সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 7)
হরকত ছাড়া:
فلنقصن عليهم بعلم وما كنا غائبين ﴿٧﴾
হরকত সহ:
فَلَنَقُصَّنَّ عَلَیْهِمْ بِعِلْمٍ وَّ مَا کُنَّا غَآئِبِیْنَ ﴿۷﴾
উচ্চারণ: ফালানাকুসসান্না ‘আলাইহিম বি‘ইলমিওঁ ওয়ামা-কুন্না-গাইবীন।
আল বায়ান: অতঃপর অবশ্যই আমি তাদের নিকট জ্ঞানের ভিত্তিতে বর্ণনা করব। আর আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭. অতঃপর অবশ্যই আমরা তাদের কাছে পূর্ণ জ্ঞানের সাথে তাদের কাজগুলো বিবৃত করব, আর আমরা তো অনুপস্থিত ছিলাম না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর পরিপূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে তাদের নিকট তাদের সমস্ত কাহিনী অবশ্যই জানিয়ে দেব, কেননা আমি তো মোটেই অনুপস্থিত ছিলাম না।
আহসানুল বায়ান: (৭) তারপর অবশ্যই আমি তাদের নিকট সজ্ঞানে তাদের কার্যাবলী বিবৃত করব।[1] আর আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম না।
মুজিবুর রহমান: তখন আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দিব, যেহেতু আমি পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি, আর আমিতো কোন কালে বেখবর ছিলামনা।
ফযলুর রহমান: অতঃপর আমি তাদের কাছে জ্ঞাতসারে (তাদের সব ঘটনা) বর্ণনা করব। আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম না।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর আমি স্বজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা করব। বস্তুতঃ আমি অনুপস্থিত তো ছিলাম না।
জহুরুল হক: তখন আমরা নিশ্চয়ই তাদের কাছে বর্ণনা করবো জ্ঞানের সাথে, আর আমরা তো অনুপস্থিত ছিলাম না।
Sahih International: Then We will surely relate [their deeds] to them with knowledge, and We were not [at all] absent.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭. অতঃপর অবশ্যই আমরা তাদের কাছে পূর্ণ জ্ঞানের সাথে তাদের কাজগুলো বিবৃত করব, আর আমরা তো অনুপস্থিত ছিলাম না।(১)
তাফসীর:
(১) আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে বলছেন যে, তিনি তার বান্দারা ছোট, বড়, গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বহীন যা করত বা বলত সবকিছু সম্পর্কে কিয়ামতের মাঠে বিস্তারিত জানাবেন। তিনি বেখবর নন। বরং তিনি চোখের খিয়ানত ও অন্তরের গোপন ভেদ সম্পর্কেও অবগত। আল্লাহ বলেন, “তার অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই [সূরা আল-আনআম: ৫৯] [ইবন কাসীর] সুতরাং আল্লাহ হাশরের মাঠে তাদেরকে যা জানাবেন তা জ্ঞানের ভিত্তিতেই জানাবেন। দুনিয়াতে যা কিছুই ঘটেছে সবই তার জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে। সবকিছু তিনি জানার পরও তাঁর ফেরেশতাদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ট জন হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকেন না।
তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক তিনি তো তাদের সংগেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত। [সূরা আল-মুজাদালাহ: ৭] অন্যত্র বলেন, “তিনি জানেন যা যমীনে প্রবেশ করে এবং যা তা থেকে নির্গত হয় আর যা আসমান থেকে নাযিল হয় এবং যা কিছু তাতে উত্থিত হয়। [সূরা সাবা: ২] আরও বলেন, “তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা থেকে বের হয় এবং আসমান হতে যা কিছু নামে ও আসমানে যা কিছু উত্থিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেন—তিনি (জ্ঞানে) তোমাদের সংগে আছেন।” [সূরা আল-হাদীদ: ৪] আরও বলেন, “আর আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন এবং আপনি সে সম্পর্কে কুরআন থেকে যা-ই তিলাওয়াত করেন এবং তোমরা যে কাজই কর না কেন, আমরা তোমাদের সাক্ষী থাকি- যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও। আর আসমানসমূহ ও যমীনের অণু পরিমাণও আপনার রবের দৃষ্টির বাইরে নয় এবং তার চেয়ে ক্ষুদ্রতর বা বৃহত্তর কিছুই নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। [সূরা ইউনুস: ৬১] [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭) তারপর অবশ্যই আমি তাদের নিকট সজ্ঞানে তাদের কার্যাবলী বিবৃত করব।[1] আর আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম না।
তাফসীর:
[1] যেহেতু আমি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য প্রত্যেক বিষয়ের খবর রাখি, তাই (উম্মত ও পয়গম্বর) উভয়ের সামনেই সমস্ত ব্যাপার বিবৃত করব এবং তারা যা যা করেছিল, তা সবই তাদের সামনে পেশ করে দেব।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও বিষয় সংক্ষেপ:
জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম আ‘রাফ। জান্নাতীগণ জান্নাতে আর জাহান্নামীগণ জাহান্নামে প্রবেশ করার পূর্বে এ আ‘রাফ নামক স্থানে জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে কথোপকথন হবে। এ সূরার ৪৬ ও ৪৮ নং আয়াতে আ‘রাফ শব্দটি উল্লেখ আছে বিধায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ, তবে আটটি আয়াত ব্যতীত। এ আটটি আয়াত হল-
(وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ............ إِنَّا لَا نُضِيْعُ أَجْرَ الْمُصْلِحِيْنَ)
১৬৩ থেকে ১৭০ আয়াত।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সূরা আ‘রাফ মক্কায় অবতীর্ণ। (ফাতহুল কাদীর, ২/২৩৯)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাগরিবের সালাতে দু’ ভাগে ভাগ করে এ সূরা তেলাওয়াত করতেন। (সহীহ নাসাঈ হা: ৯৪৫, আবূ দাঊদ হা: ৮১৬)
সূরাটির প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায় যে, এ সূরার অধিকাংশ বিষয়বস্তু আখিরাত ও রিসালাতের সাথে সম্পৃক্ত। সূরার প্রথম দিকে নবুওয়াত ও পরকালের সত্যতা, তারপর আদম (আঃ)-কে শয়তানের বিপদগামীকরণ, অতঃপর অন্যান্য নাবী ও তাদের জাতির আলোচনা এবং যারা অবিশ্বাসী ছিল তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি, আবার পরকালের পুনঃ আলোচনাপূর্বক তাওহীদের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে সূরা শেষ করা হয়েছে।
১-৭ নং আয়াতের তাফসীরঃ
ال۬ـمـّٓـص۬ ‘আলিফ, লাম, মীম, সোয়াদ’ এগুলোকে “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর বলা হয়। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার শুরুতে আলোচনা রয়েছে, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
حَرَجٌ শব্দটির দু’টি অর্থ পাওয়া যায়- ১. কাতাদাহ, মুজাহিদ ও সুদ্দী (রাঃ) বলেন:
حَرَجٌ أيْ شَكٌ
অর্থাৎ সন্দেহ। অর্থ হল: এ কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোন সন্দেহ না থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَلْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ)
“সত্য তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেছে; সুতরাং তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১৪৭)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَإِنْ كُنْتَ فِيْ شَكٍّ مِّمَّآ أَنْزَلْنَآ إِلَيْكَ فَسْأَلِ الَّذِيْنَ يَقْرَأُوْنَ الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكَ ج لَقَدْ جَا۬ءَكَ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ)
“আমি তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তুমি সন্দেহ করে থাক তবে তোমার পূর্বের কিতাব যারা পাঠ করে তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর; তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার নিকট সত্য অবশ্যই এসেছে। সুতরাং তুমি কখনও সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা ইউনুস ১০:৯৪)
২. অধিকাংশ আলেম বলেন: حَرَجٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল: সংকীর্ণতা। অর্থাৎ এ কুরআনের তাবলীগ করতে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে। হয়তো কাফিররা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলবে, তোমাকে কষ্ট দেবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَلَعَلَّکَ تَارِکٌۭ بَعْضَ مَا یُوْحٰٓی اِلَیْکَ وَضَا۬ئِقٌۭ بِھ۪ صَدْرُکَ اَنْ یَّقُوْلُوْا لَوْلَآ اُنْزِلَ عَلَیْھِ کَنْزٌ اَوْ جَا۬ئَ مَعَھ۫ مَلَکٌﺚ اِنَّمَآ اَنْتَ نَذِیْرٌﺚ وَاللہُ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ وَّکِیْلٌ)
“তবে কি তোমার প্রতি যা ওয়াহী করা হয়েছে তার কিছু তুমি বর্জন করবে এবং এতে তোমার মন সংকুচিত হবে এজন্য যে, তারা বলে, ‘তার নিকট ধন-ভাণ্ডার প্রেরিত হয় না কেন অথবা তার সাথে ফেরেশতা আসে না কেন?’ তুমি কেবল সতর্ককারী এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ের কর্মবিধায়ক।” (সূরা হুদ ১১:১২)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيْقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُوْلُوْنَ )
“আমি অবশ্যই জানি, তারা যা বলে তাতে তোমার অন্তর সংকুচিত হয়।” (সূরা হিজর ১৫:৯৭)
তবে দ্বিতীয় উক্তিটিই সঠিক। (আযউয়াউল বায়ান, ২/১৯০) অর্থাৎ এ কুরআন দ্বারা ভীতি প্রদর্শন করতে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّآ أُنْذِرَ اٰبَا۬ٓؤُهُمْ فَهُمْ غَافِلُوْنَ)
“যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পূর্বপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা গাফিল রয়ে গেছে।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬) কেননা কুরআনের ব্যাপারে নাবী (সাঃ) এর কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম জাতিকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ কর” আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে কুরআন ও সুন্নাহ। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ ج وَمَا نَهٰكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا)
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশর ৫৯:৭) সেই সাথে আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করছেন কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোন বন্ধু বা ওলী তথা দল, মত, তরীকা ইত্যাদি যারা প্রবৃত্তির অনুকরণ করে চলে তাদের অনুসরণ করো না। কেননা তাদের অনুসরণ করলে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوْكَ عَنْ سَبِيْلِ اللّٰهِ ط إِنْ يَّتَّبِعُوْنَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُوْنَ)
“যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরণ করে; আর তারা শুধু অনুমানভিত্তিক কথা বলে।” (সূরা আনআম ৬:১১৬) সুতরাং সর্বদা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মেনে চললে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব, অন্যথায় পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হতে হবে।
(قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ)
‘তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।’ অর্থাৎ সত্য বিষয় তোমরা খুব কমই অনুধাবন কর, যার কারণে তোমাদের অধিকাংশই কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ে এদিক সেদিক থেকে দীন গ্রহণ করতে দৌড়াচ্ছ।
(وَكَمْ مِّنْ قَرْيَةٍ)
‘কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি!’ অর্থাৎ ইতোপূর্বে আল্লাহ তা‘আলা যত জাতিকে ধ্বংস করেছেন সবাই রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ ও তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدِ اسْتُهْزِئَ بِرُسُلٍ مِّنْ قَبْلِكَ فَحَاقَ بِالَّذِيْنَ سَخِرُوْا مِنْهُمْ مَّا كَانُوْا بِه۪ يَسْتَهْزِءُوْنَ)
“তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকেই ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করা হয়েছে। তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করছিল পরিণামে তা-ই বিদ্রƒপকারীদেরকে পরিবেষ্টন করেছে।” (সূরা আন‘আম ৬:১০)
(فَجَا۬ءَهَا بَأْسُنَا.....)
‘আমার শাস্তি তাদের ওপর পতিত হয়েছিল’ অর্থাৎ যাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার আযাব এসেছে তারা সে সময় হয় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা দিনের বেলা বিশ্রামরত অবস্থায় ছিল। যেমন-
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَفَاَمِنَ اَھْلُ الْقُرٰٓی اَنْ یَّاْتِیَھُمْ بَاْسُنَا بَیَاتًا وَّھُمْ نَا۬ئِمُوْنَ اَوَ اَمِنَ اَھْلُ الْقُرٰٓی اَنْ یَّاْتِیَھُمْ بَاْسُنَا ضُحًی وَّھُمْ یَلْعَبُوْنَ)
“জনপদবাসী কি নিরাপদ হয়ে গেছে যে, তাদের ওপর আমার শাস্তি আসবে রাতের বেলায় যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে? অথবা জনপদের অধিবাসীবৃন্দ কি ভয় রাখে না যে, আমার শাস্তি তাদের ওপর আসবে পূর্বাহ্নে যখন তারা থাকবে খেল তামাশায়?” (সূরা আ‘রাফ ৭: ৯৭-৯৮)
(فَمَا كَانَ دَعْوٰهُمْ)
‘তাদের কথা শুধু এটাই ছিল...’ অর্থাৎ যখনই তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসেছিল তখন তাদের একটাই কথা ছিল, হে আল্লাহ! আমরা জালিম। কিন্তু আযাব এসে যাওয়ার পর স্বীকারোক্তি কোন উপকারে আসেনি। সূরা আম্বিয়ার ১১-১৫ নং আয়াতে এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন।
অতএব নাবী-রাসূলদের অবাধ্য পূর্ববর্তী জাতির ওপর আপতিত শাস্তি থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। আমরাও যেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অবাধ্য না হই, তাঁর অনুসরণ বর্জন করে অন্য পথ না খুঁজি এবং তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন না করি। অন্যথায় আমাদের ওপরও তাদের মত শাস্তি আসতে পারে।
(فَلَنَسْئَلَنَّ الَّذِيْنَ أُرْسِلَ)
‘অতঃপর যাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করব’ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক উম্মাত ও রাসূলকেই জিজ্ঞাসা করা হবে। রাসূলরা কি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের ডাকে উম্মত থেকে কি সাড়া পেয়েছেন? আর উম্মতেরা কি নাবীদের দাওয়াত গ্রহণ করেছে এবং তাঁদের ডাকে কি সাড়া দিয়েছে?
রাসূলদের জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(يَوْمَ يَجْمَعُ اللّٰهُ الرُّسُلَ فَيَقُوْلُ مَاذَآ أُجِبْتُمْ)
“স্মরণ কর, যেদিন আল্লাহ রাসূলগণকে একত্র করবেন এবং জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে।”
(وَيَوْمَ يُنَادِيْهِمْ فَيَقُوْلُ مَاذَآ أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِيْنَ)
“আর সেদিন আল্লাহ এদেরকে ডেকে বলবেন, ‘তোমরা রাসূলগণকে কী জবাব দিয়েছিলে?” (সূরা কাসাস ২৮:৬৫)
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল আমলের বর্ণনা জানিয়ে দেবেন, কারণ মানুষ যখন কোন আমল করে আল্লাহ তা‘আলা তা প্রত্যক্ষ করেন, তিনি দেখেন না এমন নয়।
সুতরাং দীনের পথে চলতে এবং তার দিকে দাওয়াত দিতে কোন সংকোচ বোধ করা যাবে না। পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। অতএব আমরা সর্বদা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মেনে চলব, তাহলে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারব।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দাওয়াতের মূল সিলেবাস ছিল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ।
২. আল্লাহ তা‘আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তথা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ এর অনুসরণেই ইসলাম মেনে চলা ওয়াজিব।
৩. ইসলাম বিদ্বেষী ও অস্বীকারকারী পূর্ববর্তী উম্মাতের ধ্বংসের কারণ অবগত হলাম।
৪. মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা অথবা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে আযাব আসার পর তাওবাহ কবূল হবে না।
৫. প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪-৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ পাক বলেনঃ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের কারণে আমি কত লোকালয়কেই ধ্বংস করেছি! আর দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছি। যেমন তিনি বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তোমার পূর্বে রাসূলদেরকে উপহাস করা হয়েছিল, ফলে ঐ উপহাসের শাস্তি হিসেবে সেই উপহাসকারীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন আমি পাপের কারণে বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম তখন তাদের বড় বড় অট্টালিকা ও মজবুত ঘরবাড়ী ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়লো এবং তাদের প্রস্রবণ ও নদী-নালা তছনছ হয়ে গেল।” অন্য জায়গায় বলেনঃ “জীবিকার প্রাচুর্যের কারণে যখন তারা অহংকারে ফেটে পড়লো তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম, তাদের বাড়ীঘর এমন হয়ে গেল যে, যেন তারা তাতে কোন দিন বসবাসই করেনি, কিন্তু অল্প কয়েকজন বেঁচে গেল, এখন তাদের উত্তরাধিকারী একমাত্র আমিই।”
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমার শাস্তি তাদের উপর রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা ভরা দ্বিপ্রহরে যখন তারা বিশ্রামরত ছিল তখনই আপতিত হয়েছে। আর এ দু'টোই হচ্ছে উদাসীন থাকার সময়। যেমন তিনি অন্যত্র বলেনঃ “ঐ লোকদের কি এই ভয় নেই যে, আমার শাস্তি রাত্রিকালে ঘুমন্ত অবস্থায় অকস্মাৎ তাদেরকে ঘিরে ফেলে অথবা অতি প্রত্যুষে তাদের উপর এসে পড়ে যখন তারা অশ্লীল ও বাজে কাজে লিপ্ত থাকে? আর নিজেদের পাপরাশির মাধ্যমে চালবাজীকারীরা এটাকে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে তাদেরকে ভূ-গর্ভে ধ্বসিয়ে দিতে সক্ষম অথবা এমনভাবে তাদেরকে ভীষণ শাস্তি দ্বারা গ্রেফতার করতে পারেন যা তারা কল্পনা বা ধারণাও করতে পারবে না? কিংবা তাদের সফরে তাদেরকে পাকড়াও করবেন যা তারা প্রতিরোধ করতে পারবে না?” যেমন তিনি আরও বলেনঃ “যখন তাদের উপর শাস্তি এসেই পড়ে তখন ‘বাস্তবিকই আমরা অপরাধী ছিলাম’ একথা বলা ছাড়া তাদের আর কিছুই বলার থাকে না। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “যারা সীমালংঘন করেছিল এরূপ বহু গ্রামবাসীকে আমি সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছি।” উপরোক্ত আয়াতগুলো নবী (সঃ)-এর নিম্নের হাদীসের স্পষ্ট দলীলঃ “ কোন কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়নি যে পর্যন্ত না তাদের সমস্ত শাস্তি শেষ করে দেয়া হয়েছে।” আবদুল মালিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “এটা কিরূপ হবে?” তখন তিনি “আমার শাস্তি যখন তাদের কাছে এসেই পড়েছিল তখন তাদের মুখে-বাস্তবিকই আমরা অত্যাচারী ছিলাম এই কথা ছাড়া আর কিছুই ছিল না” এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন।
আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি তাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসবাদ করবো।” যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “রাসূলগণ যখন প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল তখন তোমরা তাদেরকে কি উত্তর দিয়েছিলে?” আরও এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “সেইদিন আল্লাহ রাসূলদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করবেনতোমাদের কওম তোমাদেরকে কি জবাব দিয়েছিল? তারা উত্তরে বলবে-আমাদের জানা নেই, আপনিই গায়েবের সংবাদ রাখেন। তখন আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঐ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-তোমরা রাসূলদেরকে কি জবাব দিয়েছিলে?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “আমি রাসূলদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল নেতা। তোমাদের সকলকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বাদশাহ্ তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, পুরুষ লোককে তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসিত হবে তার স্বামী সম্পর্কে এবং খাদেমকে জিজ্ঞেস করা হবে তার মনিবের মাল সম্পর্কে।”
মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দেবো, যেহেতু আমি পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি, আর আমি তো বে-খবর ছিলাম না।” কিয়ামতের দিন তাদের আমলনামা খুলে দেয়া হবে এবং তাদের আমল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই দেখতে রয়েছেন। তিনি তো গোপন দৃষ্টিপাত সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত। তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। যদি গাছের কোন পাতা পড়ে যায় বা অন্ধকারে কোন বীজ পড়ে থাকে তবে সেটাও তার দৃষ্টির অন্তরালে থাকে না। স্পষ্ট কিতাবের মধ্যে কী নেই? আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সবকিছুই তো লিপিবদ্ধ রয়েছে এতে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।