সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 190)
হরকত ছাড়া:
فلما آتاهما صالحا جعلا له شركاء فيما آتاهما فتعالى الله عما يشركون ﴿١٩٠﴾
হরকত সহ:
فَلَمَّاۤ اٰتٰهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَهٗ شُرَکَآءَ فِیْمَاۤ اٰتٰهُمَا ۚ فَتَعٰلَی اللّٰهُ عَمَّا یُشْرِکُوْنَ ﴿۱۹۰﴾
উচ্চারণ: ফালাম্মাআ-তা-হুমা-সা-লিহান জা‘আলা-লাহূ, শুরাকাআ ফীমাআ-তা-হুমা- ফাতা‘আ-লাল্লা-হু ‘আম্মা-ইউশরিকূন।
আল বায়ান: অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে এক সুসন্তান দান করলেন, তখন তাদেরকে তিনি যা প্রদান করেছেন সে বিষয়ে তারা তাঁর বহু শরীক নির্ধারণ করল। বস্তুত তারা যাদের শরীক করে তাদের থেকে আল্লাহ অনেক ঊর্ধ্বে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯০. অতঃপর তিনি (আল্লাহ) যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সুসন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন সেটাতে আল্লাহ্র বহু শরীক নির্ধারণ করে(১), বস্তুত তারা যাদেরকে (তার সাথে) শরীক করে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন তিনি তাদেরকে সর্বাঙ্গ-সুন্দর সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দেয়া হয় তাতে অন্যকে আল্লাহর শরীক গণ্য করে। তারা যাদেরকে শরীক গণ্য করে আল্লাহ তাদের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
আহসানুল বায়ান: (১৯০) সুতরাং তিনি যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দেওয়া হয়, সে সম্বন্ধে আল্লাহর অংশী করে।[1] কিন্তু তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে।
মুজিবুর রহমান: অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে সৎ ও সুস্থ সন্তান দান করেন তখন তারা আল্লাহর দেয়া এই দানে অংশী স্থাপন করে, কিন্তু তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তার অনেক উর্ধ্বে।
ফযলুর রহমান: অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সুসন্তান দিলে তিনি তাদেরকে যা দিয়েছেন সে ব্যাপারে তারা (অর্থাৎ তাদের পরবর্তী বংশধররা) তাঁর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করে (অর্থাৎ সন্তানের কল্যাণার্থে দেব-দেবীর আশ্রয় নেয়)। তারা যাদেরকে (আল্লাহর) অংশীদার সাব্যস্ত করে আল্লাহ তাদের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তাদেরকে যখন সুস্থ ও ভাল দান করা হল, তখন দানকৃত বিষয়ে তার অংশীদার তৈরী করতে লাগল। বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের শরীক সাব্যস্ত করা থেকে বহু উর্ধে।
জহুরুল হক: কিন্তু তিনি যখন তাদের সুষ্ঠু একটি দান করলেন তারা তাঁর সঙ্গে দাঁড় করালো অংশীদার তিনি তাদের যা দিয়েছেন তার সন্বন্ধে। কিন্তু বহু উচ্চে অবস্থিত আল্লাহ্ তারা যা অংশী বানায় সে-সব থেকে।
Sahih International: But when He gives them a good [child], they ascribe partners to Him concerning that which He has given them. Exalted is Allah above what they associate with Him.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৯০. অতঃপর তিনি (আল্লাহ) যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সুসন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন সেটাতে আল্লাহ্–র বহু শরীক নির্ধারণ করে(১), বস্তুত তারা যাদেরকে (তার সাথে) শরীক করে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।(২)
তাফসীর:
(১) কাতাদা বলেন, হাসান বসরী বলতেন, এর দ্বারা ইয়াহুদী ও নাসারাদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে সন্তান-সন্তুতি দান করেন, কিন্তু তারা সেগুলোকে ইয়াহুদী কিংবা নাসারা বানিয়ে ছাড়ে। [তাবারী; ইবন কাসীর]
(২) ইয়াহুদী ও নাসারা ছাড়াও বাস্তবে যারাই আল্লাহর দেয়া নেয়ামতকে অন্যের জন্য নির্দিষ্ট করে তারাও এ আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে। কারণ মহান সৃষ্টিকর্তা সর্বশক্তিমান আল্লাহই সর্বপ্রথম মানব জাতিকে সৃষ্টি করেন। মুশরিকরাও এ কথা অস্বীকার করে না। তারপর পরবর্তী কালের প্রত্যেকটি মানুষকেও তিনি অস্তিত্ব দান করেন। আর একথাটিও মুশরিকরা জানে। তাই দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় সুস্থ, সবল ও নিখুঁত অবয়বধারী শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ব্যাপারে আল্লাহর উপরই পূর্ণ ভরসা করা হয়।
কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়ে যদি চাঁদের মত ফুটফুটে সুন্দর শিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলেও জাহেলী কর্মকাণ্ড নবতর রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোন দেবী, অবতার, অলী ও পীরের নামে নজরানা ও শিন্নি নিবেদন করা হয় এবং শিশুকে এমন সব নামে অভিহিত করা হয় যেন মনে হয় সে আল্লাহর নয়, বরং অন্য কারোর অনুগ্রহের ফল। যেমন তার নামকরণ করা হয় হোসাইন বখশ, (হোসাইনের দান) পীর বখশ (পীরের দান), আব্দুর রাসূল (রাসূলের দাস), আবদুল উযযা (উযযার দাস), আবদে শামস (সূর্য দেবতার দাস) ইত্যাদি, ইত্যাদি।
আরবের মুশরিক সম্প্রদায়ের অপরাধ ছিল এই যে, তারা সুস্থ, সবল ও পূর্ণ অবয়ব সম্পন্ন সন্তান জন্মের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করতো কিন্তু সন্তানের জন্মের পর আল্লাহর এ দানে অন্যদেরকে অংশীদার করতো। নিঃসন্দেহে তাদের এ অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু বর্তমানে তাওহীদের দাবীদারদের মধ্যে আমরা যে শির্কের চেহারা দেখছি তা তার চাইতেও খারাপ।
এ তাওহীদের তথাকথিত দাবীদাররা সন্তানও চায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাছে। গর্ভ সঞ্চারের পর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে মানত মানে এবং সন্তান জন্মের পর তাদেরই আস্তানায় গিয়ে নজরানা নিবেদন করে। এরপরও জাহেলী যুগের আরবরাই কেবল মুশরিক, আর এরা নাকি পাক্কা তাওহীদবাদী!
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৯০) সুতরাং তিনি যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দেওয়া হয়, সে সম্বন্ধে আল্লাহর অংশী করে।[1] কিন্তু তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে।
তাফসীর:
[1] এখানে শরীক করার অর্থ এমন নামকরণ করা, যাতে শিরক হয়; যেমন ইমাম বখশ, গোলাম পীর, আব্দুর রসূল, বান্দা (বন্দে) আলী ইত্যাদি। যাতে প্রকাশ হয় যে, এই সন্তান অমুক সাহেবের দান অথবা তার দাস। ‘নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক।’ অথবা এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আমি অমুক পীরের মাযারে গিয়েছিলাম, আর সেখান থেকেই এই সন্তান লাভ হয়েছে। অথবা সন্তান লাভের পর কোন মৃত ব্যক্তির নামে নযর-নিয়ায দেওয়া। অথবা সন্তানকে কোন মাযারে নিয়ে গিয়ে তার মাথা সেখানে ঠেকানো; এই ধারণায় যে, তারই বর্কতেই এই সন্তান হয়েছে। এই সকল কর্মই আল্লাহর সাথে শরীক করার পর্যায়ভুক্ত; যা দুর্ভাগ্যক্রমে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে। পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ শিরকের খন্ডন করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৮৭-১৯২ নং আয়াতের তাফসীর:
কিয়ামত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলে দিচ্ছেন, বল: কিয়ামত কখন হবে সে জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে। তিনি তা যথাসময়ে ঘটাবেন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ عِنْدَه۫ عِلْمُ السَّاعَةِ ج وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ج وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ط وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ط وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌۭ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ ط إِنَّ اللّٰهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ )
“নিশ্চয় আল্লাহরই কাছে রয়েছে কিয়ামত সম্পর্কে জ্ঞান এবং তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আর তিনিই জানেন যা কিছু আছে গর্ভাধারে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী আয় করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।” (সূরা লুকমান ৩১:৩৪)
(ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)
‘সেটা হবে আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঘটনা।’ কাতাদাহ (রাঃ) বলেন: অর্থাৎ এ জ্ঞান আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের কাছে অস্পষ্ট ও গোপনীয়। তারা তা জানতে পারবে না।
হাসান বাসরী (রাঃ) বলেন: যখন কিয়ামত আসবে তখন আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের ওপর তা ভারী হয়ে যাবে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
(كَأَنَّكَ حَفِيٌّ)
‘তুমি এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত মনে করে’ মুফাসসিরগণ এর অনেক অর্থ বর্ণনা করেছেন। তবে সঠিক কথা ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: যখন তারা নাবী (সাঃ)-কে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন এমন ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করে যেন তিনি কিয়ামত সংঘঠিত হবার তারিখ অবগত রয়েছেন। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহী করে বললেন, বলে দাও যে- এ জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো নেই। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
(قُلْ لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِيْ نَفْعًا)
‘নিজের ভাল-মন্দের ওপরও আমার কোন অধিকার নেই।’ আল্লাহ তা‘আলার রাসূল নিজের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক নন এবং তিনি গায়েবও জানেন না। যদি তা জানতেন তাহলে তিনি সকল কল্যাণ গ্রহণ করতেন, অকল্যাণ তাঁকে স্পর্শ করতে না। এ সম্পর্কে পূর্বের সূরাগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে।
(وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا)
‘তা হতে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়।’ অর্থাৎ আদম (আঃ) থেকে হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তার নিকট প্রশান্তি ও সুখ লাভ করেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمِنْ اٰیٰتِھ۪ٓ اَنْ خَلَقَ لَکُمْ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْکُنُوْٓا اِلَیْھَا وَجَعَلَ بَیْنَکُمْ مَّوَدَّةً وَّرَحْمَةًﺚ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّتَفَکَّرُوْنَﭤ)
“আর তার দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া। নিশ্চয়ই এতে ঐসব লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা গভীরভাবে চিন্তা করে।” (সূরা রূম ৩০:২১)
আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষের মাঝে পারস্পরিক ভালবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন। এ চাহিদা তারজোড়া সৃষ্টির মাধ্যমে পূরণ হয় এবং এক অপরের নৈকট্য ও ভালবাসা অর্জন করে। সুতরাং বাস্তবতা এই যে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কারো মাঝে দেখা যায় না।
(فَلَمَّا تَغَشَّاهَا)
‘অতঃপর যখন সে তার সাথে মিলিত হয়’ অর্থাৎ যখন হাওয়া (আঃ)-এর সাথে আদম (আঃ) দৈহিক সম্পর্ক করলেন।
(حَمْلًا خَفِيْفًا فَمَرَّتْ بِهِ)
‘তখন সে এক হালকা গর্ভধারণ করে’ অর্থাৎ গর্ভ ধারণের শুরুর দিনগুলোতে প্রথমত স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর বীর্য স্থির হয়, অতঃপর বীর্য থেকে শুক্র, তারপর রক্তপিণ্ড এবং তা হতে মাংস পিণ্ডে পরিণত হয় যা স্ত্রীগর্ভে ধারণ করে চলাফেরা করতে কোন কষ্ট হয় না।
(فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللّٰهَ)
‘গর্ভ যখন ভারী হয়ে যায় তখন তারা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে’ অর্থাৎ যখন পেটে বাচ্চার আকার ধারণ করল তখন উভয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করল: হে আল্লাহ! আমাদেরকে একটি নিখুঁত ও সুন্দর সন্তান দিলে অবশ্যই আমরা শুকরিয়া আদায় করব।
কারণ পিতা-মাতার ভয় থাকে, না জানি সন্তানের কোন অঙ্গহানি বা বিকৃত অঙ্গ হয় কিনা।
(جَعَلَا لَه۫ شُرَكَا۬ءَ)
‘তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে’ এ আয়াতের দু’টি তাফসীর আলেমদের কাছে সুপরিচিত। কুরআন তার একটিকে সমর্থন করে।
১. বলা হয়: হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-এর যত সন্তান হত সবই ভূমিষ্টের পর মারা যেত। একদা তিনি গর্ভবতী হলেন। এ সুযোগে শয়তান এসে বলল: এবার যে সন্তান হবে তার নাম “আবদুল হারেস” রাখ তাহলে মারা যাবে না। হারেস ছিল শয়তানের একটি নাম। সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর তিনি তাই করলেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা বললেন, যখন সুসন্তান দিলাম তখন তারা শির্ক করল। (হাদীসটি যঈফ, সিলসিলা যঈফাহ হা: ৩৪২) এরূপ আরো মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করা হয়।
২. আয়াতের অর্থ: আল্লাহ তা‘আলা আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)-কে যখন সৎ সন্তান দান করলেন তখন তার পরবর্তী বংশধর কুফরী করল।
মূলত আদম ও হাওয়ার দিকে সম্বোধন করে তাদের বংশধরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ)
“আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের আকৃতি দান করেছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১১)
দ্বিতীয় মতের ওপর প্রমাণ বহন করে আয়াতের পরের অংশ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
(فَلَمَّآ اٰتٰهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَه۫ شُرَكَا۬ءَ فِيْمَآ اٰتٰهُمَا ج فَتَعٰلَي اللّٰهُ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ أَيُشْرِكُوْنَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَّهُمْ يُخْلَقُوْنَ )
“তিনি যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করলেন, তখন তাদেরকে যা দেয়া হল সে সম্বন্ধে তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে, আর তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে। তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট।”
এটাই কুরআনের দলীল যে, এখানে মুশরিক বলতে বানী আদমকে বুঝানো হয়েছে আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে নয়। এ মত পোষণ করেছেন- হাসান বসরী ও ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ)। (আযউয়াউল বায়ান, ২/২২৬) কারণ একজন নাবী কখনো শির্ক করতে পারেন না।
সুতরাং সকল নাবীদের ইমাম সর্বশেষ নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) যদি কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক না হন তাহলে তথাকথিত পীর, গাউস, কুতুব ও মাযারে শায়িত ব্যক্তিরা কিভাবে কল্যাণের মালিক হতে পারে? তাই সকল প্রকার কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। অতএব শুধু তাঁর কাছেই আমাদের চাওয়া উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কিয়ামত কখন হবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।
২. কিয়ামত হঠাৎ করে আসবে।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেই নিজের ভাল-মন্দের মালিক না তাহলে কি করে তিনি অন্যের জন্য ভাল বা মন্দ করবেন।
৪. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গায়েব জানেন না; কেবল আল্লাহ তা‘আলাই জানেন।
৫. স্ত্রী সৃষ্টির লক্ষ ও উদ্দেশ্যের অন্যতম একটি হল তার নিকট প্রশান্তি লাভ।
৬. আল্লাহ তা‘আলার কাছে সৎ সন্তান কামনা করা দরকার।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৮৯-১৯০ নং আয়াতের তাফসীর:
ইরশাদ হচ্ছে যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত মানুষই আদম (আঃ)-এর বংশের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বয়ং তাঁর স্ত্রী হাওয়া তাঁরই মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। তাঁদের দুজনের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে এমনভাবে বাড়িয়েছি যে, তোমরা বংশে বংশে ও গোত্রে গোত্রে পরিণত হয়েছে। এখন তোমাদের একে অপরের হকের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। নিশ্চয়ই আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই বেশী সম্মানিত যে বেশী মুত্তাকী।” (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- যেন সে (পুরুষ) তার (স্ত্রীর কাছে প্রশান্তি লাভ করে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি ও মায়া-মহব্বত সৃষ্টি করেছেন। (৩০:২১) দু' আত্মার মধ্যে যে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা জন্মে, এর চেয়ে অধিক ভালবাসা আর কোথায়ও হতে পারে না। তাই তো আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যাদুকর তার যাদুর মাধ্যমে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় যে, কি করে সে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতে পারে। মোটকথা, স্বামী যখন তার প্রকৃতিগত প্রেমের ভিত্তিতে স্বীয় স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করে তখন তার স্ত্রী প্রথমতঃ তার গর্ভাশয়ে একটা হালকা বোঝার অস্তিত্ব অনুভব করে। এটা হলো গর্ভের সূচনার সময়। এই সময় নারীর কোন কষ্ট হয় না। কেননা, এই গর্ভ তো এখন সবেমাত্র নুফা বা মাংসপিণ্ড। এখন ওটা হালকা পাতলা অবস্থায় রয়েছে। আইয়ুব (রঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রঃ)-কে (আরবী)-এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “যদি আমি আরববাসী হতাম এবং তাদের ভাষা বুঝতাম তবে এর অর্থ জানতাম। এর অর্থ এই হতে পারে যে, সে এই গর্ভ নিয়ে আরামেই চলাফেরা করে।` কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- এই গর্ভ প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ঐ গর্ভ নিয়ে সে সহজেই উঠাবসা করতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- এই প্রাথমিক সময় হচ্ছে এমন এক সময় যখন তার নিজেরই এই সন্দেহ থেকে যায় যে, তার গর্ভ আছে কি নেই। মোটকথা এর পরে নারী তার পেটের গর্ভ সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে যায়। তখন পিতা-মাতা দু’জনই আল্লাহর কাছে এই কামনা করে যে, যদি তিনি তাদেরকে নিখুঁত ও সুন্দর সন্তান দান করেন তবে এটা তাঁর বড়ই ইহসান হবে! হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “মা-বাপের এই ভয়ও থাকে যে, না জানি হয়তো কোন পশুর আকৃতি বিশিষ্ট বা কোন অঙ্গহানি যুক্ত সন্তান ভূমিষ্ট হয়ে যায় না কি! যেমন কোন কোন সময় এরূপ হয়েও থাকে।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যদি আল্লাহ আমাকে পুত্র সন্তান দান করেন।' কেননা, সন্তানের মধ্যে পুত্র সন্তানই বেশী উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা যখন তাদেরকে সহীহ সালেম ও নিখুঁত সন্তান দান করেন তখন তারা ওটাকে প্রতিমাগুলোর অংশ বানিয়ে দেয়। আল্লাহর সত্তা এরূপ শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। মুফাসিরগণ এখানে বহু আসার ও হাদীস বর্ণনা করেছেন, সেগুলো আমরা ইনশাআল্লাহ বর্ণনা করবো। অতঃপর ইনশাআল্লাহ সঠিক কোনটি সেটাও বলে দেয়ার প্রয়াস পাবো। মহান আল্লাহর উপরই আমাদের ভরসা।
ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন, হাওয়া (আঃ) যখন সন্তান প্রসব করেন তখন ইবলীস তাঁর কাছে আগমন করে। তাঁর সন্তান বেঁচে থাকতো না। শয়তান তাকে পরামর্শ দিলো- “তোমার শিশুর নাম আব্দুল হারিস রাখো, তাহলে সে জীবিত থাকবে।” তখন তার নাম আব্দুল হারিস রাখা হয় এবং সে জীবিত থাকে। এটা ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে অহী। হারিস শয়তানের নাম। এ হাদীসে তিনটি ক্রটি পরিলক্ষিত হয়। (১) এই হাদীসের বর্ণনাকারী উমার ইবনে ইবরাহীম একজন বসরী লোক। ইবনে মুঈন (রঃ) তাকে বিশ্বাসযোগ্য বললেও আবু হাতিম (রঃ) বলেন যে, তার থেকে হুজ্জত গ্রহণ করা যেতে পারে না। (২) এই রিওয়াইয়াতই মওকুফ রূপে হযরত সামুরা (রাঃ)-এর উক্তিতেই বর্ণিত হয়েছে, যা মারফু নয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে স্বয়ং হযরত সামুরা (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) তাঁর ছেলের নাম আব্দুল হারিস রেখেছিলেন। (৩) এ হাদীসের বর্ণনাকারী হাসান (রঃ) থেকেও এই আয়াতের তাফসীর এর বিপরীত বর্ণনা করা হয়েছে! তাহলে এটা স্পষ্ট কথা যে, যদি এ মারফু হাদীসটি তার দ্বারা বর্ণনাকৃত হতো তাহলে স্বয়ং তিনি এর উল্টো তাফসীর করতেন না । ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা হযরত আদম (আঃ)-এর ঘটনা নয়, বরং এটা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঘটনা। আবার এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর দ্বারা কোন মুশরিক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে এরূপ করে থাকে। কথিত আছ যে, এটা হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানের কাজের বর্ণনা, যারা নিজেদের সন্তানদেরকে নিজেদের রীতিনীতির উপর পরিচালিত করে বা তাদেরকে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টান বানিয়ে দেয়। এই আয়াতের যেসব তাফসীর বর্ণনা করা হয়েছে অনুধ্যে এটাই উত্তম তাফসীর। মোটকথা, এটা ছিল অতি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, একজন মুত্তাকী ব্যক্তি একটি আয়াতের তাফসীরে একটি মার’ হাদীস বা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উক্তিরূপে বর্ণনা করবেন, আবার নিজেই ওর বিপরীত তাফসীর করবেন! এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং এটা হ্যরত সামুরা (রাঃ)-এর নিজের উক্তি। এর পর এটা ধারণা করা যেতে পারে যে, সম্ভবতঃ সামুরা (রাঃ) এটা আহলে কিতাবের নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রমুখ যাঁরা পরে মুসলমান হয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ এর বর্ণনা সত্বরই আসবে।
মোটকথা, এ হাদীসটিকে মারফু হাদীস রূপে গ্রহণ করা যেতে পারে না। তবে এই ব্যাপারে অন্যান্য হাদীসও রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাওয়া (আঃ)-এর যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করতে তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো এবং তাদের নাম আব্দুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ ইত্যাদি রাখা হতো। এ সন্তানগুলো মারা যেতো! একদা ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের অন্য নাম রাখো তবে তারা জীবিত থাকবে । অতঃপর হযরত হাওয়া (আঃ)-এর এক সন্তান ভূমিষ্ট হলো। তখন পিতা-মাতা তার নাম রাখলেন আব্দুল হারিস। এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক .... (আরবী) -এ কথা বলেন।
গর্ভ ছিল কি ছিল না এ ব্যাপারে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর মনে সন্দেহ ছিল। মোটকথা, যখন গর্ভ ভারী হয়ে উঠলো তখন দু’জনই আল্লাহ তা'আলার নিকট দুআ করলেন যে, যদি তিনি সহীহ সালিম ও নিখুঁত সন্তান দান করেন তবে তারা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবেন। তখন শয়তান তাদের উভয়ের কাছে এসে বললোঃ তোমাদের কিরূপ সন্তান ভূমিষ্ট হবে তার কোন খবর তোমরা রাখো কি? সেই সন্তান মানুষের আকার বিশিষ্টও হতে পারে, আবার জন্তুর আকৃতি বিশিষ্টও হতে পারে । ভুল কথা তাদের সামনে সে শুভ রূপে পেশ করলো। সে তো প্রতারকই বটে। ইতোপূর্বে তাদের দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেই মারা গিয়েছিল। শয়তান তাদেরকে বুঝিয়ে বললোঃ “তোমরা যদি আমার নামে সন্তানের নাম না রাখো তবে তোমাদের সন্তান বিকলাঙ্গ হবে এবং জীবিতও থাকবে না। সুতরাং তার কথামত তারা সন্তানের নাম আব্দুল হারিস রেখে দিলো। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের প্রার্থনা। অনুযায়ী সহীহ সালিম ও নিখুঁত সন্তান দান করলেন তখন তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে বসলো।” এই আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রথমবারের গর্ভের সময় সে (শয়তান) তাদের কাছে আগমন করে এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বলে- আমি তো সেই, যে তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করিয়েছিল। এখন যদি তোমরা আমার কথামত কাজ না কর তবে আমি এমনভাবে ভেল্কী লাগিয়ে দিবো যে, এই সন্তানের শিং বেরিয়ে যাবে এবং সে পেট ফেড়ে বেরিয়ে পড়বে এবং এই হবে ঐ হবে। এইভাবে সে তাদেরকে আতংকগ্রস্ত করলো। কিন্তু তারা তার কথা মানলেন না। আল্লাহর সদিচ্ছায় মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হলো। দ্বিতীয়বার হযরত হাওয়া (আঃ) গর্ভধারণ করলেন। সেবার মৃত সন্তানই ভূমিষ্ট হলো। এবার শয়তান নিজেকে অত্যন্ত হিতাকাংখীরূপে তাদের সামনে পেশ করলো। তখন। সন্তানের ভালবাসা প্রাধান্য লাভ করলো এবং তারা সন্তানের নাম আব্দুল হারিস রেখে দিলেন। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দেয়া এই দানে অংশী স্থাপন করে বসলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ হাদীসটি গ্রহণ করে তাঁর ছাত্রদের একটি দলও এ কথাই বলেছেন। যেমন মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), ইকরামা (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)। অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী থেকে নিয়ে পরবর্তী পর্যন্ত বহু মুফাসসির এই আয়াতের তাফসীরে এ কথাই বলেছেন। কিন্তু প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, এই ঘটনাটি আহলে কিতাব থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। এর একটি বড় দলীল এই যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ওটা হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, যেমন তাফসীরে ইবনে আবূ হাতিমে রয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এ কথাটি আহলে কিতাব হতে নকল করা হয়েছে। যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তাদের কথাকে সত্যও বলো না এবং মিথ্যাও বলো না।” এর বর্ণনা তিন প্রকারের হচ্ছে। (১) ঐসব কথা, যেগুলোর বিশুদ্ধতা কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (২) যেগুলোর অসত্যতা কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। (৩) ঐসব কথা, যেগুলোর ফায়সালা আমাদের ধর্মে মিলে না । হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী এগুলোর বর্ণনায় কোন দোষ নেই। কিন্তু এগুলো সত্য কি মিথ্যা এটা মন্তব্য করা চলবে না। আমার মতে এটা তো দ্বিতীয় প্রকারের হাদীস। অর্থাৎ মানবার যোগ্য নয়। আর যেসব সাহাবী ও তাবিঈ হতে এটা বর্ণিত আছে তারা এটাকে তৃতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত মনে করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তো ওটাই বলি যা ইমাম হাসান (রঃ) বলে থাকেন। তা হচ্ছে এই যে, মুশরিকদের তাদের সন্তানদের মধ্যে আল্লাহর শরীক করার বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে। এটা হযরত আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর বর্ণনা নয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক উন্নত ও মহান। এই আয়াতগুলোতে এই বর্ণনা এবং ইতোপূর্বে হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর বর্ণনা ক্রমিক বর্ণনার মত। প্রথমে আসল মা-বাপের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ অন্যান্য মা-বাপ ও তাদের শিরকের বর্ণনা দিয়েছেন।
এখন ব্যক্তিগত বর্ণনা শেষ করে শ্রেণীগত বর্ণনার দিকে মোড় ফিরানো হচ্ছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছি। আবার আমি ঐ তারকাগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে মেরে তাড়াবার কাজ নিয়েছি।” আর এটা স্পষ্ট কথা যে, সৌন্দর্যের জন্যে যে তারকাগুলো নির্দিষ্ট রয়েছে সেগুলো ছিটকে পড়ে না। ঐগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে মারা হয় না। এখানেও কথার মোড় ফিরানো হচ্ছে যে, তারকারাজির স্বাতন্ত্রের বর্ণনার পর শ্রেণীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এর আরও বহু দৃষ্টান্ত কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।