مِّنْ رَّبِّهٖ ؕ قَالُوْۤا اِنَّا بِمَاۤ اُرْسِلَ بِهٖ مُؤْمِنُوْنَ ﴿۷۵﴾
উচ্চারণ: কা-লাল মালাউল্লাযীনাছ তাকবারূমিন কাওমিহী লিল্লাযীনাছ তুদ‘ইফূলিমান আ-মানা মিনহুম আতা‘লামূনা আন্না সা-লিহাম মুরছালুম মিররাব্বিহী কালূইন্না-বিমাউরছিলা বিহী মু’মিনূন।
আল বায়ান: তার কওমের অহঙ্কারী নেতৃবৃন্দ তাদের সেই মুমিনদেরকে বলল যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, ‘তোমরা কি জান যে, সালিহ তার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত’? তারা বলল, ‘নিশ্চয় সে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছে, আমরা তাতে বিশ্বাসী’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৫. তাঁর সম্প্রদায়ের অহংকারী নেতারা সে সম্প্রদায়ের যারা ঈমান এনেছিল- যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল, তোমরা কি জান যে, সালিহ তার রব এর পক্ষ থেকে প্রেরিত? তারা বলল, নিশ্চয় তিনি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, আমরা তার উপর ঈমানদার।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তার জাতির গর্বিত প্রধানগণ ঐসব লোকদেরকে বলেছিল যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, যারা তাদের মধ্যে ঈমান এনেছিল- ‘‘তোমরা কি জান যে সালিহ তার প্রতিপালক কর্তৃক প্রেরিত? তারা বলেছিল, ‘তিনি যে বাণী নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন তাতে আমরা বিশ্বাসী’।
আহসানুল বায়ান: (৭৫) তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা দুর্বল বিশ্বাসীদেরকে বলল, ‘তোমরা কি জান যে, স্বালেহ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল, ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানরা তাদের মধ্যকার দুর্বল ও উৎপীড়িত মু’মিনদেরকে বললঃ তোমরা কি বিশ্বাস কর যে, সালিহ তার রাব্ব কর্তৃক প্রেরিত হয়েছে? তারা উত্তরে বললঃ নিশ্চয়ই যে বার্তাসহ সে প্রেরিত হয়েছে, আমরা তা বিশ্বাস করি।
ফযলুর রহমান: তার সমপ্রদায়ের অহঙ্কারী নেতারা দুর্বল বলে বিবেচিত লোকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে বলেছিল, “তোমরা কি জান যে, ছালেহ তার প্রভুর পক্ষ থেকে প্রেরিত?” (জবাবে) তারা বলেছিল, “তাকে যা নিয়ে পাঠানো হয়েছে আমরা তো তা বিশ্বাস করি।”
মুহিউদ্দিন খান: তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক সর্দাররা ঈমানদার দারিদ্রদেরকে জিজ্ঞেস করলঃ তোমরা কি বিশ্বাস কর যে সালেহ কে তার পালনকর্তা প্রেরণ করেছেন; তারা বলল আমরা তো তার আনীত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসী।
জহুরুল হক: তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা গর্ব করেছিল তাদের প্রধানরা বললে ওদের যারা দুর্বলতা বোধ করতো -- ওদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল তাদের -- "তোমরা কি জানো যে সালিহ্ তার প্রভুর কাছ থেকে একজন প্রেরিত-পুরুষ?" তারা বললে -- "নিঃসন্দেহ তাঁকে দিয়ে যা পাঠানো হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাসী।"
Sahih International: Said the eminent ones who were arrogant among his people to those who were oppressed - to those who believed among them, "Do you [actually] know that Salih is sent from his Lord?" They said, "Indeed we, in that with which he was sent, are believers."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৫. তাঁর সম্প্রদায়ের অহংকারী নেতারা সে সম্প্রদায়ের যারা ঈমান এনেছিল- যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল, তোমরা কি জান যে, সালিহ তার রব এর পক্ষ থেকে প্রেরিত? তারা বলল, নিশ্চয় তিনি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, আমরা তার উপর ঈমানদার।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৫) তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা দুর্বল বিশ্বাসীদেরকে বলল, ‘তোমরা কি জান যে, স্বালেহ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল, ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী।’ [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যে দাওয়াত ও তাওহীদ নিয়ে তিনি এসেছেন তা যেহেতু প্রকৃতিরই আহবান, তাই আমরা তার উপর ঈমান এনেছি। বাকী থাকল তাদের এই প্রশ্ন যে, সালেহ আসলেই নবী কিনা? এ ব্যাপারে ঈমানদাররা কিছুই বলেনি। কেননা, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল কি না এটাকে তারা আলোচনার যোগ্যই মনে করেনি। তাদের কাছে তাঁর রসূল হওয়ার ব্যাপারটা ছিল এক বাস্তব এবং অবধারিত সত্য। যেমন, বাস্তবতাও তা-ই ছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৩-৭৯ নং আয়াতের তাফসীরঃ
পূর্বে আদ জাতি সম্পর্কে আলোচনা করার পর অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা সামূদ জাতির কথা নিয়ে এসেছেন যাদের নিকট প্রেরণ করেছিলেন সালেহ (আঃ)-কে।
আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পরে সামূদ জাতির প্রতি সালেহ (আঃ)-কে নাবী হিসেবে প্রেরিত হন। (তারীখুল আম্বিয়া ১/৪৯) আদ ও সামূদ জাতি একই ব্যক্তি ‘ইরাম’ এর দু’ ছেলের দু’টি বংশধারার নাম। সামূদ জাতি আরবের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় বসবাস করত। তাদের প্রধান শহরের নাম ছিল ‘হিজর’ যা সিরিয়ার অর্ন্তভুক্ত। বর্তমানে একে সাধারণভাবে ‘মাদায়েনে সালেহ’ বলা হয়। আদ জাতির ধ্বংসের পর সামূদ জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। তারাও আদ জাতির মত শক্তিশালী ও বীরের জাতি ছিল। তারা প্রস্তর খোদাই ও স্থাপত্য বিদ্যায় খুবই পারশর্দী ছিল। (সূরা শুআরা ২৬:১৯) সমতল ভূমিতে বিশালাকার অট্টালিকা নির্মাণ ছাড়াও পর্বতগাত্র খোদাই করে তারা নানারূপ প্রকোষ্ট নির্মাণ করত। তাদের স্থাপত্যের নিদর্শনাবলী আজও বিদ্যমান। এগুলোর গায়ে ইরামী ও সামূদী বর্ণমালার শিলালিপি খোদিত রয়েছে। এ এলাকাটি এখনো পরিত্যক্ত, তথায় কেউ বসবাস করে না।
সামূদ জাতিতে সালেহ (আঃ)-এর দাওয়াত:
পথভোলা এ জাতিকে অন্যান্য নাবীদের মত সালেহ (আঃ) প্রথমেই তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজাসহ যাবতীয় শির্ক ও কুসংস্কার ত্যাগ করে এক আল্লাহ তা‘আলাকে ভয়, তাঁর ইবাদত ও তাঁর প্রেরিত রাসূলের আনুগত্য করার প্রতি আহ্বান জানান। যেমন অত্র সূরার ৭৩ ও সূরা হূদের ৬১ নং আয়াতে বলা হয়েছে। তাওহীদের এ দাওয়াতের সাথে সাথে তাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন: ‘আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করেছ। সুতরাং তোমরা ‘আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর।’ تَنْحِتُوْنَ অর্থাৎ তারা পাহাড়ের পাথর কেটে বসবাসের বাড়ি নির্মাণ করত। তিনি আরো বললেন: ‘তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতেই তিনি তোমাদেরকে বসবাস করিয়েছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর আর তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন কর। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক নিকটে, তিনি আহ্বানে সাড়া দেন।’ (সূরা হূদ ১১:৬১) অন্যান্য নাবীদের মত তিনি এ কথাও বললেন, আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না।
সালেহ (আঃ)-এর দাওয়াতের ফলাফল:
সালেহ (আঃ) তাওহীদের দাওয়াত শুরু করলে জাতির লোকেরা দু’ দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল ঈমান আনে, তবে এরা ছিল সমাজের দুর্বল ও সাধারণ মানুষ। সাধারণত নাবীদের অনুসারী এমনই হয়ে থাকে। যেমন হিরাকলের হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৭) অন্য দল কুফরী করে, সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ اَرْسَلْنَآ اِلٰی ثَمُوْدَ اَخَاھُمْ صٰلِحًا اَنِ اعْبُدُوا اللہَ فَاِذَا ھُمْ فَرِیْقٰنِ یَخْتَصِمُوْنَ)
“অবশ্যই আমি সামূদ সম্প্রদায়ের নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ্কে পাঠিয়েছিলাম এ আদেশসহ- ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর’, কিন্তু তারা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে বিতর্কে লিপ্ত হল।” এ দলের পরিচয় দিয়ে অত্র সূরার ৭৫-৭৬ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা সে সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল: ‘তোমরা কি জান যে, সালেহ ‘আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল: ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী।’ তখন অহংকারীরা বললো, তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অবিশ্বাস করি।’
এ অবাধ্য লোকেরা সালেহ (আঃ)-কে বলল:
(یٰصٰلِحُ قَدْ کُنْتَ فِیْنَا مَرْجُوًّا قَبْلَ ھٰذَآ اَتَنْھٰٿنَآ اَنْ نَّعْبُدَ مَا یَعْبُدُ اٰبَا۬ؤُنَا وَاِنَّنَا لَفِیْ شَکٍّ مِّمَّا تَدْعُوْنَآ اِلَیْھِ مُرِیْبٍ)
‘হে সালেহ্! এর পূর্বে তুমি ছিলে আমাদের আশা ভরসার পাত্র। তুমি কি আমাদেরকে নিষেধ করছ ‘ইবাদত করতে তাদের, যাদের ‘ইবাদত করত আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা? আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছি সে বিষয়ে, যার প্রতি তুমি আমাদেরকে আহ্বান করছ।’ (সূরা হূদ ১১:৬২) অর্থাৎ যেহেতু নাবীরা সচ্চরিত্রবান, আমানতদার ও উত্তম আখলাকের হয়ে থাকে যেমন আমাদের নাবী ছিলেন তাই তারা সালেহ (আঃ)-এর কাছে ভাল কিছু আশা করেছিল। ভাল আশা বলতে তাদের মুআফেক হবে, তাদের মা‘বূদদেরকে গালিগালাজ করবে না, পূর্বপুরুষের ধর্মের অনুসরণ করবে ইত্যাদি। তখন সালেহ (আঃ) তাদের এ কথার জবাবে বললেন: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি একটু চিন্তা করেছ! যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, তারপরেও কি আমি তাঁর অবাধ্য হব? তাহলে তো আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি হতে রক্ষা পাব না। (সূরা হূদ ১১: ৬৩)
সালেহ (আঃ)-এর এসব কথা শুনে তারা বলতে লাগল, ‘তুমি তো জাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। তুমি তো আমাদের মত একজন মানুষ, কাজেই তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে একটি নিদর্শন উপস্থিত কর।’ (সূরা শুআরা ২৬:১৫৩-১৫৪) এমনকি তারা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলল,
(اَبَشَرًا مِّنَّا وَاحِدًا نَّتَّبِعُھ۫ٓﺫ اِنَّآ اِذًا لَّفِیْ ضَلٰلٍ وَّسُعُرٍﭧءَاُلْقِیَ الذِّکْرُ عَلَیْھِ مِنْۭ بَیْنِنَا بَلْ ھُوَ کَذَّابٌ اَشِرٌ)
“আমরা কি আমাদেরই এক ব্যক্তির অনুসরণ করব? তবে তো আমরা বিপথগামী এবং বিবেকহীনরূপে গণ্য হব। আমাদের মধ্যে কি তারই প্রতি ওয়াহী করা হয়েছে? বরং সে তো একজন মিথ্যাবাদী, দাম্ভিক।” (সূরা কামার ৫৪:২৪-২৫) তারা আরো বলল: ‘তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা আছে তাদেরকে আমরা অমঙ্গলের কারণ মনে করি।’ (সূরা নামল ২৭:৪৭)
এভাবে সমাজের প্রভাব ও শক্তিশালী শ্রেণি সালেহ (আঃ)-কে অমান্য করল এবং মূর্তিপূজাসহ শির্ক ও আল্লাহদ্রোহী কাজে লিপ্ত রইল। আল্লাহ তা‘আলার ভাষায়,
(وَاَمَّا ثَمُوْدُ فَھَدَیْنٰھُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمٰی عَلَی الْھُدٰی فَاَخَذَتْھُمْ صٰعِقَةُ الْعَذَابِ الْھُوْنِ بِمَا کَانُوْا یَکْسِبُوْنَ)
“আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, আমি তাদেরকে পথ নির্দেশ করেছিলাম; কিন্তু তারা সৎ পথের পরিবর্তে অন্ধত্ব (ভ্রান্ত পথ) অবলম্বন করেছিল। অতঃপর তাদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ লাঞ্ছণাদায়ক বজ্র শাস্তি আঘাত হানল।” (সূরা ফুসসিলাত ৪১:১৭)
সামূদ জাতির ওপর আপতিত গযবের বিবরণ:
ইবনু কাসীর বর্ণনা করেন যে, সালেহ (আঃ)-এর নিরন্তর দাওয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা স্থির করল যে, তাঁর কাছে এমন একটা বিষয় দাবী করতে হবে যা পূরণ করতে তিনি ব্যর্থ হবেন এবং এর ফলে তাঁর দাওয়াতী কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা সালেহ (আঃ)-এর কাছে দাবী করল, আপনি যদি সত্যি নাবী হন তাহলে পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে এনে দেখান। সালেহ (আঃ) তাদের দাবী শুনে অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমাদের দাবী পূরণ করা হলে তোমরা ঈমান আনবে। তবে দাবী পূরণ করার পরেও ঈমান না আনলে আল্লাহ তা‘আলার গযবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। এতে সবাই স্বীকৃতি দিল এবং সেই মর্মে অঙ্গীকার করল। তখন সালেহ (আঃ) সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তা‘আলা তার দু‘আ কবূল করে নিলেন এবং বললেন:
( اِنَّا مُرْسِلُوا النَّاقَةِ فِتْنَةً لَّھُمْ فَارْتَقِبْھُمْ وَاصْطَبِرْ)
“নিশ্চয়ই আমি তাদের পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি এক উষ্ট্রী; অতএব (হে সালেহ!) তুমি তাদের আচরণ লক্ষ কর এবং ধৈর্যশীল হও।” (সূরা কামার ৫৪:২৭) কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের ভিতর থেকে দশ মাস গর্ভবতী একটি উষ্ট্রী বের হয়ে আসলে তিনি বললেন, তোমাদের কাছে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে, অতএব তোমরা ঈমান আন। আর উষ্ট্রীর জন্য কিছু নিয়ম-কানুন বেঁধে দিলেন যা অত্র সূরার ৭৩ ও হূদের ৬৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘এটি আল্লাহর উষ্ট্রী, তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। এটাকে ‘আল্লাহর জমিতে চরে খেতে দাও এবং একে মন্দ উদ্দেশ্যে স্পর্শ কর না, করলে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে।’ উক্ত উষ্ট্রীর জন্য পানি পান করার জন্য নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করা ছিল আর বলে দেয়া ছিল সেদিন যেন কেউ পানি সংগ্রহে উপস্থিত না হয়। (সূরা কামার ৫৪:২৮)
সামূদ জাতির লোকেরা যে কূপ থেকে পানি পান করত ও তাদের গবাদি পশুদের পানি পা করাত, এ উষ্ট্রীও সেই কূপ থেকে পানি পান করত। যেদিন উষ্ট্রী পানি পান করত সেদিন পানি শেষ হয়ে যেত। অবশ্য সেদিন লোকেরা উষ্ট্রীর দুধ পান করত এবং বাকী দুধ দ্বারা তাদের সব পাত্রে ভরে নিত। কিন্তু এ হতভাগাদের কপালে এত সুখ সহ্য হল না। তার উষ্ট্রীকে হত্যা করার নীলনকশা তৈরি করল। আল্লাহ তা‘আলা গযবের পরওয়া করল না, অবশেষে শয়তান তাদেরকে সর্ববৃহৎ কুমন্ত্রণা দিল। আর তা হল, নারীর প্রলোভন। সামূদ গোত্রের দুজন পরমা সুন্দরী মহিলা, যারা সালেহ (আঃ)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষী ছিল তারা তাদের রূপ-যৌবন দেখিয়ে দুজন যুবককে উষ্ট্রী হত্যায় রাযী করাল। অতঃপর তারা তীর ও তরবারির আঘাতে উষ্ট্রীকে পা কেটে হত্যা করে ফেলল। হত্যাকারী যুবকদ্বয়ের প্রধানকে লক্ষ করেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِذِ انْۭبَعَثَ اَشْقٰٿھَا)
“যখন তাদের সর্বাধিক হতভাগ্য ব্যক্তি তৎপর হয়ে উঠেছিল।” (সূরা শামস ৯১:১২) কেননা তার কারণেই গোটা সামূদ জাতি গযবে পতিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘‘অতঃপর তারা তাদের এক সঙ্গীকে আহ্বান করল, সে ওটাকে (উষ্ট্রীকে) ধরে হত্যা করল। কী কঠোর ছিল আমার আযাব ও সতর্কবাণী! আমি তাদের উপর পাঠিয়েছি এক বিকট আওয়াজ; ফলে তারা হয়ে গেল খোয়াড় মালিকদের বিখণ্ডিত ভূষির ন্যায়।” (সূরা কামার ৫৪: ২৯-৩১)
এ উষ্ট্রী হত্যার পর সালেহ (আঃ) জাতিকে আল্লাহ তা‘আলার গযবের কথা জানিয়ে দিলেন যে,
(تَمَتَّعُوْا فِیْ دَارِکُمْ ثَلٰثَةَ اَیَّامٍﺚ ذٰلِکَ وَعْدٌ غَیْرُ مَکْذُوْبٍ)
‘‘তোমরা তোমাদের গৃহে তিন দিন জীবন উপভোগ করে নাও। এটা একটি প্রতিশ্রুতি যা মিথ্যে হবার নয়।’’ (সূরা হূদ ১১:৬৫) কিন্তু তারা এরূপ কঠোর হুশিয়ারীকে কোন গুরুত্ব না দিয়ে বরং তাচ্ছিল্যভরে বলল, “হে সালেহ! তুমি সত্য রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।” তারা সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল। তারা ভাবল, যদি আযাব এসেই যায়, তবে তার আগে সালেহকেই হত্যা করে শেষ করে দিই। কেননা এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করার কারণেই গযব আসবে। সুতরাং সে-ই গযবের জন্য দায়ী। আর যদি গযব না আসে তাহলে সে মিথ্যার দণ্ড ভোগ করুক। জাতির নয়জন নেতা এ নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দেয়। তাদের এ চক্রান্তের বিবরণ সূরা নামলে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,
(وَکَانَ فِی الْمَدِیْنَةِ تِسْعَةُ رَھْطٍ یُّفْسِدُوْنَ فِی الْاَرْضِ وَلَا یُصْلِحُوْنَ قَالُوْا تَقَاسَمُوْا بِاللہِ لَنُبَیِّتَنَّھ۫ وَاَھْلَھ۫ ثُمَّ لَنَقُوْلَنَّ لِوَلِیِّھ۪ مَا شَھِدْنَا مَھْلِکَ اَھْلِھ۪ وَاِنَّا لَصٰدِقُوْنَ)
“আর সে শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং সৎ কর্ম করত না। তারা বলল: ‘তোমরা আল্লাহর নামে শপথ কর, ‘আমরা রাত্রিকালে তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে অবশ্যই আক্রমণ করব; অতঃপর তার অভিভাবককে নিশ্চয়ই বলব, ‘তার পরিবার-পরিজনের হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি; আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।’’ (সূরা নামল ২৭:৪৮-৪৯) তাদের সিদ্ধান্ত মতে নয়জন নেতা তাদের প্রধান কাদার বিন সালেফ এর নেতৃত্বে রাতের বেলা সালেহ (আঃ)-কে হত্যা করার জন্য তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পথিমধ্যেই প্রস্তর বর্ষণে ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَکَرُوْا مَکْرًا وَّمَکَرْنَا مَکْرًا وَّھُمْ لَا یَشْعُرُوْنَﮁفَانْظُرْ کَیْفَ کَانَ عَاقِبَةُ مَکْرِھِمْﺫ اَنَّا دَمَّرْنٰھُمْ وَقَوْمَھُمْ اَجْمَعِیْنَ)
“তারা এক চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এক কৌশল অবলম্বন করলাম, কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি। অতএব দেখ, তাদের চক্রান্তের পরিণাম কী হয়েছে- আমি অবশ্যই তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি।” (সূরা নামল ২৭:৫০-৫১) যা হোক, নির্ধারিত দিনে গযব আসার প্রাক্কালেই আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে সালেহ (আঃ) স্বীয় ঈমানদার সাথীদেরকে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন এবং যাওয়ার সময় তিনি অবাধ্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি, আর আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি, কিন্তু তোমরা তো উপদেশদাতাদেরকে পছন্দ কর না।”
আপতিত গযবের ধরন:
সালেহ (আঃ) অবাধ্য জাতিকে শাস্তির ভয় দেখালে তারা বলল, এ শাস্তি কিভাবে আসবে, কোত্থেকে আসবে, এর লক্ষণ কী হবে? সালেহ (আঃ) বললেন: আগামীকাল বৃহস্পতিবার তোমাদের সকলের মুখমণ্ডল হলুদ হয়ে যাবে। পরের দিন শুক্রবার লালবর্ণ ধারণ করবে। অতঃপর শনিবার তা গাঢ় পিতবর্ণ হয়ে যাবে। এটাই হবে তোমাদের জীবনের শেষ দিন। (ইবনু কাসীর, ৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর) রবিবার সকালেই সবাই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সুগন্ধি মেখে অপেক্ষা করতে থাকে। এমতাবস্থায় ভীষণ ভূমিকম্প শুরু হল এবং ওপর থেকে বিকট ও ভয়াবহ এক গর্জন শোনা গেল। ফলে সবাই যার যার স্থানে একযোগে অধোমুখী হয়ে ভূতলশায়ী হল (সূরা আ‘রাফ ৭৮, হূদ ৬৭-৬৮) এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হল এমনভাবে, যেন তারা কোনদিন সেখানে বসবাস করেনি। অন্য আয়াতে এসেছে যে, ‘আমি তাদের উপর পাঠিয়েছি এক বিকট আওয়াজ; ফলে তারা হয়ে গেল খোয়াড় মালিকদের বিখন্ডিত ভূষির ন্যায়।’ (সূরা কামার ৫৪:৩১)
(الرَّجْفَةُ)
অর্থ ভূমিকম্প, অন্যত্র رجفة স্থানে আওয়াজের কথা এসেছে। এ থেকে বুঝা যায় উভয় শাস্তিই তাদের ওপর এসেছিল। এ সম্পর্কে আরো আলোচনা সূরা হূদের ৬১-৬৮, নামলের ৪৫-৫৩, কামারের ২৩-৩১ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
৯ম হিজরীতে তাবূক যুদ্ধে যাওয়ার পথে মুসলিম বাহিনী হিজরে অবতরণ করলে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করে বলেন,
(لَا تَدْخُلُوا مَسَاكِنَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ إِلَّا أَنْ تَكُونُوا بَاكِينَ أَنْ يُصِيبَكُمْ مَا أَصَابَهُمْ ثُمَّ تَقَنَّعَ بِرِدَائِهِ)
তোমরা ঐসব অভিশপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করো না ক্রন্দনরত অবস্থায় বতীত। যদি ক্রন্দন করতে না পার তাহলে প্রবেশ করো না। তাহলে তোমাদের ওপর ঐ গযব আসতে পারে, যা তাদের ওপর এসেছিল। এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাথা ঢেকে ফেললেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৩৩)
পার্থিব ক্ষমতা ও ধনৈশ্বর্য অধিকাংশ মানুষকে অশুভ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। বিত্তশালীরা আল্লাহ তা‘আলা ও আখেরাতকে ভুলে গিয়ে ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায়। সামূদ জাতির বেলায়ও তাই হয়েছিল। অথচ নূহ (আঃ) জাতির কঠিন শাস্তির ঘটনাবলী তখনও লোকমুখে আলোচিত হত। আর আদ জাতির নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা তো তাদের কাছে এক প্রকার টাটকা ঘটনাই ছিল। অথচ তাদের ভাইদের ধ্বংসস্তুপের ওপরে বড় বড় বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করে ও বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে তারা পেছনের কথা ভুলে গেল। এমনকি তারা আদ জাতির মত অহংকারী কার্যকলাপ শুরু করে দিল। ফলে আল্লাহ তা‘আলার গযব অনিবার্য হয়ে গেল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনকে অবমাননা করলে শাস্তি অপরিহার্য। যেমন সামূদ সম্প্রদায় শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন উষ্ট্রীকে অবমাননা করার কারণে।
২. অধিকাংশ মানুষ দুনিয়ার স্বার্থ অথবা ক্ষমতার লোভে সত্য বর্জন করে।
৩. অহংকারীদের অন্তর শক্ত হয়, তারা আল্লাহ তা‘আলার গযব দেখেও পরওয়া করে না, বরং তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেয়।
৪. নাবীদের ঘটনা বর্ণনার বড় শিক্ষা হল, লোকেদের সতর্ক করা। আমরাও যাতে নাবীর অবাধ্য না হই। অন্যথায় শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
৫. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যই দুনিয়াতে ছোট-খাট শাস্তির আস্বাদন করিয়ে থাকেন ও তাদেরকে ভয় দেখান।
৬. যুগে যুগে সমাজের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীনরা সত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল ফলে তাদের ওপর গযবও এসেছিল, তাই তাদেরকে ভয় না করে বরং আল্লাহ তা‘আলাকেই ভয় করে সত্যের সপক্ষে কথা বলা অব্যাহত রাখা উচিত।
৭. দুর্বল শ্রেণির লোকেরাই সাধরাণতঃ অন্যদের আগে আল্লাহ তা‘আলা ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয় ও অন্যদের দ্বারা নির্যাতিত হয়।
৮. মানুষকে বিপদে ফেলার জন্য শয়তানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল নারী ও অর্থ-সম্পদ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর:
ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।` ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)
তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।` হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)
ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”
আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো।
হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।
তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।