সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 31)
হরকত ছাড়া:
يا بني آدم خذوا زينتكم عند كل مسجد وكلوا واشربوا ولا تسرفوا إنه لا يحب المسرفين ﴿٣١﴾
হরকত সহ:
یٰبَنِیْۤ اٰدَمَ خُذُوْا زِیْنَتَکُمْ عِنْدَ کُلِّ مَسْجِدٍ وَّ کُلُوْا وَ اشْرَبُوْا وَ لَا تُسْرِفُوْا ۚ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الْمُسْرِفِیْنَ ﴿۳۱﴾
উচ্চারণ: ইয়া-বানীআ-দামা-খুযূযীনাতাকুম ‘ইনদা কুল্লি মাছজিদিওঁ ওয়া কুলূওয়াশরাবূওয়ালাতুছরিফূ ইন্নাহূলা-ইউহিব্বুল মুছরিফীন।
আল বায়ান: হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. হে বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহন কর।(১) আর খাও এবং পান কর কিন্তু অপচয় কর না।(২) নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
আহসানুল বায়ান: (৩১) হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর।[1] পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। [2]
মুজিবুর রহমান: হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ কর, আর খাও এবং পান কর। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবেনা, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালবাসেননা।
ফযলুর রহমান: হে আদমসন্তানেরা! প্রত্যেক সেজদার (নামাযের ও তওয়াফের) সময় সাজগোছ করে নিও আর পানাহার করো; তবে অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীদের ভালবাসেন না।
মুহিউদ্দিন খান: হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।
জহুরুল হক: হে আদম-সন্তানরা! তোমাদের বেশভূষা গ্রহণ করো প্রত্যেক সিজদাস্থলে, আর খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না, নিঃসন্দেহ তিনি অমিতব্যয়ীদের ভালোবাসেন না।
Sahih International: O children of Adam, take your adornment at every masjid, and eat and drink, but be not excessive. Indeed, He likes not those who commit excess.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩১. হে বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহন কর।(১) আর খাও এবং পান কর কিন্তু অপচয় কর না।(২) নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
তাফসীর:
(১) আয়াতে পোষাককে ‘যীনাত’ বা ‘সাজ-সজ্জা’ শব্দের মাধ্যমে এ জন্যই ব্যক্ত করা হয়েছে যে, সালাতে শধু গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করা ছাড়াও সামথ্য অনুযায়ী সাজ-সজ্জার পোষাক পরিধান করা শ্ৰেয়। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু সালাতের সময় উত্তম পোষাক পরিধানে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি বলতেনঃ 'আল্লাহ্ তা'আলা সৌন্দর্য পছন্দ করেন, তাই আমি প্রতিপালকের সামনে সুন্দর পোষাক পরে হাজির হই’। যে গুপ্ত-অঙ্গ সর্বাবস্থায় বিশেষতঃ সালাত ও তাওয়াফে আবৃত করা ফরয, তার সীমা কি? কুরআনুল কারীম সংক্ষেপে গুপ্ত-অঙ্গ আবৃত করার নির্দেশ দিয়ে এর বিবরণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন যে, পুরুষের গুপ্তাঙ্গ নাভী থেকে হাটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের গুপ্তাঙ্গ মুখমন্ডল, হাতের তালু এবং পদযুগল ছাড়া সমস্ত দেহ।
হাদীসসমূহে এসব বিবরণ বর্ণিত রয়েছে। এ হচ্ছে গুপ্ত অঙ্গের ফরয সম্পর্কিত বিধান। এটি ছাড়া সালাতই হয় না। সালাতে শুধু গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করাই কাম্য নয়; বরং সাজ-সজ্জার পোষাক পরিধান করতেও বলা হয়েছে। যেমন সাদা পোষাক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের পোষাকাদির মধ্যে সাদা পোষাক পরিধান কর। কেননা, পোষাকাদির মধ্যে তাই উত্তম পোষাক। আর এতে তোমাদের মৃতদেরকে কাফনও দাও। [আবু দাউদঃ ৩৮৭৮, তিরমিযীঃ ৯৯৪, ইবন মাজাহঃ ১৪৭২]
অনেকে সাজসজ্জার পোষাক পরাকে অহংকারী পোষাক মনে করে থাকে এটা আসলে ঠিক নয়। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার অন্তরে অনু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক লোক বললঃ কোন লোক পছন্দ করে তার পোষাক উত্তম হোক, তার জুতা সুন্দর হোক। রাসূল বললেনঃ অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর, সুন্দরকে ভালবাসেন। অহংকার হল, হককে না মানা, মানুষকে অবজ্ঞা করা। [মুসলিমঃ ১৪৭] আবার অহংকার হয় এমন পোষাকও পরা যাবে না যদিও তাতে কারো কারো নিকট বাহ্যিক সুন্দর রয়েছে। যেমনঃ টাখনুর নীচে কাপড় পরা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে অহংকার বশে কাপড় টাখনুর নীচে ছেড়ে দিবে আল্লাহ তার দিকে তাকবেন না। [বুখারীঃ ৫৭৮৩]
আয়াতের শানে নুযুল হিসেবে এসেছে যে, আরবের মুশরিকরা জাহেলিয়াতে মসজিদে হারামে কাবার তাওয়াফ করার সময় উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। এ ব্যাপারে তাদের দর্শন ছিল, যে কাপড় পরে গুণাহ করেছি তা দিয়ে তাওয়াফ করা যাবে না। বিশেষতঃ কুরাইশরা এ বিধিবিধানের প্রবর্তন করে। তারাই শুধু তাওয়াফের জন্য কাপড় দিতে পারবে। এতে করে তারা কিছু বাড়তি সুবিধা আদায় করতে পারত। এমনকি মহিলারাও উলঙ্গ তাওয়াফ করত। শয়তান তাদেরকে এভাবে ইবাদাত করতে উদ্বুদ্ধ করত এবং এ কাজকে তাদের মনে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দিত। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ মহিলা উলঙ্গ অবস্থায় কা'বার তাওয়াফ করত আর বলত, কে আমাকে তাওয়াফের কাপড় ধার দেবে? যা তার লজ্জাস্থানে রাখবে। আরও বলতঃ আজ হয় কিছু অংশ প্রকাশ হয়ে পড়বে নয়ত পুরোটাই। আর যা আজ প্রকাশিত হবে তা আর হালাল করব না। তখন এ আয়াত নাযিল হয়- “তোমরা তোমাদের মাসজিদ তথা ইবাদাতের স্থানে সুন্দর পোষাক পরবে।” [মুসলিমঃ ৩০২৮]
(২) এ আয়াত থেকে একটি মাসআলা এরূপ বুঝা যায় যে, জগতে পানাহারের যত বস্তু রয়েছে সেগুলো সব হালাল ও বৈধ ৷ যতক্ষণ পর্যন্ত কোন বিশেষ বস্তুর অবৈধতা ও নিষিদ্ধতা শরীআতের কোন দলীল দ্বারা প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ প্রত্যেক বস্তুকে হালাল ও বৈধ মনে করা হবে। আয়াতে وَلَا تُسْرِفُوا বলে পানাহারের অনুমতি বরং নির্দেশ থাকার সাথে সাথে অপব্যয় করার নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। আয়াতে ব্যবহৃত إسراف শব্দের অর্থ সীমালংঘন করা। সীমালংঘন কয়েক প্রকারের হতে পারে। (এক) হালালকে অতিক্রম করে হারাম পর্যন্ত পৌছা এবং হারাম বস্তু পানাহার করতে থাকা। এ সীমালংঘন যে হারাম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। (দুই) আল্লাহর হালালকৃত বস্তুসমূহকে শরীআত সম্মত কারণ ছাড়াই হারাম মনে করে বর্জন করা। হারাম বস্তু ব্যবহার করা যেমন অপরাধ ও গোনাহ, তেমনি হালালকে হারাম মনে করাও আল্লাহর আইনের বিরোধিতা ও কঠোর গোনাহ। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কম খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়া, ফলে ফরয কর্ম সম্পাদনের শক্তি না থাকা- এটাও সীমালংঘনের মধ্যে গণ্য। উল্লেখিত উভয় প্রকার অপব্যয় নিষিদ্ধ করার জন্য কুরআনুল কারীমের এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ “অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” [সূরা আল-ইসরাঃ ২৭]
অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন, যারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করে- প্রয়োজনের চাইতে বেশী ব্যয় করে না এবং কমও করে না।” [সূরা আল-ফুরকানঃ ৬৭] এ আয়াতে পানাহার সম্পর্কে যে মধ্যবর্তিতার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে, তা শুধু পানাহারের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিধান ও বসবাসের প্রত্যেক কাজেই মধ্য পন্থা পছন্দনীয় ও কাম্য।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “সীমালংঘন ও অহংকার না করে খাও, দান কর এবং পরিধান কর।” [নাসাঈঃ ৫/৭৯, ইবন মাজাহঃ ৩৬০৫] অনুরূপভাবে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ যা ইচ্ছা পানাহার কর এবং যা ইচ্ছা পরিধান কর, তবে শুধু দুটি বিষয় থেকে বেঁচে থাক। (এক) তাতে অপব্যয় অর্থাৎ প্রয়োজনের চাইতে বেশী না হওয়া চাই এবং (দুই) গর্ব ও অহংকার না থাকা চাই। [বুখারী] অন্যত্র এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও বর্ণিত হয়েছে। [নাসায়ী: ২৫৫৯] তবে এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি স্বাভাবিক সীমা দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ আদম সন্তান যে সমস্ত ভাণ্ডার পূর্ণ করে, তন্মধ্যে পেট হল সবচেয়ে খারাপ। আদম সন্তানের জন্য স্বল্প কিছু লোকমাই যথেষ্ট, যা দিয়ে সে তার পিঠ সোজা রাখতে পারে। এর বেশী করতে চাইলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ নিঃশ্বাসের জন্য নির্দিষ্ট করে। [তিরমিযীঃ ২৩৮০, ইবন মাজাহঃ ৩৩৪৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৪/১৩২]
(وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا) আয়াত থেকে বেশ কয়েকটি মাসআলা জানা যায়। (এক) যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু পানাহার করা ফরয। (দুই) শরীআতের কোন দলীল দ্বারা কোন বস্তুর অবৈধতা প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত সব বস্তুই হালাল। (তিন) আল্লাহ্ তা'আলা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তুসমূহকে ব্যবহার করা অপব্যয় ও অবৈধ ৷ (চার) যেসব বস্তু আল্লাহ্ তাআলা হালাল করেছেন, সেগুলোকে হারাম মনে করাও অপব্যয় এবং মহাপাপ। (পাঁচ) পেট ভরে খাওয়ার পরও আহার করা সমীচীন নয়। (ছয়) এতটুকু কম খাওয়াও অবৈধ, যদ্দরুন দুর্বল হয়ে ফরয কর্ম সম্পাদন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। [দেখুন, কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩১) হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর।[1] পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। [2]
তাফসীর:
(1) আয়াতে (زِينَة) (সৌন্দর্য) বলতে পোশাক বুঝানো হয়েছে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণও হল মুশরিকদের উলঙ্গ তাওয়াফ করা। তাই তাদেরকে বলা হল, পোশাক পরে আল্লাহর ইবাদত ও তাওয়াফ কর।
(2) (إِسْرَافٌ) (অপচয় করা) প্রত্যেক জিনিসেই এমন কি পানাহারেও অপছন্দনীয়। একটি হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, “যা ইচ্ছা খাও, যা ইচ্ছা পরিধান কর। তবে দুটি জিনিস থেকে অবশ্যই বেঁচে থাক। অপচয় ও অহংকার থেকে।” (বুখারী, লিবাস অধ্যায়) কোন কোন সালাফের উক্তি হল, মহান আল্লাহ (وَّ کُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا وَ لَا تُسۡرِفُوۡا) (পানাহার কর এবং অপচয় করো না) এই অর্ধেক আয়াতে সমস্ত চিকিৎসাবিদ্যাকে একত্রিত করে দিয়েছেন। (ইবনে কাসীর) কেউ কেউ বলেছেন, (زِينَة) হল এমন পোশাক, যা সৌন্দর্যের জন্য পরা হয়। তাঁদের এই উক্তি অনুযায়ী নামাযে ও তাওয়াফে সাজ-সজ্জা করার নির্দেশও পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে এই আয়াত দ্বারা নামাযে লজ্জাস্থান ঢাকা ওয়াজেব হওয়ার কথাও প্রমাণ করা হয়েছে। বরং হাদীসসমূহের আলোকে লজ্জাস্থান (পুরুষের নাভি থেকে নিয়ে হাঁটু পর্যন্ত অংশকে) ঢাকা প্রত্যেক অবস্থায় জরুরী। এমন কি মানুষ নির্জনে একাকী থাকলেও। (ফাতহুল কাদীর) জুমআহ এবং ঈদের দিনে সুগন্ধি ব্যবহার করাও মুস্তাহাব। কেননা, এটাও (زِينَة) তথা সাজ-সজ্জারই অংশ। (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩১ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: জাহিলী যুগে জনৈক মহিলা উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করছিল আর বলছিল: কে আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করতে সহযোগিতা করবে? তার লজ্জাস্থানে মাত্র এক টুকরা কাপড় রেখে বলছিল:
الْيَوْمَ يَبْدُو بَعْضُهُ أَوْ كُلُّهُ فَمَا بَدَا مِنْهُ فَلاَ أُحِلُّهُ
আজ কিছু বা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হবে, যা কিছু প্রকাশ পাবে তা ঢাকব না, তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (সহীহ মুসলিম হা: ৩০২৬)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে: জাহিলী যুগের মহিলারা উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত, তবে হুমস ব্যতীত। হুমস হল কুরাইশ ও তাদের সন্তানাদি। এরা উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত না, বরং তাদের পুরুষেরা তাওয়াফ করতে আগত পুরুষদের জন্য কাপড় দিত, আর মহিলারা আগত মহিলাদের কাপড় দিত। হুমস- তারা মুযদালেফায় যেত না, সব মানুষ আ‘রাফাতে অবস্থান করত। (সহীহ মুসলিম হা: ১২১৯)
আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের মনগড়া বিধানের প্রতিবাদ করে মানব জাতির জন্য বিধান দিলেন যেন প্রত্যেকে সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ তথা ভাল পোশাক পরিধান করে। বিশেষ করে জুমু‘আর দিন ও ঈদের দিন। সুগন্ধি ব্যবহার সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। আর মিসওয়াক করা তার পরিপূর্ণতা। সর্বোত্তম পোশাক হল সাদা পোশাক। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: তোমরা সাদা পোশাক পরিধান কর, কেননা পোশাকের মাঝে সাদা পোশাক উত্তম এবং এর দ্বারা মৃতদের কাফন দাও। (আবূ দাঊদ হা: ৪০৬১, তিরমিযী হা: ৯৯৪, সহীহ)
مَسْجِدٍ মাসজিদ বলতে সালাতের সময়কে বুঝানো হয়েছে।
(وكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا)
‘খাও এবং পান কর’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: যত ইচ্ছা খাও এবং যত ইচ্ছা পরিধান কর। তবে অপচয় ও অহংকার করলে তুমি ভুল করবে। (সহীহ বুখারী, পোশাক অধ্যায়)
অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা খাওয়া ও পান করা হালাল করেছেন যদি তাতে অপচয় ও অহংকার না হয়। (তাবারী ১২/৩৯৪, হা: ১৪৫২৯)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: তোমরা খাও, পান কর এবং দান কর, তবে অহংকার করে নয় ও অপচয় করে নয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা নেয়ামতের ব্যবহার বান্দার কাছ থেকে দেখতে চান। (ইবনু মাযাহ হা: ৩৬০৫, হাসান) সুতরাং অপচয় সকল ক্ষেত্রে অপছন্দনীয়, এ জন্যই বলা হয়েছে; “অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই” (সূরা ইসরা ১৭:২৭)। অপচয় দু’ভাবে হতে পারে; নষ্ট করার মাধ্যমে এবং অতিরিক্ত ব্যয় করার মাধ্যমে। তাই এ থেকে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সালাতের জন্য সাধ্যপক্ষে ভাল পোশাক পরিধান করা কর্তব্য। সেই সাথে সুগন্ধি ব্যবহার ও মিসওয়াক করা মুস্তাহাব।
২. অপচয় করা হারাম। এ থেকে আমাদের অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এই আয়াতে মুশরিকদের কাজের প্রতিবাদ করা হচ্ছে যে, তারা উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতো। এটাকেই শরীয়তের বিধান বলে বিশ্বাস করতো। দিনে পুরুষ লোকেরা এবং রাত্রে স্ত্রীলোকেরা কাপড় খুলে ফেলে তাওয়াফ করতো। তাই আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন- তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় (যার মধ্যে বায়তুল্লাহর তাওয়াফের ইবাদতও রয়েছে) শরীরকে উলঙ্গ অবস্থা থেকে রক্ষা কর এবং গুপ্তাঙ্গকে আবৃত করে ফেল। তাছাড়া নিজেদেরকে সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত কর। পূর্ববর্তী মনীষীগণ এটাই লিখেছেন যে, এ আয়াতটি মুশরিকদের উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে মারফরূপে বর্ণিত আছে যে, এটা নামাযের সময় জুতা পরিধান করা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই হাদীসে বলা হয়েছে যে, নামাযের সময় সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত হওয়া মুসতাহাব, বিশেষ করে জুমআ’ ও ঈদের দিন সুগন্ধি ব্যবহার করাও উত্তম। কেননা, এটাও সৌন্দর্যেরই অন্তর্ভুক্ত।
সবচেয়ে উত্তম পোশাক হচ্ছে সাদা পোশাক। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা সাদা পোশাক পরিধান কর, কেননা, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম পোশাক। নিজেদের মৃতদেরকেও এই কাপড়ের কাফন পরাও। তোমরা চোখে সুরমা ব্যবহার কর। কেননা, এটা দৃষ্টিশক্তিকে তীক্ষ করে এবং ভ্র গজিয়ে থাকে।” এ হাদীসটির ইসনাদ খুবই উত্তম। তামীম দারী (রঃ) এক হাজার দিরহামের বিনিময়ে একটি চাদর ক্রয় করেছিলেন এবং ওটা পরিধান করে নামায পড়তেন।
আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ“তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপব্যয় ও অমিতাচার করো না'। এ আয়াতে সুরুচি সম্পন্ন ও পবিত্র সমুদয় জিনিসই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা যা ইচ্ছা খাও এবং যা ইচ্ছা পান কর, তোমাদের উপর কোনই দোষারোপ করা হবে না। কিন্তু দু'টি জিনিস নিন্দনীয় বটে। একটি হচ্ছে অপব্যয় ও অমিতাচার এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে দর্প ও অহংকার। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ তোমরা খাও, পর এবং অপরকেও দাও। কিন্তু অপব্যয় করো না এবং তোমাদের মধ্যে যেন অহংকার প্রকাশ না পায়। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় নিয়ামতরাশি প্রতীয়মান দেখতে চান।” এটা হচ্ছে পরিধান সম্পর্কীয় কথা। এখন খাওয়া সম্পর্কীয় কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ পাত্র অপেক্ষা জঘন্য পাত্র আর নেই যে পাত্রের আহার্য পেট পূর্ণ করে ভক্ষণ করা হয় । মানুষের জন্যে তো এমন কয়েক গ্রাস খাদ্যই যথেষ্ট যা তাকে স্বীয় অবস্থায় কায়েম রাখতে সক্ষম হয়। আর যদি সে আরও কিছু খেতে চায় তবে যেন পেটের এক তৃতীয়াংশে খাবার দেয়, এক তৃতীয়াংশে পানি রাখে এবং বাকী এক তৃতীয়াংশ সহজভাবে শ্বাস লওয়ার জন্যে ফাকা রেখে দেয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ “ইসরাফ’ বা অপব্যয় হচ্ছে এই যে, মানুষ মনে যা চাইবে তাই খাবে।”
সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে লোকেরা উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতো তারা হজ্বের মৌসুমে নিজেদের উপর চর্বি হারাম করে নিতো। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “চর্বি হারাম নয়। তোমরা খাও, পান কর এবং চর্বিকে হারাম করে নেয়ার ব্যাপারে যে বাড়াবড়ি করেছে তা আর করো না।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তা তোমরা খাও এবং পান কর। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেনঃ (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা খাও কিন্তু হারাম খেয়ো না। কেননা এটা বাড়াবাড়ি । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেতোমরা খাও পান কর, কিন্তু অতিরিক্ত পানাহার করো না। কেননা এটাই হচ্ছে ‘ইসরাফ’ বা অপব্যয়। আল্লাহ তা'আলা অপব্যয়কারীকে ভালবাসেন না।। শব্দ দ্বারা বা সীমালংঘনকারীকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলা সীমালংঘন কারীদেরকে ভালবাসেন না। কেননা, লোকেরা বাড়াবাড়ি করে সাবধানতা অবলম্বন করতঃ হালালকেও হারাম করে নিতো অথবা হারামকেও হালাল বানিয়ে নিতো। আল্লাহ পাকের অভিপ্রায় হচ্ছে- “তোমরা হালালকে হালাল রাখ এবং হারামকে হারাম রাখ। এটাই হচ্ছে ন্যায়পরায়ণতা এবং এরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।