আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 191)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 191)



হরকত ছাড়া:

أيشركون ما لا يخلق شيئا وهم يخلقون ﴿١٩١﴾




হরকত সহ:

اَیُشْرِکُوْنَ مَا لَا یَخْلُقُ شَیْئًا وَّ هُمْ یُخْلَقُوْنَ ﴿۱۹۱﴾۫ۖ




উচ্চারণ: আ ইউশরিকূনা মা-লা-ইয়াখলুকুশাইআওঁ ওয়াহুম ইউখলাকূন।




আল বায়ান: তারা কি এমন কিছুকে শরীক করে, যারা কোন কিছু সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯১. তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা কি এমন কিছুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে।




আহসানুল বায়ান: (১৯১) তারা কি এমন বস্তুকে অংশী-স্থাপন করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট।



মুজিবুর রহমান: তারা কি এমন বস্তুকে (আল্লাহর সাথে) অংশী করে যারা কোন বস্তুই সৃষ্টি করেনা, বরং তারা নিজেরাই (আল্লাহর দ্বারা) সৃষ্ট?



ফযলুর রহমান: তারা কি এমনসব বস্তুকে (আল্লাহর) অংশীদার করছে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়?



মুহিউদ্দিন খান: তারা কি এমন কাউকে শরীক সাব্যস্ত করে, যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি, বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে।



জহুরুল হক: তারা কি অংশীদার বসায় তাকে যে কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরই সৃষ্টি করা হয়েছে?



Sahih International: Do they associate with Him those who create nothing and they are [themselves] created?



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৯১. তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ সমস্ত লোকদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করছেন, যার আল্লাহর সাথে মূর্তি, দেব-দেবী ইত্যাদিকে শরীক করে। অথচ তারা সৃষ্ট, মানুষের হাতের তৈরী। তারা কিছুরই মালিক নয়। ক্ষতি কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। উপাসনাকারীদের পক্ষে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও তাদের নেই। বরং এগুলো হচ্ছে, মৃত। নড়াচড়া কিংবা শোনা বা দেখার ক্ষমতাও তাদের নেই। বরং উপাসনাকারীরা এগুলোর চেয়ে বেশী শক্তিশালী; কারণ তাদের চোখ আছে, কান আছে, তারা পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখে। তাহলে তোমরা কিভাবে তাদের ইবাদত করছ যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি? কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতাও যাদের নেই? [ইবন কাসীর]

অন্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা'আলা অনুরূপ বলেছেন, “হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোন: তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও। এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষনকারী ও অন্বেষনকৃত কতই না দুর্বল; তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি যেমন মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল, আল্লাহ নিশ্চয় ক্ষমতাবান, পরাক্রমশালী। [সূরা হজ-৭৩–৭৪] আল্লাহ বলেন, যে, তাদের উপাস্যগুলো সবাই একত্রিত হলেও কোন একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। বরং যদি মাছি এ সমস্ত উপাস্যদের কোন নিকৃষ্ট খাবার নিয়ে উড়ে চলে যায়, তারা সেটাও মাছির কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। যার অবস্থা হচ্ছে এই, রিযক কিংবা সাহায্য লাভের জন্য কিভাবে ইবাদত তার করা হবে? [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৯১) তারা কি এমন বস্তুকে অংশী-স্থাপন করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৮৭-১৯২ নং আয়াতের তাফসীর:



কিয়ামত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলে দিচ্ছেন, বল: কিয়ামত কখন হবে সে জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে। তিনি তা যথাসময়ে ঘটাবেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّ اللّٰهَ عِنْدَه۫ عِلْمُ السَّاعَةِ ج وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ج وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ط وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ط وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌۭ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ ط إِنَّ اللّٰهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ )‏



“নিশ্চয় আল্লাহরই কাছে রয়েছে কিয়ামত সম্পর্কে জ্ঞান এবং তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আর তিনিই জানেন যা কিছু আছে গর্ভাধারে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী আয় করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।” (সূরা লুকমান ৩১:৩৪)



(ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)



‘সেটা হবে আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঘটনা।’ কাতাদাহ (রাঃ) বলেন: অর্থাৎ এ জ্ঞান আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের কাছে অস্পষ্ট ও গোপনীয়। তারা তা জানতে পারবে না।



হাসান বাসরী (রাঃ) বলেন: যখন কিয়ামত আসবে তখন আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের ওপর তা ভারী হয়ে যাবে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



(كَأَنَّكَ حَفِيٌّ)



‘তুমি এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত মনে করে’ মুফাসসিরগণ এর অনেক অর্থ বর্ণনা করেছেন। তবে সঠিক কথা ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: যখন তারা নাবী (সাঃ)-কে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন এমন ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করে যেন তিনি কিয়ামত সংঘঠিত হবার তারিখ অবগত রয়েছেন। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহী করে বললেন, বলে দাও যে- এ জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো নেই। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



(قُلْ لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِيْ نَفْعًا)



‘নিজের ভাল-মন্দের ওপরও আমার কোন অধিকার নেই।’ আল্লাহ তা‘আলার রাসূল নিজের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক নন এবং তিনি গায়েবও জানেন না। যদি তা জানতেন তাহলে তিনি সকল কল্যাণ গ্রহণ করতেন, অকল্যাণ তাঁকে স্পর্শ করতে না। এ সম্পর্কে পূর্বের সূরাগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে।



(وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا)



‘তা হতে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়।’ অর্থাৎ আদম (আঃ) থেকে হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তার নিকট প্রশান্তি ও সুখ লাভ করেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمِنْ اٰیٰتِھ۪ٓ اَنْ خَلَقَ لَکُمْ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْکُنُوْٓا اِلَیْھَا وَجَعَلَ بَیْنَکُمْ مَّوَدَّةً وَّرَحْمَةًﺚ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّتَفَکَّرُوْنَﭤ)‏



“আর তার দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া। নিশ্চয়ই এতে ঐসব লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা গভীরভাবে চিন্তা করে।” (সূরা রূম ৩০:২১)



আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষের মাঝে পারস্পরিক ভালবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন। এ চাহিদা তারজোড়া সৃষ্টির মাধ্যমে পূরণ হয় এবং এক অপরের নৈকট্য ও ভালবাসা অর্জন করে। সুতরাং বাস্তবতা এই যে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কারো মাঝে দেখা যায় না।



(فَلَمَّا تَغَشَّاهَا)



‘অতঃপর যখন সে তার সাথে মিলিত হয়’ অর্থাৎ যখন হাওয়া (আঃ)-এর সাথে আদম (আঃ) দৈহিক সম্পর্ক করলেন।



(حَمْلًا خَفِيْفًا فَمَرَّتْ بِهِ)



‘তখন সে এক হালকা গর্ভধারণ করে’ অর্থাৎ গর্ভ ধারণের শুরুর দিনগুলোতে প্রথমত স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর বীর্য স্থির হয়, অতঃপর বীর্য থেকে শুক্র, তারপর রক্তপিণ্ড এবং তা হতে মাংস পিণ্ডে পরিণত হয় যা স্ত্রীগর্ভে ধারণ করে চলাফেরা করতে কোন কষ্ট হয় না।



(فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللّٰهَ)



‘গর্ভ যখন ভারী হয়ে যায় তখন তারা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে’ অর্থাৎ যখন পেটে বাচ্চার আকার ধারণ করল তখন উভয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করল: হে আল্লাহ! আমাদেরকে একটি নিখুঁত ও সুন্দর সন্তান দিলে অবশ্যই আমরা শুকরিয়া আদায় করব।



কারণ পিতা-মাতার ভয় থাকে, না জানি সন্তানের কোন অঙ্গহানি বা বিকৃত অঙ্গ হয় কিনা।



(جَعَلَا لَه۫ شُرَكَا۬ءَ)



‘তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে’ এ আয়াতের দু’টি তাফসীর আলেমদের কাছে সুপরিচিত। কুরআন তার একটিকে সমর্থন করে।



১. বলা হয়: হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-এর যত সন্তান হত সবই ভূমিষ্টের পর মারা যেত। একদা তিনি গর্ভবতী হলেন। এ সুযোগে শয়তান এসে বলল: এবার যে সন্তান হবে তার নাম “আবদুল হারেস” রাখ তাহলে মারা যাবে না। হারেস ছিল শয়তানের একটি নাম। সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর তিনি তাই করলেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা বললেন, যখন সুসন্তান দিলাম তখন তারা শির্ক করল। (হাদীসটি যঈফ, সিলসিলা যঈফাহ হা: ৩৪২) এরূপ আরো মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করা হয়।



২. আয়াতের অর্থ: আল্লাহ তা‘আলা আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)-কে যখন সৎ সন্তান দান করলেন তখন তার পরবর্তী বংশধর কুফরী করল।



মূলত আদম ও হাওয়ার দিকে সম্বোধন করে তাদের বংশধরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ)



“আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের আকৃতি দান করেছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১১)



দ্বিতীয় মতের ওপর প্রমাণ বহন করে আয়াতের পরের অংশ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:



(فَلَمَّآ اٰتٰهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَه۫ شُرَكَا۬ءَ فِيْمَآ اٰتٰهُمَا ج فَتَعٰلَي اللّٰهُ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ ‏ أَيُشْرِكُوْنَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَّهُمْ يُخْلَقُوْنَ )



“তিনি যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করলেন, তখন তাদেরকে যা দেয়া হল সে সম্বন্ধে তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে, আর তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে। তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট।”



এটাই কুরআনের দলীল যে, এখানে মুশরিক বলতে বানী আদমকে বুঝানো হয়েছে আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে নয়। এ মত পোষণ করেছেন- হাসান বসরী ও ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ)। (আযউয়াউল বায়ান, ২/২২৬) কারণ একজন নাবী কখনো শির্ক করতে পারেন না।



সুতরাং সকল নাবীদের ইমাম সর্বশেষ নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) যদি কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক না হন তাহলে তথাকথিত পীর, গাউস, কুতুব ও মাযারে শায়িত ব্যক্তিরা কিভাবে কল্যাণের মালিক হতে পারে? তাই সকল প্রকার কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। অতএব শুধু তাঁর কাছেই আমাদের চাওয়া উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কিয়ামত কখন হবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।

২. কিয়ামত হঠাৎ করে আসবে।

৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেই নিজের ভাল-মন্দের মালিক না তাহলে কি করে তিনি অন্যের জন্য ভাল বা মন্দ করবেন।

৪. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গায়েব জানেন না; কেবল আল্লাহ তা‘আলাই জানেন।

৫. স্ত্রী সৃষ্টির লক্ষ ও উদ্দেশ্যের অন্যতম একটি হল তার নিকট প্রশান্তি লাভ।

৬. আল্লাহ তা‘আলার কাছে সৎ সন্তান কামনা করা দরকার।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর:

যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।

ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?

হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।

উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।