আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 116)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 116)



হরকত ছাড়া:

قال ألقوا فلما ألقوا سحروا أعين الناس واسترهبوهم وجاءوا بسحر عظيم ﴿١١٦﴾




হরকত সহ:

قَالَ اَلْقُوْا ۚ فَلَمَّاۤ اَلْقَوْا سَحَرُوْۤا اَعْیُنَ النَّاسِ وَ اسْتَرْهَبُوْهُمْ وَ جَآءُوْ بِسِحْرٍ عَظِیْمٍ ﴿۱۱۶﴾




উচ্চারণ: কা-লা আলকূ ফালাম্মা আলকাও ছাহারূআ‘ইউনান না-ছি ওয়াছতারহাবূহুম ওয়া জাঊ বিছিহরিন ‘আজীম।




আল বায়ান: সে বলল, ‘তোমরা নিক্ষেপ কর।’ অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল তখন তারা লোকদের চোখে যাদু করল এবং তাদেরকে ভীত করে তুলল। তারা বড় যাদু প্রদর্শন করল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৬. তিনি বললেন, ‘তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকদের চোখে জাদু করল, তাদেরকে আতংকিত করল এবং তারা এক বড় রকমের জাদু নিয়ে এল।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: সে বলল, ‘তোমরাই ছুঁড়’। যখন তারা বান ছুঁড়ল তখন লোকজনের চোখ যাদুগ্রস্ত হয়ে গেল, তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা বড়ই সাংঘাতিক এক যাদু দেখাল।




আহসানুল বায়ান: (১১৬) সে বলল, ‘তোমরাই (প্রথমে) নিক্ষেপ কর।’[1] সুতরাং যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকের চোখে যাদু করল, তাদেরকে আতঙ্কিত করল এবং তারা এক বড় রকমের যাদু দেখাল।[2]



মুজিবুর রহমান: বললঃ তোমরাই নিক্ষেপ কর। সুতরাং যখন যাদুকরেরা নিক্ষেপ করল তখন লোকের চোখে ধাঁধাঁর সৃষ্টি করল এবং তাদেরকে ভীত ও আতংকিত করল, তারা এক বড় রকমের যাদু দেখাল।



ফযলুর রহমান: সে বলল, “তোমরাই নিক্ষেপ কর।” তারপর তারা যখন নিক্ষেপ করল তখন তারা লোকদের চোখগুলোকে সম্মোহিত করল, তাদেরকে আতঙ্কগ্রস্ত করল এবং একটা বড় যাদু প্রদর্শন করল।



মুহিউদ্দিন খান: তিনি বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল তখন লোকদের চোখগুলোকে বাধিয়ে দিল, ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল এবং মহাযাদু প্রদর্শন করল।



জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "তোমরাই ফেলো।" অতঃপর যখন তারা ফেললো তখন লোকদের চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়ে দিল আর তাদের ভয়াতুর করলো, আর তারা নিয়ে এলো এক বড় রকমের জাদু!



Sahih International: He said, "Throw," and when they threw, they bewitched the eyes of the people and struck terror into them, and they presented a great [feat of] magic.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১১৬. তিনি বললেন, ‘তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকদের চোখে জাদু করল, তাদেরকে আতংকিত করল এবং তারা এক বড় রকমের জাদু নিয়ে এল।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ জাদুকররা যখন তাদের লাঠি ও দড়িগুলো মাটিতে নিক্ষেপ করল, তখন দর্শকদের নযরবন্দী করে দিয়ে তাদের উপর ভীতি সঞ্চারিত করে দিল এবং মহাজাদু দেখাল। এ আয়াতের দ্বারা বুঝা যায় যে, তাদের জাদু ছিল এক প্রকার নযরবন্দী যাতে দর্শকদের মনে হতে লাগল যে, এই লাঠি আর দড়িগুলো সাপ হয়ে দৌড়াচ্ছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে সেগুলো ছিল তেমনি লাঠি ও দড়ি যা পূর্বে ছিল, সাপ হয়নি। এটা এক রকম সম্মোহনী, যার প্রভাব মানুষের কল্পনা ও দৃষ্টিকে ধধিয়ে দেয়। [ইবন কাসীর] কিন্তু তাই বলে এ কথা প্রতীয়মান হয় না যে, জাদু এ প্রকারেই সীমাবদ্ধ। বরং জাদুর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। প্রত্যেক প্রকার অনুসারে শরীআতে তার বিধানও ভিন্ন হয়ে থাকে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১১৬) সে বলল, ‘তোমরাই (প্রথমে) নিক্ষেপ কর।’[1] সুতরাং যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকের চোখে যাদু করল, তাদেরকে আতঙ্কিত করল এবং তারা এক বড় রকমের যাদু দেখাল।[2]


তাফসীর:

[1] কিন্তু যেহেতু মূসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর রসূল। তিনি ছিলেন সাহায্যপ্রাপ্ত। সেই জন্য আল্লাহর সাহায্যের উপর তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। সুতরাং তিনি নির্ভয়ে ও নির্দ্বিধায় যাদুকরদেরকে বললেন, ‘তোমরা যা দেখাতে চাও, তা প্রথমে দেখাও।’ এ ছাড়া এর মধ্যে এ কৌশলও থাকতে পারে যে, যাদুকরদের যাদুর উত্তর যখন তিনি মু’জিযারূপে দেবেন, তখন তা জনসাধারণের মনে বেশি প্রভাব ফেলবে। যার ফলে তাঁর সত্যতা প্রকাশ পাবে এবং লোকেদের জন্য ঈমান আনা সহজ হবে।

[2] কোন কোন হাদীসে বলা হয়েছে যে, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ সংখ্যায় অতিরঞ্জন করা হয়েছে। যারা সকলেই এক একটি রশি ও লাঠি মাঠে ফেলল, যা দর্শকদের চোখে ছুটাছুটি করছে বলে মনে হল। এ যেন তাদের ধারণায় ছিল বিরাট যাদু; যা তারা পেশ করেছিল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০৩-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর:



আলোচ্য আয়াতগুলোতে মূসা ও হারূন (আঃ) এবং তাদের চিরশত্রু ফির‘আউনের আলোচনা করা হয়েছে। মূসা (আঃ) একজন উলূল আযম রাসূল, আর ফির‘আউন হল দুনিয়াতে বড় রব দাবীদার একজন তাগুত। উভয়ের পরিচয় সূরা বাকারার ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (আঃ)-এর মুখে তোতলামী থাকার কারণে তাঁর দু‘আর কারণে দাওয়াতী কাজে সহযোগী হিসেবে বড় ভাই হারূন (আঃ)-কে নাবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়।



আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ফির‘আউনের কাছে রবের দাওয়াত দিয়ে পাঠালেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْۭ بَعْدِھِمْ مُّوْسٰی بِاٰیٰتِنَآ اِلٰی فِرْعَوْنَ وَمَلَائِھ۪)



“তাদের পর মূসাকে আমার নিদর্শনসহ ফির‘আউন ও তার পরিষদবর্গের নিকট পাঠিয়েছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১০৩)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اِذْهَبَآ إِلٰي فِرْعَوْنَ إِنَّه۫ طَغٰي)‏



‘তোমরা উভয়ে ফির‘আউনের নিকট যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে। (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৩)



মূসা ফির‘আউনের কাছে গিয়ে বললেন:



(إِنَّا رَسُوْلُ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)‏



‘আমরা জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত রাসূল। (সূরা শুআরা ২৬:১৬)



তারপর রবের দাওয়াত শুনে ফির‘আউন বলে:



(فَمَنْ رَّبُّكُمَا يٰمُوْسٰي)‏



‘‘হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক?’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৯) কারণ ফির‘আউন জানত আমিই সবচেয়ে বড় রব। মিসর আমার কর্তৃত্বাধীন, আমার আদেশে সব কিছু হচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(وَنَادٰی فِرْعَوْنُ فِیْ قَوْمِھ۪ قَالَ یٰقَوْمِ اَلَیْسَ لِیْ مُلْکُ مِصْرَ وَھٰذِھِ الْاَنْھٰرُ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِیْﺆ اَفَلَا تُبْصِرُوْنَ)



“ফিরআ‘উন তার সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বলে ঘোষণা করল: হে আমার সম্প্রদায়! মিসরের বাদশাহী কি আমার নয়? এই নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত, তোমরা কি দেখ না?” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১) তাছাড়া মূসা (আঃ)-কে ছোটবেলা থেকে আমিই লালন-পালন করে আসছি। সুতরাং আমিই হলাম রব। তাই সে মূসা (আঃ)-কে এরূপ প্রশ্ন করল।



মূসা (আঃ) জবাবে বললেন:



(رَبُّنَا الَّذِيْ أَعْطٰي كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَه۫ ثُمَّ هَدٰي)



“আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন।” (সূরা ত্বা-হা- ২০:৫০)



(فَظَلَمُوْا بِهَا)



অর্থাৎ রবের দাওয়াত পাওয়ার পর সে অস্বীকার করল এবং কুফরী করল। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَجَحَدُوْا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَآ أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَّعُلُوًّا ط فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِيْنَ)‏



“তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্ত‎র এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল। দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” (সূরা নামল ২৭:১৪)



(فَأَرْسِلْ مَعِيَ بَنِيْ إِسْرَا۬ئِيْلَ)



‘আমার সাথে বানী ইসরাঈলকে দিয়ে দাও’ বানী ইসরাঈলের আসল বাসস্থান ছিল শাম এলাকা। ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে তারা মিসরে চলে আসে এবং এখানেই বসবাস শুরু করে। ফির‘আউন তাদেরকে দাস বানিয়েছিল এবং তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করে। তাই মূসা (আঃ) বললেন: বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে দিয়ে দিন- আমি তাদের নিয়ে চলে যাব।



(فَأَلْقٰي عَصَاهُ)



‘সে তার লাঠি নিক্ষেপ করল’ এখানে মূসা (আঃ)-এর মু‘জিযাহ সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। মূসা (আঃ) যখন ফির‘আউনকে বলেছেন- আমি নিদর্শন নিয়ে এসেছি। ফির‘আউন বলল, নিদর্শন দেখাও। মূসা (আঃ) তখন লাঠি মাটিতে ছেড়ে দিলে তা বড় অজগর সাপে পরিণত হল। এ অবস্থা দেখে ফির‘আউন পরিষদবর্গকে বলল: সে একজন বিজ্ঞ জাদুকর। এর পরবর্তী ঘটনা আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



(سَحَرُوْآ أَعْيُنَ النَّاسِ)



‘তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল’। ফির‘আউন শহরের বিজ্ঞ জাদুকরদের নিয়ে আসলো। জাদুকররা মূসা (আঃ)-কে জাদু প্রদর্শনের কথা বললে মূসা (আঃ) বললেন: ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর‎।’ তারা তাদের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলে এমন বড় বড় সাপে পরিণত হয় যে, তাদের জাদুর প্রভাবে মূসা (আঃ)-এর মনে হল তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَاَوْجَسَ فِیْ نَفْسِھ۪ خِیْفَةً مُّوْسٰی , قُلْنَا لَا تَخَفْ اِنَّکَ اَنْتَ الْاَعْلٰی , وَاَلْقِ مَا فِیْ یَمِیْنِکَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوْاﺚ اِنَّمَا صَنَعُوْا کَیْدُ سٰحِرٍﺚ وَلَا یُفْلِحُ السَّاحِرُ حَیْثُ اَتٰی , فَاُلْقِیَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوْٓا اٰمَنَّا بِرَبِّ ھٰرُوْنَ وَمُوْسٰی)



“মূসা তার অন্ত‎রে কিছু ভীতি অনুভব করল। আমি বললাম, ‘ভয় কর‎ না, তুমিই বিজয়ী। ‘তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর‎, এটা তারা যা করছে তা গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা কেবল জাদুকরের কৌশল। জাদুকর যেরূপ নিয়ে আসুক, সফল হবে না।’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৬৬-৬৯)



(اٰمَنَّا بِرَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)



‘আমরা বিশ্ব প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি’ অর্থাৎ যখন জাদুকররা বুঝতে পারল, মূসা যা প্রদর্শন করছে তা জাদু নয় তখন তারা সিজদাবনত হল এবং ঈমান আনল।



অবশেষে ফির‘আউন তাদেরকে শূলবিদ্ধ করে হত্যা করে।



(فَإِذَا جَا۬ءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ)



অর্থাৎ যখন তাদের ফল-ফসল ভাল হয়, দেশে কোন দুর্ভিক্ষ থাকে না তখন তারা বলে এসব আমাদের অর্জন, আমাদের কারণে হয়েছে।



আর যদি অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন তারা মূসা (আঃ) ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে অশুভ কারণ মনে করে। অর্থাৎ মূসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা এসব অকল্যাণের কারণ বলে অপবাদ দিত।



(فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوْفَانَ)



‘অতঃপর তাদের উপর তুফান প্রেরণ করেছি’ এখানে মূসা (আঃ)-এর অবাধ্য জাতি ফির‘আউনের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য পরপর যে আযাব এসেছিল তার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে।



الطُّوْفَانَ বা তুফান। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এমন বৃষ্টি যা ডুবিয়ে দেয় এবং শস্যসমূহকে মূলোৎপাটন করে দেয়। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন: এমন তুফান দেয়া হয়েছিল যাতে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছিল। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



وَالْجَرَادَ বা পঙ্গপাল। একদিন হঠাৎ হাজার হাজার পঙ্গপাল এসে ফির‘আউনের সকল ফসল খেয়ে ফেলে।



আর পাশাপশি বানী ইসরাঈলের ঘরবাড়ি, শস্যভূমি ও বাগবাগিচা সবই সুরক্ষিত ছিল। ফির‘আউনের সম্প্রদায় ছুটে গেল মূসা (আঃ)-এর কাছে। তারা এ আযাব চলে যাওয়ার জন্য কাতর কণ্ঠে নিবেদন জানাল এবং ওয়াদা করল যে, এই আযাব চলে গেলে তারা ঈমান আনবে। এরূপ কথা সকল আযাবের সময়ই বলেছিল।



وَالضَّفَادِعَ



বা ব্যাঙ। পুনরায় যখন তারা অবাধ্য হল তখন ব্যাঙ দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি, হাড়ি-বাতিল, জামা-কাপড় ইত্যাদি ভরে দিলেন। কোন স্থানে বসলে সাথে সাথে শত শত ব্যাঙের নীচে তলিয়ে যেত।



وَالْقُمَّلَ



উকুন। উকুন সাধারণত মানুষের মাথায় থাকে। এখানে ব্যাপক অর্থে ঘুন পোকা ও কেড়ি পোকাকেও গণ্য করা হয়েছে যা ফির‘আউনের সকল প্রকার কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা, খাট-পালঙ্ক ও আসবাবপত্র এবং খাদ্য-শস্যে লেগেছিল। এছাড়া দেহের সর্বত্র সর্বদা উকুনের কামড়ে তারা অতিষ্ঠ হয়েছিল।



وَالدَّمَ বা রক্ত। তাদের শাস্তিস্বরূপ এবার আল্লাহ তা‘আলা রক্ত দিলেন। খাদ্যে ও পান পাত্রে রক্ত, কুয়া ও পুকুরে রক্ত, তরি-তরকারীতে রক্ত, কলসি-বালতিতে রক্ত। খেতে বসলে সাথে সাথে থালা বাটিতে রক্ত ভরে যেত। পানি মুখে নেয়ামাত্র গ্লাস ভর্তি রক্ত হয়ে যেত। এসব আযাব দেয়ার পরেও তারা ঈমান আনেনি।



এদের এই হঠকারিতা ও কপট আচরণের কথা আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন এভাবে:



(فَاسْتَكْبَرُوْا وَكَانُوْا قَوْمًا مُّجْرِمِيْنَ)



“অতঃপর তারা অহঙ্কার করল আর তারা তো ছিল অপরাধী সম্প্রদায়।”



এছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে অনেক শাস্তি দিয়েছিলেন। সবশেষে তাদেরকে সদলবলে সাগরে ডুবিয়ে মারেন।



(وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِيْنَ كَانُوْا يُسْتَضْعَفُوْنَ)



অর্থাৎ যাদেরকে ফির‘আউন দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং যাদের ওপর নানাভাবে জুলুম করত, এদেরকে বরকতময় রাজ্য- শাম দেশের উত্তরাধিকারী বানাতে চান। সেখানে মহান আল্লাহ তা‘আলা আমালিকাদের পর বানী ইসরাঈলকে বিজয়ী করেন। মূসা ও হারূন (আঃ)-এর ইনতিকালের পর বানী ইসরাঈলরা শাম দেশে তখন গেলেন যখন ইউশা বিন নূম আমালেকাদেরকে পরাজিত করে বানী ইসরাঈলদের জন্য রাস্তা সহজ করে দিলেন।



(قَالُوْا يَا مُوسٰي اجْعَلْ لَّنَا إِلٰهًا)



অর্থাৎ যখন মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেলেন আর ফির‘আউন ও তার দলবল সমুদ্রে ডুবে গেল, ওপারে পার হয়ে বানী ইসরাঈল দেখল সেখানকার মানুষ প্রতিমা পূজা করছে।



ইবনু জুরাইজ (আঃ) বলেন: তারা গরুর মূর্তি বানিয়ে পূজা করত যার কারণে গো-বৎসের পূজা করতে বানী ইসরাঈলদের ইচ্ছা জাগে। তাই তারা মূসা (আঃ)-কে বলল: হে মূসা তাদের যেমন ইলাহ আছে তেমনি আমাদের ইলাহ বানিয়ে দাও।



আবূ ওকিদী আল লাইসি বলেন: সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে মক্কা থেকে হুনাইনে গমন করেন। বর্ণনাকারী বলেছেন: কাফিরদের একটি বরই গাছ ছিল যার নিচে তারা অবস্থান করত এবং অস্ত্র-সস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত।



তাকে ذات أنواط ‘যাতে আনওয়াত’ বলা হত। তিনি বলেছেন: আমরা সে সবুজ গাছটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা বললাম: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল! তাদের যেমন “যাতে আনওয়াত” আছে আমাদের তেমন কিছু বানিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললাম: সে সত্ত্বার শপথ! তোমরা তেমন কথা বলেছ যেমন কথা মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় মূসাকে বলেছিল



(اجْعَلْ لَّنَا إِلٰهًا كَمَا لَهُمْ اٰلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُوْنَ)



তাদের মত আমাদের জন্য মা‘বূদ বানিয়ে দিন। (ইবনু জারীর, ১৩/ ৮১- ৮২)



(وَوَاعَدْنَا مُوسٰي ثَلَاثِيْنَ لَيْلَةً)



অর্থাৎ ফির‘আউন ও তার দলবল ধ্বংস করার পর বানী ইসরাঈলদেরকে হিদায়াতের জন্য ধর্মগ্রন্থ দেবেন- এ জন্য মূসা (আঃ)-কে ত্রিশ রাত্রির জন্য তূর পাহাড়ে আহ্বান জানালেন। পরে আরো দশদিন যোগ করে চল্লিশ রাত্রি পূর্ণ করলেন।



পরের দশদিনের ব্যাপারে মুফাসসিরগণ মতানৈক্য করেছেন। অধিকাংশ মুফাসসির বলেন:



ত্রিশরাত বলতে যুলকাদা মাসের ত্রিশরাত আর দশ রাত বলতে যুলহজ্জের দশরাত।



ইবনু আব্বাস, মুজাহিদসহ প্রমুখ মুফাসসির বলেন: এ হিসেবে মূসা (আঃ)-এর নির্দিষ্ট সময় কুরবানীর দিন পূর্ণ হয়। এ দিনেই মূসা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেন আর এ দিনেই আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (আঃ)-এর ওপর দীন ইসলামকে পূর্ণ করে দেন। যেমন বলেন:



(الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا)



মূসা (আঃ) তূর পাহাড়ে যাবার সময় হারূন (আঃ)-কে বানী ইসরাঈলদের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। পরের আয়াতেই এর আলোচনা রয়েছে।



(لَنْ تَرَانِيْ)



মূসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে চাইলে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে বললেন: তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাবে না। অর্থাৎ দুনিয়াতে চর্মচোখ দ্বারা আমাকে কখনো দেখা সম্ভব না। আখিরাতে মু’মিনগণ আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে- এর প্রমাণাদি পূর্বের সূরায় আলোচনা করা হয়েছে।



(بِرِسٰلٰتِيْ وَبِكَلَامِيْ)



অর্থাৎ মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা‘আলা নবুওয়াত দান করলেন এবং সরাসরি তার সাথে কথা বললেন। আর তাদের যা প্রয়োজন ফলকে সবকিছু লিখে দিয়ে দিলেন-



মূসা (আঃ) চল্লিশ দিন পূর্ণ হবার পর লিখিত ফলকসহ ফিরে এসে যখন দেখলেন, তার উম্মাত গো-বৎস পূজায় লিপ্ত হয়ে গেছে তখন রাগে ফলক ফেলে দিলেন এবং হারূনের মাথা ধরে শাসাতে লাগলেন। পরে অবশ্য ফলক তুলে নিয়েছিলেন।



(وَاتَّخَذَ قَوْمُ مُوسٰي مِنْۭ بَعْدِه۪)



অর্থাৎ মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ রাত্রির জন্য তূর পাহাড়ে গেলেন, তখন সামেরী নামক জনৈক ব্যক্তি সম্প্রদায়ের সোনার অলঙ্কার জমা করে তা থেকে একটি বাছুর তৈরি করল। যার মধ্যে জিবরীল (আঃ)-এর ঘোড়ার পায়ের নীচের কিছু মাটি মিশিয়ে দিল যা তার কাছে রাখা ছিল এবং যার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা প্রাণ প্রতিষ্ঠার শক্তি রেখে দিলেন। যার কারণে বাছুরটি গরুর মত শব্দ করত। এ সম্পর্কে সূরা ত্বহার ৮৮-৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত আছে।



(وَاخْتَارَ مُوسٰي قَوْمَه۫ سَبْعِيْنَ)



মূসা (আঃ) নিজ জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করলেন তূর পাহাড়ে নিয়ে যাবার জন্য। এ সত্তরজন ব্যক্তি কারা ছিল তা নিয়ে অনেক মতামত রয়েছে।



একটি মত হল: যখন মূসা (আঃ) তাদেরকে তাওরাতের আহকাম শোনালেন, তারা বলল- আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, এ কিতাব সত্যিই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। যতক্ষণ আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে স্বয়ং কথা বলতে না শুনব ততক্ষণ এটাকে মানব না। সুতরাং তিনি সত্তর জন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন এবং তাদেরকে তূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বললেন যা তারাও শুনল। কিন্তু তারা নতুন দাবী করে বসল যতক্ষণ আল্লাহ তা‘আলাকে আমরা নিজ চোখে না দেখব ততক্ষণ ঈমান আনব না।



দ্বিতীয় মত হল: এ সত্তর জন ব্যক্তি হল তারা যাদেরকে পুরো জাতির তরফ হতে বাছুর পূজার মহাপাপ থেকে তাওবাহ করার জন্য তূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।



তৃতীয় মত হল: এ সত্তর জন ব্যক্তি বানী ইসরাঈলকে বাছুর পূজা করতে দেখেছিলেন। কিন্তু তারা নিষেধ করেনি। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ দ্বিতীয় মত গ্রহণ করেছেন।



(إِنَّا هُدْنَآ إِلَيْكَ)



‘আমরা তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছি’ এ আয়াত থেকেই অনেকে বলেন, মূসা (আঃ)-এর অনুসারীদেরকে এ জন্য ইয়াহূদী বলা হয়।



(وَرَحْمَتِيْ وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ)



এটি আল্লাহ তা‘আলার করুণার পরিব্যাপ্তি বটে যে, পৃথিবীতে সৎ অসৎ সবাই আল্লাহ তা‘আলার করুণা হতে উপকৃত হচ্ছে।



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলার রহমতের একশত অংশ আছে। তার মধ্যে একটি অংশ দুনিয়াতে দিয়েছেন। যার কারণে সকল সৃষ্টি একে অপরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে থাকে। এমনকি পশুরাও নিজ নিজ বাচ্চার ওপর মায়া করে নিজের পা তুলে নেয়। আর তিনি রহমতের নিরানব্বই ভাগ অংশ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন মু’মিনদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা এ দয়া প্রদর্শন করবেন। (সহীহ মুসলিম হা: ২১০৮, ইবনু মাযাহ হা. ৪২৯৩)



(الرَّسُوْلَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ)



উম্মি নাবী অর্থ হল, নিরক্ষর নাবী। যিনি লেখাপড়া জানেন না। এখানে উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মাদ (সাঃ)। কারণ তিনি লেখাপড়া জানতেন না।



(إِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ إِلَيْكُمْ جَمِيْعَا)



এ আয়াতও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত সার্বজনীন রিসালাত প্রমাণিত হবার জন্য স্পষ্ট দলীল, এতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে আদেশ করছেন যেন তিনি ঘোষণা করে দেন, হে বিশ্বের মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতির জন্য ত্রাণকর্তা ও রাসূল। তাই পরিত্রাণ ও সুপথ খৃস্ট ধর্মে নেই, ইয়াহূদী ধর্মে নেই এবং অন্য কোন ধর্মেও নেই। পরিত্রাণ ও সুফল যদি থাকে তাহলে কেবল ইসলাম ধর্মেই রয়েছে।



(يُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَكَلِمٰتِهِ)



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর কালেমার প্রতি ঈমান আনে, এখানে কালিমার কথা বলা হল। কালিমার পরিমাণ অন্যত্র উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ لَّوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِّكَلِمٰتِ رَبِّيْ لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَنْ تَنْفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّيْ وَلَوْ جِئْنَا بِمِثْلِه ۪ مَدَدًا)‏



“বল:‎ ‘আমার প্রতিপালকের কালিমা লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে- আমরা এটার সাহায্যের জন্য অনুরূপ আরও সমুদ্র আনলেও।’ (সূরা কাহ্ফ ১৮:১০৯)



অন্যত্র বলেন:



(وَلَوْ أَنَّ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَّالْبَحْرُ يَمُدُّه۫ مِنْۭ بَعْدِه۪ ۪ ۪ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمٰتُ اللّٰهِ ط إِنَّ اللّٰهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ)‏



“আর সমগ্র পৃথিবীতে যত গাছ আছে তা সবই যদি কলম হয় এবং যে সমুদ্র রয়েছে তার সাথে যদি আরও সাতটি সমুদ্র শামিল হয়ে কালি হয় তবুও আল্লাহ তা‘আলার কালিমা লেখা শেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা প্রতাপশালী, মহা প্রজ্ঞাময়।” (সূরা লুকমান ৩১:২৭)



আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আবূ বাকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ) এর মাঝে বিতর্ক হল, আবূ বকর (রাঃ) উমার (রাঃ) কে রাগিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর রাগান্বিত অবস্থায় উমার সেখান থেকে চলে গেলেন, আবূ বকর (রাঃ) তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে তাঁর পিছু নিলেন, কিন্তু উমার (রাঃ) ক্ষমা করলেন না, বরং তাঁর সম্মুখের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দরবারে আসলেন। আবূ দারদা (রাঃ) বলেন: আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে ছিলাম, ঘটনা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমাদের এ সঙ্গী আবূ বকর (রাঃ) আগে কল্যাণ লাভ করেছে। তিনি বলেন: এতে উমার (রাঃ) লজ্জিত হলেন এবং সালাম করে নাবী (সাঃ) এর পাশে বসে পড়লেন ও সব কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে বর্ণনা করলেন। আবূ দারদা (রাঃ) বলেন: এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অসন্তুষ্ট হলেন। আবূ বকর (রাঃ) বারবার বলছিলেন, হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ)! আমি অধিক দোষী ছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমরা আমার খাতিরে আমার সাথীর ক্রটি উপেক্ষা করবে কি? তোমরা আমার খাতিরে আমার সঙ্গীর ক্রটি উপেক্ষা করবে কি? এমন একদিন ছিল যখন আমি বলেছিলাম: হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সকলের জন্য রাসূল, তখন তোমরা বলেছিলে, “তুমি মিথ্যা বলেছ” আর আবূ বকর (রাঃ) বলেছিল, আপনি সত্য বলেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪০)



– أسْبَاطُ - (وَقَطَّعْنَاهُمُ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أَسْبَاطًا)



শব্দটি سَبْطٌ এর বহুবচন, অর্থ পৌত্র। এখানে গোত্রের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ইয়াকুব (আঃ)-এর বারটি সন্তান থেকে বারটি গোত্র আবির্ভূত হল। প্রত্যেক গোত্রের জন্য এক একটি দলপতি নিযুক্ত করেছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيْبًا)



“তাদের মধ্য হতে বার জন নেতা নিযুক্ত করেছিলাম” (সূরা মায়িদাহ ৫:১২)



পরের আয়াতগুলো সম্পর্কে সূরা বাক্বারায় আলোচনা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দীনের দাওয়াত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। যেমন মূসা (আঃ) ফির‘আউনের কাছে দিয়েছেন।

২. জাদু কুফরী কাজ, এর প্রভাব রয়েছে।

৩. দুনিয়ার সম্পদ মু’মিনদের উত্তরাধিকার করে দেয়া হয়েছে, কাফের-মুশরিকাদের কোন অংশ নেই। তবে মু’মিনদের ঈমান দুর্বল ও দীন থেকে সরে পড়ার কারণে কাফেররা এসকল সম্পদ দখল করে আছে।

৪. সত্যের নিদর্শন দেখে জাদুকররা ঈমান আনয়ন করেছে, শত বাধা ও হুমকি ঈমান থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

৫. বানী ইসরাঈলদের ওপর পরপর কয়েকটি আযাব প্রদান করে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল।

৬. মূসা (আঃ) সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেছেন।

৭. চর্ম চোখে আল্লাহ তা‘আলাকে দুনিয়াতে দেখা অসম্ভব।

৮. আল্লাহ তা‘আলা কথা বলেন এবং তাঁর কথার আওয়াজ রয়েছে।

৯. নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা জাহানের নাবী। তাঁর খবর যার কাছেই পৌঁছবে অতঃপর ঈমান আনবে না, সে কাফির।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১১৫-১১৬ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে হযরত মূসা (আঃ) ও যাদুকরদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংগ্রাম সম্পর্কীয় কথোপকথনের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যাদুকররা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমিই কি প্রথমে তোমার বিস্ময়কর বস্তু নিক্ষেপ করবে, না আমরাই প্রথমে নিক্ষেপ করবো?” হযরত মূসা (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “তোমরাই প্রথমে নিক্ষেপ কর।” এতে মূসা (আঃ)-এর নিপুণতা এই ছিল যে, প্রথমে জনগণ যাদুকরদের কলাকৌশল পর্যবেক্ষণ করবে এবং ঐ ব্যাপারে চিন্তা গবেষণা করবে। যখন তাদের এই প্রতারণামূলক কার্যকলাপের মহড়া শেষ হবে তখন তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সত্য ও বাস্তব কার্যকলাপের দিকে মনোযোগ দেবে যার জন্যে তারা অপেক্ষমান ছিল এবং সেটা তখন স্পষ্টরূপে তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কেননা, সত্য ও বাস্তব জিনিস অনুসন্ধানের পর তা প্রাপ্ত হলে সেটা অন্তরের উপর বেশী দাগ কেটে থাকে। আর হলোও তাই। এখন আল্লাহ বলেনঃ “যখন যাদুকরগণ তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো মাটিতে নিক্ষেপ করলো তখন তারা যাদুর মাধ্যমে দর্শকদের নযরবন্দী করে দিলো। তারা তখন এমনভাবে দেখতে থাকলো যে, যা কিছু তারা দেখতে আছে তা যেন সবই বাস্তব। অথচ ঐ লাঠিগুলো ও রজ্জ্বগুলো প্রকৃতপক্ষে লাঠি ও রজ্জ্বই ছিল। দর্শকদের শুধুমাত্র এটা ধারণা ও খেয়াল ছিল যে, ঐগুলো সাপ।” তাই ইরশাদ হচ্ছে- “তাদের যাদুর কারণে মনে হচ্ছিল যে, ওগুলো পিল পিল করে চলছে। এ দেখে মূসা (আঃ) আতংকিত হয়। তখন আমি (আল্লাহ) বললাম, ভয় করো না, জয়যুক্ত তুমিই হবে। তোমার লাঠিখানা তুমিও মাটিতে ফেলে দাও। এটা সাপ হয়ে গিয়ে ঐ সাপগুলোকে গিলে ফেলবে। এ যাদু তো প্রতারণা মাত্র। এই যাদুকরগণ কৃতকার্য হতে পারে না।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, পনেরো হাজার যাদুকর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যেক যাদুকরের সাথেই দড়ি ও লাঠি ছিল। মূসা (আঃ) তার ভাই হারূন (আঃ)-কে নিয়ে লাঠি খাড়া করে বেরিয়ে পড়লেন এবং প্রতিযোগিতার মাঠে হাযির হলেন। ফিরাউন সভাষদবর্গসহ সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিল। যাদুকরগণ সর্বপ্রথম যাদু দ্বারা হযরত মূসা (আঃ)-এর ন্যরবন্দী করে। তারপর ফিরাউন ও জনগণের চোখে ভেলকি লাগিয়ে দেয়। তারপর প্রত্যেক যাদুকর স্বীয় রঞ্জু ও লাঠি নিক্ষেপ করে। ওগুলো সাপ হয়ে যায়। সারা ময়দান সাপে ভরে যায়। একের উপর এক পিল পিল করে চলতে থাকে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজারেও বেশী। সবারই সাথে ছিল লাঠি ও রঞ্জু। সর্ব সাধারণেরও ন্যরবন্দী হয়ে যায়। সুতরাং মাঠের এই দৃশ্য দেখে সবাই ভীত হয়ে পড়ে। ইবনে আবি বাররাহ (রাঃ) বলেন যে, ফিরাউন সত্তর হাজার যাদুকরকে আহ্বান করেছিল। সর হাজার রঞ্জু ও সত্তর হাজার লাঠি সর্পের আকার ধারণ করে পিল পিল করে চলছিল। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা খুব বড় রকমের যাদু দেখিয়েছিল।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।