সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 155)
হরকত ছাড়া:
واختار موسى قومه سبعين رجلا لميقاتنا فلما أخذتهم الرجفة قال رب لو شئت أهلكتهم من قبل وإياي أتهلكنا بما فعل السفهاء منا إن هي إلا فتنتك تضل بها من تشاء وتهدي من تشاء أنت ولينا فاغفر لنا وارحمنا وأنت خير الغافرين ﴿١٥٥﴾
হরকত সহ:
وَ اخْتَارَ مُوْسٰی قَوْمَهٗ سَبْعِیْنَ رَجُلًا لِّمِیْقَاتِنَا ۚ فَلَمَّاۤ اَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَۃُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ اَهْلَکْتَهُمْ مِّنْ قَبْلُ وَ اِیَّایَ ؕ اَتُهْلِکُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَآءُ مِنَّا ۚ اِنْ هِیَ اِلَّا فِتْنَتُکَ ؕ تُضِلُّ بِهَا مَنْ تَشَآءُ وَ تَهْدِیْ مَنْ تَشَآءُ ؕ اَنْتَ وَلِیُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَ ارْحَمْنَا وَ اَنْتَ خَیْرُ الْغٰفِرِیْنَ ﴿۱۵۵﴾
উচ্চারণ: ওয়াখতা-রা মূছা-কাওমাহূছাবা‘ঈনা রাজুলাল লিমীকা-তিনা- ফালাম্মাআখাযাতহুমুর রাজফাতুকা-লা রাব্বি লাও শি’তা আহলাকতাহুম মিন কাবলুওয়াইয়্যা-ইয়া আতুহলিকুনা-বিমা-ফা‘আলাছছুফাহাউ মিন্না- ইন হিয়া ইল্লা-ফিতনাতুকা তুদিল্লু বিহা-মান তাশাউ ওয়া তাহদী মান তাশাউ আনতা ওয়ালিইউনা-ফাগফিরালানাওয়ারহামনা-ওয়া আনতা খাইরুল গা-ফিরীন।
আল বায়ান: আর মূসা নিজ কওম থেকে সত্তর জন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানের জন্য নির্বাচন করল। অতঃপর যখন ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করল তখন সে বলল, ‘হে আমার রব, আপনি চাইলে ইতঃপূর্বে এদের ধ্বংস করতে পারতেন এবং আমাকেও। আমাদের মধ্যে নির্বোধরা যা করেছে তার কারণে কি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? এটাতো আপনার পরীক্ষা ছাড়া কিছু না। এর মাধ্যমে যাকে চান আপনি পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আপনি আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আপনি উত্তম ক্ষমাশীল।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫৫. আর মূসা তার সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোককে আমাদের নির্ধারিত স্থানে একত্র হওয়ার জন্য মনোনীত করলেন। অত:পর তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, তখন মূসা বললেন, হে আমার রব। আপনি ইচ্ছে করলে আগেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতেন! আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ, তারা যা করেছে সে জন্য কি আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? এটা তো শুধু আপনার পরীক্ষা, যা দ্বারা আপনি যাকে ইচ্ছে বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত করেন। আপনিই তো আমাদের অভিভাবক; কাজেই আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আর ক্ষমাশীলদের মধ্যে আপনিই তো শ্রেষ্ঠ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: মূসা তার জাতির সত্তর জন লোককে বাছাই করল আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য। যখন ভূমিকম্প তাদের উপর আঘাত হানল তখন সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছে করলে তো এদেরকে আর আমাকেও আগেই ধ্বংস করে দিতে পারতে! আমাদের মধ্যেকার নির্বোধেরা যা করেছে তার জন্য কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে? ওটা তো কেবল তোমার পরীক্ষা, যাকে চাও তদ্দ্বারা পথভ্রষ্ট কর, আর যাকে চাও সত্য পথে পরিচালিত কর, তুমি আমাদের প্রতি দয়া কর, তুমিই তো সবচেয়ে বেশী ক্ষমাশীল।’
আহসানুল বায়ান: (১৫৫) আর মূসা আপন সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার প্রতিশ্রুতির সময়ে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করল। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল[1] তখন মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কর্মদোষে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এতো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল। [2]
মুজিবুর রহমান: মূসা তার সম্প্রদায় হতে সত্তর জন নেতৃস্থানীয় লোক আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হওয়ার জন্য নির্বাচন করল, যখন ঐ লোকগুলি একটি কঠিন ভূ-কম্পনে আক্রান্ত হল তখন মূসা বললঃ হে আমার রাব্ব! আপনি ইচ্ছা করলে এর পূর্বেও ওদেরকে এবং আমাকে ধ্বংস করতে পারতেন, আমাদের মধ্যকার কতক নির্বোধ লোকের অন্যায়ের কারণে কি আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? এটাতো আপনার পরীক্ষা, আপনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথে পরিচালিত করেন, আপনিইতো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন, এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন, ক্ষমাকারীদের মধ্যে আপনিইতো উত্তম ক্ষমাকারী।
ফযলুর রহমান: আমার নির্ধারিত সময় ও স্থানে সাক্ষাতের জন্য মূসা তার সমপ্রদায়ের সত্তরজন লোককে বাছাই করল। অতঃপর যখন ভূমিকম্প তাদেরকে আঘাত করল তখন মূসা বলল, “হে আমার প্রভু! তুমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে ও আমাকে আগেই ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে নির্বোধ লোকদের কর্মের জন্য কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এ তো তোমার পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করবে এবং যাকে ইচ্ছা সুপথগামী করবে। তুমি আমাদের অভিভাবক; তাই আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ কর। তুমিই তো শ্রেষ্ঠ ক্ষমাকারী।”
মুহিউদ্দিন খান: আর মূসা বেছে নিলেন নিজের সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোক আমার প্রতিশ্রুত সময়ের জন্য। তারপর যখন তাদেরকে ভূমিকম্প পাকড়াও করল, তখন বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার, তুমি যদি ইচ্ছা করতে, তবে তাদেরকে আগেই ধ্বংস করে দিতে এবং আমাকেও। আমাদেরকে কি সে কর্মের কারণে ধ্বংস করছ, যা আমার সম্প্রদায়ের নির্বোধ লোকেরা করেছে? এসবই তোমার পরীক্ষা; তুমি যাকে ইচ্ছা এতে পথ ভ্রষ্ট করবে এবং যাকে ইচ্ছা সরলপথে রাখবে। তুমি যে আমাদের রক্ষক-সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদের উপর করুনা কর। তাছাড়া তুমিই তো সর্বাধিক ক্ষমাকারী।
জহুরুল হক: আর মূসা তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে সত্তর জন লোককে বাছাই করলেন আমাদের নির্ধারিত স্থলের জন্য, কাজেই যখন ভূমিকম্প তাদের পাকড়ালো, তিনি বললেন -- "আমার প্রভু! তুমি যদি ইচ্ছা করতে তবে এর আগেই তো তুমি তাদের ধ্বংস করতে পারতে, আর আমাকেও। তুমি কি আমাদের ধ্বংস করবে আমাদের মধ্যের নির্বোধরা যা করেছে তার জন্যে? এ তোমার পরীক্ষা বৈ তো নয়। এর দ্বারা তুমি বিপথগামী করো যাদের তুমি ইচ্ছা করো, আর সৎপথে চালাও যাদের তুমি ইচ্ছা করো। তুমিই আমাদের অভিভাবক, অতএব আমাদের পরিত্রাণ করো ও আমাদের প্রতি করুণা করো, কারণ তুমিই পরিত্রাণকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম।
Sahih International: And Moses chose from his people seventy men for Our appointment. And when the earthquake seized them, he said, "My Lord, if You had willed, You could have destroyed them before and me [as well]. Would You destroy us for what the foolish among us have done? This is not but Your trial by which You send astray whom You will and guide whom You will. You are our Protector, so forgive us and have mercy upon us; and You are the best of forgivers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫৫. আর মূসা তার সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোককে আমাদের নির্ধারিত স্থানে একত্র হওয়ার জন্য মনোনীত করলেন। অত:পর তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, তখন মূসা বললেন, হে আমার রব। আপনি ইচ্ছে করলে আগেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতেন! আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ, তারা যা করেছে সে জন্য কি আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? এটা তো শুধু আপনার পরীক্ষা, যা দ্বারা আপনি যাকে ইচ্ছে বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত করেন। আপনিই তো আমাদের অভিভাবক; কাজেই আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আর ক্ষমাশীলদের মধ্যে আপনিই তো শ্রেষ্ঠ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫৫) আর মূসা আপন সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার প্রতিশ্রুতির সময়ে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করল। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল[1] তখন মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কর্মদোষে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এতো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল। [2]
তাফসীর:
[1] ঐ সত্তরজন ব্যক্তির বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী টীকায় হবে। এখানে এটা বলা হচ্ছে যে, মূসা (আঃ) নিজ জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করলেন এবং তাদেরকে ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন; যেখানে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হল। যার কারণে মূসা (আঃ) বললেন,----।
[2] বানী ইস্রাঈলের এই সত্তরজন ব্যক্তি কারা ছিল? এ সম্পর্কে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি মত হল যে, যখন মূসা (আঃ) তাদেরকে তাওরাতের আহকাম শুনালেন, তারা বলল, ‘আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, এই কিতাব সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে? যতক্ষণ আমরা আল্লাহকে স্বয়ং কথা বলতে না শুনব, ততক্ষণ এটাকে মানব না।’ সুতরাং তিনি সত্তরজন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন এবং তাদেরকে ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর সাথে কথোপকথন করলেন, যা তারাও শুনল। কিন্তু তারা একটি নতুন দাবী করে বসল যে, যতক্ষণ আমরা নিজ চোখে আল্লাহকে না দেখব, ঈমান আনব না। দ্বিতীয় মত হল, এই সত্তরজন ব্যক্তি হল তারা, যাদেরকে পূর্ণ জাতির তরফ হতে বাছুর-পূজার মহাপাপ থেকে তওবা করার জন্য ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর সেখানে গিয়ে তারা আল্লাহকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করল। তৃতীয় মত হল, এই সত্তরজন ব্যক্তি বানী ইস্রাঈলকে বাছূর-পূজা করতে দেখেছিল, কিন্তু তারা তাদেরকে নিষেধ করেনি। চতুর্থ মত হল, এই সত্তরজন ব্যক্তি যাদেরকে মহান আল্লাহর আদেশে নির্বাচন করে ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে গিয়ে তারা আল্লাহর নিকট দু’আ করে। যার মধ্যে একটি দু’আ ছিল ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান কর, যা এর পূর্বে কাউকে দান করা হয়নি। আর না পরবর্তীতে কাউকে দান করা হবে।’ মহান আল্লাহর এই দু’আ পছন্দ হল না। যার কারণে তাদেরকে ভূমিকম্প দ্বারা ধ্বংস করা হল। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ দ্বিতীয় মতকে গ্রহণ করেছেন এবং ঐ ঘটনাকে সেই ঘটনা বলে নির্ধারিত করেছেন, যা সূরা বাক্বারার ৫৫নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। যেখানে তাদের উপর বিদ্যুৎ (বজ্র) রূপে মৃত্যু নেমে এসেছিল। আর এখানে ভূমিকম্পন দ্বারা মৃত্যুর কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, হতে পারে দুই আযাবই তাদের উপর এসেছিল; আকাশ হতে বজ্র ও পৃথিবী হতে ভূমিকম্প। যাই হোক, মূসা (আঃ) দু’আ ও দরখাস্ত করে বললেন, তাদের জন্য যদি ধ্বংসই অবধারিত ছিল, তাহলে এর পূর্বে যখন তারা বাছুর-পূজায় নিমগ্ন ছিল, তখনই ধ্বংস করতেন।---’ সুতরাং তার ফলে মহান আল্লাহ তাদেরকে পুনর্জীবন দান করলেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০৩-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াতগুলোতে মূসা ও হারূন (আঃ) এবং তাদের চিরশত্রু ফির‘আউনের আলোচনা করা হয়েছে। মূসা (আঃ) একজন উলূল আযম রাসূল, আর ফির‘আউন হল দুনিয়াতে বড় রব দাবীদার একজন তাগুত। উভয়ের পরিচয় সূরা বাকারার ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (আঃ)-এর মুখে তোতলামী থাকার কারণে তাঁর দু‘আর কারণে দাওয়াতী কাজে সহযোগী হিসেবে বড় ভাই হারূন (আঃ)-কে নাবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়।
আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ফির‘আউনের কাছে রবের দাওয়াত দিয়ে পাঠালেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْۭ بَعْدِھِمْ مُّوْسٰی بِاٰیٰتِنَآ اِلٰی فِرْعَوْنَ وَمَلَائِھ۪)
“তাদের পর মূসাকে আমার নিদর্শনসহ ফির‘আউন ও তার পরিষদবর্গের নিকট পাঠিয়েছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১০৩)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِذْهَبَآ إِلٰي فِرْعَوْنَ إِنَّه۫ طَغٰي)
‘তোমরা উভয়ে ফির‘আউনের নিকট যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে। (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৩)
মূসা ফির‘আউনের কাছে গিয়ে বললেন:
(إِنَّا رَسُوْلُ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)
‘আমরা জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত রাসূল। (সূরা শুআরা ২৬:১৬)
তারপর রবের দাওয়াত শুনে ফির‘আউন বলে:
(فَمَنْ رَّبُّكُمَا يٰمُوْسٰي)
‘‘হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক?’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৯) কারণ ফির‘আউন জানত আমিই সবচেয়ে বড় রব। মিসর আমার কর্তৃত্বাধীন, আমার আদেশে সব কিছু হচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(وَنَادٰی فِرْعَوْنُ فِیْ قَوْمِھ۪ قَالَ یٰقَوْمِ اَلَیْسَ لِیْ مُلْکُ مِصْرَ وَھٰذِھِ الْاَنْھٰرُ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِیْﺆ اَفَلَا تُبْصِرُوْنَ)
“ফিরআ‘উন তার সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বলে ঘোষণা করল: হে আমার সম্প্রদায়! মিসরের বাদশাহী কি আমার নয়? এই নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত, তোমরা কি দেখ না?” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১) তাছাড়া মূসা (আঃ)-কে ছোটবেলা থেকে আমিই লালন-পালন করে আসছি। সুতরাং আমিই হলাম রব। তাই সে মূসা (আঃ)-কে এরূপ প্রশ্ন করল।
মূসা (আঃ) জবাবে বললেন:
(رَبُّنَا الَّذِيْ أَعْطٰي كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَه۫ ثُمَّ هَدٰي)
“আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন।” (সূরা ত্বা-হা- ২০:৫০)
(فَظَلَمُوْا بِهَا)
অর্থাৎ রবের দাওয়াত পাওয়ার পর সে অস্বীকার করল এবং কুফরী করল। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَجَحَدُوْا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَآ أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَّعُلُوًّا ط فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِيْنَ)
“তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল। দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” (সূরা নামল ২৭:১৪)
(فَأَرْسِلْ مَعِيَ بَنِيْ إِسْرَا۬ئِيْلَ)
‘আমার সাথে বানী ইসরাঈলকে দিয়ে দাও’ বানী ইসরাঈলের আসল বাসস্থান ছিল শাম এলাকা। ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে তারা মিসরে চলে আসে এবং এখানেই বসবাস শুরু করে। ফির‘আউন তাদেরকে দাস বানিয়েছিল এবং তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করে। তাই মূসা (আঃ) বললেন: বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে দিয়ে দিন- আমি তাদের নিয়ে চলে যাব।
(فَأَلْقٰي عَصَاهُ)
‘সে তার লাঠি নিক্ষেপ করল’ এখানে মূসা (আঃ)-এর মু‘জিযাহ সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। মূসা (আঃ) যখন ফির‘আউনকে বলেছেন- আমি নিদর্শন নিয়ে এসেছি। ফির‘আউন বলল, নিদর্শন দেখাও। মূসা (আঃ) তখন লাঠি মাটিতে ছেড়ে দিলে তা বড় অজগর সাপে পরিণত হল। এ অবস্থা দেখে ফির‘আউন পরিষদবর্গকে বলল: সে একজন বিজ্ঞ জাদুকর। এর পরবর্তী ঘটনা আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
(سَحَرُوْآ أَعْيُنَ النَّاسِ)
‘তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল’। ফির‘আউন শহরের বিজ্ঞ জাদুকরদের নিয়ে আসলো। জাদুকররা মূসা (আঃ)-কে জাদু প্রদর্শনের কথা বললে মূসা (আঃ) বললেন: ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর।’ তারা তাদের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলে এমন বড় বড় সাপে পরিণত হয় যে, তাদের জাদুর প্রভাবে মূসা (আঃ)-এর মনে হল তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاَوْجَسَ فِیْ نَفْسِھ۪ خِیْفَةً مُّوْسٰی , قُلْنَا لَا تَخَفْ اِنَّکَ اَنْتَ الْاَعْلٰی , وَاَلْقِ مَا فِیْ یَمِیْنِکَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوْاﺚ اِنَّمَا صَنَعُوْا کَیْدُ سٰحِرٍﺚ وَلَا یُفْلِحُ السَّاحِرُ حَیْثُ اَتٰی , فَاُلْقِیَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوْٓا اٰمَنَّا بِرَبِّ ھٰرُوْنَ وَمُوْسٰی)
“মূসা তার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করল। আমি বললাম, ‘ভয় কর না, তুমিই বিজয়ী। ‘তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর, এটা তারা যা করছে তা গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা কেবল জাদুকরের কৌশল। জাদুকর যেরূপ নিয়ে আসুক, সফল হবে না।’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৬৬-৬৯)
(اٰمَنَّا بِرَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)
‘আমরা বিশ্ব প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি’ অর্থাৎ যখন জাদুকররা বুঝতে পারল, মূসা যা প্রদর্শন করছে তা জাদু নয় তখন তারা সিজদাবনত হল এবং ঈমান আনল।
অবশেষে ফির‘আউন তাদেরকে শূলবিদ্ধ করে হত্যা করে।
(فَإِذَا جَا۬ءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ)
অর্থাৎ যখন তাদের ফল-ফসল ভাল হয়, দেশে কোন দুর্ভিক্ষ থাকে না তখন তারা বলে এসব আমাদের অর্জন, আমাদের কারণে হয়েছে।
আর যদি অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন তারা মূসা (আঃ) ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে অশুভ কারণ মনে করে। অর্থাৎ মূসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা এসব অকল্যাণের কারণ বলে অপবাদ দিত।
(فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوْفَانَ)
‘অতঃপর তাদের উপর তুফান প্রেরণ করেছি’ এখানে মূসা (আঃ)-এর অবাধ্য জাতি ফির‘আউনের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য পরপর যে আযাব এসেছিল তার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে।
الطُّوْفَانَ বা তুফান। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এমন বৃষ্টি যা ডুবিয়ে দেয় এবং শস্যসমূহকে মূলোৎপাটন করে দেয়। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন: এমন তুফান দেয়া হয়েছিল যাতে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছিল। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
وَالْجَرَادَ বা পঙ্গপাল। একদিন হঠাৎ হাজার হাজার পঙ্গপাল এসে ফির‘আউনের সকল ফসল খেয়ে ফেলে।
আর পাশাপশি বানী ইসরাঈলের ঘরবাড়ি, শস্যভূমি ও বাগবাগিচা সবই সুরক্ষিত ছিল। ফির‘আউনের সম্প্রদায় ছুটে গেল মূসা (আঃ)-এর কাছে। তারা এ আযাব চলে যাওয়ার জন্য কাতর কণ্ঠে নিবেদন জানাল এবং ওয়াদা করল যে, এই আযাব চলে গেলে তারা ঈমান আনবে। এরূপ কথা সকল আযাবের সময়ই বলেছিল।
وَالضَّفَادِعَ
বা ব্যাঙ। পুনরায় যখন তারা অবাধ্য হল তখন ব্যাঙ দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি, হাড়ি-বাতিল, জামা-কাপড় ইত্যাদি ভরে দিলেন। কোন স্থানে বসলে সাথে সাথে শত শত ব্যাঙের নীচে তলিয়ে যেত।
وَالْقُمَّلَ
উকুন। উকুন সাধারণত মানুষের মাথায় থাকে। এখানে ব্যাপক অর্থে ঘুন পোকা ও কেড়ি পোকাকেও গণ্য করা হয়েছে যা ফির‘আউনের সকল প্রকার কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা, খাট-পালঙ্ক ও আসবাবপত্র এবং খাদ্য-শস্যে লেগেছিল। এছাড়া দেহের সর্বত্র সর্বদা উকুনের কামড়ে তারা অতিষ্ঠ হয়েছিল।
وَالدَّمَ বা রক্ত। তাদের শাস্তিস্বরূপ এবার আল্লাহ তা‘আলা রক্ত দিলেন। খাদ্যে ও পান পাত্রে রক্ত, কুয়া ও পুকুরে রক্ত, তরি-তরকারীতে রক্ত, কলসি-বালতিতে রক্ত। খেতে বসলে সাথে সাথে থালা বাটিতে রক্ত ভরে যেত। পানি মুখে নেয়ামাত্র গ্লাস ভর্তি রক্ত হয়ে যেত। এসব আযাব দেয়ার পরেও তারা ঈমান আনেনি।
এদের এই হঠকারিতা ও কপট আচরণের কথা আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন এভাবে:
(فَاسْتَكْبَرُوْا وَكَانُوْا قَوْمًا مُّجْرِمِيْنَ)
“অতঃপর তারা অহঙ্কার করল আর তারা তো ছিল অপরাধী সম্প্রদায়।”
এছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে অনেক শাস্তি দিয়েছিলেন। সবশেষে তাদেরকে সদলবলে সাগরে ডুবিয়ে মারেন।
(وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِيْنَ كَانُوْا يُسْتَضْعَفُوْنَ)
অর্থাৎ যাদেরকে ফির‘আউন দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং যাদের ওপর নানাভাবে জুলুম করত, এদেরকে বরকতময় রাজ্য- শাম দেশের উত্তরাধিকারী বানাতে চান। সেখানে মহান আল্লাহ তা‘আলা আমালিকাদের পর বানী ইসরাঈলকে বিজয়ী করেন। মূসা ও হারূন (আঃ)-এর ইনতিকালের পর বানী ইসরাঈলরা শাম দেশে তখন গেলেন যখন ইউশা বিন নূম আমালেকাদেরকে পরাজিত করে বানী ইসরাঈলদের জন্য রাস্তা সহজ করে দিলেন।
(قَالُوْا يَا مُوسٰي اجْعَلْ لَّنَا إِلٰهًا)
অর্থাৎ যখন মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেলেন আর ফির‘আউন ও তার দলবল সমুদ্রে ডুবে গেল, ওপারে পার হয়ে বানী ইসরাঈল দেখল সেখানকার মানুষ প্রতিমা পূজা করছে।
ইবনু জুরাইজ (আঃ) বলেন: তারা গরুর মূর্তি বানিয়ে পূজা করত যার কারণে গো-বৎসের পূজা করতে বানী ইসরাঈলদের ইচ্ছা জাগে। তাই তারা মূসা (আঃ)-কে বলল: হে মূসা তাদের যেমন ইলাহ আছে তেমনি আমাদের ইলাহ বানিয়ে দাও।
আবূ ওকিদী আল লাইসি বলেন: সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে মক্কা থেকে হুনাইনে গমন করেন। বর্ণনাকারী বলেছেন: কাফিরদের একটি বরই গাছ ছিল যার নিচে তারা অবস্থান করত এবং অস্ত্র-সস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত।
তাকে ذات أنواط ‘যাতে আনওয়াত’ বলা হত। তিনি বলেছেন: আমরা সে সবুজ গাছটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা বললাম: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল! তাদের যেমন “যাতে আনওয়াত” আছে আমাদের তেমন কিছু বানিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললাম: সে সত্ত্বার শপথ! তোমরা তেমন কথা বলেছ যেমন কথা মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় মূসাকে বলেছিল
(اجْعَلْ لَّنَا إِلٰهًا كَمَا لَهُمْ اٰلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُوْنَ)
তাদের মত আমাদের জন্য মা‘বূদ বানিয়ে দিন। (ইবনু জারীর, ১৩/ ৮১- ৮২)
(وَوَاعَدْنَا مُوسٰي ثَلَاثِيْنَ لَيْلَةً)
অর্থাৎ ফির‘আউন ও তার দলবল ধ্বংস করার পর বানী ইসরাঈলদেরকে হিদায়াতের জন্য ধর্মগ্রন্থ দেবেন- এ জন্য মূসা (আঃ)-কে ত্রিশ রাত্রির জন্য তূর পাহাড়ে আহ্বান জানালেন। পরে আরো দশদিন যোগ করে চল্লিশ রাত্রি পূর্ণ করলেন।
পরের দশদিনের ব্যাপারে মুফাসসিরগণ মতানৈক্য করেছেন। অধিকাংশ মুফাসসির বলেন:
ত্রিশরাত বলতে যুলকাদা মাসের ত্রিশরাত আর দশ রাত বলতে যুলহজ্জের দশরাত।
ইবনু আব্বাস, মুজাহিদসহ প্রমুখ মুফাসসির বলেন: এ হিসেবে মূসা (আঃ)-এর নির্দিষ্ট সময় কুরবানীর দিন পূর্ণ হয়। এ দিনেই মূসা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেন আর এ দিনেই আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (আঃ)-এর ওপর দীন ইসলামকে পূর্ণ করে দেন। যেমন বলেন:
(الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا)
মূসা (আঃ) তূর পাহাড়ে যাবার সময় হারূন (আঃ)-কে বানী ইসরাঈলদের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। পরের আয়াতেই এর আলোচনা রয়েছে।
(لَنْ تَرَانِيْ)
মূসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে চাইলে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে বললেন: তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাবে না। অর্থাৎ দুনিয়াতে চর্মচোখ দ্বারা আমাকে কখনো দেখা সম্ভব না। আখিরাতে মু’মিনগণ আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে- এর প্রমাণাদি পূর্বের সূরায় আলোচনা করা হয়েছে।
(بِرِسٰلٰتِيْ وَبِكَلَامِيْ)
অর্থাৎ মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা‘আলা নবুওয়াত দান করলেন এবং সরাসরি তার সাথে কথা বললেন। আর তাদের যা প্রয়োজন ফলকে সবকিছু লিখে দিয়ে দিলেন-
মূসা (আঃ) চল্লিশ দিন পূর্ণ হবার পর লিখিত ফলকসহ ফিরে এসে যখন দেখলেন, তার উম্মাত গো-বৎস পূজায় লিপ্ত হয়ে গেছে তখন রাগে ফলক ফেলে দিলেন এবং হারূনের মাথা ধরে শাসাতে লাগলেন। পরে অবশ্য ফলক তুলে নিয়েছিলেন।
(وَاتَّخَذَ قَوْمُ مُوسٰي مِنْۭ بَعْدِه۪)
অর্থাৎ মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ রাত্রির জন্য তূর পাহাড়ে গেলেন, তখন সামেরী নামক জনৈক ব্যক্তি সম্প্রদায়ের সোনার অলঙ্কার জমা করে তা থেকে একটি বাছুর তৈরি করল। যার মধ্যে জিবরীল (আঃ)-এর ঘোড়ার পায়ের নীচের কিছু মাটি মিশিয়ে দিল যা তার কাছে রাখা ছিল এবং যার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা প্রাণ প্রতিষ্ঠার শক্তি রেখে দিলেন। যার কারণে বাছুরটি গরুর মত শব্দ করত। এ সম্পর্কে সূরা ত্বহার ৮৮-৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত আছে।
(وَاخْتَارَ مُوسٰي قَوْمَه۫ سَبْعِيْنَ)
মূসা (আঃ) নিজ জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করলেন তূর পাহাড়ে নিয়ে যাবার জন্য। এ সত্তরজন ব্যক্তি কারা ছিল তা নিয়ে অনেক মতামত রয়েছে।
একটি মত হল: যখন মূসা (আঃ) তাদেরকে তাওরাতের আহকাম শোনালেন, তারা বলল- আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, এ কিতাব সত্যিই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। যতক্ষণ আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে স্বয়ং কথা বলতে না শুনব ততক্ষণ এটাকে মানব না। সুতরাং তিনি সত্তর জন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন এবং তাদেরকে তূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বললেন যা তারাও শুনল। কিন্তু তারা নতুন দাবী করে বসল যতক্ষণ আল্লাহ তা‘আলাকে আমরা নিজ চোখে না দেখব ততক্ষণ ঈমান আনব না।
দ্বিতীয় মত হল: এ সত্তর জন ব্যক্তি হল তারা যাদেরকে পুরো জাতির তরফ হতে বাছুর পূজার মহাপাপ থেকে তাওবাহ করার জন্য তূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তৃতীয় মত হল: এ সত্তর জন ব্যক্তি বানী ইসরাঈলকে বাছুর পূজা করতে দেখেছিলেন। কিন্তু তারা নিষেধ করেনি। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ দ্বিতীয় মত গ্রহণ করেছেন।
(إِنَّا هُدْنَآ إِلَيْكَ)
‘আমরা তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছি’ এ আয়াত থেকেই অনেকে বলেন, মূসা (আঃ)-এর অনুসারীদেরকে এ জন্য ইয়াহূদী বলা হয়।
(وَرَحْمَتِيْ وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ)
এটি আল্লাহ তা‘আলার করুণার পরিব্যাপ্তি বটে যে, পৃথিবীতে সৎ অসৎ সবাই আল্লাহ তা‘আলার করুণা হতে উপকৃত হচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলার রহমতের একশত অংশ আছে। তার মধ্যে একটি অংশ দুনিয়াতে দিয়েছেন। যার কারণে সকল সৃষ্টি একে অপরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে থাকে। এমনকি পশুরাও নিজ নিজ বাচ্চার ওপর মায়া করে নিজের পা তুলে নেয়। আর তিনি রহমতের নিরানব্বই ভাগ অংশ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন মু’মিনদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা এ দয়া প্রদর্শন করবেন। (সহীহ মুসলিম হা: ২১০৮, ইবনু মাযাহ হা. ৪২৯৩)
(الرَّسُوْلَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ)
উম্মি নাবী অর্থ হল, নিরক্ষর নাবী। যিনি লেখাপড়া জানেন না। এখানে উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মাদ (সাঃ)। কারণ তিনি লেখাপড়া জানতেন না।
(إِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ إِلَيْكُمْ جَمِيْعَا)
এ আয়াতও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত সার্বজনীন রিসালাত প্রমাণিত হবার জন্য স্পষ্ট দলীল, এতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে আদেশ করছেন যেন তিনি ঘোষণা করে দেন, হে বিশ্বের মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতির জন্য ত্রাণকর্তা ও রাসূল। তাই পরিত্রাণ ও সুপথ খৃস্ট ধর্মে নেই, ইয়াহূদী ধর্মে নেই এবং অন্য কোন ধর্মেও নেই। পরিত্রাণ ও সুফল যদি থাকে তাহলে কেবল ইসলাম ধর্মেই রয়েছে।
(يُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَكَلِمٰتِهِ)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর কালেমার প্রতি ঈমান আনে, এখানে কালিমার কথা বলা হল। কালিমার পরিমাণ অন্যত্র উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ لَّوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِّكَلِمٰتِ رَبِّيْ لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَنْ تَنْفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّيْ وَلَوْ جِئْنَا بِمِثْلِه ۪ مَدَدًا)
“বল: ‘আমার প্রতিপালকের কালিমা লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে- আমরা এটার সাহায্যের জন্য অনুরূপ আরও সমুদ্র আনলেও।’ (সূরা কাহ্ফ ১৮:১০৯)
অন্যত্র বলেন:
(وَلَوْ أَنَّ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَّالْبَحْرُ يَمُدُّه۫ مِنْۭ بَعْدِه۪ ۪ ۪ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمٰتُ اللّٰهِ ط إِنَّ اللّٰهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ)
“আর সমগ্র পৃথিবীতে যত গাছ আছে তা সবই যদি কলম হয় এবং যে সমুদ্র রয়েছে তার সাথে যদি আরও সাতটি সমুদ্র শামিল হয়ে কালি হয় তবুও আল্লাহ তা‘আলার কালিমা লেখা শেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা প্রতাপশালী, মহা প্রজ্ঞাময়।” (সূরা লুকমান ৩১:২৭)
আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আবূ বাকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ) এর মাঝে বিতর্ক হল, আবূ বকর (রাঃ) উমার (রাঃ) কে রাগিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর রাগান্বিত অবস্থায় উমার সেখান থেকে চলে গেলেন, আবূ বকর (রাঃ) তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে তাঁর পিছু নিলেন, কিন্তু উমার (রাঃ) ক্ষমা করলেন না, বরং তাঁর সম্মুখের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দরবারে আসলেন। আবূ দারদা (রাঃ) বলেন: আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে ছিলাম, ঘটনা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমাদের এ সঙ্গী আবূ বকর (রাঃ) আগে কল্যাণ লাভ করেছে। তিনি বলেন: এতে উমার (রাঃ) লজ্জিত হলেন এবং সালাম করে নাবী (সাঃ) এর পাশে বসে পড়লেন ও সব কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে বর্ণনা করলেন। আবূ দারদা (রাঃ) বলেন: এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অসন্তুষ্ট হলেন। আবূ বকর (রাঃ) বারবার বলছিলেন, হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ)! আমি অধিক দোষী ছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমরা আমার খাতিরে আমার সাথীর ক্রটি উপেক্ষা করবে কি? তোমরা আমার খাতিরে আমার সঙ্গীর ক্রটি উপেক্ষা করবে কি? এমন একদিন ছিল যখন আমি বলেছিলাম: হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সকলের জন্য রাসূল, তখন তোমরা বলেছিলে, “তুমি মিথ্যা বলেছ” আর আবূ বকর (রাঃ) বলেছিল, আপনি সত্য বলেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪০)
– أسْبَاطُ - (وَقَطَّعْنَاهُمُ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أَسْبَاطًا)
শব্দটি سَبْطٌ এর বহুবচন, অর্থ পৌত্র। এখানে গোত্রের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ইয়াকুব (আঃ)-এর বারটি সন্তান থেকে বারটি গোত্র আবির্ভূত হল। প্রত্যেক গোত্রের জন্য এক একটি দলপতি নিযুক্ত করেছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيْبًا)
“তাদের মধ্য হতে বার জন নেতা নিযুক্ত করেছিলাম” (সূরা মায়িদাহ ৫:১২)
পরের আয়াতগুলো সম্পর্কে সূরা বাক্বারায় আলোচনা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দীনের দাওয়াত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। যেমন মূসা (আঃ) ফির‘আউনের কাছে দিয়েছেন।
২. জাদু কুফরী কাজ, এর প্রভাব রয়েছে।
৩. দুনিয়ার সম্পদ মু’মিনদের উত্তরাধিকার করে দেয়া হয়েছে, কাফের-মুশরিকাদের কোন অংশ নেই। তবে মু’মিনদের ঈমান দুর্বল ও দীন থেকে সরে পড়ার কারণে কাফেররা এসকল সম্পদ দখল করে আছে।
৪. সত্যের নিদর্শন দেখে জাদুকররা ঈমান আনয়ন করেছে, শত বাধা ও হুমকি ঈমান থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
৫. বানী ইসরাঈলদের ওপর পরপর কয়েকটি আযাব প্রদান করে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল।
৬. মূসা (আঃ) সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেছেন।
৭. চর্ম চোখে আল্লাহ তা‘আলাকে দুনিয়াতে দেখা অসম্ভব।
৮. আল্লাহ তা‘আলা কথা বলেন এবং তাঁর কথার আওয়াজ রয়েছে।
৯. নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা জাহানের নাবী। তাঁর খবর যার কাছেই পৌঁছবে অতঃপর ঈমান আনবে না, সে কাফির।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৫৫-১৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সত্তরজন লোক নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং মূসা (আঃ) এরূপ সত্তরজন লোক নির্বাচন করে তাদেরকে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করার জন্যে রওয়ানা হন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করলো তখন নিম্নরূপ কথা বললোঃ
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান করুন যা আপনি ইতিপূর্বে কাউকে দান করেননি এবং না আমাদের পরে কাউকেও দান করবেন। তাদের এই প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলার কাছে পছন্দনীয় হলো না। সুতরাং ভূমিকম্প তাদেরকে ঘিরে ফেললো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন ত্রিশজনসহ আসতে বলেছিলেন যারা গো-বৎস পূজার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং দুআর জন্যে একটা সময় ও স্থান নির্ধারণ করেছিল। মূসা (আঃ) সত্তরজন লোক নির্বাচন করলেন, যাদেরকে নিয়ে তিনি ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে বের হলেন। কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে নিয়ে অঙ্গীকার স্থলে পৌছলেন তখন তারা তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা যে পর্যন্ত না আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবো সেই পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। এখন আমাদেরকে দেখিয়ে দিন। এই আস্পর্ধামূলক কথার শাস্তি হিসেবে তাদের উপর বিদ্যুত পতিত হলো এবং সবাই ওখানে মরে পড়ে থাকলো। হযরত মূসা (আঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় উঠে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি এখন বানী ইসরাঈলের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে কি জবাব দেবো? এরা তো তাদের মধ্যে ভাল লোক ছিল, আপনি তাদেরকেও ধ্বংস করে দিলেন। হে আল্লাহ! যদি আপনি তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করে দিতেন।”(হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)
হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্য থেকে সত্তরজন খুবই ভাল লোককে বেছে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “চল, আল্লাহর কাছে যাই। তোমরা কওমের অবশিষ্ট লোকদের পক্ষ থেকে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ এবং শরীর ও কাপড় পবিত্র করে নাও।” অতঃপর তিনি নির্ধারিত দিনে তাদেরকে নিয়ে দূরে সাইনার দিকে চললেন। এর সবকিছুই আল্লাহর অবগতি ও অনুমতিক্রমে হয়েছিল। এখন এই সত্তরজন লোক যারা মূসা (আঃ)-এর পরিচালনাধীনে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছিল তারা বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর সাথে আপনার বাক্যালাপ হয়ে থাকে, আমাদেরকে তা শুনতে দিন।” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি একটা অত্যন্ত ঘন মেঘখণ্ডের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পাহাড়টিও মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং তার লোকগুলোকে বললেনঃ “তোমরাও আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও।” মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এমন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠতো যে, কেউই তার চেহারার প্রতি দৃষ্টি রাখতে পারতো । এজন্যে তিনি স্বীয় চেহারার উপর পর্দা ফেলে দিতেন। ঐলোকগুলো যখন মেঘখণ্ডের নিকটে এসে ওর মধ্যে প্রবেশ করলো তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল । তারা মূসা (আঃ) ও আল্লাহর কথা শুনতে লাগলো। তিনি মূসা (আঃ)-কে আদেশ ও নিষেধ করে বলেছিলেনঃ “এটা কর এবং ওটা করো না।” যখন তিনি ওটা থেকে মুক্ত হলেন এবং মেঘ সরে গেল তখন তিনি ঐ লোকদের দিকে মনঃসংযোগ করলেন। তারা তাঁকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! যে পর্যন্ত না আপনি আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে দেখাবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনবো না। তাদের এই ঔদ্ধত্যের কারণে বিজলী তাদেরকে পাকড়াও করলো। তাদের প্রাণপাখী দেহ থেকে বেরিয়ে গেল। তারা মৃত অবস্থায় পড়ে রইলো। এ দেখে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপের সুরে বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যখন এদেরকে ধ্বংস করারই ইচ্ছে করেছিলেন তখন তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করলেন না কেন? এরা বোকামীর কাজ করেছে। আমার পিছনে আপনি কি বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করে দিবেন?`
হযরত আলী ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মূসা (আঃ), হারূন (আঃ), শাবর ও শাবীর প্রমুখ মিলে এক পাহাড়ের উপত্যকার দিকে গেলেন। হারূন (আঃ) একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মৃত্যু দান করেন। মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিকট প্রত্যাবর্তন করলে তারা তাকে হারূন (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মূসা (আঃ) উত্তরে বলেন যে, তিনি মারা গেছেন। তারা তখন বলে- “না, বরং সম্ভবতঃ আপনিই তাকে মেরে ফেলেছেন। তিনি অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন।” মূসা (আঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা, তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক বেছে নাও।” তারা সত্তরজন লোক নির্বাচন করলো। অতঃপর তারা হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনাকে কে হত্যা করেছে?` হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহ থেকে শব্দ আসলোঃ “আমাকে কেউই হত্যা করেনি। আমি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছি।” লোকগুলো তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এরপরে আর কখননা আমরা আপনার অবাধ্য হবো না।” তারা শাস্তি এই পেলো যে, বিদ্যুৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো। হযরত মূসা (আঃ) বিনা কারণে ডানে বামে ঘুরতেন এবং বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি কি এই বোকা লোকদের কথায় আমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন? এটা তো আপনার পরীক্ষা ছিল। আপনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সকলকেই জীবিত করে দিলেন এবং সকলকেই নবী করলেন। এটা হচ্ছে অত্যন্ত গারীব ও অবিশ্বাসযোগ্য হাদীস। এই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে আম্মারা ইবনে উবাইদ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত ব্যক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “ঐ লোকগুলোর উপর শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের সামনে গো-বৎসের পূজা চলছিল, অথচ তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। তাদের কওমকে তারা ঐ শিরকের কাজ থেকে নিষেধ পর্যন্ত করেনি।” এই জন্যেই হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নির্বোধ নামে অভিহিত করেছেন। তাদের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা আপনার একটা পরীক্ষা।` নিম্নরূপে তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছিলেনঃ
“হে আল্লাহ! এটাতো আপনার পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। একমাত্র আপনারই হুকুম চলে থাকে। আপনি যা চান তাই হয়। হিদায়াত দান ও পথভ্রষ্টকরণ আপনারই হাতে। আপনি যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ কুপথ দেখাতে পারে না। আপনি যাকে দান থেকে বিমুখ করেন তাকে কেউ দান করতে পারে না। পক্ষান্তরে আপনি যাকে দান করেন তা তার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। রাজ্যের মালিক আপনিই। হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আপনারই রয়েছে। খাক ও আমর আপনার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।”
এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের অলী বা অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন ও আমাদের উপর দয়া করুন। কেননা, আপনিই তো হচ্ছেন সর্বোত্তম ক্ষমাশীল।”
(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঢেকে ফেলা, গোপন করা এবং পাপের কারণে পাকড়াও না করা। আর (আরবী) এর সঙ্গে যখন (আরবী) যুক্ত হয় তখন ভাবার্থ হয়। ক্ষমা করে দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলার তাকে আগামীতে পুনরায় পাপে জড়িত না করা।
“হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে এই দুনিয়াতেও কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ নির্ধারিত করুন।” (আরবী) -এর তাফসীর সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। “আমরা তাওবা করেছি এবং আপনার নিকটই প্রত্যাবর্তন করেছি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈল (আরবী) বলেছিল বলেই তাদের নাম ইয়াহুদী হয়ে গেছে। (এটা ইবনে জারীর তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর জাবীর আলজাফী নামক বর্ণনাকারী দুর্বল)
মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! এটা আপনার পরীক্ষা। তাই ইরশাদ হচ্ছে- শাস্তি সেই পায় যাকে শাস্তি দেয়ার আমি ইচ্ছা করি এবং মনে করি যে, তার শাস্তি হওয়াই উচিত। নচেৎ, আমার করুণা তো প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। আমি যা চাই তাই করি। প্রতিটি কাজে নিপণতা ও ন্যায় পরায়ণতার অধিকার আমারই । রহমতযুক্ত আয়াত খুবই বিরাট ও ব্যাপক এবং সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মুখে উচ্চারিত হয়“হে আমাদের প্রভু! আপনার করুণা ও জ্ঞান সব কিছুকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।”
জুনদুব ইবনে আবদিল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন বেদুইন আসলো। সে তার উটটি বসিয়ে বাধলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়লো। নামায শেষে উষ্ট্ৰীটিকে খুলে সে ওর উপর সওয়ার হলো এবং দুআ করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দয়া করুন। এই দয়ায় আপনি অন্য কাউকেও শরীক করবেন না। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বললেনঃ “আচ্ছা বলতো, এই লোকটি বেশী পথভ্রষ্ট ও নির্বোধ, না তার উটটি ? সে যা বলছে তা তোমরা শুনেছো কি?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হ্যা শুনেছি।' তিনি বললেনঃ “আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। তিনি স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এক ভাগ তিনি সমস্ত মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। দানব, মানব এবং চতুষ্পদ জন্তু সবাই এই অংশ থেকেই অংশ পেয়েছে। বাকী নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের জন্যে নির্দিষ্ট রেখেছেন। এখন বল তো, এই উভয়ের মধ্যে কে বেশী নির্বোধ?” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এই একশ’ ভাগের মধ্যে মাত্র এক ভাগ তিনি দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছেন। এই এক ভাগ দেয়ার কারণেই সৃষ্টজীব একে অপরের উপর করুণা ও মমতা দেখিয়ে থাকে। এ কারণেই সমস্ত প্রাণী নিজেদের সন্তান ও বাচ্চাদের উপর স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করে থাকে। বাকী নিরানব্বই ভাগ করুণা তার কাছেই রয়েছে। এগুলোর প্রকাশ কিয়ামতের দিন ঘটবে। কিয়ামতের দিন এই একভাগ করুণার সাথে সঞ্চিত নিরানব্বই ভাগ করুণা মিলিয়ে দেয়া হবে।”
আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর একশ’ ভাগ রহমত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক ভাগ মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন । এর দ্বারাই মানুষ, বন্য পশু এবং পাখী একে অপরের উপর দয়া দেখিয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আল্লাহর শপথ! ধর্মের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি পাপী এবং জীবিকা উপার্জনের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি নির্বোধ সেও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তিও জান্নাতে প্রবেশ করবে যাকে পাপের কারণে আগুন পরিবেষ্টন করেছে। তাঁর রহমত কিয়ামতের দিন এমনভাবে ছেয়ে যাবে যে, ইবলীসও তার থেকে কিছু অংশ পাওয়ার আশা পোষণ করবে।” (এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব । সা’দ নামক এর একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত ব্যক্তি)
আল্লাহ পাক বলেনঃ ঐ ব্যক্তিই আমার রহমতের হকদার হবে, যে আমাকে ভয় করে ও পরহেজগারী অবলম্বন করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমার প্রভু নিজের জন্যে রহমতকে ফরয করে নিয়েছেন।”
‘তারা তাকওয়া অবলম্বন করে অর্থাৎ শিক ও কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তারা যাকাত প্রদান করে। বলা হয়েছে যে, এখানে যাকাত দ্বারা নসের যাকাত বুঝানো অথবা মালের যাকাত বুঝানো হয়েছে কিংবা দু'টোকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা, এটা হচ্ছে মক্কী আয়াত।
তারা আমার আয়াত সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করে অর্থাৎ ওগুলোর সত্যতা স্বীকার করে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।