সূরা আন-নাযি‘আত (আয়াত: 46)
হরকত ছাড়া:
كأنهم يوم يرونها لم يلبثوا إلا عشية أو ضحاها ﴿٤٦﴾
হরকত সহ:
کَاَنَّهُمْ یَوْمَ یَرَوْنَهَا لَمْ یَلْبَثُوْۤا اِلَّا عَشِیَّۃً اَوْ ضُحٰهَا ﴿۴۶﴾
উচ্চারণ: কাআন্নাহুম ইয়াওমা ইয়ারাওনাহা-লাম ইয়ালবাছূইল্লা-‘আশিইইয়াতান আও দুহা- হা।
আল বায়ান: যেদিন তারা তা দেখবে, সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা (দুনিয়ায়) এক সন্ধ্যা বা এক সকালের বেশী অবস্থান করেনি।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৬. যেদিন তারা তা দেখতে পাবে সেদিন তাদের মনে হবে যেন তারা দুনিয়ায় মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক প্ৰভাত অবস্থান করেছে!(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যেদিন তারা তা দেখবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা (পৃথিবীতে) এক সন্ধ্যা বা এক সকালের বেশি অবস্থান করেনি।
আহসানুল বায়ান: ৪৬। যেদিন তারা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা পৃথিবীতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক প্রভাতকাল অবস্থান করেছে। [1]
মুজিবুর রহমান: যেদিন তারা এটা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা পৃথিবীতে এক সন্ধ্যা অথবা এক প্রভাতের অধিক অবস্থান করেনি।
ফযলুর রহমান: যেদিন তারা তা দেখতে পাবে, সেদিন মনে হবে যেন দুনিয়ায় তারা মাত্র একটি সন্ধ্যা কিংবা একটি সকাল অবস্থান করেছে।
মুহিউদ্দিন খান: যেদিন তারা একে দেখবে, সেদিন মনে হবে যেন তারা দুনিয়াতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছে।
জহুরুল হক: যেদিন তারা একে দেখবে সেদিন যেন তারা মাত্র এক সন্ধ্যাবেলা বা তার প্রভাতকাল ব্যতীত অবস্থান করে নি।
Sahih International: It will be, on the Day they see it, as though they had not remained [in the world] except for an afternoon or a morning thereof.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৬. যেদিন তারা তা দেখতে পাবে সেদিন তাদের মনে হবে যেন তারা দুনিয়ায় মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক প্ৰভাত অবস্থান করেছে!(১)
তাফসীর:
(১) দুনিয়ার জীবনের স্বল্পতার বিষয়বস্তুটি পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানেও বর্ণিত হয়েছে। যেমন, সূরা ইউনুস, আল-ইসরা, ত্বা-হা, আল-মুমিনুন, আর-রূম, ইয়াসীন ও আহকাফে এ দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৪৬। যেদিন তারা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা পৃথিবীতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক প্রভাতকাল অবস্থান করেছে। [1]
তাফসীর:
[1] عشية যোহর থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং ضحى সূর্যোদয় থেকে নিয়ে দুপুর পর্যন্ত সময়কে বলা হয়। অর্থাৎ, যখন কাফেররা জাহান্নামের আযাব প্রত্যক্ষ করবে তখন দুনিয়ার আরাম-বিলাসিতা এবং তার মজা সব কিছু ভুলে যাবে। আর তাদের এমন মনে হবে যে, তারা দুনিয়াতে পুরো একটি দিনও অবস্থান করেনি; বরং দিনের প্রথম ভাগ অথবা শেষ ভাগ কেবলমাত্র অবস্থান করেছিল। অর্থাৎ, পার্থিব জীবনটা তাদের কাছে খুবই স্বল্পক্ষণের মনে হবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৪-৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর:
(الطَّامَّةُ الْكُبْرٰي)
(মহা সংকট) কিয়ামতের অন্যতম নাম। কেননা সে দিন হবে খুবই ভয়াবহ ও গোলযোগপূর্ণ দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهٰي وَأَمَرُّ)
“অধিকন্তু কিয়ামত তাদের আযাবের নির্ধারিতকাল এবং কিয়ামত হবে কঠিনতর ও তিক্তকর।” (সূরা কামার ৫৪ : ৪৬)
কিয়ামত দিবসে মানুষ তার ভাল-মন্দ প্রত্যেক আমল প্রত্যক্ষ করবে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَجِایْ۬ ئَ یَوْمَئِذٍۭ بِجَھَنَّمَﺃ یَوْمَئِذٍ یَّتَذَکَّرُ الْاِنْسَانُ وَاَنّٰی لَھُ الذِّکْرٰی)
“এবং সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে?” (সূরা ফাজর ৮৯: ২৩)
(وَبُرِّزَتِ الْـجَحِيْمُ)
অর্থাৎ أظهرت বা প্রত্যেক কাফিরদের জন্য জাহান্নাম প্রকাশ করে দেয়া হবে যাতে তাদের আফসোস আরো বেড়ে যায়। কোন কোন আলেম বলেন: মু’মিনরাও কাফিরদের মত জাহান্নাম দেখবে। মু’মিনরা তা দেখে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে যে, ঈমান ও আমলের বদৌলতে তিনি তাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেছেন।
طَغٰي অর্থাৎ যারা কুফরী ও পাপ কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, দুনিয়া হাসিল করতে দীন ঠিক থাকল, না লংঘন হল তার তোয়াক্কা করে না তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ তা‘আলার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে অর্থাৎ সে জানে যে, একদিন আমার মরণ হবে, আমার ভাল-মন্দ কর্মের হিসাব দিতে হবে এবং এ বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করে আর নিজের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, মনে যা চায় তাই করে নাÑতাদের ঠিকানা জান্নাত।
(أَيَّانَ مُرْسَاهَا)
অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা নাবী (সাঃ)-কে কিয়ামত সংঘঠিত হওয়ার ব্যাপারকে অবজ্ঞা করে জিজ্ঞাসা করে তা কখন হবে? আল্লাহ তা‘আলা বলে দিচ্ছেন : এ বিষয়ে তোমার ও কোন মাখলুকের জ্ঞান নেই। বরং আল্লাহ তা‘আলাই জানেন কখন কিয়ামত সংঘটিত হবে। জিবরীল (আঃ) নাবী (সাঃ)-কে কিয়ামত কখন হবে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে জবাবে বলেন :
مَا المَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ
অর্থ : এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে অধিক অবগত নয়। (সহীহ মুসলিম, মিশকাত হা. ০১)
(أَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَّخْشَاهَا)
অর্থাৎ তোমাকে প্রেরণ করেছি কেবল মানুষকে আমার শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য। অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করবে ও তোমার অনুসরণ করবে তারাই সফলকাম ও নাজাত প্রাপ্ত হবে।
عَشِيَّةً - (عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا)
অর্থ সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়। ضُحَا অর্থ সূর্যোদয় থেকে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া পর্যন্ত সময়। অর্থাৎ মানুষ যখন স্ব-স্ব কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে সমবেত হবে তখন পৃথিবীর জীবনকাল তাদের কাছে খুবই কম সময় বলে গণ্য হবে। তাদের মনে হবে তারা দুনিয়াতে দিনের এক বিকাল বা দিনের প্রথম ভাগের কিছু সময় অবস্থান করেছে। কাতাদাহ (রহঃ) বলেন : কাফিররা যখন আখিরাত প্রত্যক্ষ করবে তখন তাদের কাছে দুনিয়ার জীবন এরূপ মনে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেক মানুষের কিয়ামতের দিন তার ভাল-মন্দ সকল আমলের কথা স্মরণ হবে।
২. জাহান্নামকে প্রকাশ করে দেয়ার হেকমত জানলাম।
৩. যারা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে আখিরাতকে ভুলে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হয় তাদের ঠিকানা জাহান্নাম।
৪. যারা নিজের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ফযীলত জানলাম।
৫. কাফিরদের দৃষ্টিতে আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন অতি নগণ্য মনে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৪-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর
(আরবি) দ্বারা কিয়ামতের দিন উদ্দেশ্য। কেননা, ঐদিন হবে খুবই ভয়াবহ ও গোলযোগপূর্ণ দিন। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত বড়ই কঠিন ও অপছন্দনীয় দিন।” (৫৪:৪৬) যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “সেই দিন মানুষ উপদেশ গ্রহণ করবে, কিন্তু তখন উপদেশ গ্রহণে কি কাজ হবে?” (৮৯:২৩) অর্থাৎ ঐ সময় উপদেশ গ্রহণে কোনই উপকার হবে। মানুষের সামনে জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে। তারা ঐ জাহান্নাম স্বচক্ষে দেখবে। পার্থিব জীবনে যারা শুধু পার্থিব চিন্তায় ও তৎপরতায় লিপ্ত ছিল, সেই দিন তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। তাদের খাদ্য হবে যাককূম নামক গাছ এবং পানীয় হবে হামীম বা ফুটন্ত পানি। তবে হ্যা, যারা আল্লাহ তা'আলার সামনে দখুন হওয়ার ভয় করেছে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজেদেরকে বিরত রেখেছে, তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। সেখানে তারা সর্বপ্রকারের নিয়ামত লাভ করবে।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে একথা তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে। তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ আমি সেটা জানি না এবং শুধু আমি কেন, আল্লাহর মাখলুকাতের মধ্যে কেউই তা জানে না। এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। ওটা আকাশ ও পৃথিবীর উপর বোঝা হয়ে আছে, অকস্মাৎ এসে পড়বে। জনগণ তোমাকে এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যে, যেন তুমি সেটা জান। অথচ মহামহিমান্বিত আল্লাহ ছাড়া সে সম্পর্কে কারো কোন জ্ঞান নেই।
হযরত জিবরাঈল (আঃ) যখন মানুষের রূপ ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করেন তখন তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। তাকে কিয়ামতের দিন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি বলেন “জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা বেশী জানে না।”
আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ হে নবী (সঃ)! যে এর ভয় রাখে তুমি শুধু তাকেই সতর্ককারী। অর্থাৎ তুমি একজন সতর্ককারী মাত্র। যারা ঐ ভয়াবহ দিনকে ভয় করে তারাই শুধু এতে লাভবান হবে। তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করবে বলে সেই দিনের ভয়াবহতা থেকে তারা রক্ষা পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যারা তোমার সতর্কীকরণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে না, বরং তোমার বিরোধিতা করবে তারা সেই দিন নিকৃষ্ট ধরনের ধ্বংসাত্মক আযাবের কবলে পতিত হবে।
মানুষ যখন নিজেদের কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে সমবেত হবে তখন পৃথিবীর জীবনকাল তাদের কাছে খুবই কম বলে অনুভূত হবে। তাদের মনে হবে যে, তারা যেন সকাল বেলার কিছু অংশ অথবা বিকেল বেলার কিছু অংশ পৃথিবীতে অতিবাহিত করেছে।
যুহরের সময় থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে (আরবি) বলা হয় এবং সূর্যোদয় থেকে নিয়ে অর্ধ দিন পর্যন্ত সময়কে (আরবি) বলা হয়। অর্থাৎ আখিরাতের তুলনায় পৃথিবীর সুদীর্ঘ বয়সকেও অতি অল্পকাল বলে মনে হবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।