আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 64)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 64)



হরকত ছাড়া:

فكذبوه فأنجيناه والذين معه في الفلك وأغرقنا الذين كذبوا بآياتنا إنهم كانوا قوما عمين ﴿٦٤﴾




হরকত সহ:

فَکَذَّبُوْهُ فَاَنْجَیْنٰهُ وَ الَّذِیْنَ مَعَهٗ فِی الْفُلْکِ وَ اَغْرَقْنَا الَّذِیْنَ کَذَّبُوْا بِاٰیٰتِنَا ؕ اِنَّهُمْ کَانُوْا قَوْمًا عَمِیْنَ ﴿۶۴﴾




উচ্চারণ: ফাকাযযাবূহু ফাআনজাইনা-হু ওয়াল্লাযীনা মা‘আহূফিল ফুলকি ওয়া আগরাকনাল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা- ইন্নাহুম কা-নূকাওমান ‘আমীন।




আল বায়ান: অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলল। ফলে আমি তাকে ও তার সাথে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম; আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল তাদেরকে আমি ডুবিয়ে দিলাম। নিশ্চয় তারা ছিল অন্ধ কওম।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৪. অতঃপর তারা তার উপর মিথ্যারোপ করল। ফলে তাকে ও তার সাথে যারা নৌকায় ছিল আমরা তাদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করেছিল তাদেরকে ডুবিয়ে দেই। তারা তো ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: কিন্তু তারা তাকে (মিথ্যেবাদী মনে করে) অস্বীকার করল। অতঃপর আমি তাকে আর তার সঙ্গে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে বাঁচিয়ে দিলাম আর আমার আয়াতগুলোকে যারা অস্বীকার করেছিল তাদেরকে ডুবিয়ে মারলাম। তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।




আহসানুল বায়ান: (৬৪) অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। ফলে তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল, আমি তাদেরকে উদ্ধার করি। আর যারা আমার নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদেরকে (তুফানে) নিমজ্জিত করি। নিশ্চয় তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়। [1]



মুজিবুর রহমান: কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করল, ফলে তাকে এবং তার সাথে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে (আযাব হতে) রক্ষা করলাম, আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অমান্য করেছিল, তাদেরকে ডুবিয়ে মারলাম। বস্তুতঃ নিঃসন্দেহে তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।



ফযলুর রহমান: অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। পরে আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল তাদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা আমার নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করেছিল তাদেরকে ডুবিয়ে দেই। আসলে ওরা ছিল কতগুলো অন্ধ (সত্যদর্শনে অক্ষম) লোক।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। আমি তাকে এবং নৌকাস্থিত লোকদেরকে উদ্ধার করলাম এবং যারা মিথ্যারোপ করত, তাদেরকে ডুবিয়ে দিলাম। নিশ্চয় তারা ছিল অন্ধ।



জহুরুল হক: কিন্তু তারা তাঁকে মিথ্যারোপ করলো, তাই তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে যারা ছিল তাদের আমরা উদ্ধার করেছিলাম জাহাজে, আর ডুবিয়ে দিয়েছিলাম তাদের যারা আমাদের নির্দেশসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল। নিঃসন্দেহ তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।



Sahih International: But they denied him, so We saved him and those who were with him in the ship. And We drowned those who denied Our signs. Indeed, they were a blind people.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬৪. অতঃপর তারা তার উপর মিথ্যারোপ করল। ফলে তাকে ও তার সাথে যারা নৌকায় ছিল আমরা তাদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করেছিল তাদেরকে ডুবিয়ে দেই। তারা তো ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।(১)


তাফসীর:

(১) আলোচ্য আয়াতসমূহে নূহ আলাইহিস সালামের উম্মতের অবস্থা ও তাদের সংলাপের বিবরণ রয়েছে। আদম 'আলাইহিস সালাম যদিও সর্বপ্রথম নবী, কিন্তু তার আমলে ঈমানের সাথে কুফর ও গোমরাহীর দ্বন্দ ছিল না। কুফর ও কাফেরদের কোথাও অস্তিত্ব ছিল না। কুফর ও শির্কের সাথে ঈমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নূহ আলাইহিস্ সালামের আমল থেকেই শুরু হয়। রিসালাত ও শরীআতের দিক দিয়ে তিনিই জগতের প্রথম রাসূল। এছাড়া তুফানে সমগ্র বিশ্ব নিমজ্জিত হওয়ার পর যারা প্রাণে বেঁচে ছিল, তারা ছিল নূহ আলাইহিস সালাম ও তার নৌকাস্থিত সঙ্গী-সাথী৷ তাদের দ্বারাই পৃথিবী নতুনভাবে আবাদ হয়। এই কাহিনীতে সাড়ে নয়শ বছরের সুদীর্ঘ আয়ুষ্কাল, তার নবীসুলভ চেষ্টা-চরিত্র, অধিকাংশ উম্মতের বিরুদ্ধাচরণ এবং এর পরিণতিতে গুটিকতক ঈমানদার ছাড়া অবশিষ্ট সবার প্লাবনে নিমজ্জিত হওয়ার বিষয় বর্ণিত হয়েছে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, আদম 'আলাইহিস সালাম ও নূহ আলাইহিস সালামের মাঝখানে দশ ‘করণ’ বা প্রজন্ম অতিক্রান্ত হয়েছে। [মুস্তাদরাক হাকেমঃ ২/৫৪৬]

কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তার বয়স হয়েছিল নয়শ পঞ্চাশ বছর। [সূরা আল-আনকাবুতঃ ১৪] কেউ কেউ বলেনঃ তিনি এক হাজার বছরই আয়ু পেয়েছিলেন তন্মধ্যে নয়শ’ পঞ্চাশ বছর প্লাবনের পূর্বে আর পঞ্চাশ বছর প্লাবনের পরে। উপরোক্ত আয়াতেও এ ব্যাপারে ইঙ্গিত রয়েছে। নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় ইরাকে বসবাসকারী ছিল এবং শির্কে লিপ্ত ছিল। তাদের শির্ক সম্পর্কে সুস্পষ্ট কথা এই যে, তারাই যমীনের বুকে সর্বপ্রথম শির্ক করেছিল। হাদীসে এসেছে যে, তাদের সম্প্রদায়ের পাঁচজন মহাব্যক্তিত্ব যাদের নাম যথাক্ৰমে- উদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর; তারা অত্যন্ত নেককার লোক ছিলেন। হঠাৎ করেই তারা মারা যান।

এতে করে তাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ে। তখন শয়তান এসে তাদেরকে বলেঃ আমি কি তোমাদেরকে তাদের কিছু ছবি বানিয়ে দেব না, যাতে তোমরা তাদেরকে দেখে দেখে বেশী ইবাদাত করতে পার? তারা অনুমতি দিলে শয়তান কিছু ছবি বানিয়ে তাদের ইবাদাতখানার পিছনে টাঙিয়ে রাখে। পরবর্তী প্রজন্ম সেগুলোকে ইবাদাতখানার সম্মুখভাগে নিয়ে আসে এবং সেগুলোকে মূর্তির আকৃতি দান করে। তখনো তাদের ইবাদাত শুরু হয়নি। এ প্রজন্ম মারা যাওয়ার পরে পরবর্তী প্রজন্ম কি উদ্দেশ্যে এ মূর্তিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল তা ভুলে গেলে শয়তান তাদের কাছে এসে বললঃ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এগুলোর ইবাদাত করত এবং এগুলোর উসিলায় আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করত। শেষপর্যন্ত তারা এগুলোর ইবাদাত শুরু করে। [বুখারীঃ ৪৯২০] আর এখান থেকেই পৃথিবীতে মূর্তিপূজার উদ্ভব হয়েছে।

আল্লাহ্ তা'আলা সূরা নূহে তার বিস্তারিত আলোচনা করে কিভাবে নূহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। এখানে আল্লাহ্ তা'আলা নূহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের কিছু অংশ উল্লেখ করেছেন। তিনি তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে একথা বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য একটি মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করি।” এখানে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতের দাওয়াত রয়েছে। এটাই সব নীতির মূলনীতি। তারপর শির্ক ও কুফর থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এটি এ সম্প্রদায়ের মধ্যে মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। অতঃপর ঐ মহাশাস্তির আশংকা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে, যা বিরুদ্ধাচরণের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এর অর্থ আখেরাতের মহাশাস্তিও হতে পারে এবং দুনিয়ার প্লাবনের শাস্তিও হতে পারে। তার সম্প্রদায়ের ملأ বা নেতা গোছের লোকেরা উত্তরে বললঃ আমরা মনে করি যে, তুমি প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে রয়েছ। কারণ, তুমি আমাদেরকে বাপ-দাদার দ্বীন পরিত্যাগ করতে বলছ। কেয়ামতে পুনরায় জীবিত হওয়া, প্রতিদান ও শাস্তি ইত্যাদি কুসংস্কার বৈ আর কিছু নয়।

এহেন পীড়াদায়ক ও মর্মম্ভদ কথাবার্তার জবাবে নূহ আলাইহিস সালাম নবীসুলভ ভাষায় যা বললেন, তা প্রচারক ও সংস্কারকদের জন্য একটি উজ্জ্বল শিক্ষা ও হেদায়াত। উত্তেজনার স্থলে উত্তেজিত ও ক্রোধাম্বিত হওয়ার পরিবর্তে তিনি সাদাসিধা ভাষায় তাদের সন্দেহ নিরসনে প্রবৃত্ত হলেন। বললেনঃ হে আমার সম্প্রদায়, আমার মধ্যে কোন ভ্রষ্টতা নেই। তবে আমি তোমাদের ন্যায় পৈতৃক দ্বীনের অনুসারী নই; বরং বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে রাসূল। আমি যা কিছু বলি, পালনকর্তার নির্দেশেই বলি এবং আল্লাহ তা'আলার বাণীসমূহ তোমাদের কাছে পৌছাই। এতে তোমাদের মঙ্গল। এতে না আল্লাহর কোন লাভ আছে এবং না আমার কোন স্বাৰ্থ আছে। এরপর তারা যেহেতু নূহ আলাইহিস সালামকে তাদের মত মানুষ হওয়ার কারণে রাসূল হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করছিল, সেহেতু তিনি তার জবাবে বলেনঃ তোমরা কি এর ফলে বিস্মিত যে, তোমাদের পালনকর্তার বাণী তোমাদেরই মধ্য থেকে একজনের মাধ্যমে তোমাদের কাছে এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও এবং রহমত লাভে ধন্য হও? অর্থাৎ তার ভয় প্রদর্শনের ফলে তোমরা হুশিয়ার হয়ে বিরুদ্ধাচরণ ত্যাগ কর যাতে করে তোমাদের প্রতি রহমত নাযিল হয়।

স্বজাতির মর্মম্ভদ কথাবার্তার জবাবে নূহ আলাইহিস সালামের দয়ার্দ্র এবং শুভেচ্ছামূলক আচরণও চেতনাহীন জাতির মধ্যে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারল না। তারা অন্ধভাবেই মিথ্যারোপ করে যেতে থাকল। তখন আল্লাহ্ তাআলা তাদের প্রতি প্লাবনের শাস্তি প্রেরণ করলেন। আল্লাহ বলেনঃ এর পরিণতিতে আমরা নূহ ও তার সঙ্গীদেরকে নৌকায় উঠিয়ে মুক্তি দিয়েছি এবং যারা আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলেছিল, তাদেরকে নিমজ্জিত করে দিয়েছি। নিশ্চয়ই তারা ছিল অন্ধ।

মোটকথা, এখানে নূহ আলাইহিস সালামের সংক্ষিপ্ত কাহিনী বর্ণনা করে কয়েকটি বিষয় ব্যক্ত করা হয়েছে- (এক) পূর্বতন সমস্ত নবী-রাসূলের দাওয়াত ও বিশ্বাসের মূলনীতি ছিল অভিন্ন। (দুই) আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদেরকে কঠিন বিপদেও রক্ষা করেন। (তিন) রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করা আল্লাহর আযাব ডেকে আনারই নামান্তর। পূর্ববর্তী উম্মতরা যেমন নবীগণের প্রতি মিথ্যারোপ করার কারণে আযাবে গ্রেফতার হয়েছে, এ কালের লোকদেরও এ থেকে ভয়মুক্ত হওয়া উচিত নয়।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬৪) অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। ফলে তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল, আমি তাদেরকে উদ্ধার করি। আর যারা আমার নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদেরকে (তুফানে) নিমজ্জিত করি। নিশ্চয় তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়। [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, সত্য থেকে। তারা সত্য দেখল না এবং তা গ্রহণ করতে প্রস্তুতও হল না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৯-৬৪ নং আয়াতের তাফসীর:



এ সূরার ৫৯ নং আয়াত থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত নাবীগণ দ্বীন প্রচারে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন তাদেরই কয়েকজনের আলোচনা নিয়ে আসা হয়েছে। এ সব আয়াত নাবীদের দাওয়াতী মূল মিশন, নিজ সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা এবং সর্বশেষে তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা প্রেরিত শাস্তির কথা আলোচনা করা হয়েছে।



প্রথমেই আলোচনা করেছেন নূহ (আঃ)-এর কথা। তিনি উলূল আযম রাসূলগণের অন্যতম একজন। তিনি পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম রাসূল যাকে আদম (আঃ)-এর পর নতুন রিসালাত দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল।



নূহ (আঃ) ও আদম (আঃ)-এর মাঝে সময়ের ব্যবধান দশ শতাব্দিকাল। এর মধ্যবর্তী সময়ের প্রত্যেকেই ইসলামের ওপর ছিলেন।



ইবনু আব্বাস (রাঃ)-সহ অনেক মুফাসসির বলেন: প্রতিমা পূজার সূচনা এভাবে হয়েছিল যে, সৎ ও পূণ্যবান লোকগণ যখন মারা গেলেন তখন তাদের অনুসারীরা তাদের কবরের ওপর মাসজিদ নির্মাণ করে এবং তাদের ছবি তৈরি করে মাসজিদে রেখে দেয় যাতে ঐগুলো দেখে তাদের অবস্থা ও ইবাদতকে স্মরণ করতে পারে। আর এর ফলে যেন নিজেদেরকে তাদের মত গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। যখন কয়েক যুগ অতীত হয়ে গেল। তখন ঐ ছবিগুলোর পরিবর্তে তাদের মূর্তি তৈরি করা হল। কিছু দিন অতীত হবার পর ঐগুলোর ইবাদত করতে লাগল এবং সৎ ব্যক্তিদের নামে নামকরণ করতে লাগল। যেমন ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাসর ইত্যাদি।



এভাবে যখন মূর্তিপূজা বেড়ে গেল তখন তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে নূহ (আঃ)-কে আল্লাহ তা‘আলা প্রেরণ করলেন। নূহ (আঃ) দাওয়াত দিলেন এভাবে:



(يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللّٰهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلٰهٍ غَيْرُه۫)



‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ‘ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন সত্যিকার ইলাহ নেই।’ (সূরা আ‘রাফ ৭:৫৯)



এ তাওহীদের দাওয়াত সকল নাবীই দিয়েছেন। যখন তাঁরা এ দাওয়াত দিতেন তখন লোকেরা তাদেরকে পাগল, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি বলতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِذَا رَأَوْهُمْ قَالُوآ إِنَّ هٰؤُلَا۬ءِ لَضَا۬لُّوْنَ)



“এবং যখন তাদেরকে দেখতো তখন বলত: নিশ্চয়ই এরা পথভ্রষ্ট।” (সূরা মুতাফফিফীন ৮৩:৩২)



(عَلٰي رَجُلٍ مِّنْكُمْ)



‘তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের মধ্য থেকে একজন পুরুষকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এ বিষয়ে আশ্চর্য হওয়াকে তিনি নিন্দার সাথে উল্লেখ করেছেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: এরূপ সব উম্মাতেরাই আশ্চর্য হয়েছে যে, আমি তাদের মধ্য হতেই একজন পুরুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَآ إِلٰي رَجُلٍ مِّنْهُمْ أَنْ أَنْذِرِ النَّاسَ)



“মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদেরই একজনের নিকট ওয়াহী প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর‎।” (সূরা ইউনুস ১০:২)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُّؤْمِنُوْا إِذْ جَا۬ءَهُمُ الْهُدٰي إِلَّآ أَنْ قَالُوْآ أَبَعَثَ اللّٰهُ بَشَرًا رَّسُوْلًا)



‘যখন তাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকেদেরকে ঈমান আনা হতে বিরত রাখে তাদের এ উক্তি, ‘আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?’ (সূরা ইসরা ১৭:৯৪)



অর্থাৎ আমাদের নাবীসহ সকল নাবীই মানুষ ছিলেন তারা কোন ফেরেশতা নন, নূরেরও তৈরি নন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَآ اَرْسَلْنَا قَبْلَکَ مِنَ الْمُرْسَلِیْنَ اِلَّآ اِنَّھُمْ لَیَاْکُلُوْنَ الطَّعَامَ وَیَمْشُوْنَ فِی الْاَسْوَاقِﺚ وَجَعَلْنَا بَعْضَکُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةًﺚ اَتَصْبِرُوْنَﺆ وَکَانَ رَبُّکَ بَصِیْرًا)



“তোমার পূর্বে আমি যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছি তারা সকলেই তো আহার করত ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করত। হে মানুষ! আমি তোমাদের পরস্পরকে পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে কি? আর তোমার প্রতিপালক সমস্ত‎ কিছু দেখেন।” (সূরা ফুরকান ২৫:২০)



নূহ (আঃ) ৯৫০ বছর দাওয়াতী কাজ করার পর যখন অধিকাংশ লোকেরাই তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল তখন আল্লাহ তা‘আলা নূহ (আঃ)-এর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাদের ব্যতীত সবাইকে ডুবিয়ে ধ্বংস করে দিলেন। এ সম্পর্কে আলোচনা আরো সামনের সূরাগুলোতে আসবে ইনশা আল্লাহ।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নাবীদের দাওয়াতী মূলমন্ত্র তাওহীদ।

২. মূর্তিপূজার সূচনা হয় নূহ (আঃ)-এর যুগ থেকে।

৩. সকল নাবীগণই ছিলেন স্বীয় সম্প্রদায় থেকে প্রেরিত একজন পুরুষ। কেউ-ই নূরের তৈরি ফেরেশতা নন।

৪. নাবীদের অবাধ্যতার পরিণতি ভয়াবহ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৬৩-৬৪ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা এতে ব্ৰিত কেন হচ্ছ যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরই একজন লোকের উপর অহী প্রেরণ করেছেন। এটা তো তোমাদের উপর দয়া ও অনুগ্রহ। সে তোমাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাচ্ছে, যেন তোমরা তার শাস্তি থেকে ভয় কর এবং শিরক থেকে বিরত থাক। এর ফলে হয়তো তোমাদের উপর দয়া প্রদর্শন করা হবে। কিন্তু হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো এবং তার বিরোধিতা করতে শুরু করে দিলো। তাদের অতি অল্প সংখ্যক লোকই ঈমান আনয়ন করলো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “সুতরাং আমি তাকে এবং তার সাথে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে (আমার শাস্তি হতে) রক্ষা করলাম, আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অমান্য করেছিল, তাদেরকে ডুবিয়ে মারলাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়া হয় এবং জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়, এখন তারা আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকেও সাহায্যকারী পায়নি।

আল্লাহ পাক বলেনঃ এরা অন্ধ ছিল। সত্যকে তারা দেখতেই পাচ্ছিল না। আল্লাহর বন্ধুদের সাথে শত্রুতা পোষণকারীরা কেমন শাস্তি পেলো, এই ঘটনায় আল্লাহ এর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এটাও দেখিয়েছেন যে, রাসূল ও মুমিনগণ মুক্তি পেয়ে গেল। যেমন তিনি বলেনঃ আমি অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে সাহায্য করবো। বিজয় ও সফলতা সৎ লোকেরাই লাভ করবে, দুনিয়াতে এবং আখিরাতেও। যেমন তিনি নূহ (আঃ)-এর কওমকে ডুবিয়ে দিয়ে ধ্বংস করলেন এবং নূহ (আঃ) ও তার সঙ্গীদেরকে মুক্তি দিলেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেনঃ “নূহ (আঃ)-এর কওম এত বেশী ছিল যে, শহর ও জঙ্গল ভরে গিয়েছিল। যমীনের প্রতিটি অংশের উপর তাদের দখল ছিল। ইবনে অহাব (রঃ) বলেনঃ “ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আমার কাছে সংবাদ পৌছেছে যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে যারা নৌকায় আশ্রয় নিয়ে মুক্তি পেয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল আশিজন। তাদের মধ্যে জুরহুম’ নামক একজন লোক ছিলেন যার ভাষা ছিল আরবী।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।